ঢাবি শিক্ষকদের বহিষ্কার-অব্যাহতির প্রতিবাদ শিক্ষক সমিতির, সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি

ঢাবি প্রতিনিধি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) সিন্ডিকেটে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপককে স্থায়ী বহিষ্কার ও ছয় শিক্ষককে একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি।

সমিতি বলছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। এটি রাষ্ট্রযন্ত্রের নির্দেশনা নয়, বরং ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ, ১৯৭৩’-এর আইন অনুযায়ী পরিচালিত হয়। ওই আইন অনুযায়ী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষক, কর্মকর্তা বা কর্মচারীর অপরাধ অনুসন্ধান কমিটি ও ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক সম্পূর্ণভাবে প্রমাণিত হওয়ার আগে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের কোনো শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা রাখে না।

বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) মধ্যরাতে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এ প্রতিবাদ জানিয়েছে শিক্ষক সমিতি। সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. নিজামুল হক ভূইয়া ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. জিনাত হুদা এতে সই করেছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির বর্তমানে কোনো দৃশ্যমান কার্যক্রম নেই। সর্বশেষ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত নীল দলের শিক্ষকরা নির্বাচিত হলেও ৫ আগস্টের পর নতুন নির্বাচন না হওয়ায় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কাগজে-কলমে সেই কমিটিই বহাল রয়েছে। অন্যদিকে বিএনপি-সমর্থিত সাদা দলের শিক্ষকরা অনানুষ্ঠানিকভাবে সমিতির বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির নির্বাচন প্রতিবছর ডিসেম্বর মাসে হওয়ার কথা থাকলেও ২০২৪ ও ২০২৫ সালে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। ফলে গঠনতন্ত্র অনুযায়ী আগের কমিটি বহাল রয়েছে। নিয়মতান্ত্রিক জটিলতার কারণে নির্বাচন না হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএনপি সমর্থক শিক্ষকদের সাদা দল কার্যত শিক্ষকদের প্রতিনিধিত্ব করছে।

শিক্ষক সমিতির বিজ্ঞপ্তিতে এর আগে গত ২২ জুন সিন্ডিকেট সভায় তিন শিক্ষককে বহিষ্কারের বিষয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বলা হয়েছে, ১৯৭৩-এর আইন অনুযায়ী, তথ্যানুসন্ধান কমিটি, তদন্ত কমিটি ও ট্রাইব্যুনাল গঠনের মাধ্যমে এসব শিক্ষককে আত্মপক্ষ সমর্থন, নিজ বক্তব্য প্রদান ও অভিযোগ উত্থাপনকারীদের মুখোমুখি বা সরাসরি সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে বক্তব্য খণ্ডন করার বিন্দুমাত্র সুযোগ দেওয়া হয়নি। এটি পরিষ্কারভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও দীর্ঘ ঐতিহ্যের লঙ্ঘন, মানবাধিকারের লঙ্ঘন এবং সমান অধিকারপ্রাপ্তির চরম লঙ্ঘন।

সমিতি বলছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ববর্তী অনির্বাচিত প্রশাসন মব তৈরির মাধ্যমে একটি একপাক্ষিক নীতি অনুসরণ করেছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও বিধিমালা উপেক্ষা করে প্রায় ৭০-৮০ জন শিক্ষককে একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে বিরত রাখা হয়েছে এবং বিভিন্ন ট্যাগিংয়ের মাধ্যমে তাদের সামাজিকভাবে অসম্মানিত করার নীতি গ্রহণ করা হয়েছে, যা মূলত মানসিক ও অর্থনৈতিক নিপীড়নের নামান্তর।

পূর্ববর্তী প্রশাসন নির্বাচিত সিনেট, সিন্ডিকেট ও শিক্ষক সমিতিকে অকার্যকর করার মাধ্যমে এ ধরনের আইনবহির্ভূত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বলেও অভিযোগ করেছে সমিতি। বলেছে, নির্বাচিত শিক্ষক প্রতিনিধিদের জোর করে বিরত রেখে একতরফাভাবে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, তা কখনোই সুবিচার নিশ্চিত করবে না। দুঃখজনক হলেও সত্যি, বর্তমান প্রশাসন দুই বছর আগে শাস্তি পাওয়া শিক্ষককে পুনরায় শাস্তি দিয়ে শাস্তির মাত্রা দ্বিগুণ করেছে।

বিশ্ববিদ্যালয় বিভিন্ন মত, পথ ও দর্শনের বৈচিত্র্য এবং সমন্বয়ে পরিচালিত জ্ঞানার্জনের প্রতিষ্ঠান উল্লেখ করে শিক্ষক সমিতির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পরমতসহিষ্ণুতা, বহুত্ববাদ, স্বাধীন গবেষণা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে লালন ও ধারণ করাই একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল চেতনা। রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে অতীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রজ্ঞাবান, অভিজ্ঞ এবং জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের শাস্তি প্রদানের ঘটনা বিরল।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় ভিন্নমত দমন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকোচনের নীতি এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে শিক্ষকসমাজের মধ্যে আতঙ্ক ও ভীতি ছড়িয়ে অনিরাপত্তার সংস্কৃতি তৈরি করা হলো বলে মনে করছে শিক্ষক সমিতি। এ ঘটনা ভবিষ্যতের জন্য অশুভ দৃষ্টান্ত হিসেবে থেকে যাবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে বিবৃতিতে।

গত দুই বছরে ঢাবির যে ১০ শিক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তা প্রত্যাহারের জোর দাবি জানিয়েছে শিক্ষক সমিতি। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, একটি সুশৃঙ্খল ও মেধাভিত্তিক একাডেমিক পরিবেশ এবং নিরাপদ ক্যাম্পাস গড়ে তোলার মাধ্যমে সমিতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার অনুকূল পরিবেশ ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানাচ্ছে।

এর আগে গত মঙ্গলবার ঢাবি সিন্ডিকেট সভায় ‘জুলাইয়ের চেতনাবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও সংগঠনের বিরুদ্ধে’ ব্যবস্থা নিতে তিন শিক্ষককে বরখাস্ত ও আরও চারজনকে সব ধরনের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সাত শিক্ষকের মধ্যে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. সাদেকা হালিম, নিউক্লিয়ার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শফিকুল ইসলাম ও অধ্যাপক ড. আফরোজা শেলীকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়।

অন্যদিকে ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি ও ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল মুহিতকে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব থেকে এবং ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক ড. আবু সারা শামসুর রউফ এবং শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. রফিকুল ইসলামকে একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে সরানো হয়েছে। এ ছাড়া অনিয়ম ও থিসিসে চৌর্যবৃত্তির দায়ে ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বাহাউদ্দিনকেও বিশ্ববিদ্যালয়ের সব একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

ad
ad

খবরাখবর থেকে আরও পড়ুন

৮৬ ডেপুটি ও ১৭৯ সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগ

বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) তাদের নিয়োগ দিয়ে পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করেছে আইন মন্ত্রণালয়ের সলিসিটর কার্যালয়।

১৯ ঘণ্টা আগে

৩ মামলায় গ্রেপ্তার, চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন কারাগারে

চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমনকে একটি হত্যা ও দুটি অস্ত্র মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে চট্টগ্রামের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সায়মা আফরীন হীমার আদালতে হাজির করা হলে বিচারক তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

২০ ঘণ্টা আগে

ইউনিভার্সেল মেডিকেলে কিডনি ও বোন ম্যারো প্রতিস্থাপনবিষয়ক বৈজ্ঞানিক সেমিনার

রাজধানীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ভারতের ম্যাক্স হেলথকেয়ারের যৌথ উদ্যোগে কিডনি প্রতিস্থাপন, বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্টেশন এবং জটিল রক্তরোগের আধুনিক চিকিৎসা নিয়ে একটি বৈজ্ঞানিক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে।

২০ ঘণ্টা আগে

আমাকে ফাঁসি দিয়ে দেন— হাজতখানায় নেওয়ার সময় লতিফ সিদ্দিকী

এরপর পুলিশ সদস্যরা তার কাছ থেকে মাইক্রোফোন সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে ট্রাইব্যুনালের এজলাসে তাদের সঙ্গে লতিফ সিদ্দিকীর উচ্চবাচ্য হয়। পরে ট্রাইব্যুনাল-২-এর কাঠগড়া থেকে তাকে হাজতখানায় নেওয়ার সময় এক সাংবাদিক জানতে চান, ট্রাইব্যুনালে তিনি কী বলতে চাচ্ছিলেন। জবাবে লতিফ সিদ্দিকী বলেন, ‘বলতে চাচ্ছিলাম যে আমা

২১ ঘণ্টা আগে