বিজ্ঞান

বৃষ্টির দিনে গরম বেশি লাগে কেন?

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
প্রতিকী ছবি। ছবি : এআইয়ের তৈরি।

বৃষ্টি মানেই ঠান্ডা হাওয়া, ভিজে রাস্তাঘাট আর কুয়াশাভেজা জানালার কাচ। কিন্তু বৃষ্টির দিনে বরং গরমটা যেন আরও বেড়ে যায়। ঘরে বসে ঘাম ঝরে, ফ্যান চালিয়েও যেন আরাম পাওয়া যায় না। কেন?

এর পেছনে রয়েছে আর্দ্রতা, শহরের কংক্রিট কাঠামো, জলবায়ু পরিবর্তন এবং আমাদের প্রতিদিনের জীবনধারার প্রভাব। বিজ্ঞানীরা এ বিষয়ে গবেষণা করেছেন এবং তুলে ধরেছেন কিছু চমকপ্রদ তথ্য, যা আমাদের এই অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতার পেছনের বিজ্ঞান বুঝতে সাহায্য করে।

প্রথমেই বুঝে নেওয়া দরকার ‘আর্দ্রতা’ ভূমিকা। সাধারণভাবে আমরা গরমকে তাপমাত্রার পরিমাপে বুঝি। কিন্তু বাস্তবে আমাদের শরীর কতটা গরম অনুভব করছে, তা নির্ভর করে বাতাসে জলীয়বাষ্পের পরিমাণের ওপর। বৃষ্টির ঠিক আগে ও পরে বাতাসে আর্দ্রতা খুব বেশি থাকে। এই জলীয়বাষ্প ঘামের বাষ্পীভবনকে বাধা দেয়, ফলে শরীর স্বাভাবিক উপায়ে ঠান্ডা হতে পারে না। এর ফলে আমরা অনেক বেশি অস্বস্তি অনুভব করি।

যুক্তরাষ্ট্রের ‘ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা এনওএএ-এর আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ ড. জেনিফার ফ্রান্সিস বলেন, “বৃষ্টির দিনে আর্দ্রতা এতটাই বেড়ে যায় যে, শরীরের ঘাম বাষ্প হয়ে উড়ে যেতে পারে না। ফলে তাপমাত্রা কম থাকলেও শরীর গরম অনুভব করে।” তিনি আরও বলেন, “এই সময়টাতে আমাদের শরীর একটা তাপমাত্রা ফাঁদে পড়ে যায়। বাইরে থেকে ঠান্ডা লাগলেও ভিতরে ভিতরে গরম লাগে।”

এছাড়া শহুরে এলাকাগুলোর জন্য রয়েছে ‘আরবান হিট আইল্যান্ড’ প্রভাব। শহরে রাস্তাঘাট, ভবন, ছাদ—সবই কংক্রিট বা পাকা রাস্তা দিয়ে তৈরি। এগুলো দিনের বেলায় প্রচুর তাপ শোষণ করে রাখে এবং রাতেও সেই তাপ ধীরে ধীরে নিঃসরণ করে। ফলে বৃষ্টি হলেও শহরের চারপাশ গরম থাকে। এর সঙ্গে যদি আর্দ্রতা মিশে যায়, তাহলে গরম লাগার অনুভূতিটা আরও বেড়ে যায়।

যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব রিডিংয়ের আবহাওয়া গবেষক ড. রিচার্ড অ্যালেন বলেন, “বৃষ্টির পরপরই শহরের জমে থাকা গরম বাতাস এবং কংক্রিট কাঠামো থেকে বের হওয়া তাপ মিলে যায় আর্দ্র বাতাসের সঙ্গে। তখন তাপমাত্রা তুলনামূলক কম হলেও শরীরের ওপর গরমের চাপ থেকে যায়।”

আরেকটি কারণ হলো বৃষ্টির আগে ও পরে বাতাসের চলাচলের ধরণ। সাধারণত বৃষ্টির আগে নিম্নচাপ সৃষ্টি হয়, যার ফলে বাতাস ভারী হয়ে ওঠে এবং উপরের দিকে তাপ চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়। এর ফলে মাটির কাছাকাছি গরম আটকে যায়। একে বলা হয় ‘তাপের আবদ্ধতা’। এর ফলে গরম লাগে আরও বেশি।

আবহাওয়ার এই আচরণ জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গেও সম্পর্কযুক্ত। বৈশ্বিক উষ্ণতা বা গ্লোবাল ওয়ার্মিং ধীরে ধীরে আমাদের মৌসুমগুলোর স্বভাব পাল্টে দিচ্ছে। আগে বর্ষা মানেই ঠান্ডা বাতাস আর টানা বৃষ্টি। এখন বর্ষা মানে কখনও একটানা রোদ, আবার হঠাৎ প্রবল বৃষ্টি, আবার গরম ও ঘেমে ওঠা শরীর। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বর্ষার চরিত্রও বদলাচ্ছে।

কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ু বিজ্ঞানী ড. সোফিয়া চ্যাং বলেন, “বৃষ্টির সময় আমাদের এখন যে গরম লাগছে, সেটা হলো জলবায়ু পরিবর্তনের একটা পরিষ্কার লক্ষণ। বৃষ্টির সঙ্গে শীতলতা এখন আর হাত ধরাধরি করে চলে না।” তিনি আরও বলেন, “আগে বর্ষা মানেই তাপমাত্রা হঠাৎ নেমে যাওয়া, কিন্তু এখন তা হয় না। কারণ বাতাসে তাপ আটকে থাকে।”

আরো একটি বিষয় আমাদের চোখে পড়ে না, কিন্তু প্রভাব ফেলে। তা হলো ‘ল্যাটেন্ট হিট অব কন্ডেনসেশন’। যখন জলীয়বাষ্প ঘন হয়ে জলকণায় পরিণত হয় (অর্থাৎ বৃষ্টি নামে), তখন একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ তাপ পরিবেশে মুক্ত হয়। এই তাপ অনেক সময় স্থানীয় তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়। ফলে বৃষ্টির পরপরই গরম বেড়ে যায়।

বৃষ্টির দিনে যদি আপনি দেখেন, হঠাৎ গরম অনুভব করছেন, ঘামছেন বা ঘরের ভেতর হাঁসফাঁস লাগছে, তাহলে সেটা অস্বাভাবিক নয়। এটা আমাদের নতুন পরিবেশে স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। তাই এই সময়ে একটু সতর্ক থাকা জরুরি। খোলা জায়গায় বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখা, প্রচুর পানি পান করা এবং শরীরকে ঠান্ডা রাখার উপায় খুঁজে নেওয়া দরকার।

সবশেষে বলা যায়, বৃষ্টির দিনে গরম লাগাটা এখন শুধু অনুভব নয়, এর পেছনে রয়েছে বৈজ্ঞানিক কারণ এবং বৈশ্বিক পরিবর্তনের ছাপ। আমরা হয়তো আজ তা বুঝে উঠতে পারছি না, কিন্তু আগামী দিনে এই পরিবর্তন আরও প্রকট হবে বলে মনে করছেন গবেষকেরা। তাই এখন থেকেই আবহাওয়ার এই পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এবং প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় সচেতন হওয়াই হবে একমাত্র পথ।

ad
ad

খবরাখবর থেকে আরও পড়ুন

পুলিশ-জনগণের সম্পর্ক আরও দৃঢ় করতে হবে: রাষ্ট্রপতি

রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেছেন, পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি সমুন্নত রাখতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে কমিউনিটি পুলিশিং জোরদার, সেবামুখী মনোভাব গড়ে তোলা এবং মানবাধিকার সমুন্নত রাখার মাধ্যমে পুলিশ ও জনগণের সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

৪ ঘণ্টা আগে

হাওরে বিপর্যয় ‘মানবসৃষ্ট’, দায়ীদের বিচার দাবি কৃষক মজুর সংহতির

গত কয়েকদিনের অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল এবং ফসলরক্ষা বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকে হাওর অঞ্চলে ব্যপক ফসলহানির ঘটনা ঘটেছে। এই বিপর্যয়কে ‘মানবসৃষ্ট’ বলে অভিহিত করেছে বাংলাদেশ কৃষক মজুর সংহতি। একই সঙ্গে সংগঠনটির পক্ষ থেকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কর্মকর্তাসহ দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার ও শাস্তির দাবি জানানো হয়েছে।

৫ ঘণ্টা আগে

২৪ ঘণ্টায় হাম ও উপসর্গে ৯ শিশুর মৃত্যু

গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে হামে ৩ জন এবং হামের উপসর্গে ৬ জন মারা গেছে। এ নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ালো ৩৫২ জনে।

৬ ঘণ্টা আগে

জুলাই শহিদের প্রকৃত খুনিদের বিচার হবে: চিফ প্রসিকিউটর

জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে উত্তরা এলাকায় সংঘটিত হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় দায়ীদের বিচারে কোনো পক্ষপাত বা আপস করা হবে না বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম।

৭ ঘণ্টা আগে