আন্তর্জাতিক আইন, ক্ষমতার রাজনীতি ও জবাবদিহির সংকট

আন্তর্জাতিক রাজনীতির সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্নগুলোর একটি হলো, ক্ষমতা কি শেষ পর্যন্ত আইনকে পরাজিত করে। আধুনিক বিশ্বব্যবস্থা ঘোষণা করে যে রাষ্ট্র যত শক্তিশালীই হোক, যুদ্ধের মধ্যেও তার আচরণের সীমা থাকবে। অথচ বাস্তবতা প্রায়ই দেখায়, আইন দুর্বল রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে বাধ্যবাধকতা আর শক্তিশালী রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে বিতর্কে পরিণত হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থান এই পুরোনো বৈপরীত্যকেই নতুন তীব্রতায় সামনে এনেছে।

আইসিসি কোনো বিশ্বসরকারের আদালত নয়। ১৯৯৮ সালের রোম সংবিধানের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত এই স্থায়ী আন্তর্জাতিক আদালত গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ এবং নির্দিষ্ট শর্তে আগ্রাসনের অপরাধে ব্যক্তির দায় নির্ধারণ করে। এটি রাষ্ট্রের বিচার করে না, ব্যক্তির অপরাধমূলক দায় বিচার করে। বর্তমানে ১২৫টি রাষ্ট্র রোম সংবিধানের পক্ষভুক্ত হলেও যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এর সদস্য নয়।

কিন্তু সদস্য না হওয়াই সব ক্ষেত্রে আদালতের এখতিয়ার নাকচ করে না। কোনো অভিযুক্তের নিজ রাষ্ট্র রোম সংবিধানের সদস্য না হলেও অভিযোগকৃত অপরাধ যদি সদস্য রাষ্ট্রের ভূখণ্ডে সংঘটিত হয়, তবে নির্দিষ্ট আইনি শর্তে আইসিসির এখতিয়ার প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। ফিলিস্তিন ২০১৫ সালে রোম সংবিধানের পক্ষভুক্ত হয় এবং আদালত অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের পরিস্থিতির ওপর তার আঞ্চলিক এখতিয়ার স্বীকার করেছে। অতএব, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অ-সদস্যতার যুক্তি রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী হলেও আইসিসির এখতিয়ার বিষয়ক প্রশ্নের পূর্ণ আইনি উত্তর নয়।

২০২৪ সালের ২১ নভেম্বর আইসিসির প্রাক্‌বিচারিক কক্ষ ইসরায়েলের এখতিয়ার-সংক্রান্ত আপত্তি প্রত্যাখ্যান করে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। এটি দোষী সাব্যস্ত করার রায় নয়। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা অর্থ হলো, বিচারকেরা মনে করেছেন অভিযোগগুলো বিচারিক প্রক্রিয়ায় অগ্রসর করার মতো যুক্তিসংগত ভিত্তি রয়েছে। চূড়ান্ত অপরাধ নির্ধারণের জন্য যথাযথ বিচার, প্রমাণ পরীক্ষা এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণ সুযোগ অপরিহার্য। ইসরায়েল অভিযোগ ও আদালতের এখতিয়ার প্রত্যাখ্যান করেছে।

অন্যদিকে, গাজায় বিপুল বেসামরিক প্রাণহানি, বাস্তুচ্যুতি, খাদ্য ও চিকিৎসাসংকট আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের প্রয়োগ নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলেছে। বেসামরিক জনগণকে সুরক্ষা দেওয়া, সামরিক ও বেসামরিক লক্ষ্য পৃথক করা, সামঞ্জস্য বজায় রাখা এবং মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করা কোনো পক্ষের প্রতি রাজনৈতিক সহানুভূতির বিষয় নয়। এগুলো আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের মৌলিক দাবি। একইভাবে, বেসামরিক ব্যক্তির ওপর হামলা, জিম্মি গ্রহণ কিংবা নির্বিচার সহিংসতা যে পক্ষই করুক, তার নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহি প্রয়োজন।

২০২৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প প্রশাসন আইসিসির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞার নির্বাহী আদেশ জারি করে। হোয়াইট হাউস আদালতের পদক্ষেপকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অবৈধ ও ভিত্তিহীন কার্যক্রম হিসেবে আখ্যায়িত করে। যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তির কেন্দ্রে রয়েছে সার্বভৌমত্ব ও সম্মতির নীতি। ওয়াশিংটনের বক্তব্য হলো, যে রাষ্ট্র রোম সংবিধান গ্রহণ করেনি, তার নাগরিকদের ওপর এমন আদালত বিচারিক কর্তৃত্ব প্রয়োগ করতে পারে না।

এই আপত্তিকে অবজ্ঞা করা উচিত নয়। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা, জবাবদিহি, প্রমাণের মান, বিচারিক সংযম এবং রাজনৈতিক পক্ষপাতের আশঙ্কা নিয়ে কঠোর আলোচনা প্রয়োজন। আইসিসিও সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। এর মামলার ভৌগোলিক বণ্টন, তদন্তের দীর্ঘসূত্রতা, সীমিত সম্পদ এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কার্যকারিতা আদালতের বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর প্রশ্ন সৃষ্টি করেছে।

তবে আদালতের কোনো সিদ্ধান্তের জবাবে বিচারক, কৌঁসুলি বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ওপর অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ আরও গভীর বিপদ সৃষ্টি করে। এতে শুধু কয়েকজন ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হন না। ভবিষ্যৎ তদন্তকারী, সাক্ষী, আইনজীবী, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং সহযোগী রাষ্ট্রের কাছেও একটি ভীতিকর বার্তা পৌঁছে যায়। বিচারিক সিদ্ধান্তের জবাব আইনি যুক্তি, আপিল ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের মাধ্যমে দেওয়া উচিত। রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক প্রতিশোধের মাধ্যমে নয়।

আইসিসির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা তার নিজস্ব পুলিশ বাহিনী না থাকা। আদালত গ্রেপ্তার ও অভিযুক্তকে হস্তান্তরের জন্য রাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল। ফলে পরোয়ানা জারি হওয়া এবং তার বাস্তব প্রয়োগ এক বিষয় নয়। অভিযুক্ত ব্যক্তি কোথায় ভ্রমণ করছেন, সেই রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা কী এবং দেশীয় আদালত কী ব্যাখ্যা দিচ্ছে, তার ওপর গ্রেপ্তারের সম্ভাবনা নির্ভর করে।

রাজনৈতিক ক্ষমতা হারালে একজন নেতার কূটনৈতিক সুরক্ষা কমতে পারে, কিন্তু গ্রেপ্তার স্বয়ংক্রিয় হয়ে যায় না।

এই বাস্তবতা আন্তর্জাতিক আইনের মূল সংকট প্রকাশ করে। জাতীয় আইনের পেছনে রাষ্ট্রের পুলিশ ও নির্বাহী শক্তি থাকে। আন্তর্জাতিক আইনের পেছনে প্রধানত থাকে রাষ্ট্রগুলোর সম্মতি, সহযোগিতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা। বড় শক্তি বা তার ঘনিষ্ঠ মিত্র সহযোগিতা প্রত্যাখ্যান করলে আইন প্রায়ই নৈতিক ঘোষণায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। অথচ দুর্বল রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে একই আইন তুলনামূলক দ্রুত ও কঠোরভাবে কার্যকর হতে পারে।

এই দ্বৈততা আইনের মর্যাদাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ইউক্রেনের ক্ষেত্রে যে মানদণ্ড দাবি করা হয়, গাজার ক্ষেত্রেও সেই মানদণ্ড চাইতে হবে। রাশিয়া, ইসরায়েল, হামাস, সুদান, মিয়ানমার, আফগানিস্তান কিংবা অন্য কোনো পক্ষের পরিচয় অপরাধের আইনি সংজ্ঞা বদলে দিতে পারে না। জবাবদিহি যদি মিত্রতার ওপর নির্ভর করে, তবে সেটি ন্যায়বিচার নয়, নির্বাচিত বিচার।

জাতিসংঘও একই ক্ষমতাগত বৈপরীত্যে আক্রান্ত। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যদের ভেটো আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার প্রশ্নে প্রায়ই সমষ্টিগত সিদ্ধান্তকে অকার্যকর করে। তবু জাতিসংঘকে দুর্বল করে অস্বচ্ছ ও সীমিত প্রতিনিধিত্বের বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করা সমাধান নয়। গাজা বা কোনো ভূখণ্ডের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট জনগণের কার্যকর প্রতিনিধিত্ব, আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার, নিরাপত্তা এবং ন্যায়বিচার অপরিহার্য। জনগণকে বাদ দিয়ে তাদের জন্য নির্মিত শান্তি প্রকৃত শান্তি নয়।

টেকসই সমাধান হলো আইসিসিকে প্রশ্নাতীত ঘোষণা করা নয়, আবার শক্তিশালী রাষ্ট্রের চাপের কাছে তাকে অকার্যকর করে দেওয়াও নয়। প্রয়োজন এখতিয়ারের অধিকতর স্পষ্টতা, উন্নত প্রমাণমান, দ্রুততর বিচার, প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা, রাজনৈতিক পক্ষপাত থেকে স্বাধীনতা এবং সব অঞ্চলের জন্য সমান প্রয়োগ। বৃহৎ শক্তিগুলোকেও বুঝতে হবে যে নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থা শুধু প্রতিপক্ষকে নিয়ন্ত্রণের অস্ত্র নয়। সেই নিয়ম নিজের ও মিত্রের ক্ষেত্রেও গ্রহণ করার নৈতিক সাহসই প্রকৃত নেতৃত্ব।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি ট্রাম্প, নেতানিয়াহু কিংবা আইসিসিকে ছাড়িয়ে যায়। প্রশ্ন হলো, আমরা কি এমন পৃথিবী চাই যেখানে ক্ষমতাশালী রাষ্ট্র নিজের জন্য ব্যতিক্রম দাবি করবে, নাকি এমন ব্যবস্থা চাই যেখানে একই আইন বন্ধু ও শত্রু উভয়ের জন্য প্রযোজ্য হবে।

আন্তর্জাতিক আইন নিখুঁত নয়। কিন্তু তার অনুপস্থিতির বিকল্প ন্যায়বিচার নয়, বরং ক্ষমতার অবাধ শাসন। শক্তি রাষ্ট্রকে প্রভাবশালী করতে পারে, কিন্তু তাকে নৈতিকভাবে নির্দোষ বা আইনগতভাবে দায়মুক্ত করতে পারে না। কারণ যে বিশ্বে শক্তিশালীর জন্য আইন থাকে না, সেই বিশ্বে দুর্বলের জন্য ন্যায়বিচারও শেষ পর্যন্ত অবশিষ্ট থাকে না।

[এই নিবন্ধটি প্রকাশ্য ও বিশ্বাসযোগ্য তথ‍্যের ভিত্তিতে লেখকের স্বাধীন বিশ্লেষণ। এটি কোনো প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক অবস্থান নয়।]

লেখক: কলামিস্ট ও অর্থনীতি বিষয়ক বিশ্লেষক

Ad
Ad
ad
ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

খাদ্য নিরাপত্তা— নতুন নেতৃত্বে নতুন প্রত্যাশা

মানুষের জীবনে কিছু প্রয়োজন আছে, যেগুলো নিয়ে কোনো আপস চলে না। খাদ্য তার প্রথম সারিতে। সকালে শ্রমজীবী মানুষের নাশতার রুটি, দুপুরে পরিবারের ভাতের হাঁড়ি, কৃষকের গোলায় ধান কিংবা দুর্যোগে অসহায় মানুষের হাতে পৌঁছে যাওয়া খাদ্যসহায়তা—সবকিছুর পেছনেই রয়েছে একটি বিশাল রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা। সেই ব্যবস্থাপনার কেন

১৫ দিন আগে

পিংক বাস: একটি রঙ, একটি পরিবর্তন ও অনেক প্রশ্ন

বাংলাদেশের গণপরিবহনে নারীদের জন্য ‘পিংক বাস’ চালু হওয়া নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ঢাকার রাস্তায় যখন নারী চালক, নারী সহকারী আর নারী যাত্রীদের নিয়ে বাস চলছে, তখন সেটা দেখতে ভালো লাগে। কিন্তু এই ভালো লাগার ভেতরেই কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন লুকিয়ে আছে, যে প্রশ্নগুলো শুধু বাসের রং নিয়ে নয়, বরং আ

১৬ দিন আগে

আমরা যা দেখাই, আমরা কি সত্যিই তাই?

মানুষের একটা অদ্ভুত স্বভাব আছে— সে নিজেকে যেমন, তার চেয়ে একটু ভালো করে দেখাতে চায়। আগে এই প্রবণতার সীমা ছিল পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন, অফিস কিংবা বন্ধুমহল পর্যন্ত। এখন সেই ছোট পরিসরটি বিস্ফোরিত হয়ে গেছে। হাতে একটি স্মার্টফোন, সামনে একটি ক্যামেরা, আর পেছনে কোটি কোটি দর্শকের সম্ভাবনা। ফলে মানুষ এখন

১৭ দিন আগে

উৎপাদন খাতে চীনের বিরুদ্ধে অভিযোগ: সত্য নাকি অতিরঞ্জন?

পশ্চিমা অর্থনীতিবিদদের তৈরি করা এই ‘স্টেয়ারকেস মডেল’ থেকে যে ধারণার জন্ম, চীনের বিরুদ্ধে মূলত সেই ধারণাটিই প্রয়োগ করা হয়। কিন্তু এই ধারাবাহিকতাকেই কেন অর্থনীতির চূড়ান্ত নিয়ম হিসেবে মেনে নিতে হবে? প্রতিটি দেশেরই অধিকার আছে, তার সম্পদভিত্তি, শ্রমশক্তি, পুঁজিবাজার ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা যে উন্নয়নপথকে ধরে

২০ দিন আগে
Advertisement