প্রাথমিকের প্রশ্নপত্র সরবরাহ-বিক্রির অভিযোগ, অস্বীকার সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তার

নান্দাইল (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি
সরবরাহ করা বাংলা ও ইংরেজি প্রশ্নপত্র, যাতে বিদ্যালয়ের নাম লেখা নেই। ছবি: রাজনীতি ডটকম
সরবরাহ করা বাংলা ও ইংরেজি প্রশ্নপত্র, যাতে বিদ্যালয়ের নাম লেখা নেই। ছবি: রাজনীতি ডটকম

ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় প্রান্তিক মূল্যায়ন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়ন ও সরবরাহ নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। কয়েকটি ক্লাস্টারের একাধিক বিদ্যালয়ে একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়া এবং কিছু বিদ্যালয়ে প্রশ্নপত্রের জন্য টাকা নেওয়ার অভিযোগ করেছেন শিক্ষকরা। এ ঘটনায় উপজেলা শিক্ষা কার্যালয়ের সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা সালমা আক্তারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তবে তিনি প্রশ্নপত্র তৈরি বা বিক্রির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

গত বুধবার উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষা বা দ্বিতীয় প্রান্তিক মূল্যায়ন শেষ হয়। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিজেদের প্রণয়ন করা প্রশ্নপত্র দিয়ে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা নেওয়ার কথা। কোনো বিদ্যালয়ে এককভাবে প্রশ্নপত্র তৈরি করা সম্ভব না হলে একাধিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক একত্রে বসে প্রশ্নপত্র তৈরি করে তা দিয়ে পরীক্ষা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

তবে চলতি মাসে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় প্রান্তিক মূল্যায়ন পরীক্ষায় অনেক বিদ্যালয়ে বাইরে থেকে প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করে পরীক্ষা নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এ অভিযোগের ভিত্তিতে নান্দাইল উপজেলার রাজগাতী, মুশুলী, আচারগাঁও ও সিংরইল ইউনিয়নের দুটি ক্লাস্টারের একাধিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে খোঁজ নিয়ে একই প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। ওই দুটি ক্লাস্টারে মোট ৭০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষক জানান, তারা নিজেরা প্রশ্নপত্র তৈরি করেননি। উপজেলা শিক্ষা কার্যালয়ের সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা সালমা আক্তার তাদের কাছে প্রশ্নপত্র সরবরাহ করেছেন বলে অভিযোগ করেন তারা। বিনিময়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনুযায়ী টাকা দিতে হয়েছে বলেও দাবি করেন কয়েকজন শিক্ষক।

শিক্ষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কোনো বিদ্যালয়ে ৩০০ শিক্ষার্থী থাকলে প্রশ্নপত্রের জন্য প্রায় ৩ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। বিদ্যালয়গুলো শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ফি আদায় করে এই অর্থের ব্যবস্থা করেছে বলে জানান তারা। তবে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পরীক্ষার জন্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ফি আদায়ের কোনো বিধান নেই বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

বিদ্যালয়গুলোতে একই প্রশ্নপত্র

নান্দাইল উপজেলার গাংগাইল ইউনিয়নের অরণ্যপাশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. তোফাজ্জল হোসেন বলেন, তিনি উপজেলা শিক্ষা অফিস থেকে প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করেছেন।

মুশুলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সালমা বেগম বলেন, ক্লাস্টারভিত্তিক কয়েকটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের প্রণয়ন করা প্রশ্নপত্র দিয়ে তার বিদ্যালয়ে পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে।

তবে তার বিদ্যালয়ের প্রশ্নপত্রের সঙ্গে অন্য বিদ্যালয়ের প্রশ্নপত্রের হুবহু মিল পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে সালমা বেগম বলেন, অন্য বিদ্যালয়গুলো হয়তো উপজেলা শিক্ষা অফিস থেকে প্রশ্নপত্র কিনেছে। প্রশ্নপত্রের টাকা পরিশোধের জন্য অভিভাবকদের নিয়ে সভা করে বিষয়টি জানানো হয়। পরে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পরীক্ষার ফি নেওয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান।

মোরাগালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. জাকারিয়া বলেন, তারা নিজেরা প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করেননি। ক্লাস্টারের প্রশ্নপত্র কিনে এনে পরীক্ষা নিয়েছেন। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পরীক্ষার ফি নিয়ে প্রশ্নপত্রের মূল্য পরিশোধ করা হয়েছে।

নগর কচুরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে জানা যায়, ক্লাস্টারভিত্তিক প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করা হলেও সেটি টাকা দিয়ে সংগ্রহ করতে হয়েছে। কয়েকটি বিদ্যালয় থেকে একাধিক বিষয়ের প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করে দেখা যায়, সেগুলোর ওপর সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের নাম লেখা নেই। প্রশ্নপত্রের ওপরে ‘দ্বিতীয় প্রান্তিক মূল্যায়ন’, ‘নান্দাইল, ময়মনসিংহ’ এবং বিষয় ও শ্রেণির নাম উল্লেখ রয়েছে।

অন্যদিকে নান্দাইল পৌরসভার চন্ডীপাশা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও চারিআনিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রশ্নপত্র সংগ্রহ করে দেখা যায়, সেখানে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের নাম উল্লেখ রয়েছে। বিদ্যালয় দুটির শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা নিজেরাই প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করেছেন। এসব প্রশ্নপত্রের সঙ্গে ইউনিয়ন পর্যায়ের বিদ্যালয়গুলোর প্রশ্নপত্রের মিল পাওয়া যায়নি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজগাতী ও মুশুলী ইউনিয়ন এবং সিংরইল ও আচারগাঁও ইউনিয়ন নিয়ে দুটি ক্লাস্টার গঠিত। এ দুটি ক্লাস্টারে মোট ৭০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। বিদ্যালয়গুলোর তদারকির দায়িত্বে রয়েছেন উপজেলা শিক্ষা কার্যালয়ের সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা সালমা আক্তার। প্রশ্নপত্র সরবরাহ ও এর বিনিময়ে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ মূলত তার বিরুদ্ধেই উঠেছে।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে সালমা আক্তার সাংবাদিকদের বলেন, প্রশ্নপত্র তৈরি ও সরবরাহের দায়িত্ব তার নয়। তিনি কোনো প্রশ্নপত্র বিক্রি করেননি। বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের আগেই আলাদা প্রশ্নপত্র তৈরি করে পরীক্ষা নেওয়ার জন্য বলা হয়েছিল। একই সঙ্গে পরীক্ষার জন্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোনো ফি না নিতেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

এ বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফজিলাতুন নেছার সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, নিয়মের বাইরে কিছু করা হয়ে থাকলে বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement