আনু মুহাম্মদ

'হাত-পা বাঁধা' চুক্তি বাস্তবায়নের জন্যই পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে

প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ০৫ মার্চ ২০২৬, ১৮: ৩১
আনু মুহাম্মদ। ফাইল ছবি

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বাণিজ্য চুক্তিকে ‘হাত-পা বাঁধা চুক্তি’ অভিহিত করে অর্থনীতিবিদ ও শিক্ষক আনু মুহাম্মদ বলেছেন, ‘এই চুক্তি বাস্তবায়নের জন্যই ড. খলিলুর রহমানকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।’

আজ বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘জ্বালানি রূপান্তরে বিনিয়োগ চুক্তি ও জনস্বার্থ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এ কথা বলেন।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ও কনজুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) যৌথ আয়োজনে এই আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

সভায় বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য চুক্তি প্রসঙ্গে আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘এই চুক্তির আওতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পছন্দ করে না কিংবা তাদের স্বার্থের সঙ্গে অসঙ্গতি হয় এরকম কোনো দেশের সঙ্গে বাংলাদেশ কোনো ধরনের চুক্তি করতে পারবে না।’

এর আগে গতকাল বুধবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তির করার আগে এ বিষয়ে দুই রাজনৈতিক দল— বিএনপি ও জামায়াত থেকে ‘সম্মতি’ এসেছিল। এ প্রসঙ্গে টেনে আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘গত সরকারের (অন্তর্বর্তীকালীন) সময়ে সব দল সরকারের সঙ্গে মিটিং করেছে। যখন এই চুক্তিটা হচ্ছে, চুক্তি নিয়ে কোনো দল কিন্তু কোনো কথা বলেনি।’

তিনি আরও বলেন, “খলিলুর রহমান বললেন— ‘এই চুক্তির বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বিএনপি এবং জামায়াতের নেতৃবৃন্দের সাথে কথা বলেছেন। তাদের সম্মতি নিয়ে এই চুক্তি করা হয়েছে।’ এটাই হচ্ছে আমাদের জন্য একটা বড় উদ্বেগের বিষয়।”

‘যারা নির্বাচিত হয়ে সরকারে আসছে, তারাই যদি অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় স্বাক্ষরিত চুক্তির সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাহলে এটা জ্বালানি খাতসহ অন্যান্য সব খাতের জন্য একটা বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করবে,’— বলেন আনু মুহাম্মদ।

তিনি আরও বলেন, ‘হাসিনা সরকার যে অনিয়ম-অস্বচ্ছতা করেছে, জনগণকে না জানিয়ে জনস্বার্থবিরোধী যেসব চুক্তি করেছে, অন্তর্বর্তী সরকার জনস্বার্থের বিরুদ্ধে যেসব চুক্তি করেছে; বর্তমান নির্বাচিত সরকারের পরীক্ষা হচ্ছে— তারা যে ভিন্ন, তারা যে জনপ্রতিনিধিত্ব করছে সেটা প্রমাণ করতে হলে ওই চুক্তিগুলো প্রকাশ করা তাদের দায়িত্ব, চুক্তি অব্যাহত রাখা নয়।’

প্রসঙ্গত, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল শতাধিক দেশের ওপর চড়া হারে শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। বাংলাদেশের ওপর বাড়তি ৩৭ শতাংশ শুল্কের ঘোষণা আসে। পরে দর কষাকষি করে এ হার ২০ শতাংশ নামে, যা ১ অগাস্ট কার্যকর হয়। আর আগে থেকেই বাংলাদেশি পণ্যে ছিল ১৫ শতাংশ শুল্ক; সব মিলিয়ে শুল্ক দাঁড়ায় ৩৫ শতাংশ।

এরপর নয় মাসের দীর্ঘ আলোচনার পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পারস্পরিক শুল্ক নিয়ে চুক্তি করেছে বাংলাদেশ; যাতে আগের চেয়ে শুল্কহার কমেছে ১ শতাংশ। ওই চুক্তিতে পৌঁছাতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্তের পাশাপাশি আরও পণ্য কিনতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ইতোমধধ্যে গম আমদানি বাড়ানো হয়েছে। তুলা ও সয়াবিনসহ আরও পণ্য আমদানি বাড়ানোর প্রক্রিয়া চলছে।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদ শেষের তিন দিন আগে হওয়া এই চুক্তির সমালোচনা করেছেন অনেকে। একটি অনির্বাচিত সরকার হয়েও বিগত অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে বাণিজ্য চুক্তি করেছে, তা দেখে ‘হতভম্ব’ ও ‘স্তম্ভিত’ হওয়ার কথা বলেছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডি।

২৮ ফেব্রুয়ারি সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ‘এ ধরনের একটি চুক্তি কীভাবে একটি সরকার, অনির্বাচিত সরকার করে যেতে পারে, যার দায় চাপবে নির্বাচিত সরকারের ওপর।’

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে স্বাক্ষরিত ওই চুক্তি নিয়ে বিশ্লেষকদের সমালোচনার মধ্যেই চুক্তির আগে এ বিষয়ে দুই রাজনৈতিক দল— বিএনপি ও জামায়াত থেকে ‘সম্মতি’ এসেছিল বলে জানালেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, যিনি মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার দায়িত্বে ছিলেন।

উল্লেখ্য, আজ বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ও কনজুমারস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত ‘জ্বালানি রূপান্তরে বিনিয়োগ চুক্তি ও জনস্বার্থ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় ক্যাব ১৩ দফা দাবি উত্থাপন করেছে।

জ্বালানি খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ক্যাব যুব সংসদ উত্থাপিত ১৩ দফা দাবি নিচে উল্লেখ করা হলো—

১. বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানি খাতকে বাণিজ্যিক খাত হতে পুনরায় সেবাখাত হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করা এবং সরকারি সেবা মুনাফামুক্ত নিশ্চিত করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ কস্ট প্লাস নয়, কস্টভিত্তিক নিশ্চিত করা;

২. জ্বালানি দক্ষতা ও সংরক্ষণ উন্নয়নের মাধ্যমে বর্তমানের তুলনায় জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি গড়ে বর্তমান সরকারের ৫ বছর মেয়াদে কমপক্ষে ৫% কমানো নিশ্চিত করা;

৩. সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন অব্যাহত বৃদ্ধি দ্বারা ওই ৫ বছরে গড়ে ১৫% বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি নিশ্চিত করা এবং ছোট শিল্প হিসাবে এ বিদ্যুৎ উন্নয়নে অগ্রাধিকার দেওয়া;

৪. এলএনজি আমদানি বৃদ্ধি ৫ বছরের জন্য রহিত করা এবং কয়লা বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধি নিষিদ্ধ করা;

৫. গ্যাস উন্নয়ন তহবিলের অর্থে গণশুনানির ভিত্তিতে স্থলভাগের শতভাগ গ্যাস বাপেক্সসহ দেশীয় কোম্পানি দ্বারা শতভাগ অনুসন্ধান ও উত্তোলন নিশ্চিত করা;

৬. গণশুনানির ভিত্তিতে ছাতক (পূর্ব) ও ভোলা/দক্ষিণাঞ্চলের অব্যবহৃত মজুদ গ্যাস ব্যবহারের কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন নিশ্চিত করা;

৭. আদানির সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি বাতিল করানো এবং আদানির বিদ্যুৎ আমদানি রদ নিশ্চিত করা;

৮. স্পিডি অ্যাক্ট ২০১০ রহিতকরণ অধ্যাদেশ ২০২৪-এর অন্তর্ভুক্ত ২(ক) এবং ২(খ) অনুচ্ছেদ বাতিলের জন্য ক্যাবের দায়েরকৃত রিট দ্রুত নিষ্পত্তি করে এই আইনের আওতায় সম্পাদিত সকল চুক্তি রিভিউক্রমে লাইসেন্স বাতিলসহ সকল ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ করা;

৯. ওইসকল চুক্তির কারণে রাষ্ট্রের যত আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার ক্ষতিপূরণ সংশ্লিষ্টদের নিকট থেকে আদায় নিশ্চিত করা;

১০. জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট দুর্নীতি ও অপরাধমূলক কার্যক্রমের সাথে জড়িত ব্যক্তিবর্গের ‘জ্বালানি অপরাধী’ হিসাবে বিচার নিশ্চিত করা;

১১. (ক) লুণ্ঠনমূলক ‘ব্যয় ও মুনাফা’ মুক্ত করে বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যয় কমিয়ে বিদ্যমান মূল্যহার কমানো এবং (খ) এলপিজির বাজার ওলিগোপলি থেকে মুক্ত করার জন্য এলপিজি অপারেটরস এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব)-এর কর্তৃত্ব রদ করা, উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে দেশি-বিদেশি আমদানিকারকদের প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে এলপিজি আমদানির লাইসেন্স প্রদান করা, সরকারি মালিকানায় এলপিজি টার্মিনাল ও ওয়েল রিফাইনারি করা এবং সরকারি মালিকানায় এলপিজির ৫০% আমদানি ও স্টোরেজ ক্ষমতা উন্নয়ন নিশ্চিত করা;

১২. বিইআরসির জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিইআরসির বিরুদ্ধে আনীত ক্যাব-এর অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি করা, ক্যাব প্রস্তাবিত বিইআরসি আইন সংশোধনী প্রস্তাব বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা ও সেই সাথে ক্যাব প্রস্তাবিত জ্বালানি রূপান্তর নীতি, ২০২৪-এর আলোকে গণবান্ধব জ্বালানি রূপান্তর নিশ্চিত করা এবং

১৩. আন্তর্জাতিক জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবসা সুরক্ষায় প্রণীত জ্বালানি সনদ চুক্তি ১৯৯২ স্বাক্ষরে সরকারকে বিরত রাখা।

ad
ad

খবরাখবর থেকে আরও পড়ুন

৩৬ টাকায় ধান, ৪৯ টাকায় সিদ্ধ চাল কিনবে সরকার

চলতি বোরো মৌসুমে ৩৬ টাকা কেজি ধান ও ৪৯ টাকা দরে সিদ্ধ চাল কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এছাড়াও ৪৮ টাকা দরে আতপ চাল এবং ৩৬ টাকা দরে কেনা হবে গম।

১ ঘণ্টা আগে

রাবিতে ‘গুপ্ত রাজনীতি’ নিষিদ্ধের দাবিতে ছাত্রদলের দেয়াল লিখন

বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ‘গুপ্ত রাজনীতি’ নিষিদ্ধের দাবিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) দেয়াল লিখন কর্মসূচি পালন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। বুধবার (২২ এপ্রিল) দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার সংলগ্ন প্রাচীরে এ কর্মসূচি শুরু হয়।

৩ ঘণ্টা আগে

প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে পাটের ব্যাগ-স্কুলড্রেস দেবে সরকার

আগামী জুলাই মাস থেকে দেশের প্রতিটি উপজেলায় দুটি করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে পাটের তৈরি ব্যাগ ও স্কুলড্রেস দেবে সরকার। আজ বুধবার (২২ এপ্রিল) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকের পর তার শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন এ তথ্য জানান।

৪ ঘণ্টা আগে

পরিবহনের নতুন ভাড়া নির্ধারণ নিয়ে সিদ্ধান্ত বৃহস্পতিবার: সড়কমন্ত্রী

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রেক্ষাপটে বাসভাড়া সমন্বয়ের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) হবে বলে জানিয়েছেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।

৪ ঘণ্টা আগে