সংযম, সহনশীলতা ও ইবাদত: জিলকদ মাসের প্রকৃত তাৎপর্য

বিল্লাল বিন কাশেম

জিলকদ মাস সমাগত। আর কয়েকদিন পরেই শুরু হবে পবিত্র হজের প্রস্তুতি— বিশ্ব মুসলিমের সবচেয়ে বড় সমাবেশের দিকে ধাবিত হবে কোটি কোটি হৃদয়। এই প্রেক্ষাপটে জিলকদ মাসের তাৎপর্য নতুন করে ভাবার দাবি রাখে। কারণ, এই মাসটি শুধু একটি ক্যালেন্ডারের সময় নয়; এটি আত্মসংযম, সহনশীলতা ও ইবাদতের এক অনন্য প্রশিক্ষণকাল।

ইসলামি শরিয়তে জিলকদ চারটি সম্মানিত মাসের (আশহুরে হুরুম) একটি। এই মাসগুলোতে যুদ্ধ-বিগ্রহ, অন্যায়-অবিচার ও অশান্তি থেকে বিরত থাকার বিশেষ নির্দেশনা রয়েছে। অর্থাৎ, এই মাস শুধু বাহ্যিক শান্তির নয়, বরং অন্তরের পরিশুদ্ধিরও সময়। কিন্তু আমাদের বর্তমান সমাজ বাস্তবতায় আমরা কি সেই শিক্ষা ধারণ করতে পারছি?

সংযম: আত্মশুদ্ধির প্রথম ধাপ

সংযম মানে শুধু বাহ্যিক নিয়ন্ত্রণ নয়; এটি এক গভীর আত্মিক অনুশীলন। মানুষের ভেতরের কামনা-বাসনা, রাগ-ক্ষোভ, হিংসা-বিদ্বেষ— এসবকে নিয়ন্ত্রণে আনাই প্রকৃত সংযম। জিলকদ মাস আমাদের সেই সুযোগ এনে দেয়।

আজকের সমাজে আমরা অল্পতেই উত্তেজিত হয়ে পড়ি, সামান্য মতভেদেই সম্পর্ক ভেঙে ফেলি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাষার সীমা লঙ্ঘন করি। এই বাস্তবতায় সংযমের চর্চা শুধু ধর্মীয় দায়িত্ব নয়, বরং সামাজিক প্রয়োজন।

সংযম শেখায়—

  • কখন কথা বলতে হবে, কখন নীরব থাকতে হবে
  • কখন প্রতিবাদ করতে হবে, আর কখন ধৈর্য ধারণ করতে হবে
  • কীভাবে নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণে রেখে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হয়

জিলকদ মাস আমাদের এই সংযমের অনুশীলনে উদ্বুদ্ধ করে, যাতে আমরা ব্যক্তি ও সমাজ— উভয় স্তরেই স্থিতিশীলতা অর্জন করতে পারি।

সহনশীলতা: শক্তির অন্য নাম

সহনশীলতা অনেক সময় দুর্বলতা হিসেবে বিবেচিত হয়, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এটি শক্তিরই বহিঃপ্রকাশ। একজন সহনশীল ব্যক্তি প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নিজের মূল্যবোধ ধরে রাখতে পারেন।

জিলকদ মাস আমাদের শেখায়— প্রতিশোধ নয়, বরং ক্ষমাই উত্তম পথ। আজকের বিশ্বে যেখানে বিভাজন, সহিংসতা ও অসহিষ্ণুতা বাড়ছে, সেখানে এই শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

পরিবারে, কর্মক্ষেত্রে কিংবা রাষ্ট্রীয় পরিসরে— সহনশীলতা একটি অপরিহার্য গুণ। এটি সম্পর্ককে সুদৃঢ় করে, দ্বন্দ্ব কমায় এবং একটি সুস্থ সামাজিক পরিবেশ তৈরি করে।

আমরা যদি জিলকদ মাসে অন্তত এই একটি গুণ আত্মস্থ করতে পারি, তবে তা আমাদের জীবনে দীর্ঘস্থায়ী ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

ইবাদত: আত্মার পুষ্টি

ইবাদত শুধু নামাজ, রোজা বা আনুষ্ঠানিক ধর্মীয় আচার নয়; এটি মানুষের আত্মার খাদ্য। জিলকদ মাসে ইবাদতের প্রতি মনোযোগ বাড়ানো মানে নিজের আত্মাকে শুদ্ধ করা।

এই মাসে আমরা—

  • নামাজে মনোযোগ বৃদ্ধি করতে পারি
  • কুরআন তিলাওয়াত ও অর্থ অনুধাবনে সময় দিতে পারি
  • বেশি বেশি দোয়া ও ইস্তিগফার করতে পারি
  • নফল ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের চেষ্টা করতে পারি

ইবাদত আমাদের মনে প্রশান্তি আনে, জীবনের উদ্দেশ্য স্পষ্ট করে এবং আমাদের নৈতিকভাবে দৃঢ় করে তোলে।

সংঘাতমুক্ত সমাজ গঠনে জিলকদ

জিলকদ মাসের অন্যতম বড় শিক্ষা হলো— সংঘাত এড়িয়ে চলা। কিন্তু বাস্তবে আমরা প্রায়শই দেখি, ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্র— সব পর্যায়েই সংঘাত বাড়ছে।

রাজনৈতিক বিভাজন, সামাজিক বৈষম্য, ব্যক্তিগত স্বার্থ— এসব কারণে আমরা ক্রমেই অসহিষ্ণু হয়ে উঠছি। এই অবস্থায় জিলকদ মাস আমাদের সামনে এক বিকল্প পথ দেখায়— সংলাপ, সহমর্মিতা ও সমঝোতার পথ।

যদি ব্যক্তি পর্যায়ে আমরা সংযম ও সহনশীলতার চর্চা করি, তবে তা সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। আর সমাজ যদি শান্ত হয়, তবে রাষ্ট্রও স্থিতিশীল হবে।

হজের প্রস্তুতি: বাহ্যিক নয়, অন্তরেরও

জিলকদ মাস হজের পূর্বপ্রস্তুতির সময়। যারা হজে যাবেন, তারা এই মাসে শারীরিক, মানসিক ও আর্থিক প্রস্তুতি নেন। কিন্তু হজের প্রকৃত প্রস্তুতি হলো আত্মিক প্রস্তুতি।

হজ শুধু একটি সফর নয়; এটি আত্মসমর্পণের প্রতীক। সেখানে গিয়ে মানুষ সব ভেদাভেদ ভুলে এক কাতারে দাঁড়ায়, আল্লাহর সামনে নিজেকে সমর্পণ করে।

জিলকদ মাস সেই আত্মসমর্পণের অনুশীলন। এই মাসে আমরা যদি নিজের ভেতরের অহংকার, হিংসা, লোভ—এসব দূর করতে পারি, তবে হজের প্রকৃত শিক্ষা আমরা উপলব্ধি করতে পারব।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রাসঙ্গিকতা

আজকের বিশ্বে আমরা এক অস্থির সময় পার করছি। প্রযুক্তির উন্নয়ন আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে বাড়িয়েছে মানসিক চাপ, প্রতিযোগিতা ও বিচ্ছিন্নতা।

এই বাস্তবতায় জিলকদ মাসের শিক্ষা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—

  • জীবনের মূল উদ্দেশ্য কী
  • কীভাবে আমরা নিজেদেরকে উন্নত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারি
  • কীভাবে একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠা করা যায়

ব্যক্তিগত থেকে প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়োগ

জিলকদ মাসের শিক্ষা শুধু ব্যক্তিগত জীবনে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; এটি প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়েও প্রয়োগ করতে হবে।

  • শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নৈতিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে
  • কর্মক্ষেত্রে সততা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে
  • রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ন্যায়বিচার ও সমতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে

এভাবে আমরা একটি সুস্থ, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে পারি।

জিলকদ মাস আমাদের জন্য এক অনন্য সুযোগ— নিজেকে নতুন করে গড়ার, ভুল থেকে ফিরে আসার এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের। সংযম, সহনশীলতা ও ইবাদতের মাধ্যমে আমরা যদি এই মাসের শিক্ষা ধারণ করতে পারি, তবে তা আমাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে গভীর প্রভাব ফেলবে।

এটি শুধু একটি মাসের অনুশীলন নয়; বরং একটি জীবনব্যাপী দর্শন। যদি আমরা এই দর্শনকে ধারণ করতে পারি, তবে আমাদের জীবন হবে আরও অর্থবহ, সমাজ হবে আরও শান্তিপূর্ণ, আর বিশ্ব হবে আরও মানবিক।

জিলকদ মাস তাই আমাদের সামনে একটি প্রশ্ন ছুড়ে দেয়— আমরা কি সত্যিই পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত?

লেখক: উপপরিচালক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন

ad
ad

খবরাখবর থেকে আরও পড়ুন

দেশে এক দশকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বেড়ে দেড়গুণ, কর্মসংস্থান বেড়েছে ২৫%

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) অর্থনৈতিক শুমারি ২০২৪-এ এমন তথ্য উঠে এসেছে। মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) রাজধানীর আগারগাঁওয়ের পরিসংখ্যান ভবনে এ অর্থনৈতিক শুমারির ফলাফল প্রকাশ করা হয়।

১৫ ঘণ্টা আগে

৩ মাসের মধ্যে পৃথক সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় করার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ

দেশের বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় গঠনের চূড়ান্ত নির্দেশনা দিয়ে হাইকোর্টের ১৮৫ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট দুই বিচারপতির স্বাক্ষরের পর মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে এই রায়টি প্রকাশ করা হয়।

১৫ ঘণ্টা আগে

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দপ্তরের জাল সিল তৈরির চেষ্টার অভিযোগে আটক ১

শাহবাগ থানার ওসি মনিরুজ্জামান জানান, গোপন খবরে রাজধানীর তোপখানা রোডের মেহেরবা প্লাজার জে আর অ্যান্ড ব্রাদার্স নামক একটি সিল তৈরির দোকান থেকে তাকে আটক করা হয়।

১৫ ঘণ্টা আগে

ঢাকাসহ ২০ জেলায় ঝড়-বজ্রবৃষ্টির শঙ্কা

এদিকে আবহাওয়া অফিসের আরেক পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আগামী কয়েক দিন দেশের বিভিন্ন জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়া ও বিদ্যুৎ চমকানোসহ বৃষ্টি অথবা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। এ সময় কোথাও কোথাও বিক্ষিপ্তভাবে শিলাবৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে।

১৬ ঘণ্টা আগে