নদী থেকে থালায়— মাইক্রোপ্লাস্টিকের নীরব আগ্রাসনে বাংলাদেশ

ড. মো. শরীফুল ইসলাম

আমরা ভেবেছিলাম প্লাস্টিক শুধু নদীর তীরে জমে থাকা পলিথিন, ড্রেনে আটকে থাকা বোতল কিংবা সমুদ্রে ভাসমান আবর্জনার নাম। কিন্তু বাস্তবতা আরও ভয়ংকর। সেই প্লাস্টিক আজ অদৃশ্য ক্ষুদ্র কণায় ভেঙে আমাদের নদীতে, মাছের শরীরে, রান্নার তেলে, লবণে, এমনকি মানুষের রক্ত ও মস্তিষ্কেও পৌঁছে গেছে। যে নদী আমাদের জীবন, জীবিকা ও খাদ্যের উৎস— সেই নদীই ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে অদৃশ্য বিষের আধারে। বাংলাদেশের নদীগুলোও এই সংকট থেকে মুক্ত নয়। হালদা, কর্ণফুলী, বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বংশী ও শীতলক্ষ্যাসহ বিভিন্ন নদীতে সাম্প্রতিক গবেষণায় মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। এসব তথ্য শুধু পরিবেশ দূষণের নয়; বরং খাদ্যনিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য এবং নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতির জন্য এক গভীর সতর্কসংকেত। বিজ্ঞানীরা একে বলছেন ‘নীরব আগ্রাসন’। কারণ এই দূষণের কোনো শব্দ নেই, ধোঁয়া নেই, তাৎক্ষণিক বিপর্যয়ও নেই। কিন্তু প্রতিদিন অসংখ্য ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা নদীর পানির সঙ্গে মিশে খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করছে এবং অজান্তেই মানুষের শরীরে জমা হচ্ছে। আজ আমরা যে মাছ খাই, যে লবণ ও ভোজ্যতেল ব্যবহার করি— সবকিছুর মধ্যেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতির প্রমাণ মিলছে। অর্থাৎ, নদীর দূষণ এখন সরাসরি আমাদের থালায় পৌঁছে গেছে।

মাইক্রোপ্লাস্টিক কীভাবে মাছে প্রবেশ করে? নদীতে ফেলা প্লাস্টিক সূর্যের আলো, তাপ, ঢেউ ও ঘর্ষণের ফলে ক্ষুদ্র কণায় ভেঙে যায়। প্ল্যাংকটন, চিংড়ি, শামুক এবং ছোট মাছ এগুলো খাদ্য ভেবে গ্রহণ করে। পরে বড় মাছ সেই ছোট মাছ খায়। এভাবেই খাদ্যশৃঙ্খল বেয়ে মাইক্রোপ্লাস্টিক মানুষের থালায় পৌঁছে যায়। বিজ্ঞানীরা ইতোমধ্যে মানুষের রক্ত, ফুসফুস এবং প্লাসেন্টায়ও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত করেছেন। যদিও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে গবেষণা চলছে, তবুও প্রদাহ, হরমোনের ভারসাম্যহীনতা এবং বিষাক্ত রাসায়নিক বহনের সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন আর কেবল পরিবেশগত সমস্যা নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, খাদ্যনিরাপত্তা, জীববৈচিত্র্য, নদী ব্যবস্থাপনা এবং টেকসই উন্নয়নের জন্য বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ। তাই এই সংকট মোকাবিলায় বিজ্ঞানভিত্তিক নীতি, কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, শিল্পবর্জ্য নিয়ন্ত্রণ এবং নাগরিক সচেতনতার সমন্বিত উদ্যোগ এখন সময়ের দাবি।

মাইক্রোপ্লাস্টিক আসলে কী?

সাধারণভাবে পাঁচ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিক কণাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়। উৎসের ভিত্তিতে এগুলোকে দুই ভাগে দেখা যায়। কিছু ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা শুরু থেকেই ছোট আকারে তৈরি হয়—শিল্পের কাঁচামাল বা কিছু পণ্যে ব্যবহারের জন্য। এগুলো প্রাথমিক মাইক্রোপ্লাস্টিক। অন্যদিকে পলিথিন ব্যাগ, বোতল, প্যাকেট, সিনথেটিক কাপড়, মাছ ধরার জালসহ বড় প্লাস্টিক সামগ্রী সূর্যের আলো, তাপ, ঘর্ষণ ও সময়ের প্রভাবে ভেঙে ক্রমে ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়। এগুলো দ্বিতীয়ক মাইক্রোপ্লাস্টিক।

সমস্যা হলো, একটি প্লাস্টিক বোতল নদী থেকে তুলে ফেলা সম্ভব; কিন্তু সেটি যখন হাজার হাজার অতি ক্ষুদ্র কণায় ভেঙে যায়, তখন দূষণ নিয়ন্ত্রণ অনেক কঠিন হয়ে পড়ে। এসব কণা পানিতে ভাসতে পারে, তলদেশের পলিতে জমতে পারে এবং আকার ও বৈশিষ্ট্যের কারণে বিভিন্ন জলজ প্রাণী খাদ্য ভেবে গ্রহণ করতে পারে। প্লাস্টিকের সঙ্গে আবার পরিবেশে থাকা অন্যান্য রাসায়নিক দূষকও যুক্ত হতে পারে। ফলে মাইক্রোপ্লাস্টিককে শুধু ‘ছোট প্লাস্টিক’ হিসেবে দেখলে সমস্যাটির গভীরতা বোঝা যায় না।

বিশ্বের সংকট, বাংলাদেশের জন্য সতর্কতা

বিশ্বে প্রতিবছর ৪০ কোটিরও বেশি টন প্লাস্টিক উৎপাদনের কথা আন্তর্জাতিকভাবে বহুল উদ্ধৃত। উৎপাদন ও ব্যবহারের পর বিপুল প্লাস্টিক বর্জ্যের একটি অংশ যথাযথভাবে সংগ্রহ বা পুনর্ব্যবহার না হয়ে নদী-খাল-পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত সাগরে পৌঁছায়। নদীবাহিত প্লাস্টিক নিয়ে আন্তর্জাতিক গবেষণাগুলো বিশেষভাবে এশিয়ার ঘনবসতিপূর্ণ ও দ্রুত নগরায়নশীল অঞ্চলগুলোর ঝুঁকি তুলে ধরেছে।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের জনঘনত্ব বেশি, নদীর সংখ্যা অনেক, শহর দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে এবং বহু এলাকায় বর্জ্য সংগ্রহ ও পরিশোধন অবকাঠামো এখনও চাহিদার তুলনায় দুর্বল। বর্ষায় ড্রেন, খাল ও নদীর সংযোগ আরও সক্রিয় হয়। ফলে শহর ও শিল্পাঞ্চলে ফেলে দেওয়া প্লাস্টিকের শেষ গন্তব্য প্রায়ই নদী। নদী সেই বর্জ্যকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় বহন করে; আবার একটি অংশ পলিতে আটকে দীর্ঘদিন থেকে যায়। অর্থাৎ প্লাস্টিক ব্যবস্থাপনায় ব্যর্থতার মূল্য শেষ পর্যন্ত নদীকেই দিতে হয়।

হালদা: প্রজননক্ষেত্রে অদৃশ্য চাপ

হালদা বাংলাদেশের মৎস্যসম্পদের জন্য সাধারণ কোনো নদী নয়। এটি রুইজাতীয় কার্প মাছের প্রাকৃতিক প্রজননের জন্য অনন্য। প্রজনন মৌসুমে মা মাছের ডিম সংগ্রহ, রেণু উৎপাদন এবং সেখান থেকে দেশের মিঠাপানির মাছচাষে অবদান—সব মিলিয়ে হালদার পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক মূল্য অসাধারণ।

এই নদীর মাছ ও পরিবেশে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হওয়ার গবেষণার খবর তাই বিশেষ উদ্বেগের। হালদার সঙ্গে যুক্ত খাল, তীরবর্তী বসতি ও শিল্পকারখানা থেকে আসা বর্জ্য নদীর ওপর চাপ তৈরি করে। নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহে দীর্ঘদিনের মানবীয় হস্তক্ষেপও দূষণ ছড়ানো ও জমার ধরনকে প্রভাবিত করতে পারে। অতীতে নদীর একাধিক প্রাকৃতিক বাঁক কেটে সোজা করা, স্লুইস গেট ও অন্যান্য অবকাঠামোর প্রভাব নিয়ে গবেষকরা আলোচনা করেছেন।

হালদায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের প্রশ্নটি তাই শুধু একটি দূষণ সূচকের প্রশ্ন নয়। এটি মাছের প্রজনন, প্রাকৃতিক জিনগত সম্পদ, জলজ জীববৈচিত্র্য এবং ভবিষ্যৎ মৎস্য উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত। এই নদীকে রক্ষা করতে হলে দৃশ্যমান বর্জ্যের পাশাপাশি অদৃশ্য দূষককেও নিয়মিত পর্যবেক্ষণের আওতায় আনতে হবে।

বুড়িগঙ্গা: নগরায়নের মূল্য কে দিচ্ছে?

বুড়িগঙ্গার গল্প আরও নির্মম। যে নদীকে ঘিরে ঢাকা বিকশিত হয়েছে, সেই শহরেরই বর্জ্য দীর্ঘদিন ধরে নদীটির ওপর অসহনীয় চাপ সৃষ্টি করছে। পয়োবর্জ্য, শিল্পবর্জ্য, প্লাস্টিক, পলিথিন এবং নানা ধরনের কঠিন বর্জ্য প্রতিদিন নদীতে পৌঁছায়। পুরান ঢাকার একটি সীমিত অংশেই শত শত পাইপ ও বর্জ্য নির্গমন পয়েন্ট দিয়ে অপরিশোধিত তরল নদীতে যাওয়ার তথ্য বিভিন্ন জরিপে উঠে এসেছে।

বুড়িগঙ্গার ক্ষেত্রে উদ্বেগের আরেকটি দিক হলো বহু দূষকের সহাবস্থান। মাইক্রোপ্লাস্টিকের পাশাপাশি ভারী ধাতু ও অন্যান্য রাসায়নিক দূষণের তথ্যও গবেষণায় এসেছে। পরিবেশে একাধিক দূষক একসঙ্গে থাকলে তাদের পারস্পরিক প্রভাব বোঝা আরও জটিল হয়। তাই বুড়িগঙ্গাকে শুধু ‘নোংরা নদী’ হিসেবে দেখলে চলবে না; এটিকে একটি জনস্বাস্থ্য ও নগর-পরিবেশ ব্যবস্থাপনার সংকট হিসেবে দেখতে হবে।

ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নত না করে বুড়িগঙ্গাকে বাঁচানোর চেষ্টা অনেকটা কল খোলা রেখে মেঝের পানি মোছার মতো। দূষণের উৎস বন্ধ না হলে নদী পরিষ্কারের বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ স্থায়ী ফল দেবে না।

নদীর সীমানা পেরিয়ে খাদ্যচক্রে

হালদা ও বুড়িগঙ্গা দুটি বহুল আলোচিত উদাহরণ, কিন্তু সমস্যা সেখানেই সীমাবদ্ধ নয়। রূপসা ও ভৈরব নদীর পলিতে প্রতি কেজিতে হাজার হাজার মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়ার তথ্য গবেষণায় উঠে এসেছে। ঢাকার আশপাশের খালেও উচ্চমাত্রার মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। এগুলো দেখায়, দূষণটি বিচ্ছিন্ন নয়; নদী, খাল, শহর ও উপকূলকে যুক্ত করা একটি বৃহত্তর প্রবাহের অংশ।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো খাদ্যের সঙ্গে এর সংযোগ। বাংলাদেশের বাজারে বিক্রি হওয়া বিভিন্ন প্রজাতির মাছ নিয়ে একটি গবেষণায় পরীক্ষিত মাছের উল্লেখযোগ্য অংশে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। ভোজ্যতেল, টুথপেস্ট এবং উপকূলীয় লবণ নিয়েও গবেষণায় ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণার উপস্থিতি জানানো হয়েছে। বিভিন্ন গবেষণার নমুনা, পদ্ধতি ও ফলাফল এক নয়— তাই একটি গবেষণার সংখ্যা দিয়ে পুরো দেশের অবস্থা নির্ধারণ করা ঠিক হবে না। কিন্তু আলাদা আলাদা উৎসে বারবার মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হওয়া একটি বিষয় পরিষ্কার করে— আমাদের এক্সপোজারের পথ একাধিক।

জলজ খাদ্যশৃঙ্খলে ক্ষুদ্র প্রাণী প্লাস্টিক কণা গ্রহণ করতে পারে; সেগুলো আবার মাছের খাদ্য হতে পারে। মানুষ মাছের কোন অংশ খাচ্ছে, কণার আকার কত, রান্না বা প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রভাব কী—এসবের ওপর মানুষের প্রকৃত গ্রহণমাত্রা নির্ভর করে। তাই ‘মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে’মানেই তাৎক্ষণিক স্বাস্থ্যবিপর্যয়— এমন সিদ্ধান্ত বৈজ্ঞানিকভাবে অতিসরলীকরণ হবে। বরং এটি আরও গবেষণা, মানসম্মত পরীক্ষা ও দীর্ঘমেয়াদি নজরদারির জোরালো কারণ।

মানবস্বাস্থ্য: আতঙ্ক নয়, সতর্কতার বিজ্ঞান

মানুষের রক্ত, ফুসফুস, প্লাসেন্টা এবং সাম্প্রতিক গবেষণায় অন্যান্য অঙ্গ-টিস্যুতেও মাইক্রো ও ন্যানোপ্লাস্টিক শনাক্ত হওয়ার খবর বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা দরকার— কোনো পদার্থ শরীরে শনাক্ত হওয়া এবং সেটি নির্দিষ্ট রোগের সরাসরি কারণ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়।

গবেষণাগারে ও প্রাণীভিত্তিক পরীক্ষায় প্রদাহ, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, কোষীয় ক্ষতি এবং হরমোন-সম্পর্কিত প্রক্রিয়ায় সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ দেখা গেছে। প্লাস্টিকের নিজস্ব উপাদান ছাড়াও এতে ব্যবহৃত কিছু রাসায়নিক সংযোজক এবং পরিবেশ থেকে কণার পৃষ্ঠে যুক্ত দূষক ঝুঁকির অংশ হতে পারে। কিন্তু, মানুষের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির মাত্রা, কোন আকারের কণা কতটা ক্ষতিকর, দৈনিক গ্রহণের নিরাপদ সীমা কত— এসব প্রশ্নে বিজ্ঞান এখনও উত্তর খুঁজছে।

এই অনিশ্চয়তা নিষ্ক্রিয় থাকার অজুহাত নয়। বরং সতর্কতামূলক নীতি গ্রহণের যুক্তি। কারণ দূষণ ছড়িয়ে পড়ার পর অতি ক্ষুদ্র কণা পরিবেশ থেকে ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত কঠিন ও ব্যয়বহুল।

মৎস্য, খাদ্যনিরাপত্তা ও ব্লু ইকোনমির প্রশ্ন

বাংলাদেশে মাছ শুধু একটি খাদ্যপণ্য নয়; এটি পুষ্টি, কর্মসংস্থান, গ্রামীণ অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও রপ্তানির অংশ। নদী, মোহনা ও উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রের স্বাস্থ্য দুর্বল হলে তার প্রভাব মৎস্যসম্পদের ওপর পড়বেই। মাইক্রোপ্লাস্টিকের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে বিশ্বজুড়ে মাছের খাদ্যগ্রহণ, বৃদ্ধি, প্রজনন, আচরণ ও শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়া নিয়ে গবেষণা চলছে।

বাংলাদেশ যখন টেকসই মৎস্য, নিরাপদ খাদ্য ও ব্লু ইকোনমির সম্ভাবনা নিয়ে এগোতে চায়, তখন জলজ পরিবেশের গুণগত মানকে অর্থনৈতিক পরিকল্পনার কেন্দ্রে রাখতে হবে। আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যনিরাপত্তা ও পরিবেশগত মান ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে। ভবিষ্যতে মাইক্রোপ্লাস্টিক পর্যবেক্ষণও সামুদ্রিক ও মৎস্যপণ্যের মাননিয়ন্ত্রণ আলোচনায় আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। তাই এখন থেকেই গবেষণাগার সক্ষমতা, তথ্যভান্ডার এবং মানসম্মত মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা দূরদর্শী বিনিয়োগ।

নদী পরিষ্কারের আগে দূষণের পথ বন্ধ করতে হবে

প্রথম কাজ হওয়া উচিত উৎসে প্লাস্টিক কমানো। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ও অপ্রয়োজনীয় প্যাকেজিংয়ের ব্যবহার বাস্তবসম্মতভাবে কমাতে হবে এবং কার্যকর বিকল্প সহজলভ্য করতে হবে। শুধু নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা যথেষ্ট নয়; উৎপাদক, বাজার, ভোক্তা ও স্থানীয় সরকারের জন্য বাস্তবায়নযোগ্য ব্যবস্থা দরকার।

দ্বিতীয়ত, শহর ও শিল্পাঞ্চলের বর্জ্য সংগ্রহ, পৃথকীকরণ, পুনর্ব্যবহার এবং বর্জ্যপানি পরিশোধনের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। অপরিশোধিত শিল্প ও পয়োবর্জ্য যেন খাল হয়ে নদীতে না যায়, সে জন্য নিয়মিত তদারকি এবং আইন প্রয়োগ জরুরি। উৎপাদককে পণ্যের পরবর্তী বর্জ্যের দায়ে যুক্ত করার ‘Extended Producer Responsibility’ বা EPR ধারণাকেও কার্যকরভাবে এগিয়ে নেওয়া যেতে পারে।

তৃতীয়ত, বাংলাদেশের প্রধান নদীগুলোর পানি, পলি ও নির্বাচিত জলজ প্রাণীতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের জন্য একটি জাতীয় মনিটরিং প্রটোকল দরকার। গবেষণায় নমুনা সংগ্রহ, কণা শনাক্তকরণ ও রিপোর্টিংয়ের পদ্ধতি এক না হলে এক এলাকার ফল অন্য এলাকার সঙ্গে তুলনা করা কঠিন হয়। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, পরিবেশ অধিদপ্তর, মৎস্য অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার সমন্বয়ে একটি জাতীয় ডেটাবেস তৈরি করা যেতে পারে।

চতুর্থত, হালদার মতো পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল নদীতে উৎসভিত্তিক দূষণ মানচিত্র তৈরি করা জরুরি। কোথা থেকে প্লাস্টিক আসছে—শিল্প, বাজার, বসতি, পর্যটন, মাছ ধরার উপকরণ না পয়োনিষ্কাশন—তা না জানলে সঠিক সমাধানও নির্ধারণ করা যাবে না।

সবশেষে, নাগরিক আচরণকে বাদ দিয়ে কোনো প্লাস্টিক নীতি সফল হবে না। আমরা যে প্যাকেটটি রাস্তায় ফেলি, সেটি ড্রেন হয়ে খালে, খাল থেকে নদীতে এবং নদী থেকে আবার আমাদের খাদ্যব্যবস্থায় ফিরে আসতে পারে। এই সহজ সম্পর্কটি স্কুল থেকে বাজার, পরিবার থেকে শিল্পপ্রতিষ্ঠান—সব পর্যায়ে বোঝাতে হবে।

শেষ কথা

হালদার মা মাছ জানে না মাইক্রোপ্লাস্টিক কী! বুড়িগঙ্গার স্রোতও জানে না কোন বর্জ্য শিল্পের, কোনটি শহরের, আর কোনটি আমাদের দৈনন্দিন অসচেতনতার ফল। নদী শুধু আমাদের ফেলে দেওয়া জিনিস বহন করে— কখনো সাগরের দিকে, কখনো পলির ভেতর, কখনো জীবনের খাদ্যশৃঙ্খলে।

এই কারণেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের সংকটকে কেবল পরিচ্ছন্নতার সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি আমাদের উৎপাদন ও ভোগের ধরন, নগর ব্যবস্থাপনা, শিল্পনীতি, গবেষণা সক্ষমতা এবং নদীর সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের পরীক্ষা।

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ— এই পরিচয় আমরা গর্ব করে বলি। কিন্তু নদীকে যদি আমরা বর্জ্যের শেষ ঠিকানা বানিয়ে ফেলি, তবে সেই দূষণ শেষ পর্যন্ত নদীতেই আটকে থাকবে না। মাছের মাধ্যমে, খাদ্যের মাধ্যমে, পানির মাধ্যমে তার একটি অংশ আবার আমাদের জীবনেই ফিরে আসবে। তাই প্রশ্নটি আর শুধু ‘নদীতে কত প্লাস্টিক আছে’নয়। আসল প্রশ্ন—আমরা কি সেই প্লাস্টিক আমাদের থালায় পৌঁছানোর আগেই তার পথ বন্ধ করতে পারব?

সময় এখনো ফুরিয়ে যায়নি। উৎসে প্লাস্টিক কমানো, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা, শিল্পদূষণ নিয়ন্ত্রণ, বিজ্ঞানভিত্তিক নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং নাগরিক দায়িত্ব—এই পাঁচটি স্তম্ভে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে পরিস্থিতি বদলানো সম্ভব। অদৃশ্য দূষণের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধও হতে হবে দৃশ্যমান: কঠোর নীতি, নির্ভরযোগ্য বিজ্ঞান এবং আমাদের প্রতিদিনের দায়িত্বশীল আচরণ। নদীকে বাঁচানো মানে শেষ পর্যন্ত আমাদের নিজেদের খাদ্য, স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎকে বাঁচানো।

লেখক: সিনিয়র প্রোগ্রাম স্পেশালিস্ট (মৎস্য), সার্ক এগ্রিকালচার সেন্টার (SAC), ঢাকা

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

মুসলিম উম্মাহ: অতীতের গৌরব, বর্তমানের সংকট ও পুনর্জাগরণ

কেন বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তালিকায় মুসলিম বিশ্বের উপস্থিতি সীমিত? কেন এত প্রাকৃতিক সম্পদ থাকা সত্ত্বেও বহু মুসলিম দেশ প্রযুক্তির ক্রেতা, উদ্ভাবক নয়? কেন রাজনৈতিক বিভক্তি ও অভ্যন্তরীণ সংঘাত বাইরের শক্তির জন্য হস্তক্ষেপের সুযোগ তৈরি করে?

৮ দিন আগে

শুধু দাবিদাওয়ার আন্দোলন নয়, রাস্তায় নেমে আসা সাধারণ মানুষের গল্প

২০ জুলাইয়ের সেই দিন এবং এরপর পুলিশি দমন-পীড়ন প্রত্যক্ষ করার পরও মানুষ যে আবার যন্তর মন্তরে ফিরে এসেছে, তা সম্ভব হতো না, যদি এমন এক শ্রেণির মানুষ এতে যুক্ত না হতো, যারা এতদিন সংগঠিত রাজনীতির বাইরে ছিল। তারা এতদিন শুধু পর্যবেক্ষক ছিল। কিন্তু এবার তারা সিদ্ধান্ত নেয়, আর নয়। নিরাপত্তা কর্মকর্তারাও স্বী

৮ দিন আগে

পোল্ট্রি খামার: লোকসানে প্রান্তিক খামারিরা

বিশ্ব জুড়ে মানুষের খাদ্যতালিকায় প্রোটিনের অন্যতম প্রধান উৎস এখন পোল্ট্রি বা ফার্মের মুরগির মাংস। জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং মানুষের অর্থনৈতিক উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে এই মাংসের চাহিদাও দিন দিন বাড়ছে। তবে এই প্রতিযোগিতায় বিশ্ববাজারে এখনো বেশ পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) তথ্যমতে, বি

৯ দিন আগে

ককরোচ আন্দোলনে উত্তাল দিল্লি, ভারতের বুকেও কি ‘জুলাইয়ের আবহ’?

দুই দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা, আন্দোলনের কারণ ও প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে আন্দোলনের সূচনা, তরুণদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং পরে রাজপথে বড় আকারের বিক্ষোভের কারণে ভারতের চলমান ঘটনাপ্রবাহকে ঘিরে অনেকেই ‘জুলাইয়ের আবহ’-এর সঙ্গে তুলনা করছেন।

১১ দিন আগে