বিজ্ঞান

পিরিয়ড দ্রুত হওয়ার উপায় আছে কি?

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ০৮ মে ২০২৫, ০০: ১০
পিরিয়ড দ্রুত হওয়ার উপায় আছে কি?

নারীদের জীবনে মাসিক বা পিরিয়ড একটি স্বাভাবিক ও নিয়মিত শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। কিন্তু কখনো কখনো এমন সময় আসে, যখন মেয়েরা চান তাঁদের পিরিয়ডটা একটু আগে হোক—যেমন কোনো ভ্রমণ, পরীক্ষা, উৎসব বা বিশেষ দিন থাকলে। প্রশ্ন হলো, সত্যিই কি পিরিয়ড দ্রুত করানো সম্ভব? আর সম্ভব হলেও সেটা কি স্বাস্থ্যকর? বিজ্ঞান ও গবেষকদের মতামত জানলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে।

প্রথমে বুঝে নেওয়া দরকার, মেয়েদের মাসিক চক্র মূলত নিয়ন্ত্রিত হয় শরীরের হরমোন দ্বারা—বিশেষ করে ‘ইস্ট্রোজেন’ ও ‘প্রোজেস্টেরন’। এই হরমোনগুলো ডিম্বাণু তৈরি, জরায়ুর ভিতরের আবরণ (এন্ডোমেট্রিয়াম) প্রস্তুত করা ও তা ভেঙে ফেলে রক্তপাত শুরু করানোর মতো প্রক্রিয়াগুলো নিয়ন্ত্রণ করে।

যুক্তরাষ্ট্রের ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ড. জেনিফার হাভেন বলেন, “মাসিক একটি সূক্ষ্ম হরমোন-নির্ভর প্রক্রিয়া। একে কৃত্রিমভাবে এগিয়ে আনা বা বিলম্বিত করা সম্ভব, কিন্তু তার জন্য হরমোনের ভারসাম্য পরিবর্তন করতে হয়।”

অনেকেই প্রশ্ন করেন, প্রাকৃতিকভাবে কীভাবে পিরিয়ড আগে আনা যায়। কয়েকটি ঘরোয়া উপায় নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে নানা দাবি শোনা যায়, যেমন:

গরম পানিতে গোসল

পেঁপে খাওয়া

আদা চা পান করা

হলুদ দুধ পান করা

শারীরিক ব্যায়াম

এগুলো কিছুটা রক্ত সঞ্চালন বাড়াতে বা জরায়ুর পেশি সক্রিয় করতে সাহায্য করতে পারে, তবে এসব উপায়ের কার্যকারিতা নিয়ে বৈজ্ঞানিক প্রমাণ খুবই সীমিত।

যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের নারীস্বাস্থ্য গবেষক ড. রেবেকা ডানকান বলেন, “এই ধরনের প্রাকৃতিক উপায়গুলি শরীরকে কিছুটা উদ্দীপনা দিতে পারে ঠিকই, কিন্তু নিশ্চিতভাবে মাসিক এগিয়ে আনার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি এতে নেই।”

হরমোনাল পদ্ধতি—ঔষধের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ

পিরিয়ড দ্রুত করানোর সবচেয়ে কার্যকর ও বিজ্ঞানসম্মত উপায় হলো হরমোনাল কন্ট্রাসেপটিভ ব্যবহারের মাধ্যমে। এটি মূলত জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি, হরমোন থেরাপি বা প্রোজেস্টিন বড়ি হতে পারে। সাধারণত জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ির ২১ দিন পর ৭ দিন বিরতিতে পিরিয়ড হয়। এই সাইকেল সামান্য পরিবর্তন করলেই মাসিক আগে বা পরে আনা সম্ভব।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক প্রেসবাইটেরিয়ান হাসপাতালের স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ড. লিন্ডা ম্যাকগ্রে বলেন, “আমরা অনেক সময় নারীদের জরুরি প্রয়োজনে পিরিয়ড সময়ের আগে আনতে নির্ধারিত হরমোনাল ওষুধ দিয়ে থাকি। তবে এটি চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কখনোই করা উচিত নয়।” (Dr. Linda McGray, OB-GYN, NY Presbyterian Hospital)

কী ধরনের ওষুধ ব্যবহৃত হয়?

১. নরেথিস্টেরন (Norethisterone): এটি একটি কৃত্রিম প্রোজেস্টেরন। সাধারণত পিরিয়ড পিছিয়ে দিতে ব্যবহৃত হয়, তবে নির্দিষ্ট নিয়মে খেলে পিরিয়ড এগিয়ে আনাও সম্ভব। তবে এটি চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া গ্রহণ করা বিপজ্জনক।

২. কম্বাইন্ড বার্থ কন্ট্রোল পিল (Combined Oral Contraceptives): এই পিল ২১ দিন খেয়ে তারপর বন্ধ করলে পিরিয়ড শুরু হয়। চাইলে এই চক্র পরিবর্তন করে আগে পিরিয়ড করানো যায়।

ঝুঁকি ও সতর্কতা

যে কোনো হরমোনাল ওষুধেরই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকতে পারে—যেমন মাথা ঘোরা, বমিভাব, ওজন বেড়ে যাওয়া, হরমোনাল ভারসাম্য নষ্ট হওয়া ইত্যাদি। যাদের উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা হৃদরোগ আছে, তাদের জন্য ঝুঁকি আরও বেশি।

অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটির নারীস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. এলেনা ব্রাউন বলেন, “পিরিয়ড নিয়ে খেলা করা মানে নিজের হরমোনাল ভারসাম্যে হস্তক্ষেপ করা। তাই এটি খুব প্রয়োজন না হলে না করাই ভালো।”

আশ্চর্য হলেও সত্য, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, ঘুমের অভাব, ওজন কমে যাওয়া কিংবা অতিরিক্ত ব্যায়ামের কারণে অনেক সময় পিরিয়ড এগিয়ে বা পিছিয়ে যায়। মানসিক স্বাস্থ্যও এ প্রক্রিয়ায় বড় ভূমিকা রাখে।

কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞানী ড. ক্লারা ইয়ং বলেন, “মানসিক চাপ হাইপোথ্যালামাস নামক মস্তিষ্কের অংশকে প্রভাবিত করে, যেখান থেকে হরমোন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রিত হয়। ফলে স্ট্রেস থাকলে মেয়েদের মাসিক চক্র অনিয়মিত হয়ে যায়।” (

পিরিয়ড আগে করানো সম্ভব, তবে সেটি স্বাভাবিকভাবে সব সময় সম্ভব নয়। প্রাকৃতিক উপায়গুলো চেষ্টা করা যেতে পারে, তবে এগুলোর কার্যকারিতা নিশ্চিত নয়। সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি হলো চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে হরমোনাল নিয়ন্ত্রণ। তবে অপ্রয়োজনীয়ভাবে মাসিক চক্রে হস্তক্ষেপ না করাই ভালো।

সবচেয়ে বড় কথা—মাসিক একটি স্বাভাবিক ও স্বাস্থ্যকর প্রক্রিয়া। একে নিয়ে অস্বস্তি নয়, বরং নিজের শরীর ও স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন হওয়াটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement