বাদুড় কেন উল্টো হয়ে ঝোলে?

বুলা শরীফ
দিন কিংবা রাত— যখনই বাদুড় বিশ্রাম নেয়, তখন উল্টো হয়ে গাছে ঝোলে। ছবি: সংগৃহীত

পাখিরাও উড়তে পারে। কিন্তু রাতের বেলা পাখিরা গাছের ডালে বসে ঘুমায়। বাদুড়ও উড়তে পারে। কিন্তু এরা আর দশটা পাখি বা প্রাণীর মতো গাছের ডালে বসে বা শুয়ে ঘুমায় না। এরা উল্টো হয়ে ঝুলে থাকে।

দিন কিংবা রাত—যখনই হোক বাদুড়রা যখনই বিশ্রাম নেয়, সোজা হয়ে বসে না, উল্টো হয়ে গাছে ঝোলে। কেন? প্রথম উত্তর হলো, বাদুড় উড়তে পারে বলেই তাদের জন্য উল্টো হয়ে ঝুলে থাকাটাই সুবিধার। কিন্তু পাখিও ওড়ে, ওরা কেন উল্টো হয়ে ঝোলে না?

আসলে বাদুড় পাখি নয়, প্রাণী। পাখির যে সুবিধা আছে বাদুড়ের সেই সুবিধা নেই। বাদুড় আসলে উড়তে সক্ষম ডানাবিশিষ্ট একমাত্র স্তন্যপায়ী প্রাণী। স্তন্যপায়ীদের উড়তে পারার কথা নয়—বিজ্ঞান সেটাই বলে।

এর একটা কারণ, স্তন্যপায়ী প্রাণীদের শারীরিক কাঠামো। প্রতি বর্গইঞ্চি দেহের যে ভর, সেই ভর নিয়ে আসলে আকাশে ওড়া যায় না। পাখিরা পারে, কারণ শরীরের আকারের তুলনায় ভর (চলতি কথায় ওজন) অনেক কম। বাদুড়েরও সমস্যা হওয়ার কথা ছিল উড়তে, কিন্তু হয়নি, তার কারণ দীর্ঘদিনের বিবর্তন প্রক্রিয়া। ওড়ার জন্য যে শারীরিক বাধাগুলো ছিল, বিবর্তনের মাধ্যমে বাদুড় সেগুলো কাটিয়ে উঠেছে।

পাখির ক্ষেত্রে তুলনামূলক ওজন যেমন কম, তেমনি মানানসই ডানার গঠন। ডানা কতটা ভার বইতে পারে, বাতাসে দেহটাকে কতটা সাপোর্ট দেয়, সেটার ওপর নির্ভর করে ওড়ার ধরন। পাখির ওজন আর ডানার গঠন এমন, সহজেই পায়ে ভর দিয়ে আকাশে উড়তে পারে। এক্ষেত্রে নিউটনের তৃতীয় সূত্র কাজে লাগাতে হয় পাখিকে।

এই সূত্র বলে— প্রত্যেক ক্রিয়ার সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে। ডালে বসে থাকার সময় পাখি যখন ওড়ে, তখন প্রথমেই পা দিয়ে ডালে ধাক্বা দেয়। পাখির পা যে বলে ডালকে ধাক্কা দেয়, ডালও সমান বল পাখির পায়ে ফেরত দেয়। সেই বলের সাহায্যে পাখি সামনে এগোয়। সামনে এগোনোর সময় পৃথিবীর মহাকর্ষ বলের আকর্ষণে পাখি নিচে পড়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু সেটা ঠেকিয়ে রাখার জন্য ডানা মেলে দেয় পাখি। ডানা প্যারাস্যুটের মতো কাজ করে। তখনই পাখি ডানা ঝাপটায় এবং উড়তে শুরু করে। এটাকে বলে এয়ারলিফট।

একইভাবে প্রজাপতি, মৌমাছি, উইপোকা বা ফড়িংয়ের মতো কীটপতঙ্গরাও ওড়ে। বাদুড়ের পায়ের গঠন পাখি বা কীট পতঙ্গের মতো নয়। আগেই বলেছি অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মতো বাদুড়ের শরীরও ভারী। এই ভারী শরীর নিয়ে মাটি বা ডাল থেকে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় ওড়া এদের পক্ষে সম্ভব নয়।

কিন্তু বাদুড়কে যদি একটা বিল্ডিংয়ের ওপর থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়। ঠিকই সে উড়তে পারবে। ওপর থেকে পড়তে পড়তে মাটিতে পড়ার আগেই ওড়ার জন্য তার ডানাকে প্রস্তুত করে নিতে পারবে এবং স্বাচ্ছন্দ্যে উড়তেও পারবে।

তার মানে শারীরিক সীমাবদ্ধতার জন্য দাঁড়ানো অবস্থা থেকে উড়তে পারে না বাদুড়। তাই দাঁড়ানোর প্রয়োজনও হয় বাদুড়ের।

এজন্য গাছের ডালে উল্টো হয়ে গাছে ঝুলে থাকে। যখন ওড়ার দরকার হয়, তখন পেছনের পা দুটো ডাল থেকে ছেড়ে দেয়, গাছ থেকে মাটির দিকে পড়তে থাকে। তবে নিচে আছাড় খাওয়ার আগেই ডানা ঝাপটে ওড়ার শুরু করতে পারে।

দীর্ঘদিনের বিবর্তন প্রক্রিয়ায় বাদুড় এই ব্যাপারটাতে দক্ষ হয়ে উঠেছে। তাই ডাল ছেড়ে দেওয়ার পর খুব বেশি নিচে পড়তে হয় না। প্রায় সঙ্গেই সঙ্গেই ডানা প্রস্তুত করে উড়তে শুরু করে।

যেহেতু মাটিতে বা ডালে ধাক্কা মেরে ওড়ার কোনো সুযোগ নেই, আবার দাঁড়িয়ে বা বসে থাকারও কোনো দরকার নেই, তাই বাদুড়ের পাগুলোও দাঁড়ানো বা বসার জন্য উপযোগী নয়।

এ কারণেই বাদুড়কে মাটিতে ছেড়ে দিলে পায়ে ভর দিয়ে বসতে পারে না, উড়তেও পারে না। তখন বেচারার মাটিতে ডানা ঝাপটানো ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না। সুতরাং সব মিলিয়ে বাদুড়ের জন্য ঝুলে থাকাই সুবিধা।

বাদুড়ের পা যেহেতু পেছনের দিকে, তাই উল্টো হয়ে না ঝুলেও সোজা ঝোলার কোনো উপায় নেই। এভাবেই লক্ষ-কোটি বছর ধরে বাদুড় নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে। এভাবেই ঘুম-বিশ্রাম— সবই করতে পারে।

বাংলাদেশে ১১৩ প্রজাতির স্তন্যপায়ীর মধ্যে এক-চতুর্থাংশই বাদুড়। এখানকার বাদুড় হলো ফ্লাইং ফক্স (Flying Fox) বা কলাবাদুড়, উড়ুক্কু স্তন্যপায়ীদের মধ্যে এটিই বৃহত্তম; ডানার মাপ ১.৫ মিটার, ধড় ৪০ সেমি, লেজহীন। এরা বট, আম, ছাতিম, রেইনট্রি, গগণশিরীষ, নারিকেল, তাল, সুপারি, খেজুর গাছে ও বাঁশঝাড়ে এক ডজন থেকে এক হাজার সংখ্যার একটি দলে থাকে; খায় আম, লিচু, পেয়ারা, কলা ও সফেদা।

লালচে কলাবাদুড় Rousettes leschenaulti আরেকটি ব্যাপক বিস্তৃত কিন্তু বিরল বাদুড়।

ফল্স ভ্যাম্পায়ার/ডাইনি বাদুড় Megaderma lyra এদেশের চামচিকাদের মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে বড় মাথা ও ধড় ৯ সেমি, লেজহীন, খায় ক্ষুদে মেরুদণ্ডী ও কীটপতঙ্গ। গোধূলিতে এদেরই বেশি দেখা যায়।

চামচিকা Indian Pipistrelle, Pipistrellus coromandra শুধু বাংলাদেশের সবচেয়ে ছোট বাদুড়ই নয়, সবচেয়ে ছোট স্তন্যপায়ীও, মাথা ও ধড় ৪.৫ সেমি, লেজ ৩.৫ সেমি, দেশের সর্বত্র দেখা যায় ও ব্যাপক বিস্তৃত স্তন্যপায়ী।

সূত্র: ন্যাশন্যাল জিওগ্রাফিক ও বাংলাপিডিয়া

ad
ad

খবরাখবর থেকে আরও পড়ুন

গণভোটে যারা ‘না’ বলবে, তাদের ঠিকানা বাংলাদেশে হবে না: সাদিক কায়েম

যারা এই গণভোটে ‘না’ ভোটের পক্ষে থাকবে তাদের ফ্যাসিস্টের দোসর বলে আখ্যা দিয়েছেন তিনি। বলেছেন, গণভোটকে যারা ‘না’ বলবে, তাদের ঠিকানা এই বাংলাদেশে হবে না।

৪ ঘণ্টা আগে

অন-অ্যারাইভাল ভিসা বন্ধ করা হচ্ছে: পররাষ্ট্র উপদেষ্টা

পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেন, নির্বাচনের সময় অনেক রকমের চেষ্টা হতে পারে। হুট করে যেন কেউ হাজির হতে না পারে এছাড়া নির্বাচনের সময় অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতেই অন-অ্যারাইভাল ভিসা বন্ধ রাখা হয়েছে।

৪ ঘণ্টা আগে

লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার না হ‌ওয়া পর্যন্ত নির্বাচন স্থগিত চেয়ে রিট

নিরাপত্তাহীনতা ও জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের সময় লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধার না হ‌ওয়া পর্যন্ত আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন স্থগিত চেয়ে হাইকোর্টে রিট করা হয়েছে। এতে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ছাড়াও স্বরাষ্ট্র সচিব, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, নির্বাচন কমিশন সচিব, পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ও র‍

৫ ঘণ্টা আগে

আলী রীয়াজের সঙ্গে ইইউ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ সদস্যদের সাক্ষাৎ

প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (উপদেষ্টা পদমর্যাদা) এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট বিষয়ে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমের মুখ্য সমন্বয়ক অধ্যাপক আলী রীয়াজের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ইলেকশন অবজারভেশন মিশনের পলিটিক্যাল অ্যানালিস্ট মারসেল নেগি এবং ইলেকশন অ্যানালিস্ট ভাসিল ভাসচেনকা।

৬ ঘণ্টা আগে