সেপ্টেম্বরে সড়কে ৪২৩ মৃত্যু, এক-তৃতীয়াংশই মোটরসাইকেল আরোহী

সেপ্টেম্বরে সড়ক দুর্ঘটনায় দেশে প্রতিদিন গড়ে ১৪ জনের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। মাসটিতে ৪৪২টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৪২৩ জন এবং আহত হয়েছেন ৬৭৪ জন। নিহতদের মধ্যে ১৩৯ জন মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী, যা মোট মৃত্যুর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। একই সময়ে পথচারী নিহত হয়েছেন ১০৬ জন।
রোববার (৪ অক্টোবর) প্রকাশিত সেপ্টেম্বর মাসের প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানিয়েছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন। ৯টি জাতীয় দৈনিক, ১৭টি জাতীয় ও আঞ্চলিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল, বিভিন্ন ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম এবং নিজেদের তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে সংস্থাটি।
জেলা হিসেবে প্রাণহানিতে সবচেয়ে এগিয়ে ছিল গাজীপুর, যেখানে ৩৮ জন নিহত হয়েছেন। বিভাগগুলোর মধ্যে ঢাকা ছিল সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। এ বিভাগে ১৩২টি দুর্ঘটনায় ১৩৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। বিপরীতে সিলেটে দুর্ঘটনার সংখ্যা সবচেয়ে কম, ২০টি; সেখানে নিহত হয়েছেন ২১ জন। রাজধানীতে ৫২টি দুর্ঘটনায় ২১ জন নিহত ও ৪৭ জন আহত হয়েছেন।
সড়কের ধরন অনুযায়ী আঞ্চলিক মহাসড়কেই দুর্ঘটনা বেশি ঘটেছে। সেপ্টেম্বরে এসব সড়কে ১৭৮টি দুর্ঘটনা হয়েছে, যা মোট দুর্ঘটনার ৪০ দশমিক ২৭ শতাংশ। জাতীয় মহাসড়কে ১৪৫টি, শহরের সড়কে ৬৩টি এবং গ্রামীণ সড়কে ৫৬টি দুর্ঘটনা ঘটেছে।
দুর্ঘটনার কারণ বিশ্লেষণে নিয়ন্ত্রণ হারানো ছিল সবচেয়ে বেশি। এ ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছে ১৬৮টি। পথচারীকে চাপা বা ধাক্কা দেওয়ার ঘটনা ১০৯টি, মুখোমুখি সংঘর্ষ ৯৮টি এবং অন্য যানবাহনের পেছনে ধাক্কার ঘটনা ৬১টি। বাকি ছয়টি দুর্ঘটনা অন্যান্য কারণে হয়েছে।
সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে ৬১টি শিশু ও ৫৮ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। পেশাগত পরিচয়ের হিসাবে স্থানীয় পর্যায়ের ব্যবসায়ী ২৫ জন, রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ২৪ জন, পণ্যসামগ্রীর বিক্রয় প্রতিনিধি ২১ জন, এনজিওকর্মী ১৮ জন, দিনমজুর ১৪ জন, শিক্ষক ১৩ জন এবং ব্যাংক-বিমার কর্মকর্তা-কর্মচারী ১১ জন মারা গেছেন। এ ছাড়া নিহতদের মধ্যে দুই পুলিশ সদস্য, একজন সেনাসদস্য, তিন সাংবাদিক, দুই চিকিৎসক ও চার প্রকৌশলী রয়েছেন।
মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার সংখ্যাও ছিল উল্লেখযোগ্য। সেপ্টেম্বরে ১৫৪টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা হয়েছে, যা মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৩৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ। এসব ঘটনায় ১৩৯ জন নিহত হয়েছেন। দুর্ঘটনায় সম্পৃক্ত যানবাহনের মধ্যে মোটরসাইকেলের অংশ ২৩ দশমিক ৪৪ শতাংশ। পণ্যবাহী যানবাহনের অংশ ২৩ দশমিক ২৯ শতাংশ, থ্রি-হুইলারের ১৮ দশমিক ৬৬ শতাংশ এবং যাত্রীবাহী বাসের ১৬ দশমিক ৩৫ শতাংশ।
সড়কের বাইরে সেপ্টেম্বরে ১১টি নৌ-দুর্ঘটনায় ১৬ জন নিহত, সাতজন আহত ও চারজন নিখোঁজ হয়েছেন। একই সময়ে ২৩টি রেলপথ দুর্ঘটনায় ১৯ জন নিহত এবং ছয়জন আহত হয়েছেন।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণে অতিরিক্ত গতি ও যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারানোকে অধিকাংশ দুর্ঘটনার পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সংস্থাটি বলছে, বেপরোয়া গতি ও পথচারীদের অসচেতনতার কারণে পথচারী নিহতের ঘটনাও বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে গতি নিয়ন্ত্রণে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং চালকদের মোটিভেশনাল প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন ও সড়ক, চালকদের অদক্ষতা ও অসুস্থতা, নির্ধারিত বেতন ও কর্মঘণ্টার অভাব, মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল, তরুণদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো, ট্রাফিক আইন না জানা ও না মানা, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, বিআরটিএর সক্ষমতার ঘাটতি এবং গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজিকেও দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে সংস্থাটি।
নিরাপদ সড়কের জন্য জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল পুনর্গঠন, বিআরটিএ, বিআরটিসি ও ডিটিসিএর কাঠামোগত সংস্কার এবং এসব প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞ নিয়োগের সুপারিশ করেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন।
পাশাপাশি যানবাহনে আধুনিক নিরাপত্তাপ্রযুক্তি বাধ্যতামূলক করা, মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন সরিয়ে নেওয়া, দক্ষ চালক তৈরি, চালকদের বেতন ও কর্মঘণ্টা নির্ধারণ, মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহনের জন্য সার্ভিস রোড নির্মাণ এবং সব রেলক্রসিংয়ে গেটকিপার নিয়োগের সুপারিশ করেছে তারা।
সংস্থাটির মতে, নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে নীতিমালা, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর উন্নয়নের পাশাপাশি সড়ক ব্যবহারকারীদের সচেতনতা বাড়াতে হবে। এসব উদ্যোগ কার্যকর করতে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছাকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন।















