চলে গেলেন ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’র কবি হেলাল হাফিজ

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ১৩ ডিসেম্বর ২০২৪, ১৮: ৪৪

‘ব্যর্থ হয়ে থাকে যদি প্রণয়ের এত আয়োজন,/ আগামী মিছিলে এসো/ স্লোগানে স্লোগানে হবে কথোপকথন। আকালের এই কালে সাধ হলে পথে ভালোবেসো,/ ধ্রুপদী পিপাসা নিয়ে আসো যদি/ লাল শাড়িটা তোমার পরে এসো।’

প্রেম আর দ্রোহের এমন সম্মিলন ঝরেছিল যার কবিতার পঙ্ক্তিতে পঙ্ক্তিতে, সেই হেলাল হাফিজ আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। গ্লুকোমা, কিডনি জটিলতা, ডায়াবেটিস আর স্নায়বিক জটিলতার সঙ্গে আর পেরে উঠলেন না কবি। পাড়ি জমালেন না ফেরার দেশে।

রাজধানীর শাহবাগের সুপার হোস্টেলে থাকতেন কবি হেলাল হাফিজ। শুক্রবার (১৩ ডিসেম্বর) দুপুরে সেই হোস্টেলের বাথরুমে নিথর অবস্থায় পড়ে ছিলেন কবি। দুপুর আড়াইটার দিকে তাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে নেওয়া হয়।

বিএসএমএমইউ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. রেজাউর রহমান গণমাধ্যমকে জানান, কবির মৃত্যু হয়েছে আগেই। তাকে মৃত অবস্থায় নেওয়া হয়েছিল হাসপাতালে।

চিরকুমার হেলাল হাফিজ ২০২২ সালে মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়লে বেশ কিছুদিন হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। পরে বন্ধু ইসমত শিল্পীর বাসায় ছিলেন কিছুদিন। পরে আবার ফিরে যান শাহবাগের সুপার হোম হোস্টেলের একাকী জীবনে।

কবি আবিদ আজম জানিয়েছেন, আগামীকাল শনিবার (১৪ ডিসেম্বর) জাতীয় প্রেসক্লাবে হেলাল হাফিজের জানাজা পড়ানো হবে।

ষাটের দশকের শেষভাগ থেকে কবিতা লিখছেন হেলাল হাফিজ। তবে তিনি স্বল্পপ্রজ। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হয় তার কবিতার বই ‘যে জলে আগুন জ্বলে’। তাতে স্থান পেয়েছেন ১৯৬৯ সাল থেকে ১৯৮৫ সালে লেখা কবির গোটা পঞ্চাশেক কবিতা। তাতে ছিল প্রেম, ছিল দ্রোহ। ছিল বাংলার এক তরুণের উদ্দাম আবেগ-উচ্ছ্বলতা, দ্রোহ-প্রেম-বিরহের এক অনবদ্য সংমিশ্রণ।

অন্তত ৩৩ বার পুনর্মুদ্রণ হওয়া সেই একটি কবিতার বই-ই তিন দশক ধরে হেলাল হাফিজকে দিয়েছে আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা। কবিতার নিবিড় পাঠক ছাড়াও সাধারণ মানুষের মুখে মুখে ফিরেছে তার কবিতার সব লাইন। এত কম কবিতা লিখে এত জনপ্রিয়তা পাওয়ার নজির ইতিহাসে বিরল।

‘যে জলে আগুন জ্বলে’ বইয়ের অন্যতম জনপ্রিয় কবিতা নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়, যার প্রথম দুটি লাইন— ‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়/ এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’— কিংবদন্তীর মতো ফেরে মানুষের মুখে। ‘নিউট্রন বোমা বোঝো/ মানুষ বোঝো না’— মাত্র দুটি পঙ্ক্তির এই কবিতাটিও কবির পরিচয়ের স্মারক।

গভীর প্রেম নিয়ে কবি লিখেছেন— ‘তোমাকে শুধু তোমাকে চাই, পাবো?/ পাই বা না পাই একজীবনে তোমার কাছেই যাব।’, কিংবা ‘একবার ডাক দিয়ে দেখো আমি কতটা কাঙাল/ কত হুলুস্থূল অনটন আজম্ন ভেতরে আমার।’ লিখেছেন— ‘প্রেমের প্রতিমা তুমি, প্রণয়ের তীর্থ আমার।’, কিংবা ‘এখন তুমি কোথায় আছ কেমন আছ, পত্র দিও’।

হেলাল হাফিজের কবিতার চরণে চরণে ঝরেছে বিরহ ব্যথাও। লিখেছেন— ‘আমাকে দুঃখের শ্লোক কে শোনাবে?/ কে দেখাবে আমাকে দুঃখের চিহ্ন কী এমন,/ দুঃখ তো আমার সেই জন্ম থেকে জীবনের/ একমাত্র মৌলিক কাহিনি।’, কিংবা ‘আমি তো গিয়েছি জেনে প্রণয়নের দারুণ আকালে/ নীল নীল বনভূমি ভেতরে জন্মালে/ কেউ কেউ চলে যায় চলে যেতে হয়/ অবলীলাক্রমে কেউ বেছে নেয় পৃথক প্লাবন/ কেউ কেউ এইভাবে চলে যায় বুকে নিয়ে ব্যাকুল আগুন।’

এমন প্রেম-বিরহের মধ্যেও কবি জ্বেলে দিয়েছেন দ্রোহের আগুন— ‘ছিল তা এক অগ্ন্যুৎসব, সেদিন আমি/ সবটুকু বুক রেখেছিলাম স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্রে? জীবন বাজি ধরেছিলাম প্রেমের নামে/ রক্তঋণে স্বদেশ হলো,/ তোমার দিকে চোখ ছিল না/ জন্মভূমি সেদিন তোমার সতীন ছিল।’ স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতায় হতাশা আর ক্ষোভের বহির্প্রকাশও রয়েছে তার কবিতায়— ‘আজকাল আমার কষ্টেরা বেশ ভালোই থাকেন, ... বিরোধী দলের ভুল/ মিছিলের শোভা দেখে হাসেন তুমুল,/ ক্লান্তিতে গভীর রাতে ঘরহীন ঘরেও ফেরেন,/ নির্জন নগরে তারা কতিপয় নাগরিক যেন/ কত কথোপকথনে কাটান বাকিটা রাত,.../ আমার কষ্টেরা বেশ ভালোই আছেন, মোটামুটি সুখেই আছেন।/ প্রিয় দেশবাসী;/ আপনারা কেমন আছেন?’

‘যে জলে আগুন জ্বলে’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলোর সঙ্গে আরও কিছু কবিতা যুক্ত করে ২০১২ সালে প্রকাশিত হয় তার দ্বিতীয় বই ‘কবিতা একাত্তর’। পরে ২০১৯ সালে প্রকাশিত হয় তৃতীয় বই ‘বেদনাকে বলেছি কেঁদো না’।

কবির জন্ম ১৯৪৮ সালের ৭ অক্টোবর নেত্রকোনার আটপাড়া উপজেলার বড়তলী গ্রামে। শৈশব-কৈশোর-তারুণ্য কেটেছে ওই শহরেই। নেত্রকোনা কলেজ থেকে ১৯৬৭ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে ভর্তি জন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। হেলাল হাফিজ কবিতা লেখার পাশাপাশি সাংবাদিকতাও করেছেন দীর্ঘ দিন।

প্রেমের কবি হয়েও কবির জীবনে বাস্তবে প্রেম ধরা দেয়নি মূর্ত হয়ে। সে কারণেই একাকীত্বের জীবন বেছে নিয়েছিলেন হেলাল হাফিজ। শাহবাগের সুপার হোস্টেল ছিল তার দীর্ঘ একাকীত্বের আবাসস্থল। ৭৬ বছর বয়সী কবির প্রয়াণের সঙ্গে সঙ্গে সুপার হোস্টেল হারাল ‘স্থায়ী’ বোর্ডার। অবসান ঘটল কবির একাকীত্বেরও।

Ad
Ad
ad
ad
ad

খবরাখবর থেকে আরও পড়ুন

আন্তর্জাতিক সুবিধার ‘আল্ট্রামেরিন’ ক্রেডিট কার্ড আনল সিটি ব্যাংক

কার্ডের সদস্যরা প্রতি ১০০ টাকা বা ১ মার্কিন ডলার খরচের বিপরীতে ৩টি ‘মেম্বারশিপ রিওয়ার্ডস পয়েন্ট’ অর্জন করতে পারবেন। এসব পয়েন্ট ব্যবহার করে গিফট ভাউচার সংগ্রহ, বার্ষিক ফি মওকুফ বা পয়েন্ট দিয়ে কেনাকাটার সুবিধা পাওয়া যাবে।

১৩ ঘণ্টা আগে

রাজধানীর আইসিসিবিতে প্রতি শুক্রবার বসছে ‘সুপার সেল কার বাজার’

রাজধানীতে যানবাহন কেনাবেচার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট, নিরাপদ ও আধুনিক মার্কেটপ্লেস গড়ে তোলার লক্ষ্যেই আইসিসিবির সুবিশাল ও সুসজ্জিত প্রাঙ্গণকে বেছে নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গত ৪ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া এ ধারাবাহিক আয়োজন এখন থেকে প্রতি শুক্রবার নিয়মিতভাবে আইসিসিবিতে বসবে।

১৪ ঘণ্টা আগে

বন্যায় সহায়তার জন্য তারেক রহমানের প্রতি কৃতজ্ঞতা নেপালের প্রধানমন্ত্রীর

নেপালের প্রধানমন্ত্রী দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্কের কথা তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশ শুধু নেপালের ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী নয়, বরং একটি প্রিয় বন্ধুরাষ্ট্র। দুই দেশের জনগণের মধ্যে বিদ্যমান নিবিড় যোগাযোগ ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ভবিষ্যতে দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা আরও জোরদারে সহায়ক হবে।

১৪ ঘণ্টা আগে

সস্ত্রীক আসিফ মাহমুদের ব্যাংক হিসাব ও বিদেশি সম্পদের তথ্য চেয়েছে দুদক

চিঠিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের অধীন বিভিন্ন ব্যাংক ও নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানে আসিফ মাহমুদ ও তার স্ত্রীর নামে থাকা সব ধরনের হিসাবের (বন্ধ, সুপ্ত বা চলমান) তথ্য দিতে বলা হয়েছে। ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড, লকার, বন্ড, সঞ্চয়পত্র, এফডিআর, ডিপিএস ও ঋণ হিসাবের তথ্যও চাওয়া হয়েছে।

১৫ ঘণ্টা আগে
Advertisement