শামস সুমন— প্রস্থানের পরও রয়ে যাওয়া এক কণ্ঠ

জান্নাতুল বাকেয়া কেকা
অভিনেতা শামস সুমন। ছবি: সংগৃহীত

শামস সুমন ভাই, আপনার মৃত্যু মানতে পারছি না। এ কেমন প্রস্থান আপনার?

কদিন আগেই না অফিস থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পথে কথা হলো আপনার সাথে? শোকে স্তব্ধতায় হিসেবের গরমিল কাটিয়ে পাক্কা হিসেবে করে নিশ্চিত হলাম— চার দিন আগে আপনার সাথে দেখা ও কথা হয়েছে। তাও অফিস থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পথেই কথা হয়েছিল। চ্যানেল আইয়ের চেতনা চত্বরে নিয়মিত দেখা ও সাক্ষাতের বাইরে সেই শৈশব থেকেই আপনি আমাদের কত চেনা ও অনুকরণীয় আপনজন।

একসময়ের টিভি নাটকের জনপ্রিয় অভিনেতা শামস সুমন। বয়স হয়েছিল ৬১, কী এমন বয়স? একসময় মঞ্চ থেকে শুরু করে ছোটপর্দা ও বড়পর্দা দাপিয়ে বেড়িয়েছেন। ২০০৮ সালে ‘স্বপ্নপূরণ’ চলচ্চিত্রে পার্শ্বচরিত্রে অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও অর্জন করেছিলেন।

প্রিয় মতিহারের সবুজ চত্বর, প্যারিস রোড আর জুবেরি হাউজের ঐতিহ্যখ্যাত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থী শামস সুমন। এমনিতেই শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক শহর রাজশাহী। এই শহরের প্রাণ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক চর্চা, বিশেষত আবৃত্তি চর্চার অনবদ্য নাম “স্বনন”-এর সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত এক নাম। শৈশবে আমরা তখন শহরের আবৃত্তি চর্চা ও সংস্কৃতি জগতে গৌরবের প্রতিষ্ঠান “রাজশাহী আবৃত্তি পরিষদ”-এর সাথে যুক্ত। তখন আমাদের সামনে লক্ষ্য ছিল শামস সুমন ও তাদের সমসাময়িক কজনের কাতারে পৌঁছানো।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতির চূড়ান্ত সেই “স্বনন”-এর তুখোড় আবৃত্তিকার শামস সুমন ভাই সঙ্গত কারণেই রাজশাহী আবৃত্তি পরিষদের সাথেও জড়িত ছিলেন। শামস সুমনসহ তাদের সমসাময়িক সিনিয়র কজন— আজ তাদের কথা সঙ্গত কারণেই মনে পড়ছে। আরমান পারভেজ মুরাদ তাদের একজন। তিনিও পরে টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে দারুণ খ্যাতিমান। মুরাদ ভাইও ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি বিভাগের শিক্ষার্থী। সেই মুরাদ ভাই, ডা. জয়দ্বীপ ভাদুরি দাদা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাইকোলজি বিভাগের শিক্ষক স্বাতী আপা (বর্তমানে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী) ও মিঠি আপা।

যাদের নাম আজ স্মরণে এলো, তারা প্রায় সকলেই ছিলেন সমবয়সী। এর চেয়েও বড় কথা, “রাজশাহী আবৃত্তি পরিষদ”-এর তখনকার পোস্ট-ডিপেন্ডেবল এবং অবশ্যই রাজশাহী শহরের অন্যতম তারকা। আমরা জুনিয়ররা তাদের আবৃত্তি গুণে মুগ্ধ ছিলাম। আমাদের ওই সময়ে উল্লেখিত জনদের আয়োজনে রাজশাহীর সাংস্কৃতিক নানা আয়োজন মুখর থাকত— রাজশাহী জেলা পরিষদ মিলনায়তন, শিশু ও শিল্পকলা একাডেমি।

সেসব আয়োজনে আমরা জুনিয়ররা মুরাদ ভাই, শামস সুমন ভাই, জয়দ্বীপ দাদা, স্বাতী ও মিঠি আপার ডুয়েট আবৃত্তি দেখেই বড় হয়েছি। উল্লেখিত জুটির প্রায় সবার সাথেই কলেজপড়ুয়া নতুন আরেকজন— রওশন আরা কেয়া (আমার বড় বোন)— ডুয়েট আবৃত্তিতে অংশগ্রহণ করে আলোচিত হতে দেখেছি। শামস সুমন ভাইয়েরা তখন হয়তো ঢাকামুখী হচ্ছেন। সেবার রাজশাহী জেলা পরিষদ মিলনায়তনে উল্লেখিত ডুয়েট জুটির বাইরে শামস সুমন ভাই ও রওশন কেয়ার ডুয়েট আবৃত্তি খুব আলোচিত হয়েছিল।

সুমন ভাই তো এমনিতেই সেরা। তার সাথে ডুয়েট করার তালিকায় নাম লেখানো মানেই হলো ধারাবাহিকভাবে একজন শিল্পীর একটি কাতারে উঠে যাওয়ার সম্মাননা। জুনিয়ররা তাই অপেক্ষায় থাকত— কে কবে সেই উল্লেখিত জুটির সাথে “ডুয়েট আবৃত্তি”র সুযোগ পাবে।

আমরা জুনিয়ররা তার সাথে ডুয়েট আবৃত্তির সুযোগ পাওয়ার আগেই শামস সুমনেরা ঢাকামুখী হয়ে গেলেন। আমরাও যে যার শিক্ষাজীবন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। তারপর হঠাৎই আবিষ্কার করলাম— যাদের সাথে ডুয়েট করার অপেক্ষায় ছিলাম, সেই শামস সুমন ঢাকার সাংস্কৃতিক জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে টিভি নাটক ও চলচ্চিত্রে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। শামস সুমন ও আরমান পারভেজ মুরাদ ভাই খানিক আগে-পরে বা কাছাকাছি সময়ে নিজেদের সৃজনী গুণে, অভিনয় দক্ষতায় জাতীয় পর্যায়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন। তাদের দেখে আমরা উদ্দীপ্ত হতাম।

আমরা তখন রাজশাহীর কৃতি সন্তান, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং রাজশাহী আবৃত্তি পরিষদের সিনিয়র শিল্পী— এই তিনভাবে মুরাদ ও সুমন ভাইকে নিজেদের চেনা গণ্ডির “মহাতারকা” মনে করতাম। ২০০২ সালে আমিও কর্মসূত্রে ঢাকামুখী হয়েছি। তবে কোনোদিনই তাদের সাথে যোগাযোগ হয়নি। তথাপি শামস সুমনের গৌরবের সৌরভে বুক ফুলিয়ে অংশীদার হতাম।

টিভি অনুষ্ঠানে শামস সুমন। ছবি: সংগৃহীত
টিভি অনুষ্ঠানে শামস সুমন। ছবি: সংগৃহীত

পর্যায়ক্রমে শামস সুমন তার কর্মের নানা বৈচিত্র্য ও নান্দনিকতায় উত্থান ও উৎকর্ষের শিখরে পৌঁছে জাতীয় পুরস্কারে ভূষিত হলেন। আমরাও রাজশাহীবাসী, রাজশাহী আবৃত্তি পরিষদ এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে মুগ্ধ হয়ে শামস সুমনের সম্মাননা ও কৃতিত্বের ভাগীদার হয়েছি।

কারণ মানুষ তার শৈশবকে সহজে ভোলে না। আমরাও সেই শৈশবে “রাজশাহী আবৃত্তি পরিষদ”-এর প্ল্যাটফর্মে শামস সুমনের সাথে তাদের পরিকল্পনা ও নির্দেশনায় বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবসসহ নানা স্মরণীয় দিনের সাংস্কৃতিক আয়োজনে একই মঞ্চে কাজ করেছি, যা সহসাই ভোলার নয়।

এ দেশের সাংস্কৃতিক জগতের উজ্জ্বল “নক্ষত্রখ্যাত” সংস্কৃতিজনের ভিড়ে শিক্ষা ও সংস্কৃতির নগরী রাজশাহীতে আপনিই ছিলেন আমাদের শৈশবের চেনা গণ্ডির প্রিয়, পরিচিত এবং মুগ্ধতা ছড়ানো এক “তারকা”।

শামস সুমন শৈশবে “রাজশাহী আবৃত্তি পরিষদ”-এর চেনা প্ল্যাটফর্ম থেকেই হয়ে উঠেছিলেন আমাদের বিনোদনের প্রিয় মুখ। এ ছাড়াও রাজশাহী বেতারে কাজের সুবাদে শামস সুমনের আম্মাও ছিলেন আমাদের পরিচিত মুখ।

সেই সুমন ভাই— টেলিভিশন থেকে চলচ্চিত্রের খ্যাতিমান শিল্পী। আপনাকে একদিন হঠাৎ পেলাম রেডিও ভূমির স্টেশনপ্রধান হিসেবে। চ্যানেল আইয়ের অনুষ্ঠান বিভাগের পরিচালক ছিলেন আপনি।

রাজশাহী শহরে বেড়ে ওঠা আমাদের শৈশব, কৈশোর ও তারুণ্যের দিনের প্রিয় অভিনেতা ও আবৃত্তিকার শামস সুমনের সহকর্মী হলাম। সেই সুবাদে পুরোনো শৈশবের স্মৃতি নিয়ে বহু বছর পর আপনার সাথে দেখা ও কথা হতো। প্রায় প্রতিদিনই দেখা, কথা ও কুশল বিনিময় হতো।

শৈশবের আবৃত্তি শিল্পী সুমন ভাই থেকে টেলিভিশনের পর্দা কাঁপানো গুণী শিল্পী— আপনি রাজশাহী শহরের বহু মানুষের শৈশব, কৈশোর ও তারুণ্যের স্মৃতির অংশ, বিশেষ করে আমরা যারা “রাজশাহী আবৃত্তি পরিষদ”-এর সাথে যুক্ত ছিলাম।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মতিহারের সৃজনশীল সবুজ চত্বর আপনার পদচারণায় মুখরিত ছিল। আপনার অনবদ্য গুণে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতির তুঙ্গে থাকা আবৃত্তি চর্চার সাংস্কৃতিক চারণভূমি “স্বনন” মুখরিত ছিল আপনার কর্মে ও ভূমিকায়।

রাজশাহীর জল-হাওয়া ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের উজ্জ্বল তারকা আপনি জাতীয় পরিসরে শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক নগরী রাজশাহীকে আরও খ্যাতিময় করেছেন। আপনার মাধ্যমে পৌঁছে গেছে সেই পরিচয় জাতীয় পরিসরের নান্দনিক উচ্চতায়।

আপনার অভিনীত চলচ্চিত্রগুলোর মধ‍্যে রয়েছে ‘মন জানে না মনের ঠিকানা’, ‘কক্সবাজারে কাকাতুয়া’, ‘চোখের দেখা’, ‘প্রিয়া তুমি সুখী হও’, ‘আয়না কাহিনি’, ‘বিদ্রোহী পদ্মা’, ‘জয়যাত্রা’, ‘হ্যালো অমিত’ ইত‍্যদি।

হঠাৎই একলাফে অতিক্রম করলেন জাগতিক জীবন, চলে গেলেন লোকচক্ষুর আড়ালে। পরপারের অনন্ত জীবনে আপনি শান্তিতে থাকুন— এই দোয়া করছি শোকের স্তব্ধতায়।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট

ad
ad

খবরাখবর থেকে আরও পড়ুন

আমিরাতে ভোরের আকাশে চাঁদ, ৩০ রোজা হওয়ার ইঙ্গিত

সংযুক্ত আরব আমিরাতের জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণ বলছে, এর ফলে ২৯ রমজানের সন্ধ্যায় নতুন হিজরি মাসের চাঁদ দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা কমে গেছে। অর্থাৎ রমজান মাস ৩০ দিনেই পূর্ণ হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। এ ক্ষেত্রে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ঈদুল ফিতর হবে আগামী শুক্রবার ( ২০ মার্চ)।

৯ ঘণ্টা আগে

ঈদের ছুটিতেও অফিস করছেন প্রধানমন্ত্রী

ঈদুল ফিতর উপলক্ষ্যে টানা সাত দিনের ছুটি শুরু হলেও সচিবালয়ে অফিস করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আজ মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) বেলা ১১টায় তিনি সচিবালয়ে নিজের দপ্তরে পৌঁছান। প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন এ তথ্য জানিয়েছেন।

১১ ঘণ্টা আগে

আইন না জানাও একটা অপরাধ: আইজিপি

আইন না জানাও একটা অপরাধ বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। আজ মঙ্গলবার বেলা ১১টায় রাজধানীর গাবতলী বাস টার্মিনাল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের তিনি এসব কথা বলেন।

১২ ঘণ্টা আগে

ঈদের দিন বন্ধ থাকবে মেট্রোরেল চলাচল

ঈদ উপলক্ষ্যে যাত্রীদের যাতায়াত পরিকল্পনা আগেভাগে নির্ধারণ করার জন্য এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ডিএমটিসিএল আরও জানিয়েছে, ঈদের পরের দিন থেকে যথারীতি নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী মেট্রোরেল চলাচল পুনরায় শুরু হবে।

১৪ ঘণ্টা আগে