‘জাতীয় ঐক্য’ কীভাবে সম্ভব?

ডয়চে ভেলে
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে জাতীয় ঐক্যের উদ্যোগ নিতে বলা হচ্ছে

সাম্প্রতিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজসহ সব জায়গা থেকেই জাতীয় ঐক্যের কথা হচ্ছে। কিন্তু কীভাবে হতে পারে এই ঐক্য সে ব্যাপারে এখনও কোন রূপরেখা দেখা যাচ্ছে না। জাতীয় ঐক্যের পক্ষের কেউ বলছেন, প্রধান উপদেষ্টা এই ঐক্যে ভূমিকা রাখতে পারে। আবার কেউ বলছেন, ছাত্ররাই হতে পারে ঐক্যের প্রতীক।

জাতীয় নির্বাচন, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নির্ধারণসহ নানা ইস্যুতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো ও ছাত্র আন্দোলনকারীদের মধ্যে মতবিরোধ স্পষ্ট। তবে দেশের চলমান পরিস্থিতিতে জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি করতে অন্তর্বর্তী সরকার ও বিএনপির মধ্যে ঐকমত্য হয়েছে৷ গত বুধবার রাতে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে তাদের মধ্যে এই ঐকমত্য হয়েছে৷ সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিএনপির সঙ্গে বৈঠকে দেশের স্থিতিশীলতার স্বার্থে জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস।

কীভাবে হতে পারে এই ঐক্য? জানতে চাইলে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ইমরান সালেহ প্রিন্স ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টার কাছ থেকেই এই ডাক আসতে হবে। যেটা নিয়ে জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠতে পারে সেটা হল বাংলাদেশ। ফ্যাসিবাদের দোসররা যে দেশবিরোধী তৎপরতা চালাচ্ছে এটাকে নিয়ে ঐক্য হতে পারে। প্রধান উপদেষ্টাকেই এই কলটা দিতে হবে। সরকারকেই জাতীয় ঐক্য গড়ার দায়িত্বটা নিতে হবে। জতীয় ঐক্যটা গড়ে উঠলেই আমরা ফ্যাসিবাদের চক্রান্ত প্রতিহত করতে পারব।

তিনি বলেন, ইতিমধ্যে কিন্তু বিপ্লবের মধ্য দিয়ে একটা রক্তস্নাত ঐক্য গড়ে উঠেছে৷ হাজার হাজার তরুণের যে রক্ত, এটাকে কোনভাবেই বৃথা যেতে দেওয়া যাবে না৷ আমি এখনও মনে করি না যে, আমাদের মধ্যে কোন অনৈক্য আছে, যেটা আছে সেটা হল চলার পথে ভিন্নমত থাকতেই পারে, সেটা৷ পতিত স্বৈরাচার যে ফাঁদ পেতে রেখেছে, সেখানে যেন আমরা পা না দেই।

রাজনৈতিক দলগুলো চলমান অস্থিরতার জন্য আওয়ামী লীগকে দায়ী করছে৷ তাদের দৃঢ় সন্দেহ, ক্ষমতাচ্যুতদের ষড়যন্ত্র রয়েছে। তা মোকাবিলায় জাতীয় ঐক্য প্রয়োজন৷ যদিও স্পষ্ট করছে না কেউ জাতীয় ঐক্য বলতে কী বোঝানো হচ্ছে, কীভাবে হবে এই ঐক্য। যদিও বিএনপি সংস্কারের ৩১ দফায় ঘোষণা করে রেখেছে, ক্ষমতায় গেলে আন্দোলনের সব শক্তিকে নিয়ে জাতীয় সরকার গঠন করবে।

প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে জামায়াত নেতারা বলেছেন, চট্টগ্রামে আইনজীবীকে হত্যার মতো বিষয় তাদের শক্ত হাতে দমন করতে হবে৷ এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ‘এনগেজমেন্ট' বাড়াতে সরকারপ্রধানকে পরামর্শ দেন জামায়াত আমির।

ছাত্রদের নেতৃত্বেই জাতীয় ঐক্যটা হতে পারে বলে মনে করেন বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক বাকের মজুমদার৷ ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেন, আমরা কিন্তু ৩ আগস্ট এক দফার ডাক দিয়েছিলাম৷ সেই ডাকে সবাই সাড়া দিয়েছিলেন৷ তখন আমাদের মধ্যে একটা ঐক্য ছিল বলেই আমরা ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট সরকার প্রধানকে পালাতে বাধ্য করতে পেরেছি৷ এরপর আমরা দেখেছি, অনেকেই নিজের স্বার্থ নিয়ে নানা ধরনের কাজ করছেন৷ এখন আমাদের জাতীয় ঐক্যের মূল ভিত্তি হতে পারে জাতীয় স্বার্থ৷ কিছু কিছু ক্ষেত্রে ঐক্য পরিলক্ষিত হচ্ছে না।

তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনে কিন্তু সকল দল ও মতের মানুষ ছাত্রদের উপর আস্থা রেখেছিল। গত ১৫ বছরে কিন্তু জনগণ কারও উপর আস্থা রাখতে পারেনি৷ শেষ পর্যন্ত দেশবাসী ছাত্রদের উপরই আস্থা রেখেছে৷ এই কারণে রাজনৈতিক দলগুলো যদি নিজেদের ক্ষুদ্রস্বার্থ উপেক্ষা করে ছাত্রদের উপর আস্থা রাখে তাহলেই ছাত্রদের নেতৃত্বেই জাতীয় ঐক্যটা হতে পারে৷ সরকারের উপদেষ্টারাও জাতীয় ঐক্যের কথা বলছেন।

উপদেষ্টা মাহফুজ আলম বলেছেন, রাজনৈতিক দল, জনগণ বা সরকার এখানে আলাদা কিছু নয়৷ বাংলাদেশের অখণ্ডতা রক্ষা এবং জনগণকে ঐক্যবদ্ধ রাখার কাজ সবার৷ এই ঐক্য ধরে রাখলে আশা করি, আর কখনোই ফ্যাসিজম ফিরে আসবে না৷ বিএনপি ও জামায়াত নেতারাও অখণ্ডতা ও ঐক্যের কথা বলেছেন৷ স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সবাই ঐক্যবদ্ধ থেকে কীভাবে কাজ করা যায়, তা বলেছেন।

তিনি বলেন, যেকোনো ধরনের সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা-উন্মত্ততা কীভাবে রুখে দেওয়া যায়, সে বিষয়ে সবার সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস৷ দুটি দলই বিভিন্ন ইতিবাচক প্রস্তাব দিয়েছে৷ তারা আগের মতোই সরকারকে সহযোগিতা করার কথা বলেছে।

রাজনৈতিক নেতারা মুখে ঐক্যের কথা বললেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন বক্তৃতা বিবৃতিতে এক পক্ষ আরেক পক্ষকে ঘায়েল করছে৷ ঐক্যের বিষয়ে জানতে চাইলে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না ডয়চে ভেলেকে বলেন, জাতীয় ঐক্যের আহবানটা কিন্তু সাংগঠনিক না৷ এটা আদর্শিক৷ দেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হলেও তারা ষড়যন্ত্র করছে৷ ফিরে আসতে চাইছে৷ চট্টগ্রামে আইনজীবীকে হত্যা করে একটি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধানোর যে ষড়যন্ত্র জাতি দেখেছে, তাতে ফ্যাসিবাদরা ফিরে আসার ইঙ্গিত বহন করে৷ এ সময়ে ঐক্যের ডাক ইতিবাচক৷ সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকলে ফ্যাসিস্টরা ফিরে আসার সুযোগ পাবে না।

সম্প্রতি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এক বিবৃতিতে চলমান পরিস্থিতিতে দেশের পক্ষের শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান৷ জনগণের উদ্দেশে তিনি বলেন, সরকারকে আরেকটু সময় দিন। আরেকটু ধৈর্যের পরিচয় দিন। শান্ত থাকুন। পরিস্থিতির ওপর সতর্ক ও সজাগ দৃষ্টি রাখুন৷ দল-মত-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে আমাদের প্রত্যেককে মনে রাখতে হবে, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যাত্রাপথে ষড়যন্ত্রকারীদের বাধা বিচক্ষণতার সঙ্গে অতিক্রম করতে ব্যর্থ হলে স্বাধীনতাপ্রিয় জনগণকে চরম মূল্য দিতে হবে।

জাতীয় ঐক্য গড়তে শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক কর্মী, বিভিন্ন শ্রেনী পেশার অংশীজন, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটা জাতীয় সভা ডাকার কথা বলেছেন গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি৷ ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেন, ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে তো ছাত্র, রাজনৈতিক কর্মীসহ সবাই যে যার জায়গা থেকে লড়াই করেছেন৷ যারা লড়াই করেছেন তাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে৷ এই সরকারকে ব্যর্থ করার যে ষড়যন্ত্র চলছে, সেটাকে মোকাবেলা করার জন্য৷ আবার অন্যদিকে আমাদের যে বড় কাজ সেটা হল দৈনন্দিন রাষ্ট্র পরিচালনার পাশাপাশি রাজনৈতিক উত্তরণের কাজ।

তিনি বলেন, নতুন রাজনৈতিক গণতান্ত্রিক বন্দোবস্তে যাওয়ার যে কাজ সেটাকেও এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। ফ্যাসিবাদ বিরোধী যে ঐক্য আমাদের গড়ে উঠেছে এবং সেটা যে এখনও অটুট আছে এবং আমরা যে কোন ষড়যন্ত্র মোকাবেলা এবং দেশে একটা গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় যাওয়ার কাজটাও যথাসম্ভব ঐক্যের মধ্য দিয়ে করতে পারি।

অন্তর্বর্তী সরকারকে সমর্থন জানিয়ে ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা ও তার দোসরদের সব অপচেষ্টা রুখে দিতে জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছেন দেশের ৫০ জন বিশিষ্ট নাগরিক৷ শনিবার এক বিবৃতিতে তারা এই আহবান জানান।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই প্রেক্ষাপটে পতিত শাসনের শক্তিগুলো তাদের বিদেশী পৃষ্ঠপোষকদের প্রকাশ্য এবং গোপন সমর্থনে দেশে বিভাজন সৃষ্টিতে সক্রিয় রয়েছে৷ তারা মিথ্যা তথ্য ও অপপ্রচার ছড়াচ্ছে এবং সহিংসতা উসকে দিচ্ছে৷ বিশেষ করে, বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর অত্যাচারের অতিরঞ্জিত, বানোয়াট এবং ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা প্রতিবেদন প্রচারের মাধ্যমে একটি সম্মিলিত প্রচারণা চালানো হচ্ছে৷ এই প্রপাগান্ডার ফলে ২৬ নভেম্বর চট্টগ্রামে সাইফুল ইসলাম নামে একজন সরকারি কৌঁসুলিকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়৷ আমরা সব বাংলাদেশিকে, ধর্ম, রাজনৈতিক মতাদর্শ, আদর্শ, লিঙ্গ, বয়স বা যেকোনো বৈশিষ্ট্যের পার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে এই হুমকির মুখে জাতীয় ঐক্য বজায় রাখার আহ্বান জানাই।

বিবৃতিদাতাদের মধ্যে আছেন বাংলাদেশ গবেষণা বিশ্লেষণ ও তথ্য নেটওয়ার্কের আহ্বায়ক ড. রুমি আহমেদ খান, ডায়াস্পোরা অ্যালায়েন্স ফর ডেমোক্রেসির প্রতিষ্ঠাতা ড. শামারুহ মির্জা, লেখক ও অ্যাক্টিভিস্ট ডা. শফিকুর রহমান, আইনজীবী এহতেশামুল হক, অর্থনীতিবিদ ও লেখক মো. জ্যোতি রহমান, বিজ্ঞানী ও এক্টিভিস্ট ড. ফাহাম আবদুস সালাম, প্রকৌশলী নুসরাত খান মজলিশ, বিজ্ঞানী মো. নুসরাত হোমায়রা, ড. সৈয়দ রউফ (পাবলিক সার্ভিস, কানাডা), অর্থনীতিবিদ ও সামাজিক উদ্যোক্তা নাজিয়া আহমেদ প্রমৃখ।

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জিং বাজেট

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে সরকার ৫ লাখ কর্মসংস্থান, ৬ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি, ৭ শতাংশ মূল্যস্ফীতি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, জ্ঞানভিত্তিক সৃজনশীল অর্থনীতির পথে এগিয়ে যেতে চায়। দুর্নীতি ও অপচয় পরিহার, শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি ও এনবিআরের সম্পদ সংগ্রহে গতি সঞ্চারের মাধ্য

৭ দিন আগে

হাম বিতর্কে মায়ের ওপর দায় চাপানো বন্ধ করুন

কিছুসংখ‍্যক মানুষ গত কয়েকদিন ধরে এই কথা বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলেছেন যে, মায়েরা তাদের শিশুদের বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন না, তাই হামের সংক্রমণ বাড়ছে! শিশুরা হামে আক্রান্ত হচ্ছে। আর ‘কান নিয়েছে চিলে’— সেই কানের খোঁজ না করেই কিছু মূলধারার সংবাদমাধ্যম লিখেছে, মায়েরা শিশুদের বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন না বলেই হামের

৮ দিন আগে

পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলকে হটিয়ে বিজেপি— নির্বাচনি ফলাফলের কাটাছেঁড়া

তৃণমূল নেতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভোট ব্যাংক ছিল মূলত সংখ্যালঘু ও নারী ভোট। ফলাফলে দেখা গেছে, যে তৃণমূলের ৮০ জন জয়ী প্রার্থীর মধ্যে ৩২ জন মুসলিম, যা ঠিক ঠিক ৪০ শতাংশ। এ ছাড়া অন্যান্য দলের আরও ছয়টি আসনে মুসলিম প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। তাহলে কংগ্রেস, সিপিএম ও বিশেষত নওসাদ সিদ্দিকির ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট

৯ দিন আগে

মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বেজে উঠেছে পুরোদস্তুর এক মহাযুদ্ধের দামামা

চলমান এই স্নায়ুযুদ্ধ যদি সত্যি সত্যি আগামী সপ্তাহে পূর্ণাঙ্গ সামরিক সংঘাতে রূপ নেয়, তবে তার মাশুল শুধু মধ্যপ্রাচ্যকে নয়, বরং পুরো বিশ্বকে দিতে হবে। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ আর পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই সংঘাত কূটনৈতিক টেবিলে সমাধান হবে, নাকি বিশ্বকে এক নতুন অর্থনৈতিক মন্দা ও তৃতীয়

১১ দিন আগে