ফিচার

পিরিয়ডের সময় নারীদের কি দুধ খাওয়া উচিত

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
দুধ খাওয়া ভালো, কিন্তু সবার জন্য একইভাবে উপকারী নয়। ছবি: এআইয়ের সাহায্যে তৈরি

পিরিয়ডের সময় নারীদের দুধ খাওয়া উচিত কি না, এই প্রশ্ন অনেকের মনেই ঘোরাফেরা করে। অনেকে মনে করেন, এই সময়ে দুধ খেলে পেটে ব্যথা বাড়ে বা শরীর ভারী লাগে। আবার অনেকেই বলেন, দুধ পুষ্টিকর, তাই পিরিয়ড হোক বা না হোক, প্রতিদিন দুধ খাওয়া ভালো। তবে বৈজ্ঞানিকভাবে এই বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দুধ খাওয়া আসলে উপকারী হতে পারে, তবে কিছু শর্ত আছে। চলুন, সহজ-সরল ভাষায় বিষয়টি ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করি।

পিরিয়ড মানেই নারীর শরীরে নানা ধরনের হরমোনের ওঠানামা। ইস্ট্রোজেন, প্রোজেস্টেরন ইত্যাদি হরমোনের তারতম্যের ফলে শারীরিক ও মানসিক নানা পরিবর্তন ঘটে। পেটব্যথা, মাথাব্যথা, ক্লান্তি, মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া, হজমের সমস্যা—এই সবই পিরিয়ডের সময় অনেক নারীর নিত্যসঙ্গী। ঠিক এই সময়েই খাবারদাবারের দিকেও বাড়তি নজর দেওয়া জরুরি, কারণ পুষ্টিকর খাবার শরীরকে সামলাতে সাহায্য করে। আর দুধ যেহেতু একটি গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টিকর খাবার, তাই একে বাদ দেওয়া কি ঠিক হবে?

প্রথমেই দেখা যাক, দুধে কী কী পুষ্টি উপাদান থাকে। দুধ হল প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি, ভিটামিন বি-১২, রিবোফ্লাভিন (ভিটামিন বি-২), ফসফরাস, পটাশিয়াম ইত্যাদির চমৎকার উৎস। দুধে থাকা ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি হাড় মজবুত রাখে এবং মাসল ফাংশন ঠিক রাখে। পিরিয়ডের সময় যেহেতু অনেক নারী পেট, কোমর বা উরুতে টান টান ব্যথা অনুভব করেন, তাই মাসল রিল্যাক্সেশনের জন্য ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি উপকারী ভূমিকা রাখতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ হেলথ পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ক্যালসিয়ামসমৃদ্ধ খাবার নিয়মিত খাওয়ার ফলে পিরিয়ডের সময় হওয়া "প্রীমেনস্ট্রুয়াল সিনড্রোম" বা পিএমএস-এর উপসর্গ অনেকটাই হ্রাস পায়। যেমন—মুড সুইং, মাথাব্যথা, ক্লান্তি, এমনকি স্তনের অস্বস্তিও কমে আসে।

হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের পুষ্টিবিদ ড. উইলিয়াম হ্যারিসন জানান, "প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় যদি পর্যাপ্ত ক্যালসিয়াম থাকে, তবে পিরিয়ডের সময় হরমোনের ওঠানামা শরীরে কম নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এতে নারীরা তুলনামূলকভাবে বেশি স্বস্তি বোধ করেন।"

আবার যুক্তরাষ্ট্রের জার্নাল অব অবস্ট্রেট্রিকস অ্যান্ড গাইনিকোলজি পত্রিকায় ২০১৯ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রতিদিন ১২০০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম গ্রহণ করলে পিরিয়ডের সময় নারীদের ব্যথা, অস্থিরতা ও মনঃসংযোগের সমস্যা অনেকটা কমে যায়।

এখানে মনে রাখা দরকার, দুধ খাওয়া ভালো, কিন্তু সবার জন্য একইভাবে উপকারী নয়। কিছু নারী দুধ খেলে পেট ফাঁপা, গ্যাস, ডায়রিয়া বা বমিভাব অনুভব করেন। একে বলে "ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স"। এ ক্ষেত্রে পিরিয়ডের সময় দুধ খাওয়া বরং কষ্টের কারণ হতে পারে।

কানাডার টরন্টো ইউনিভার্সিটির ডায়েটিশিয়ান প্রফেসর লরা জনস্টন বলেন, "যাদের ল্যাকটোজ ইনটলারেন্স আছে, তাদের জন্য পিরিয়ডের সময় দুধ খাওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়। তবে তারা দুধের বদলে দই, ছানা বা প্ল্যান্ট-ভিত্তিক মিল্ক যেমন—সয়ামিল্ক বা আলমন্ডমিল্ক খেতে পারেন।"

তবে যাঁদের দুধ সহ্য হয়, তাঁরা অবশ্যই দুধ খেতে পারেন, বরং খাওয়া উচিত। কারণ, পিরিয়ডের সময় শরীর অনেকটা রক্ত হারায়, এতে দুর্বলতা আসে। সেই দুর্বলতা কাটাতে দুধ হতে পারে দারুণ একটি খাবার। দুধে থাকা প্রোটিন শরীরে শক্তি জোগায়, ক্লান্তি কমায়।

এ নিয়েও অনেক ভুল ধারণা আছে। অনেকেই ভাবেন, ঠান্ডা দুধ খেলে পিরিয়ড বন্ধ হয়ে যায় বা ব্যথা বাড়ে। আবার কেউ বলেন, গরম দুধ খেলে আরাম লাগে। আসলে, এই বিষয়টি ব্যক্তিভেদে ভিন্ন। যাঁদের ঠান্ডা দুধ খেয়ে পেট খারাপ হয়, তাঁরা গরম দুধ খেতে পারেন। তবে কোনো বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ঠান্ডা দুধ খাওয়াকে ক্ষতিকর বলা হয়নি।

অনেক নারী পিরিয়ডের সময় মুড ভালো রাখতে চকোলেট খেতে চান। এই সময় চকোলেট মিল্কও খেতে ইচ্ছে করে। চকোলেটে থাকা ম্যাগনেসিয়াম হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। তবে অতিরিক্ত চিনি এড়িয়ে চলা ভালো। তাই ঘরে বানানো লো-সুগার কোকো দুধ খাওয়ায় আপত্তি নেই।

দুধে কী থাকে? এই প্রশ্নেরও উত্তর পাওয়া যায় গবেষণায়। ইউনিভার্সিটি অফ ম্যাসাচুসেটসের গবেষক ড. এমিলি ফস্টার এক গবেষণায় দেখান, "প্রতিদিন দুধ খাওয়া নারীদের মধ্যে পিরিয়ডের সময় ব্যথার মাত্রা তুলনামূলকভাবে কম দেখা গেছে।" কারণ, ক্যালসিয়াম মাসল কনট্রাকশন নিয়ন্ত্রণ করে এবং ম্যাগনেসিয়াম নার্ভের চাপ কমায়।

যদি কেউ দুধ না খেতে চান, তাহলে বিকল্প হিসেবে খেতে পারেন দই বা ঘোল। বিশেষ করে গ্রিক ইয়োগার্ট —এতে প্রোটিন বেশি, ল্যাকটোজ কম। ছানা থেকেও ক্যালসিয়াম পাওয়া যায়। এ ছাড়া, নারকেল দুধ বা ওটমিল্কেও কিছুটা ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি থাকে।

যাঁদের দুধে অ্যালার্জি আছে বা দুধ হজম হয় না, তাঁদের দুধ খাওয়ার দরকার নেই। আবার পিরিয়ডের সময় কারও যদি গ্যাস্ট্রিক প্রবণতা বেড়ে যায়, তাহলে তাঁরা দুধ খেয়ে দেখেই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, উপকারী লাগছে কি না।

পিরিয়ডের সময় দুধ খাওয়া একেকজনের শরীর অনুযায়ী উপকারী বা অপকারী হতে পারে। তবে বৈজ্ঞানিক গবেষণা বলছে, দুধে থাকা ক্যালসিয়াম, প্রোটিন ও ভিটামিন ডি নারীর এই বিশেষ সময়টিতে উপশম দিতে পারে। দুধ খেলে হরমোনের ভারসাম্য রক্ষা হয়, মেজাজ কিছুটা স্থির থাকে, আর পেশি ও হাড় থাকে শক্তিশালী। যাঁরা দুধ সহ্য করতে পারেন, তাঁদের জন্য এটি অবশ্যই একটি ভালো খাদ্য। আর যাঁদের সমস্যা হয়, তাঁরা বিকল্প দুধজাত খাবার খেয়ে সেই ঘাটতি পূরণ করতে পারেন।

সঠিক পুষ্টি নিলে শরীরও সঠিকভাবে কাজ করে। পিরিয়ড একটি স্বাভাবিক জৈবিক প্রক্রিয়া, একে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। বরং নিজের শরীরের প্রতি যত্নশীল হলে এই সময়টাও আরামদায়ক হতে পারে—এক গ্লাস উষ্ণ দুধের মতোই।

ad
ad

খবরাখবর থেকে আরও পড়ুন

দিল্লিতে জাহেদ উর রহমানকে প্রবেশে বাধা, খোঁজ নিচ্ছে ঢাকা

দিল্লি বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীর পলিসি ও স্ট্র্যাটেজিবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানকে প্রবেশে বাধা দেওয়ার ঘটনায় কূটনৈতিক পর্যায়ে খোঁজখবর শুরু করেছে বাংলাদেশ। আগাম কূটনৈতিক যোগাযোগ থাকা সত্ত্বেও তাকে ইমিগ্রেশন পর্যায়ে আটকে দেওয়ার ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন ঢাকার কর্মকর্তারা।

৭ ঘণ্টা আগে

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তিকে স্বাগত বাংলাদেশের, টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠার আশাবাদ

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি চুক্তি চূড়ান্ত হওয়াকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানিয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ একই সঙ্গে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো সদিচ্ছার সঙ্গে চুক্তিটি বাস্তবায়ন করবে এবং এটি দীর্ঘস্থায়ী ও টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

৭ ঘণ্টা আগে

দুদকের ৬ মামলার আসামি বেনজীর, দেশে ফিরিয়ে আনা হবে যেভাবে

এর আগে ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বর-কাণ্ড এবং ডিসেম্বরে তৎকালীন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বাসভবনের সামনের সড়ক বালুর ট্রাক দিয়ে আটকে দেওয়ার মতো আলোচিত ঘটনাগুলোর সময় ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার ছিলেন বেনজীর। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পুলিশের এই কর্মকর্তাকে বক্তৃতা-বিবৃতিতে ক্ষমত

২১ ঘণ্টা আগে

এমপি মনিরুলের বক্তব্য এক্সপাঞ্জড, নাহিদ বললেন ‘বর্ণবাদী’

তার এ বক্তব্য ‘ব্যক্তি স্বাধীনতার লঙ্ঘন’ অভিহিত করে তা এক্সপাঞ্জ (সংসদের কার্যবিবরণী থেকে বাদ) ঘোষণা করেন সংসদ অধিবেশনে সভাপতির আসনে থাকা ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল। পরে সংসদের বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলাম এ বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি এ বক্তব্যকে ‘হীন মানসিকতা ও বর্ণবাদী আচ

১ দিন আগে