শিক্ষায় সংকট, বেকারত্বের হতাশা— জিডিপি বাড়লেও ফুঁসছে ভারতের তরুণরা

জয়ন্ত রায় চৌধুরী
আপডেট : ২৫ জুলাই ২০২৬, ১৭: ৪৩
২২ জুলাই নয়া দিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া আন্দোলনকারীদের নিয়ন্ত্রণে মানববন্ধন তৈরি করেছেন ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) সমর্থকরা। ছবি: রয়টার্স

দুপুর অনেক আগেই গড়িয়ে গেছে। দিল্লির ঝাপসা রোদের নিচে হাজারো তরুণ-তরুণী বসে আছেন আন্দোলনের মঞ্চে। কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা এই আন্দোলন গতকাল শুক্রবার নতুন গতি পায়, যখন ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে সরকারকে চাপে ফেলতে দেশব্যাপী আন্দোলনের ডাক দেয়।

জনপথের ইম্পেরিয়াল হোটেল থেকে অষ্টাদশ শতকে জয়পুরের শাসক সাওয়াই মান সিং নির্মিত যন্তর মন্তরের দিকে যাওয়া সরু সড়কটি ব্যারিকেড দিয়ে বন্ধ করে রেখেছে পুলিশ। দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে নিয়োজিত পুলিশ সদস্যরা তিন সারিতে অবস্থান নিয়েছেন। কিন্তু তাতেও থেমে নেই আন্দোলনকারীরা।

দিল্লি ও আশপাশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি গুয়াহাটি, পুনে-সহ দেশের নানা প্রান্ত থেকে আসা তরুণ-তরুণীরা পুলিশের ব্যারিকেড এড়িয়ে আন্দোলনস্থলে পৌঁছে যাচ্ছেন। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নজর কাড়া এই আন্দোলনে যোগ দিচ্ছেন তারা।

গাজিয়াবাদের ২১ বছর বয়সী প্রকৌশল শিক্ষার্থী কৌস্তভ দত্ত বলেন, ‘আমি এসেছি কারণ সোমবার কোনো কারণ ছাড়াই শিক্ষার্থীদের নির্মমভাবে পেটানো হয়েছে। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। শিক্ষার্থীরা সেই ব্যবস্থার সংস্কার ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছিল। তাহলে তাদের অপরাধীর মতো আচরণ করা হবে কেন?’

চলতি বছরের মে মাসে দেশ জুড়ে মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজে ভর্তির জন্য অনুষ্ঠিত ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি এন্ট্রান্স টেস্টে (নিট) প্রশ্নফাঁস ও নানা অনিয়মের অভিযোগের প্রতিবাদে কয়েক সপ্তাহ আগে সিজেপি এই আন্দোলন শুরু করে। তবে সোমবার পুলিশ আন্দোলনকারীদের ওপর দমন-পীড়ন চালানোর পর আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়। পুলিশ অনেককে ধাওয়া করে মারধর করে। এতে চোখ ও মাথায় আঘাত পাওয়া বহু শিক্ষার্থীসহ অনেককে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়।

তবে ভারতের তরুণদের কাছে ত্রুটিপূর্ণ এই পরীক্ষা এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ ছিল বহুদিনের জমে থাকা ক্ষোভের শেষ বিস্ফোরণ। ১৯৯০-এর দশক থেকে ভারতের তরুণ জনগোষ্ঠী, শিক্ষার হার এবং মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) দ্রুত বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি। ফলে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা হতাশা সামান্য একটি স্ফুলিঙ্গেই বড় আন্দোলনের রূপ নিয়েছে।

ভারতে বর্তমানে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩৬ কোটি ৭০ লাখ। অনেকের মতে, এটিই বিশ্বের সবচেয়ে বড় তরুণ জনগোষ্ঠী। দীর্ঘদিন ধরে এটিকে ভারতের ‘যুব জনমিতিক সুবিধা’ বা ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো মোটেও সহজ হয়নি।

ভারতের অর্থনীতি বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলোর মধ্যে অন্যতম দ্রুতগতিতে বেড়েছে। অনেক সময় জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশেরও বেশি হয়েছে। কিন্তু সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকোনমির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুনে দেশটির বেকারত্বের হার ছিল প্রায় ৬ দশমিক ৬৪ শতাংশ, যা দীর্ঘদিন ধরেই উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।

স্নাতকদের মধ্যে বেকারত্ব আরও বেশি। চলতি বছর প্রকাশিত আজিম প্রেমজি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ২৫ থেকে ২৯ বছর বয়সী স্নাতকদের মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশই বেকার।

দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (জেএনইউ) সাবেক অর্থনীতি অধ্যাপক বিশ্বজিৎ ধর ইউনাইটেড নিউজ অব ইন্ডিয়াকে (ইউএনআই) বলেন, ‘এই আন্দোলনগুলো দেখিয়ে দিচ্ছে যে, বহুল আলোচিত জনমিতিক সুবিধাকে আমরা সেই অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে রূপ দিতে পারিনি, যার প্রতিশ্রুতি বেশি শিক্ষিত নতুন প্রজন্মকে দেওয়া হয়েছিল।’

‘স্টেট অব ওয়ার্কিং ইন্ডিয়া ২০২৬’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০০৪-০৫ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৫০ লাখ স্নাতক যুক্ত হলেও চাকরি পেয়েছেন মাত্র প্রায় ২৮ লাখ। আর তাদের মধ্যেও বেতনভিত্তিক চাকরিতে প্রবেশ করতে পেরেছেন আরও কমসংখ্যক মানুষ। ফলে স্নাতকদের বেকারত্ব বেড়েছে এবং আয়ের প্রবৃদ্ধিও ধীর হয়ে পড়েছে।

কানপুরের স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী প্রীতি মিশ্র বর্তমানে দক্ষিণ-পূর্ব দিল্লির একটি পেইং গেস্ট আবাসনে থাকেন। সরকারি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরির জন্য বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন তিনি। প্রীতি বলেন, ‘চাকরি পেলেও শুরুর বেতন এত কম যে এখনো বাবা-মায়ের ওপর নির্ভর করতে হয়।’

মানবসম্পদ খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ভারতের অনেক জায়গায় প্রকৌশলীদের মাসিক শুরুর বেতন মাত্র ৩০ হাজার রুপি। মানবসম্পদ পরামর্শকদের মতে, গত আট থেকে ১০ বছরে এই অঙ্কে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। প্রীতি বলেন, ‘ভালো মানের চাকরি খুবই কম। তাই সবাই প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার দিকে ঝুঁকছে। এখন আশঙ্কা হচ্ছে, সেই পরীক্ষাগুলোও সাধারণ তরুণদের জন্য ক্রমেই অন্যায্য হয়ে উঠছে।’

অন্যদিকে, ভারতে উচ্চশিক্ষায় ভর্তির হার ২০০০ সালে ১০ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৬ সালে প্রায় ৩০ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন দেশটিতে শিক্ষিত তরুণের সংখ্যা বেশি।

কৌস্তভ দত্ত বলেন, ‘এসব বিষয় সব সময়ই আমাদের ভাবায়। আমার বাবা একজন কৃষক। আমি ও আমার ভাইবোনদের পড়াশোনার জন্য তিনি ঋণ নিয়েছেন। আমরা কি এমন চাকরি পাব, যা আমাদের পরিবারের অবস্থার উন্নতি করবে? নাকি চাকরির ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হব, পরীক্ষায় প্রতারিত হব?’

হঠাৎ চারপাশে জোরে স্লোগান শোনা যায়। সিজেপি নেতা অভিজিৎ দিপকে ঘোষণা দেন— এবার সবাই দাঁড়িয়ে জাতীয় সংগীত গাওয়ার সময়।

ঘামে ভেজা, কিন্তু গর্বে উজ্জ্বল মুখগুলো একসঙ্গে গাইতে শুরু করে ভারতের জাতীয় সংগীত ‘জন গণ মন’। শিক্ষার্থীদের নিয়ন্ত্রণে লাঠি হাতে দায়িত্ব পালন করা পুলিশ সদস্যরাও তখন সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে যান। কিছুক্ষণের জন্য হলেও দিল্লির মেঘাচ্ছন্ন আকাশ ভেদ করে সূর্যের আলো উঁকি দেয়।

লেখক: ভারতীয় সংবাদ সংস্থা ইউএনআই-এর সম্পাদক

Ad
Ad
ad
ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

সাংঘর্ষিক রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসার লক্ষণ এখনো দৃশ্যমান নয়

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সূক্ষ্মতা স্পষ্ট করা দরকার— আমি রাজনৈতিক প্রতিবাদ বা আন্দোলনকে অন্যায় বলছি না। আমার মূল যুক্তিটি প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক নিয়ে— রাজপথকে যদি প্রধান রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে রাখা হয়, তাহলে সংসদীয় গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

১৬ দিন আগে

খাদ্য নিরাপত্তা— নতুন নেতৃত্বে নতুন প্রত্যাশা

মানুষের জীবনে কিছু প্রয়োজন আছে, যেগুলো নিয়ে কোনো আপস চলে না। খাদ্য তার প্রথম সারিতে। সকালে শ্রমজীবী মানুষের নাশতার রুটি, দুপুরে পরিবারের ভাতের হাঁড়ি, কৃষকের গোলায় ধান কিংবা দুর্যোগে অসহায় মানুষের হাতে পৌঁছে যাওয়া খাদ্যসহায়তা—সবকিছুর পেছনেই রয়েছে একটি বিশাল রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা। সেই ব্যবস্থাপনার কেন

১৮ দিন আগে

পিংক বাস: একটি রঙ, একটি পরিবর্তন ও অনেক প্রশ্ন

বাংলাদেশের গণপরিবহনে নারীদের জন্য ‘পিংক বাস’ চালু হওয়া নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ঢাকার রাস্তায় যখন নারী চালক, নারী সহকারী আর নারী যাত্রীদের নিয়ে বাস চলছে, তখন সেটা দেখতে ভালো লাগে। কিন্তু এই ভালো লাগার ভেতরেই কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন লুকিয়ে আছে, যে প্রশ্নগুলো শুধু বাসের রং নিয়ে নয়, বরং আ

১৯ দিন আগে

আমরা যা দেখাই, আমরা কি সত্যিই তাই?

মানুষের একটা অদ্ভুত স্বভাব আছে— সে নিজেকে যেমন, তার চেয়ে একটু ভালো করে দেখাতে চায়। আগে এই প্রবণতার সীমা ছিল পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন, অফিস কিংবা বন্ধুমহল পর্যন্ত। এখন সেই ছোট পরিসরটি বিস্ফোরিত হয়ে গেছে। হাতে একটি স্মার্টফোন, সামনে একটি ক্যামেরা, আর পেছনে কোটি কোটি দর্শকের সম্ভাবনা। ফলে মানুষ এখন

২০ দিন আগে
Advertisement