বাঘ-সিংহের লড়াই, বিজয়ের মুকুট কার?

বুলা শরীফ
বাঘ ও সিংহের লড়াই। প্রতীকী ছবি

পৃথিবীর অন্যতম হিংস্র শিকারি প্রাণী সিংহ। শক্ত চোয়াল দিয়ে সে সবকিছু ছিন্নভিন্ন করে খেতে পারে। বনের সব প্রাণী তার ভয়ে অস্থির ও তটস্থ থাকে। সিংহ বনের রাজা, নিশ্চয়ই শক্তিশালী। যে কারও সঙ্গে লড়াইয়ে সিংহেরই জেতার কথা।

প্রশ্ন হচ্ছে বনের রাজা সিংহ হলেও একটি দেশের রাজাই কি সবচেয়ে বেশি শক্তিশালী? শৌর্যে-বীর্যে, অর্থে, ক্ষমতায় রাজাই শক্তিশালী হয়ে থাকেন। তবে গায়ের শক্তিতে রাজার চেয়ে অনেক বীরযোদ্ধাই শক্তিশালী হতে পারেন।

ভাবেন তো, একটা পুরুষ বাঘ আর একটা পুরুষ সিংহের মুখোমুখি লড়াইয়ে হলে কী ঘটতে পারে? সমীক্ষায় দেখা যায়, বাঘ ও সিংহের মধ্যে লড়াইয়ে সিংহের জয়ের অনুপাত ১:২৫। অর্থাৎ ২৫টি লড়াইয়ে মধ্যে সিংহ মাত্র একটিতে জয় লাভ করে, বাকি সবগুলো জিতে যায় বাঘ।

এ প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক লড়াইয়ের কাহিনী উল্লেখ করা যেতে পারে। উনিশ শতকের শুরুর দিকের কথা। ভারতীয় উপমহাদেশ তখন ব্রিটিশরা শাসন করছে। কিন্তু তখনো রাজতন্ত্র বিলুপ্ত হয়নি। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে আঞ্চলিক রাজারা তখনো রাজত্ব করছেন। কেউ কেউ ব্রিটিশদের বশ্যতা মেনে নিয়েছেন, কেউ কেউ স্বাধীনভাবে রাজ্য চালাচ্ছেন।

এমন এক রাজা ছিলেন গুজরাটের বরোদায়। গুজরাট ভারতের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য, যেখানে এখনো বুনো সিংহ আছে। নিশ্চয়ই উনবিংশ শতাব্দীর শুরুতেই সিংহের সংখ্যাটা বর্তমানের তুলনায় বেশি ছিল।

রাজার খেয়াল হলো, যুদ্ধ বাঁধাবেন বাঘে-সিংহের মধ্যে। গুজরাট সিংহের জন্য বিখ্যাত। তাই বরোদার রাজার আবেগটা ছিল সিংহের পক্ষেই। তিনি বাজিও ধরেন সিংহের পক্ষ নিয়ে। কিন্ত লড়াইয়ের ময়দানে সিংহ তার মান বাঁচাতে পারেনি। হেরে যায় বাঘের সঙ্গে, সঙ্গে রাজার তহবিল থেকে বেরিয়ে যায় ৩৭ হাজার রুপি।

শুধু একটা লড়াই দিয়ে পুরো দুটো প্রজাতির শক্তিমত্তা বিচার করা হয়তো ঠিক না।সিংহটা শারীরিকভাবে দুর্বল বা অসুস্থ থাকতে পারে। কিন্তু বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ তো আর ভুল তথ্য দেবে না। তাই বৈজ্ঞানিক তুলনাটা দেখে নেওয়া যেতে পারে।

প্রথমেই আসে আকার। খোলা চোখে সিংহের চেয়ে বাঘ আকারে কিছুটা ছোট। কিন্তু ওজনে বাঘ ঢের এগিয়ে। একটা পুরুষ সিংহের ওজন গড়ে ১৯০ কেজি, স্ত্রী সিংহের সেখানে ১৩০ কেজি।

অন্যদিকে একটা পুরুষ রয়েল বেঙ্গল টাইগারের ওজন গড়ে ২২৭ কেজি, স্ত্রী রয়েল বেঙ্গল টাইগারের ওজন ১৪০ কেজি। যদিও ওজন বেশি হলেই সব সময় শক্তি বেশি হয় না। তবে বাঘের-সিংহের বেলায় এটাই সত্যি।

একটা বাঘের চোয়ালের শক্তি সিংহের চেয়ে অনেক বেশি। সিংহপ্রতি বর্গ ইঞ্চিতে ৬৫০ পাউন্ডের ওজনের কামড় বসাতে পারে। অন্যদিকে বাঘের কামড়ের ওজন প্রতি বর্গ ইঞ্চিতে ১০৫০ পাউন্ড।

শিকার ধরার সামর্থ্যেও বাঘ বেশ এগিয়ে। সিংহ নিজের দ্বিগুণ ওজনের প্রাণী শিকার করতে পারে। বাঘ শিকার করতে পারে নিজের ওজনের পাঁচগুণ শক্তিশালী প্রাণীকে।

আফ্রিকায় বুনো মোষ কেপ বাফোলো আছে। ৮৭০ কেজি ওজনের এই বাফোলোকে একা একা শিকার করতে পারে না সিংহ। ভারতীয় উপমহাদেশে বাস করে মহিষ প্রজাতির সবচেয়ে বড় প্রাণী গৌর। একটা পুরুষ গৌরের ওজন গড়ে ১৫০০ কেজি। রয়েল বেঙ্গল টাইগারের অন্যতম প্রিয় শিকার এই গৌর।

উল্লেখ্য, বাঘ একা শিকার করে, সিংহ শিকার করে দলবেঁধে। তাই সদলবলে কেপ বাফোলো শিকার করতেই পারে সিংহ। কিন্তু গৌর শিকারের সময় বাঘ কখোনেই অন্যকে সঙ্গী করে না। বাংলাদেশে এখনো গৌর আছে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের জঙ্গলে। কিন্তু রয়েল বেঙ্গলের আবাস সুন্দরবনে গৌর নেই।

বালাদেশের জঙ্গলে তাই এখন আর বাঘের গৌর শিকারের সুযোগ নেই। তবে ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য জঙ্গলগুলোতে এখনো বাঘ-গৌরের বসবাস আছে।

বাঘ আকারে ছোট, ওজনে বেশি। তাই এর পেশী অনেক শক্তিশালী। যেটা বড় বড় প্রাণী শিকার করতে সুবিধা হিসেবে কাজ করে। তাছাড়া বাঘের পা সিংহের চেয়ে ছোট। সুতরাং শারীরিক ভারসাম্যও বাঘের অনেক বেশি। এটাও বাঘকে অনেকটাই এগিয়ে রাখে।

বাঘের শক্তিমত্তার আরেকটা প্রকাশ হলো, একা থাকার প্রবণতা। শুধু প্রজনন মৌসুমেই কিছু দিন স্ত্রী বাঘের সঙ্গে সময় কাটায় পুরুষ বাঘ। বছরের অন্য সময় তার নিজের এলাকায় নিজেই সর্বেসর্বা।

প্রায় ৫০০ বর্গকিলোমিটারের মতো এলাকা নিজের দখলে রাখে একটা পুরুষ বাঘ। এর মধ্যে অন্য পুরুষ এমনকি বছরের বেশিরভাগ সময় স্ত্রী বাঘেরও প্রবেশ নিষেধ।

সিংহও নিজের এলাকা ভাগ করে নেয়। তবে সেই এলাকায় পুরো একটা দল নিয়েই রাজত্ব করে। এখানেই বাঘের শক্তিমত্তার প্রমাণ যেমন মেলে, তেমনি সিংহের রাজকীয় স্বভাবের চিত্রও ফুটে ওঠে।

বনের রাজা সিংহকে বুদ্ধির জোরে হারিয়ে কুয়োয় ফেলে শেয়াল পণ্ডিতের উল্লাস করার গল্প আমাদের অনেকেই জানি। ‘হুররে হুয়া, কেয়া মজা, বনের রাজা কুপোকাত, কুয়োর মধ্যে দেখে ছায়া লম্ফ দিয়ে প্রাণপাত’।

তবে সিংহ বনের রাজা আসলে দলবদ্ধতার কারণেই। একজন রাজা যেমন পুরো পরিবার, সাম্রাজ্য নিয়ে নিজের রাজ্য চালায়, সিংহের ভেতরেও এ ধরনের বৈশিষ্ট্য রয়েছে। দলের ওপর তার কর্তৃত্ব, নিজে শিকার না করলেও খাবারের সেরা অংশ দখল নেওয়া, প্রয়োজনে রাজার মতো বিলাসী জীবনযাপন সিংহকে রাজার মর্যাদা দিয়েছে।

বাঘ সিংহের চেয়ে বেশি আক্রমণাত্মক। তারা আক্রমণের জন্য মনস্থির করলে সঙ্গে সঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু সিংহ সুযোগের অপেক্ষায় থাকে, বুঝেশুনে আক্রমণে অংশ নেয়।

সিংহের মস্তিষ্কের আকার কিন্তু বাঘের চেয়ে ছোটো। গবেষণার ফল বলছে, বাঘের মস্তিষ্ক সিংহের চেয়ে ১৬ শতাংশ বড়। তাই আপেক্ষিক আর বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে বলা যায়, বাঘ আর সিংহের লড়াইয়ে বিজয় মুকুট বাঘের মাথাতেই থাকবে। (দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যম ও সাময়িকী অবলম্বনে)

ad
ad

খবরাখবর থেকে আরও পড়ুন

অন-অ্যারাইভাল ভিসা বন্ধ করা হচ্ছে: পররাষ্ট্র উপদেষ্টা

পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেন, নির্বাচনের সময় অনেক রকমের চেষ্টা হতে পারে। হুট করে যেন কেউ হাজির হতে না পারে এছাড়া নির্বাচনের সময় অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতেই অন-অ্যারাইভাল ভিসা বন্ধ রাখা হয়েছে।

২ ঘণ্টা আগে

লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার না হ‌ওয়া পর্যন্ত নির্বাচন স্থগিত চেয়ে রিট

নিরাপত্তাহীনতা ও জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের সময় লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধার না হ‌ওয়া পর্যন্ত আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন স্থগিত চেয়ে হাইকোর্টে রিট করা হয়েছে। এতে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ছাড়াও স্বরাষ্ট্র সচিব, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, নির্বাচন কমিশন সচিব, পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ও র‍

৩ ঘণ্টা আগে

আলী রীয়াজের সঙ্গে ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ সদস্যদের সাক্ষাৎ

প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (উপদেষ্টা পদমর্যাদা) এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট বিষয়ে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমের মুখ্য সমন্বয়ক অধ্যাপক আলী রীয়াজের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ইলেকশন অবজারভেশন মিশনের পলিটিক্যাল অ্যানালিস্ট মারসেল নেগি এবং ইলেকশন অ্যানালিস্ট ভাসিল ভাসচেনকা।

৪ ঘণ্টা আগে

নির্বাচনে বিশৃঙ্খলা রোধে ফোর্সের সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে: স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, নির্বাচনে কেউ যেন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে সেজন্য ফোর্সের সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। কেউ বিশৃঙ্খলা করতে পারবে না। সবাই সহযোগিতা করলে নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবেই হবে।

৬ ঘণ্টা আগে