কারবাবালা: ভয়াবহ হৃদয়বিদারক যুগান্তকারী ঘটনা

এম গোলাম মোস্তফা ভুইয়া

মহররম হিজরি বছরের প্রথম মাস। পবিত্র কোরআনে এ মাসের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সুরা তওবার ৩৬ নম্বর আয়াতে বর্ণিত যে মাসগুলোয় যুদ্ধবিগ্রহ হারাম করা হয়েছে, তার মধ্যে মহররম অন্যতম। অনেক কারণে এ মাসটি মুসলিম উম্মাহর কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

স্বয়ং রাসুল (সা.) এ মাসকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে বর্ণনা করেছেন এবং তিনি বিশ্ববাসীর প্রতি তার দায়িত্ব, অর্থাৎ মানুষকে শান্তির ধর্ম ইসলামের পথে আহ্বান করার কাজ শুরু করেছিলেন মহররম মাসে। তবে এ কথা সত্য— ১০ মহররম কারবালা প্রান্তরে দলবলসহ হজরত ইমাম হুসাইনের (রা.) শহিদ হওয়ার ঘটনা এ দিনের গুরুত্ব ও তাৎপর্যকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে।

১০ মহররমের কারবালার ঘটনা সমগ্র বিশ্ব মুসলিমের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারবালার প্রান্তরে উম্মতের কান্ডারি দয়াল নবি রাসুল (সা.)-এর দৌহিত্র হজরত ইমাম হুসাইনের (রা.) মর্মান্তিক শাহাদাত বিশ্ব ইতিহাসে এক বেদনাবিধুর কালো অধ্যায়। ৬১ হিজরির এ মর্মান্তিক শাহাদাত দুনিয়ার আশেকে রাসুল (সা.) ও উম্মতে মুহাম্মদী (সা.)-এর হৃদয়কে আজও ভারাক্রান্ত করে।

হিজরি ৬১ সালের ১০ মহররম কারবালার ময়দানে ভয়াবহ, হৃদয়বিদারক ও যুগান্তকারী ঘটনা ঘটেছিল। কারবালার মরুপ্রান্তরে মাওলা ইমাম হুসাইন (রা.) ও তার ৭২ জন সাথী যে বীরত্বের ইতিহাস তৈরি করেছিলেন, তা ইতিহাসের এক কালজয়ী অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

কারবালা কেবল একটি যুদ্ধ ছিল না। এ বীরত্বগাঁথার ব্যাপ্তি এতটাই বিস্তৃত যে, তা স্থান ও কালকে অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছে। যেসব কারণে ইমাম হুসাইন (রা.)-এর আন্দোলন এত বিশাল প্রভাব বিস্তার করেছে, তার মধ্যে এর মহান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এবং নৈতিক ও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ অন্যতম। বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্র ইমাম হুসাইন (রা.) অত্যাচারী, চরিত্রহীন ও ক্ষমতালোভী শাসক ইয়াজিদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর উদ্দেশ্য সম্পর্কে বলেছেন, ‘আমি সৎকাজের আদেশ দান ও অসৎ কাজে বাধা প্রদানের উদ্দেশ্যে সংগ্রামে নেমেছি।’

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে বলা যায়, ইমাম হুসাইন (রা.) নৈতিক ও মানবীয় মূল্যবোধ সমুন্নত রাখার লক্ষ্যে আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন। কারবালার ময়দানে ইমাম হুসাইন বিন আলীর (রা.) সঙ্গে যেসব মহান শহিদ আত্মত্যাগ করেছিলেন, তাদের প্রতিটি পদক্ষেপে এসব মূল্যবোধ অক্ষুণ্ণ রাখার প্রচেষ্টা ছিল লক্ষ্যণীয়। নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিকতার পাশাপাশি সাহসিকতা ও বীরত্ব ছিল কারবালা আন্দোলনের প্রধান আকর্ষণ।

কারবালার ময়দানে ইমাম হুসাইন (রা.) ও তার সঙ্গী-সাথীরা ধৈর্যের চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেছিলেন, যার উদাহরণ পৃথিবীতে বিরল। কারবালায় শাহাদাতের কয়েকদিন আগে থেকেই তিনি বিভিন্নভাবে সাথীদের ধৈর্য ধারণের শিক্ষা দিয়ে আসছিলেন।

পাপাত্মা ইয়াজিদের বাহিনী কারবালায় যে নারকীয় হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠেছিল, তা সহ্য করা কোনো মানুষের পক্ষেই হয়তো সম্ভব নয়। কিন্তু আল্লাহর ওপর নির্ভরতা এবং তার প্রতিশ্রুত পুরস্কার লাভের আশায় ইমামের সাথীরা ছিলেন দৃঢ়চিত্ত ও অবিচল। শত্রুবাহিনী যখন ইমামের দুধের শিশু থেকে শুরু করে তরুণ ও যুবক সন্তানদের এবং তার প্রাণপ্রিয় ভাইকে হত্যা করে চলছিল, তখন আশুরার মহান বিপ্লব সফল করার জন্য ইমামের অঙ্গীকার আরও দৃঢ় হচ্ছিল। প্রিয় নবিজির বংশধরদের শাহাদাত তাকে বিন্দুমাত্র তার অবস্থান থেকে টলাতে পারেনি।

অনেকেই প্রশ্ন করেন— আমরা ইমাম হুসাইন (রা.)-এর জন্য এত কান্না করি কেন? করি কারণ, কারবালার এই আত্মত্যাগ শুধু একটি পরিবারের নয়; এটি সত্য, ন্যায় ও মানবিক মর্যাদা রক্ষার জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগের প্রতীক। তাই যুগে যুগে মুসলমানরা এবং ন্যায়বিচারে বিশ্বাসী মানুষ এ আত্মত্যাগকে স্মরণ করে। এই আত্মত্যাগকে স্মরণ করলেই হৃদয় অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে। ইসলামের ইতিহাসে কারবালার ঘটনা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবিচল থাকার এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে রয়েছে।

মুয়াবিয়া ও ইয়াজিদের অনুসারী, অত্যাচারী ও অত্যাচারীদের উত্তরসূরি ছাড়া সবাই এই অসীম আত্মত্যাগকে স্মরণ করে। এই আত্মত্যাগকে স্মরণ করলেই চোখ অশ্রুজলে ভরে যায়। যদি আজ ইসলাম জীবিত ও প্রাণবন্ত থাকে, তবে তার পেছনে কারবালার আত্মত্যাগ এক গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।

হে আল্লাহ! আপনি তাদের প্রতি অভিশাপ বর্ষণ করুন, যারা মুহাম্মদ (সা.) ও তার আহলে বাইতের প্রতি প্রথম জুলুম করেছে এবং সর্বশেষ জালিম যে প্রথম জালিমকে তার জুলুমের ক্ষেত্রে অনুসরণ করেছে। হে আল্লাহ! যারা ইমাম হুসাইনের (আ.) বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল, তাদের ওপর লানত বর্ষণ করুন। আর তাদের অনুসারী, অনুগামী ও আনুগত্য স্বীকারকারীদের ওপরও লানত বর্ষণ করুন।

হে আবা আবদিল্লাহ! আপনার প্রতি এবং আপনার পবিত্র সত্তার প্রতি সালাম, যে সত্তা সমাধিস্থ হয়েছে। আমার পক্ষ থেকে আল্লাহর সালাম অনন্তকালব্যাপী, যতদিন দিবা-নিশি অবিচল রয়েছে। আল্লাহ যেন এ জিয়ারতকেই আমার জীবনের শেষ জিয়ারত না করেন। ইমাম হুসাইন (আ.)-এর সন্তানগণ এবং তার সাথীদের প্রতিও সালাম।

শেষে ইরানের বিশিষ্ট কবি ফুয়াদ কেরমানির ভাষায় বলতে চাই—

‘শত্রুরা তোমাকে মেরেছে, কিন্তু নেভেনি তো নূর তোমার,

হ্যাঁ, ওই নূর তো নেভার নয়, কেননা সে নূর যে খোদার।’

আর গরিবে নেওয়াজ হজরত খাজা মঈনুদ্দিন চিশতী (রহ.)-এর ভাষায়—

‘হুসাইন শাহানশাহ, হুসাইন বাদশাহ-এ-দ্বীন;

হুসাইন দ্বীনের আশ্রয়স্থল।

শির দিয়েছেন, দেননি ইয়াজিদের হাতে হাত;

লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর বুনিয়াদ হুসাইন।’

মহররমে কারবালার ত্যাগের মহিমায় উজ্জীবিত হওয়ার শিক্ষা হলো— যাবতীয় অন্যায়, অবিচার, অসত্য ও স্বেচ্ছাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো। কোনো সমাজে বা রাষ্ট্রে এ ধরনের পরিস্থিতির উদ্ভব হলে সর্বশক্তি দিয়ে তা প্রতিরোধ করাই হোক কারবালার মূলমন্ত্র। তাই মর্সিয়া ক্রন্দন নয়, কারবালার বাস্তব শিক্ষা— সত্যের জন্য আত্মত্যাগের অতুলনীয় আদর্শ— সাদরে গ্রহণ করতে হবে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাষায়—

‘ফিরে এলো আজ সেই মহররম মাহিনা,

ত্যাগ চাই, মর্সিয়া ক্রন্দন চাহি না।’

আশুরার চেতনা জাতীয় জীবনে প্রতিফলিত হোক এবং সমাজ থেকে অন্যায়-অবিচার, জুলুম-নির্যাতনসহ সব অনাচার দূর হয়ে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হোক।

লেখক: কলাম লেখক, রাজনৈতিক কর্মী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

ছয় শিশুর মৃত্যুর বিচার হয়, ছয়শো শিশুর ঘাতকরা শাস্তি পায় না!

বর্তমান সরকার হাম প্রতিরোধে সকল ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে। এই মৃত্যুর দায় কোনোভাবেই বর্তমান সরকারের ওপর বর্তায় না। তাহলে এক্ষেত্রে দোষীদের শাস্তির আওতায় আনতে বাধা কোথায়? হামে ছয় শতাধিক শিশুর মৃত্যুর ঘটনার সঠিক তদন্ত এবং দোষীদের বিচারের আওতায় না আনা হলে, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ব

৮ দিন আগে

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দুষ্টু লোক, স্বাস্থ‍্যমন্ত্রীর কোটি টাকা ও মিরাকল প্রতিমন্ত্রী

সাম্প্রতিক সময়ের তিনটি আলোচিত ঘটনা যেন একই নাটকের তিনটি দৃশ্য। চরিত্র আলাদা, সংলাপ আলাদা, কিন্তু প্রশ্ন একটাই— প্রকৃত সত্য কী? সবটাই যে সত্য, তা নয়। আবার সবটাই যে মিথ্যা, সেটিও বলা যায় না। আর এই ধূসর অঞ্চলেই সবচেয়ে বেশি ক্ষয় হয় জনবিশ্বাসের।

১০ দিন আগে

মেগা-ইভেন্ট: ভূ-রাজনৈতিক শক্তির হাতিয়ার

ফিফা বিশ্বকাপ, অলিম্পিক গেমসের মতো, প্রায়শই ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও মানবিক সাফল্যের উৎসব হিসাবে উপস্থাপিত হয়। কিন্তু জৌলুস আর আড়ম্বরের আড়ালে লুকিয়ে আছে আরও তাৎপর্যপূর্ণ এক বাস্তবতা: মেগা-ক্রীড়া ইভেন্টগুলো আধুনিক রাষ্ট্রগুলোর জন্য সবচেয়ে শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-অর্থনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

১৪ দিন আগে

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম: ভবিষ্যৎ প্রজন্ম রক্ষায় রাষ্ট্রের পদক্ষেপ জরুরি

প্রযুক্তির অভূতপূর্ব অগ্রগতি মানুষের জীবনকে সহজ, দ্রুত এবং বিশ্বসংযুক্ত করেছে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রযুক্তিনির্ভর এই বিশ্ব নতুন কিছু সামাজিক, মানসিক ও শিক্ষাগত সংকটও তৈরি করেছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্ফোরণমূলক বিস্তার শিশু, কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের বিকাশ, শিক্ষাগ্রহণ, নৈতিকতা, সৃজনশীলতা এ

১৬ দিন আগে