
এ কে এম মাহফুজুর রহমান

প্রযুক্তির অভূতপূর্ব অগ্রগতি মানুষের জীবনকে সহজ, দ্রুত এবং বিশ্বসংযুক্ত করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর এই বিশ্ব নতুন কিছু সামাজিক, মানসিক ও শিক্ষাগত সংকটও তৈরি করেছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্ফোরণমূলক বিস্তার শিশু, কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের বিকাশ, শিক্ষাগ্রহণ, নৈতিকতা, সৃজনশীলতা এবং সামাজিক সম্পর্কের ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে।
বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৫.৩ বিলিয়ন মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে, যা বৈশ্বিক জনসংখ্যার ৬৫ শতাংশেরও বেশি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জরিপে দেখা যায়, কিশোর-কিশোরীদের একটি বড় অংশ প্রতিদিন ৩ থেকে ৭ ঘণ্টা পর্যন্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় ব্যয় করে। অনেক ক্ষেত্রে এই সময় পড়াশোনা, খেলাধুলা বা পারিবারিক যোগাযোগের সময়কেও ছাড়িয়ে যায়। ফলে বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ভার্চুয়াল জগতের ওপর অতিনির্ভরশীল একটি প্রজন্ম গড়ে ওঠার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মনোবিজ্ঞান ও স্নায়ুবিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা গেছে, টিকটক, ফেসবুক রিলস, ইউটিউব শর্টস এবং ইনস্টাগ্রাম রিলসের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহারকারীর মস্তিষ্কে দ্রুত ডোপামিন নিঃসরণ ঘটায়, যা আচরণগত আসক্তির জন্ম দেয়। বিশ্বখ্যাত মনোবিজ্ঞানী ড. জিন টোয়েঞ্জ তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার কিশোরদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্ণতা, একাকীত্ব, আত্মবিশ্বাসহীনতা এবং ঘুমের সমস্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও দক্ষিণ কোরিয়ার গবেষণাগুলোও একই ধরনের ফলাফল তুলে ধরেছে। অনেক দেশ এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে শুধু প্রযুক্তিগত নয়, জনস্বাস্থ্য ও মানসিক স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আজ তথ্য আদান-প্রদানের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলেও এর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার ক্রমেই সমাজের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে। ব্যক্তিগত আক্রমণ, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা, মিথ্যা তথ্য, গুজব, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য, অশালীন ভাষা এবং আক্রমণাত্মক আচরণ সামাজিক সম্প্রীতি ও জনবিশ্বাসকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বিশেষ করে শিশু ও কিশোর-কিশোরীরা এসব নেতিবাচক বিষয়বস্তুর প্রভাবে মানসিক, নৈতিক ও শিক্ষাগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এ কারণেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশ শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বয়সভিত্তিক সীমাবদ্ধতা, অভিভাবকীয় তদারকি এবং ক্ষতিকর কনটেন্ট অপসারণে আইনগত বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছে। আমাদের দেশেও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রেখে মিথ্যা তথ্য, অনলাইন হয়রানি, বিদ্বেষমূলক প্রচারণা এবং অসামাজিক আচরণ রোধে কার্যকর আইন প্রণয়ন সময়ের দাবি। এর মাধ্যমে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, সামাজিক মূল্যবোধ সুরক্ষিত থাকবে এবং একটি দায়িত্বশীল ডিজিটাল সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
শিক্ষাক্ষেত্রে এর প্রভাব আরও উদ্বেগজনক। একজন শিক্ষার্থী যখন প্রতি কয়েক সেকেন্ডে নতুন ভিডিও, নতুন ছবি বা নতুন তথ্যের সংস্পর্শে আসে, তখন তার মস্তিষ্ক ধৈর্যশীল শিক্ষার পরিবর্তে তাৎক্ষণিক উদ্দীপনায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। ফলে বই পড়া, গবেষণা করা, বিশ্লেষণধর্মী চিন্তা করা এবং দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রাখার মতো দক্ষতা দুর্বল হতে থাকে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, যারা প্রতিদিন অতিরিক্ত সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যয় করে, তাদের একাডেমিক ফলাফল তুলনামূলকভাবে দুর্বল হওয়ার প্রবণতা বেশি। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন শিশুদের মূল্যবোধ গঠনের অন্যতম উৎসে পরিণত হয়েছে। অথচ এই প্ল্যাটফর্মগুলোর অ্যালগরিদম মূলত ব্যবহারকারীর মনোযোগ ধরে রাখার জন্য উত্তেজনাপূর্ণ, বিতর্কিত এবং আবেগনির্ভর কনটেন্টকে বেশি প্রচার করে। ফলে ভুয়া তথ্য, ঘৃণামূলক বক্তব্য, সহিংসতা, অশ্লীলতা, অনলাইন জুয়া, সাইবার বুলিং এবং ভোগবাদী সংস্কৃতির বিস্তার তরুণদের মানসিক ও নৈতিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষতিকর প্রভাব শুধু শিশু ও শিক্ষার্থীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী, পেশাজীবী এবং কর্মজীবী জনগোষ্ঠীর মধ্যেও এর প্রভাব ক্রমশ দৃশ্যমান। কর্মঘণ্টার মধ্যে ঘন ঘন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার মনোযোগ বিচ্ছিন্ন করে, উৎপাদনশীলতা কমায় এবং সৃজনশীল চিন্তাকে বাধাগ্রস্ত করে। গবেষণায় দেখা গেছে, একটি ডিজিটাল বিঘ্নের পর একজন কর্মীর পূর্ণ মনোযোগ কাজে ফিরিয়ে আনতে গড়ে ২০ থেকে ২৫ মিনিট পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। এর ফলে কর্মদক্ষতা, উদ্ভাবনী ক্ষমতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের সামগ্রিক কার্যকারিতা ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য, যেখানে মানবসম্পদই সবচেয়ে বড় সম্পদ, এই প্রবণতা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক।
বাংলাদেশেও পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। শহর থেকে গ্রাম— প্রায় সর্বত্রই শিশুদের হাতে স্মার্টফোন পৌঁছে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে দুই বা তিন বছর বয়সী শিশুকেও খাবার খাওয়ানোর জন্য মোবাইল ফোন দেওয়া হচ্ছে। ফলে ভাষা শিক্ষা, সামাজিক যোগাযোগ দক্ষতা, মনোযোগের বিকাশ এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিকাশধারা ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে পারিবারিক বন্ধনও দুর্বল হচ্ছে। একসময় পরিবার ছিল সামাজিক শিক্ষার প্রথম বিদ্যালয়; এখন একই ঘরে বসেও পরিবারের সদস্যরা একে অপরের সঙ্গে কথা বলার পরিবর্তে নিজ নিজ স্ক্রিনে ব্যস্ত থাকেন। এতে পারিবারিক যোগাযোগ, মূল্যবোধ শিক্ষা এবং সামাজিক সম্প্রীতির ভিত্তি ক্রমশ ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে।
এ কারণেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ শুরু করেছে। অস্ট্রেলিয়া ১৬ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার সীমিত করার লক্ষ্যে যুগান্তকারী আইন প্রণয়ন করেছে। ফ্রান্সে অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া নির্দিষ্ট বয়সের নিচে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে। চীন শিশু ও কিশোরদের অনলাইন গেমিং ও ডিজিটাল ব্যবহারের সময়সীমা নির্ধারণ করেছে। দক্ষিণ কোরিয়া দীর্ঘদিন ধরে অনলাইন আসক্তি মোকাবিলায় বিশেষ নীতি অনুসরণ করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন শিশুদের জন্য অ্যালগরিদমনির্ভর কনটেন্ট সুপারিশ, অটোপ্লে, অসীম স্ক্রলিং এবং ক্ষতিকর কনটেন্ট প্রচার সীমিত করার জন্য বিভিন্ন নীতিমালা বাস্তবায়ন করছে। এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো প্রযুক্তিকে নিষিদ্ধ করা নয়, বরং শিশু ও তরুণদের সুরক্ষিত রাখা এবং একটি সুস্থ ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশেও এখন সময় এসেছে বিষয়টিকে কেবল প্রযুক্তিগত বা ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় হিসেবে না দেখে জাতীয় উন্নয়ন, মানবসম্পদ গঠন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষার প্রশ্ন হিসেবে বিবেচনা করার। এ লক্ষ্যে ১৬ বছরের নিচে বয়সভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্মার্টফোন ব্যবহারের নীতিমালা, বাধ্যতামূলক বয়স যাচাই ব্যবস্থা, শিশুদের জন্য নিরাপদ ও শিক্ষামূলক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, অভিভাবক ও শিক্ষকদের জন্য ডিজিটাল সাক্ষরতা কর্মসূচি এবং জাতীয় পর্যায়ে নিয়মিত গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা নয়, বরং দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য। কারণ একটি জাতির সবচেয়ে বড় সম্পদ তার মানবসম্পদ। শিশু ও তরুণদের মনন, সৃজনশীলতা, নৈতিকতা এবং মানসিক সুস্থতা রক্ষা করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। আজকের শিশুরাই আগামী দিনের বাংলাদেশ; তাই তাদের নিরাপদ, সৃজনশীল ও সুস্থ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতেই হবে।
লেখক: কলামিস্ট; সাবেক সহসভাপতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি; উপপরিচালক ও প্রধান, ফ্যাকাল্টি এইচআর অফিস, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি

প্রযুক্তির অভূতপূর্ব অগ্রগতি মানুষের জীবনকে সহজ, দ্রুত এবং বিশ্বসংযুক্ত করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর এই বিশ্ব নতুন কিছু সামাজিক, মানসিক ও শিক্ষাগত সংকটও তৈরি করেছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্ফোরণমূলক বিস্তার শিশু, কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের বিকাশ, শিক্ষাগ্রহণ, নৈতিকতা, সৃজনশীলতা এবং সামাজিক সম্পর্কের ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে।
বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৫.৩ বিলিয়ন মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে, যা বৈশ্বিক জনসংখ্যার ৬৫ শতাংশেরও বেশি। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জরিপে দেখা যায়, কিশোর-কিশোরীদের একটি বড় অংশ প্রতিদিন ৩ থেকে ৭ ঘণ্টা পর্যন্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় ব্যয় করে। অনেক ক্ষেত্রে এই সময় পড়াশোনা, খেলাধুলা বা পারিবারিক যোগাযোগের সময়কেও ছাড়িয়ে যায়। ফলে বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ভার্চুয়াল জগতের ওপর অতিনির্ভরশীল একটি প্রজন্ম গড়ে ওঠার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মনোবিজ্ঞান ও স্নায়ুবিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা গেছে, টিকটক, ফেসবুক রিলস, ইউটিউব শর্টস এবং ইনস্টাগ্রাম রিলসের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহারকারীর মস্তিষ্কে দ্রুত ডোপামিন নিঃসরণ ঘটায়, যা আচরণগত আসক্তির জন্ম দেয়। বিশ্বখ্যাত মনোবিজ্ঞানী ড. জিন টোয়েঞ্জ তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার কিশোরদের মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্ণতা, একাকীত্ব, আত্মবিশ্বাসহীনতা এবং ঘুমের সমস্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও দক্ষিণ কোরিয়ার গবেষণাগুলোও একই ধরনের ফলাফল তুলে ধরেছে। অনেক দেশ এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে শুধু প্রযুক্তিগত নয়, জনস্বাস্থ্য ও মানসিক স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আজ তথ্য আদান-প্রদানের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলেও এর অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার ক্রমেই সমাজের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠছে। ব্যক্তিগত আক্রমণ, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা, মিথ্যা তথ্য, গুজব, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য, অশালীন ভাষা এবং আক্রমণাত্মক আচরণ সামাজিক সম্প্রীতি ও জনবিশ্বাসকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বিশেষ করে শিশু ও কিশোর-কিশোরীরা এসব নেতিবাচক বিষয়বস্তুর প্রভাবে মানসিক, নৈতিক ও শিক্ষাগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এ কারণেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন দেশ শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বয়সভিত্তিক সীমাবদ্ধতা, অভিভাবকীয় তদারকি এবং ক্ষতিকর কনটেন্ট অপসারণে আইনগত বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছে। আমাদের দেশেও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রেখে মিথ্যা তথ্য, অনলাইন হয়রানি, বিদ্বেষমূলক প্রচারণা এবং অসামাজিক আচরণ রোধে কার্যকর আইন প্রণয়ন সময়ের দাবি। এর মাধ্যমে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, সামাজিক মূল্যবোধ সুরক্ষিত থাকবে এবং একটি দায়িত্বশীল ডিজিটাল সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
শিক্ষাক্ষেত্রে এর প্রভাব আরও উদ্বেগজনক। একজন শিক্ষার্থী যখন প্রতি কয়েক সেকেন্ডে নতুন ভিডিও, নতুন ছবি বা নতুন তথ্যের সংস্পর্শে আসে, তখন তার মস্তিষ্ক ধৈর্যশীল শিক্ষার পরিবর্তে তাৎক্ষণিক উদ্দীপনায় অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। ফলে বই পড়া, গবেষণা করা, বিশ্লেষণধর্মী চিন্তা করা এবং দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রাখার মতো দক্ষতা দুর্বল হতে থাকে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, যারা প্রতিদিন অতিরিক্ত সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যয় করে, তাদের একাডেমিক ফলাফল তুলনামূলকভাবে দুর্বল হওয়ার প্রবণতা বেশি। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন শিশুদের মূল্যবোধ গঠনের অন্যতম উৎসে পরিণত হয়েছে। অথচ এই প্ল্যাটফর্মগুলোর অ্যালগরিদম মূলত ব্যবহারকারীর মনোযোগ ধরে রাখার জন্য উত্তেজনাপূর্ণ, বিতর্কিত এবং আবেগনির্ভর কনটেন্টকে বেশি প্রচার করে। ফলে ভুয়া তথ্য, ঘৃণামূলক বক্তব্য, সহিংসতা, অশ্লীলতা, অনলাইন জুয়া, সাইবার বুলিং এবং ভোগবাদী সংস্কৃতির বিস্তার তরুণদের মানসিক ও নৈতিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষতিকর প্রভাব শুধু শিশু ও শিক্ষার্থীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী, পেশাজীবী এবং কর্মজীবী জনগোষ্ঠীর মধ্যেও এর প্রভাব ক্রমশ দৃশ্যমান। কর্মঘণ্টার মধ্যে ঘন ঘন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার মনোযোগ বিচ্ছিন্ন করে, উৎপাদনশীলতা কমায় এবং সৃজনশীল চিন্তাকে বাধাগ্রস্ত করে। গবেষণায় দেখা গেছে, একটি ডিজিটাল বিঘ্নের পর একজন কর্মীর পূর্ণ মনোযোগ কাজে ফিরিয়ে আনতে গড়ে ২০ থেকে ২৫ মিনিট পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। এর ফলে কর্মদক্ষতা, উদ্ভাবনী ক্ষমতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের সামগ্রিক কার্যকারিতা ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য, যেখানে মানবসম্পদই সবচেয়ে বড় সম্পদ, এই প্রবণতা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক।
বাংলাদেশেও পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। শহর থেকে গ্রাম— প্রায় সর্বত্রই শিশুদের হাতে স্মার্টফোন পৌঁছে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে দুই বা তিন বছর বয়সী শিশুকেও খাবার খাওয়ানোর জন্য মোবাইল ফোন দেওয়া হচ্ছে। ফলে ভাষা শিক্ষা, সামাজিক যোগাযোগ দক্ষতা, মনোযোগের বিকাশ এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিকাশধারা ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে পারিবারিক বন্ধনও দুর্বল হচ্ছে। একসময় পরিবার ছিল সামাজিক শিক্ষার প্রথম বিদ্যালয়; এখন একই ঘরে বসেও পরিবারের সদস্যরা একে অপরের সঙ্গে কথা বলার পরিবর্তে নিজ নিজ স্ক্রিনে ব্যস্ত থাকেন। এতে পারিবারিক যোগাযোগ, মূল্যবোধ শিক্ষা এবং সামাজিক সম্প্রীতির ভিত্তি ক্রমশ ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে।
এ কারণেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ শুরু করেছে। অস্ট্রেলিয়া ১৬ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার সীমিত করার লক্ষ্যে যুগান্তকারী আইন প্রণয়ন করেছে। ফ্রান্সে অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া নির্দিষ্ট বয়সের নিচে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে। চীন শিশু ও কিশোরদের অনলাইন গেমিং ও ডিজিটাল ব্যবহারের সময়সীমা নির্ধারণ করেছে। দক্ষিণ কোরিয়া দীর্ঘদিন ধরে অনলাইন আসক্তি মোকাবিলায় বিশেষ নীতি অনুসরণ করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন শিশুদের জন্য অ্যালগরিদমনির্ভর কনটেন্ট সুপারিশ, অটোপ্লে, অসীম স্ক্রলিং এবং ক্ষতিকর কনটেন্ট প্রচার সীমিত করার জন্য বিভিন্ন নীতিমালা বাস্তবায়ন করছে। এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো প্রযুক্তিকে নিষিদ্ধ করা নয়, বরং শিশু ও তরুণদের সুরক্ষিত রাখা এবং একটি সুস্থ ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশেও এখন সময় এসেছে বিষয়টিকে কেবল প্রযুক্তিগত বা ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয় হিসেবে না দেখে জাতীয় উন্নয়ন, মানবসম্পদ গঠন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষার প্রশ্ন হিসেবে বিবেচনা করার। এ লক্ষ্যে ১৬ বছরের নিচে বয়সভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্মার্টফোন ব্যবহারের নীতিমালা, বাধ্যতামূলক বয়স যাচাই ব্যবস্থা, শিশুদের জন্য নিরাপদ ও শিক্ষামূলক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, অভিভাবক ও শিক্ষকদের জন্য ডিজিটাল সাক্ষরতা কর্মসূচি এবং জাতীয় পর্যায়ে নিয়মিত গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা নয়, বরং দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য। কারণ একটি জাতির সবচেয়ে বড় সম্পদ তার মানবসম্পদ। শিশু ও তরুণদের মনন, সৃজনশীলতা, নৈতিকতা এবং মানসিক সুস্থতা রক্ষা করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। আজকের শিশুরাই আগামী দিনের বাংলাদেশ; তাই তাদের নিরাপদ, সৃজনশীল ও সুস্থ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতেই হবে।
লেখক: কলামিস্ট; সাবেক সহসভাপতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি; উপপরিচালক ও প্রধান, ফ্যাকাল্টি এইচআর অফিস, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি

আজ বাংলাদেশ শুধু কোরবানির পশু উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়, বরং উদ্বৃত্ত উৎপাদনের সক্ষমতাও অর্জন করেছে। এটি নিছক কৃষি বা প্রাণিসম্পদ খাতের সাফল্য নয়; এটি গ্রামীণ উন্নয়ন, যুব উদ্যোক্তা সৃষ্টি, নারীর অংশগ্রহণ এবং জাতীয় অর্থনীতির এক অনন্য অর্জনের গল্প।
৩ দিন আগে
রামিসার বাসায় প্রধানমন্ত্রীর এ তাৎক্ষণিক গমন সেই ধারণা ভেঙে দিয়েছে। নিজের ব্যস্ত সূচি ও মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে গভীর রাতে পল্লবীর একটি সাধারণ বাসভবনে তার ছুটে যাওয়া প্রমাণ করে, প্রতিটি নাগরিকের জীবন ও নিরাপত্তা রাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। রামিসার পরিবার ও প্রতিবেশীদের কাছে এটি এক বড় সান্ত্বনা যে তারা
৮ দিন আগে
আজকের বাস্তবতায় কোরবানির মূল চেতনা অনেকাংশে আনুষ্ঠানিকতা, সামাজিক প্রতিযোগিতা ও প্রদর্শনীর আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছে। অনেকেই কোরবানিকে বড় পশু কেনা, সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শন কিংবা বাহ্যিক আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলছেন। অথচ ইসলাম কোরবানির মাধ্যমে মানুষকে যে শিক্ষা দিতে চেয়েছে, তা অনেক গভীর ও ব্যাপক।
১৩ দিন আগে
আমরা এনবিআরের কাছে যে প্রস্তাবনা দিয়েছি, তা কেবল কিছু কর ছাড়ের দাবি নয়; এটি মূলত বাংলাদেশকে একটি ‘নলেজ ইকোসিস্টেম’ বা জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তর করার একটি সামগ্রিক ব্লুপ্রিন্ট। আমরা বিশ্বাস করি, এনবিআর যদি এই সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করে, তবে এটি দেশের শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং মেধাভিত্তিক রপ্তানি
১৬ দিন আগে