২০২৫ সালে সংখ্যালঘু সংক্রান্ত ৬৪৫ ঘটনায় সাম্প্রদায়িক উপাদান ৭১টিতে: সরকার

প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ১৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১৬: ১৮
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং

২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এক বছরে পুলিশের নথি পর্যালোচনায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য সংশ্লিষ্ট মোট ৬৪৫টি ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৭১টি ঘটনায় সাম্প্রদায়িক উপাদান পাওয়া গেছে, আর ৫৭৪টি ঘটনা সাম্প্রদায়িক নয় বলে মূল্যায়ন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং।

ফার্স্ট ইনফরমেশন রিপোর্ট (এফআইআর), জেনারেল ডায়েরি (জিডি), চার্জশিট এবং সারাদেশের তদন্ত অগ্রগতি পর্যালোচনা করে এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।

ওই পর্যালোচনার ভিত্তিতে প্রেস উইং বলছে, প্রতিটি অপরাধের ঘটনাই উদ্বেগজনক হলেও, তথ্য-উপাত্তের প্রমাণভিত্তিক বিশ্লেষণ থেকে এটি স্পষ্ট যে, অধিকাংশ ঘটনাই সাম্প্রদায়িক সহিংসতা নয়, বরং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পর্কিত; যা একদিকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চ্যালেঞ্জ নির্দেশ করে, অন্যদিকে ভীতি বা বিভ্রান্তির বদলে তথ্যভিত্তিক আলোচনার গুরুত্বকে তুলে ধরে।

পর্যালোচনায় আরও বলা হয়েছে, সাম্প্রদায়িক ঘটনাগুলোর মধ্যে প্রধানত ধর্মীয় উপাসনালয় ও প্রতিমা ভাঙচুর বা অবমাননার ঘটনা ছিল, পাশাপাশি অল্পসংখ্যক অন্যান্য অপরাধও অন্তর্ভুক্ত ছিল। অন্যদিকে, সংখ্যালঘু ব্যক্তি বা সম্পত্তিকে প্রভাবিত করে এমন অধিকাংশ ঘটনাই ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত নয় বরং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে উদ্ভূত— যার মধ্যে প্রতিবেশীর সঙ্গে বিরোধ, জমি সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, চুরি, যৌন সহিংসতা এবং পূর্ববর্তী ব্যক্তিগত শত্রুতাজনিত ঘটনাও রয়েছে।

তবে সব ধরনের অপরাধই গুরুতর এবং জবাবদিহিতা দাবি করে উল্লেখ করে প্রেস উইং জানায়, উপাত্ত থেকে এটি স্পষ্ট যে সংখ্যালঘু ভুক্তভোগীদের অধিকাংশ ঘটনাই সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ থেকে নয়, বরং ধর্ম ও জাতিগত পরিচয়ের ঊর্ধ্বে থাকা বিস্তৃত অপরাধমূলক ও অন্যান্য সামাজিক কারণ থেকে উদ্ভূত। এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক শ্রেণিবিন্যাস ভ্রান্ত তথ্য প্রতিরোধে সহায়তা করে এবং আরও কার্যকর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণে ভূমিকা রাখে।

এ ছাড়া প্রেস উইংয়ের প্রতিবেদনে পুলিশের উল্লেখযোগ্য তৎপরতার কথাও উঠে এসেছে। বলা হয়েছে, কয়েকশ ঘটনায় আনুষ্ঠানিকভাবে মামলা রুজু করা হয়েছে, বহু ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং অন্যান্য ঘটনায় তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। বিশেষ করে ধর্মীয় উপাসনালয় বা সাম্প্রদায়িকভাবে সংবেদনশীল বিষয় জড়িত এমন ঘটনাগুলোতে অপরাধ দমন ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রাতিষ্ঠানিক অঙ্গীকারের প্রতিফলন এতে দেখা যায়।

প্রতিবেদনে প্রেস উইং বলছে, জাতীয় পর্যায়ে বাংলাদেশ এখনও গুরুতর আইনশৃঙ্খলা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। প্রতি বছর সারাদেশে সহিংস অপরাধে গড়ে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ মানুষের প্রাণহানি ঘটে— যা কোনোভাবেই গর্ব করার মতো বিষয় নয়। প্রতিটি প্রাণহানি একটি ট্র্যাজেডি এবং এমন পরিসংখ্যানের মুখে কোনো সমাজেরই আত্মতুষ্টিতে ভোগা উচিত নয়। তবে একই সঙ্গে, এই পরিসংখ্যানকে প্রাসঙ্গিক প্রেক্ষাপটে বুঝতে হবে। সহিংস অপরাধ ধর্ম, জাতিগত পরিচয় ও ভৌগোলিক সীমা অতিক্রম করে সব সম্প্রদায়কেই প্রভাবিত করে।

প্রেস উইং আরও জানায়— গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিদ্যমান সূচকগুলো দেখায় যে বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নতির পথে যাচ্ছে। উন্নত পুলিশিং ব্যবস্থা, গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বয় জোরদার, দ্রুত সাড়া প্রদান এবং জবাবদিহিতা বৃদ্ধির ফলে ধীর হলেও অর্থপূর্ণ অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অপরাধ আরও কমিয়ে আনতে এবং আইনের আওতায় সবার জন্য সমান সুরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান এবং অন্যান্য বিশ্বাসের মানুষের দেশ— যেখানে সব নাগরিকের সমান অধিকার রয়েছে। প্রতিটি সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা কেবল আমাদের সাংবিধানিক দায়িত্বই নয়, বরং একটি নৈতিক কর্তব্য। উপাসনালয়ের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, উসকানি প্রতিরোধ করা, অপরাধমূলক ঘটনার ক্ষেত্রে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া এবং গুজব থেকে সত্যকে আলাদা করা সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য অত্যাবশ্যক।

এই প্রতিবেদনটি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার জন্যে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রেস উইং। এতে চ্যালেঞ্জ অস্বীকার করা হয়নি, আবার স্বস্তিদায়ক বলেও দাবিও করা হয়নি। বরং, এটি বৃহত্তর জাতীয় প্রেক্ষাপটে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর প্রভাব ফেলছে এমন অপরাধ প্রবণতার একটি বাস্তব, প্রমাণ-ভিত্তিক চিত্র তুলে ধরার জন্যে উপস্থাপন করা হয়েছে— এমনটাই বলছে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং।

এ ছাড়া গঠনমূলক পর্যালোচনা, দায়িত্বশীল প্রতিবেদন এবং ধারাবাহিক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার— এই তিনটিই আইনশৃঙ্খলার অগ্রগতির জন্য অপরিহার্য উল্লেখ করে প্রেস উইং বলছে, বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা দ্বারা নির্ধারিত হয় না, বরং এগুলো মোকাবেলার সম্মিলিত প্রচেষ্টার দ্বারা নির্ধারিত হয়। এখনও কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেলেও এটি স্পষ্ট যে বাংলাদেশের সকল নাগরিকের জন্য— মুসলিম, হিন্দু ও অন্যান্য সবার জন্যই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রতিদিন উন্নতির পথে রয়েছে।

সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পর্কিত ঘটনা (প্রেস উইংয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী):

(জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর, ২০২৫)

মোট ঘটনার সংখ্যা: ৬৪৫

সাম্প্রদায়িক উপাদান রয়েছে এমন ঘটনা: ৭১

  • মন্দির ভাঙচুর: ৩৮
  • মন্দিরে চুরি: ০১
  • হত্যাকাণ্ড: ০১
  • মন্দিরে অগ্নিসংযোগ : ০৮
  • অন্যান্য: ২৩ (অন্যের মধ্যে রয়েছে: প্রতিমা ভাঙার হুমকি, ফেসবুক পোস্ট, উপাসনালয়ের আঙ্গিনায় ক্ষতি ইত্যাদি)

পুলিশি ব্যবস্থা:

  • মামলা দায়ের: ৫০
  • গ্রেপ্তার: ৫০
  • অন্যান্য পুলিশি ব্যবস্থা: ২১ (অন্যান্য এর মধ্যে রয়েছে: প্রতিমা ভাঙার হুমকি, ফেসবুক পোস্ট, উপাসনালয় আঙ্গিনার ক্ষতি ইত্যাদি)

সাম্প্রদায়িক উপাদান নেই এমন ঘটনা: ৫৭৪

  • প্রতিবেশী বিরোধ: ৫১
  • জমি সংক্রান্ত বিরোধ: ২৩
  • চুরি: ১০৬
  • পূর্বশত্রুতা: ২৬
  • অস্বাভাবিক মৃত্যু: ১৭২
  • ধর্ষণ: ৫৮
  • অন‍্যান‍্য: ১৩৮

পুলিশি ব্যবস্থা:

  • মামলা দায়ের: ৩৯০
  • ইউডি মামলা: ১৫৪
  • গ্রেপ্তার: ৪৯৮
  • অন্যান্য পুলিশি ব্যবস্থা: ৩০ (অন্যান্যর মধ্যে রয়েছে: অপহরণ, ভয়ভীতি প্রদর্শন, চাঁদাবাজি ইত্যাদি)
ad
ad

খবরাখবর থেকে আরও পড়ুন

টবি ক্যাডম্যানের মেয়াদ নবায়ন করা হয়নি: চিফ প্রসিকিউটর

যদিও ব্রিটিশ মানবাধিকার কর্মী এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান তার ফেসবুক পোস্টে সোমবার বিকেলে জানান, আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন বিশেষজ্ঞ ও ব্রিটিশ ব্যারিস্টার টোবি ক্যাডম্যান বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) প্রধান প্রসিকিউটরের বিশেষ উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন।

৫ ঘণ্টা আগে

এস আলমের সম্পত্তি দেখভালে রিসিভার নিয়োগ

এদিন দুদকের উপপরিচালক তাহাসিন মুনাবীল হক এসব জমি ও স্থাপনা দেখভালে রিসিভার নিয়োগের আবেদন করেন। শুনানি শেষে আদালত আবেদনটি মঞ্জুর করেন।

৫ ঘণ্টা আগে

জাহিদ মালেকের দুই মেয়ের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা

অনুসন্ধানকালে নথি নিরীক্ষা ও গোপন সোর্সের মাধ্যমে পাওয়া তথ্যাদি পর্যালোচনায় প্রতীয়মাণ হয়, জাহিদ মালেকের সহযোগিতায় অভিযোগ সংশ্লিষ্টরা দেশত্যাগ করার চেষ্টা করছেন। তারা বিদেশে পালিয়ে গেলে অনুসন্ধান কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হতে পারে। সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে তাদের বিদেশ গমন রহিত করা প্রয়োজন।

৬ ঘণ্টা আগে

শাবান মাসের চাঁদ দেখা যায়নি, ৩ ফেব্রুয়ারি পবিত্র শবে বরাত

আগামী ২১ জানুয়ারি (বুধবার) থেকে পবিত্র শাবান মাস গণনা শুরু হবে। সে অনুযায়ী আগামী ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ মঙ্গলবার দিবাগত রাতে সারাদেশে পবিত্র শবে বরাত পালিত হবে।

৬ ঘণ্টা আগে