দায় এড়াতে ইসি মধ্যরাতে নির্বাচনে বিজয়ীদের গেজেট জারি করেছে: বদিউল আলম

প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম
বৃহস্পতিবার সকালে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের তথ্য উপস্থাপন করতে জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে সুজন। ছবি: সংগৃহীত

নির্বাচন কমিশন নিজেদের দায় এড়াতে মধ্যরাতে তড়িঘড়ি ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ীদের গেজেট জারি করেছে বলে মন্তব্য করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। সুজন আয়োজিত ‘নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যগণের হলফনামার তথ্যের বিশ্লেষণ’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ মন্তব্য করেন।

আজ বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী মিলনায়তনে এ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের তথ্য উপস্থাপন করতে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে সুজন।

ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘নির্বাচিত প্রার্থীদের মধ্যে অনেকেই ঋণখেলাপি। তাদের কেউ কেউ আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নিয়েছেন। অনেকে দ্বৈত নাগরিক হওয়ার পরও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা না দিয়ে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। আমরা নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের পক্ষ থেকে সুপারিশ করেছিলাম যাতে নির্বাচনের ছয়মাস আগেই প্রার্থীরা ঋণ পরিশোধ করেন এবং অভ্যাসগত ঋণখেলাপিদের মনোনয়ন দেওয়া না হয়। কিন্তু আরপিও অধ্যাদেশে বিষয়টি আমলে নেওয়া হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের আদালতের সুস্পষ্ট রায় রয়েছে, প্রার্থিতা চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। শুধু কোরাম নন জুডিস ও ম্যালিস ইন ল ছাড়া প্রার্থিতা চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে আদালত হস্তক্ষেপ করেছে নাগরিক হিসেবে আমরা তা জানতে চাই।’

তিনি আরও বলেন, ‘এবার নির্বাচন কমিশন তড়িঘড়ি করে মধ্যরাতে গেজেট জারি করেছে। এর মাধ্যমে তারা নিজেদের দায় এড়াতে চেয়েছে। আমরা নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন থেকে সুপারিশ করেছিলাম যাতে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নির্বাচন কমিশন নির্বাচনটিকে সার্টিফাই করে। কিন্তু আরপিওতে আমাদের সে সুপারিশ রাখা হয়নি।’

ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘আরপিও অনুযায়ী হলফনামার সঙ্গে সর্বশেষ বছরের আয়কর বিবরণী জমা দিতে প্রার্থীরা বাধ্য। কিন্তু অনেক প্রার্থী আয়কর বিবরণী জমা দেননি। আর আয়কর বিবরণী জমা না দেওয়া মানে অসম্পূর্ণ তথ্য দেওয়া। আমরা আশা করি, আরপিও’র বিধান মেনে নির্বাচন কমিশন হলফনামা নিয়ে ওঠা অভিযোগগুলো তদন্ত করে পদক্ষেপ নেবে।’

অনুষ্ঠানে সুজনের কোষাধ্যক্ষ সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ, সুজন জাতীয় কমিটির সদস্য একরাম হোসেনসহ সুজন নেতারা উপস্থিত ছিলেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সুজনের প্রধান সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার।

একরাম হোসেন বলেন, ‘অতীতের মতো এবারও অধিক সংখ্যক ব্যবসায়ী নির্বাচিত হয়েছেন। এখন দেখার বিষয় সংসদ সদস্যরা তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থ ও জনপ্রতিনিধি হিসেবে তাদের দায়িত্বের মধ্যে কতটা ভারসাম্য রাখতে পারবেন। দেশে নারী ভোটারের সংখ্যা প্রায় অর্ধেক। কিন্তু মাত্র ৭ জন নারী সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে। তাই ভবিষ্যতে আমাদের নারীরা আর কতো পুরুষের আধিপত্য মেনে নেবেন এই প্রশ্ন থেকে যাবে। আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক মিলে দেশে প্রায় ৬-৭ কোটি মানুষ শ্রমিক। কিন্তু জাতীয় সংসদে তাদের প্রতিনিধিত্ব যদি না থাকে, তাহলে সে সংসদ সকল মানুষের সংসদ হবে কীভাবে?’

মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে দিলীপ কুমার সরকার বলেন, ‘বিচ্ছিন্ন বিক্ষিপ্ত কিছু ঘটনা ঘটলেও গত ১২ ফেব্রুয়ারি তারিখে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট-২০২৬ মোটামুটি শান্তিপূর্ণভাবে স¤পন্ন হয়েছে। ভোট প্রদানে আগ্রহীরা ভোট দিতে পেরেছেন। নির্বাচনে বিএনপি এককভাবে ২০৯টি, জামায়াতে ইসলামী ৬৮, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৬, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২, খেলাফত মজলিস ১, গণসংহতি আন্দোলন ১, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি)-১ এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ১টি আসনে এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ৭টি আসনে বিজয়ী হয়েছেন। বাম দলগুলোর জোট গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট একটি আসনও পায়নি।’ নির্বাচনে ৮৫ জন নারী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সাতজন এবং ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ৭৯ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে চারজন বিজয়ী হয়েছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।

শিক্ষা সংক্রান্ত তথ্য উপস্থাপন করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী সর্বমোট ২৯৭ জন (চট্টগ্রাম ২ ও চট্টগ্রাম ৪ ছাড়া) সংসদ সদস্যের মধ্যে আটজনের (২.৬৯%) শিক্ষাগত যোগ্যতা পিএইচডি, ১৩৮ জনের (৪৬.৪৬%) স্নাতকোত্তর, ৯৩ জনের (৩১.৩১%) স্নাতক, ২০ জনের (৬.৭৩%) এইচএসসি এবং ১৭ জনের (৫.৭২%) এসএসসি। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সাথে তুলনা করলে দেখা যায় যে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ীদের মধ্যে উচ্চশিক্ষিতের হার দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ীদের তুলনায় কম।’

দিলীপ কুমার সরকার বলেন, ‘২৯৭ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ১৮২ জনের পেশা (৬১.২৮%) ব্যবসা, ৩৬ জনের (১২.১২%) আইন পেশা, ২২ জনের (৭.৪০%) শিক্ষকতা, ১৩ জনের (৪.৩৭%) কৃষি, আটজনের (২.৬৯%) রাজনীতি, পাঁচজনের (১.৬৮%) চাকুরি এবং ২৭ জনের (৯.০৯%) অন্যান্য। নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মধ্যে ব্যবসায়ীর হার প্রতিদ্বন্দ্বিতার তুলনায় বেশি। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারীদের মধ্যে এই হার ছিল ৪৯.২৬%; নির্বাচিতদের মধ্যে তা ৬১.২৮%। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ীদের মধ্যে ব্যবসা পেশায় জড়িতদের হার সর্বোচ্চ হলেও দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ীদের তুলনায় তা কম। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যবসায়ীদের হার ছিল ৬৬.৮৯%।’

নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের বয়স সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘২৯৭ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ১১ জনের (৩.৭০%) বয়স ৩৫ বছরের নিচে; ৩৫-উর্ধ্ব থেকে ৫৫ বছর বয়স ৮৫ জনের (২৮.৬১%); ৫৫-উর্ধ্ব থেকে ৭৫ বছর বয়স ১৮০ জনের (৬০.৬১%) এবং ৭৫ বছর উর্ধ্ব বয়স ১৯ জনের (৬.৪০%)। জাতীয় নাগরিক পাটি (এনসিপি) পার্টি থেকে নির্বাচিত সকল সংসদ সদস্যই বয়সে তরুণ অর্থাৎ ৩৫ বছরের কম বয়সী। অপর দিকে ১৯ জন ৭৫-উর্ধ্ব সংসদ সদস্যের সকলেই বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল থেকে নির্বাচিত। তবে বিজয়ীদের বেশির ভাগের (১৭৭ জন বা ৬০.৬১%) বয়স ৫৫ উর্ধ্ব থেকে ৭৫ বছর।’

মামলা সংক্রান্ত তথ্য উপস্থাপন করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘২৯৭ জন সংসদ সদস্যের মধ্যে ১৪২ জনের (৪৭.৮১%) বিরুদ্ধে বর্তমানে, ১৮৫ জনের (৬২.২৮%) বিরুদ্ধে অতীতে এবং ৯৫ জনের বিরুদ্ধে (৩১.৯৯%) অতীত-বর্তমান উভয় সময়ে মামলা ছিল। ৩০২ ধারার মামলার ক্ষেত্রে ৪৩ জনের (১৪.৪৮%) বিরুদ্ধে বর্তমানে, ৪২ জনের (১৪.১৪%) বিরুদ্ধে অতীতে এবং ১২ জনের (৪.০৪%) অতীতে মামলা ছিল এবং বর্তমানেও (উভয় সময়ে) আছে। বর্তমান মামলার ক্ষেত্রে বড় দল দুটির মধ্যে এগিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রার্থীরা (৫০.২৪%)। এর পরের অবস্থান বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর (৪৭.০৭%)। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ীদের তুলনায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ীদের মামলা সংশ্লিষ্টতা অনেক বেশি।’

প্রবন্ধের শেষভাগে তিনি বলেন, ‘নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে যে, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগত যোগ্যতার বিচারে এই সংসদে উচ্চশিক্ষিতের প্রাধান্য রয়েছে। এই সংসদে আধিক্য রয়েছে ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ও পারিবারিকভাবে সম্পদশালীদের। সংসদ সদস্যদের মধ্যে ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি প্রায় অর্ধেক। আয়কর প্রদানকারী রয়েছেন প্রায় নয়-দশমাংশ। এছাড়াও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে হত্যা বা হত্যা প্রচেষ্টা মামলাসহ ফৌজদারি মামলা রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘গণঅভ্যুত্থানের পর অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল অনেক প্রত্যাশা ও সম্ভাবনার। আশার দিক হলো, নির্বাচনটি শান্তিপূর্ণ হয়েছে। পাশাপাশি নির্বাচনে বিজয়ী দলের নেতা কর্তৃক পরাজিত দলের নেতৃবৃন্দের সাথে সাক্ষাত করা এবং পরাজিত দল কর্তৃক বিজয়ীদের অভিনন্দন জানানো নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠার পূর্বাভাস বলে মনে হচ্ছিল। কিন্তু সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেওয়া বা না নেওয়া, বিষয়কে কেন্দ্র করে বিজয়ী ও পরাজিতদের মধ্যে সৃষ্ট বিরোধ এবং ১১ দলীয় জোটভুক্ত দলগুলো কর্তৃক মন্ত্রীসভার শপথ অনুষ্ঠান বর্জন নতুন শঙ্কার জন্ম দিয়েছে। আমাদের প্রত্যাশা, দ্রুতই সংকট কেটে যাবে এবং আমরা সকলে মিলে গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় শামিল হব।’

ad
ad

খবরাখবর থেকে আরও পড়ুন

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে মার্কিন প্রেসিডেন্টের অভিনন্দন

মার্কিন প্রেসিডেন্ট তাঁর চিঠিতে তারেক রহমানকে ‘প্রিয় জনাব প্রধানমন্ত্রী’ উল্লেখ করে বলেন, ‘আমেরিকার জনগণের পক্ষ থেকে আপনাকে আপনার ঐতিহাসিক নির্বাচনী বিজয়ের জন্য অভিনন্দন জানাই। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আপনার মেয়াদ সফল হোক—এই কামনা করি।’

১ ঘণ্টা আগে

পুলিশসহ অন্যান্য বাহিনীকে জনপ্রত্যাশা পূরণ করতে হবে : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জনগণের আস্থা অর্জনের মাধ্যমে দ্রুত জনপ্রত্যাশা পূরণ করতে হবে।

২ ঘণ্টা আগে

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার চলমান থাকবে: চিফ প্রসিকিউটর

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার চলমান থাকবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম।

২ ঘণ্টা আগে

ঈদের আগেই দেওয়া হবে ফ্যামিলি কার্ড: পরিবেশ ও বনমন্ত্রী

ঈদের আগেই ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু।

২ ঘণ্টা আগে