
এস বি আহসান

বিজ্ঞাপনে মুখ ঢেকে যায় বলে বিব্রত হয়েছিলেন শঙ্খ ঘোষ। বিজ্ঞাপনে বিব্রতকর পরিস্থতি তৈরি হয় বটে, কিন্তু কখনো কখনো স্বপ্নালু আবেশও তৈরি করতে পারে পড়ুয়াদের মনে, সেটা যদি হয় বইয়ের বিজ্ঞাপন। কনকনে শীতের বুড়ি সদ্য যখন বিদায় নেয়, আড়মোড়া ভেঙে যখন গাছেরা জাগে, শিমুল-পলাশের ডালে ডালে আগুনের আভা দেখা দেয়, ভ্রমরের গুঞ্জরন বসন্ত বাতাসে ভাসে, বাংলা একাডেমি কিংবা সোহরাওয়ার্দি উদ্যানের ঘাসগুলো ঢেকে যায় পাঠকের পদধূলিতে, জাতীয় দৈনিকের মুখ তখন আক্ষরিক অর্থেই ঢেকে যায় বইয়ের বিজ্ঞাপনে।
অনলাইনের এই যুগে বইয়ের বিজ্ঞাপনের বড় মাধ্যম উঠেছে ফেসবুক আর ইউটিউব। কিন্ত আজ থেকে ২০০ বছর আগে, হুগলির শ্রীরামপুরের মিশনারির বাইরে, কলকাতার কলুটোলা কিংবা শোভাবাজারের বটতলাকে ঘিরে আমজনতার মনের খোরাক মেটাতে যে বইয়ের দুনিয়া গড়ে ওঠে, বঙ্কিমচন্দ্র যেগুলোকে ‘রুচিহীন’, ‘অশ্লীল’ বলে ভর্ৎসনা করেছেন, বিদ্যাসাগর আবার সেই বইগুলোকেই ‘ভারতীয় সাংস্কৃতির চিরকালীন উপাদান’ বলে বঙ্কিমের বিরোধিতায় বিকল্প সুর চড়িয়েছেন, বটতলাকেন্দ্রিক সেই হাটুরে সস্তা বইয়ের জন্যও বিজ্ঞাপনের দরকার পড়েছিল।
আর সেই বিজ্ঞাপন প্রচারের মাধ্যম হিসেবে সত্যিকার্থে কোনো মিডিয়ার আবির্ভাব হয়নি, সমাচার দর্পণ-এর মতো সদ্যজাত কিছু পত্রিকা ছিল, কিংবা সাময়িকী— সেগুলোতেও বইয়ের বিজ্ঞাপন দেওয়া হতো, তবে সে সংখ্য নগণ্য। কইয়ের তেলে কই ভাজতেই প্রকাশকদের ভরসা ছিল ষোলআনা। অর্থাৎ একই মলাটের ভেতরেই থাকতে আরেক বইয়ের বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপনের লক্ষ্য যখন সর্বাধিক গ্রাহকের কাছে নিজের পণ্যের কথা প্রচার করা, তাই পঞ্জিকাই ছিল এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপনী মাধ্যম। আদিরসাত্মক, হিতোপদেশ, ধর্মকাহিনির বইয়ের চেয়েও পঞ্জিকার কাটতি ছিল বেশি। হাটে, ঘাটে, পথে-প্রান্তরে, নিভৃত পল্লিতেও পৌঁছে যেত বটতলায় প্রকাশিত পঞ্জিকা। তাই রসিয়ে রঙচঙ মাখিয়ে তথাকথিত সস্তা ভাষাতেই পঞ্জিকার পেছনের পাতায় প্রচারিত হত প্রকাশকদের চোখে ‘জমজমাট’ বিজ্ঞাপন।
বিখ্যাত গবেষক, নন ফিকশন লেখক শ্রীপান্থ তার বটতলা নামের বইটিতে লিখেছেন, ‘বটতলার প্রকাশিত পঞ্জিকার আরও একটি বৈশিষ্ট্য আমাদের নজরে পড়ে। সেটি হচ্ছে বইয়ের বিজ্ঞাপন। নতুন বাংলা বইয়ের সংবাদ সমাচার দর্পণের কাল থেকে কিছু কিছু কাগজে ছাপা হতো। কোনও কোনও সাময়িকপত্রে বইয়ের বিজ্ঞাপনও দেখা যায়। যেমন ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের এডুকেশন গেজেট। কিন্তু পঞ্জিকার বইয়ের বিজ্ঞাপনের সঙ্গে এসবের তুলনাই চলে না। বটতলার প্রকাশকেরা পাতার পর পাতাজুড়ে প্রকাশ করতেন নিজেদের বইয়ের বিজ্ঞাপন। কখনও কখনও সচিত্র বিজ্ঞাপন পর্যন্ত।’
বিজ্ঞাপন ছাপা হতো পাঠকরের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য। বিজ্ঞাপনের ভাষাটাই তাই গুরুত্বপূর্ণ, ভাষা চটকদার বা আকর্ষণীয় করতে যতরকম চেষ্টা, তার সবই করতেন লেখক-প্রকাশকেরা। চলতি গদ্যের পাশাপাশি হাটুরে পদ্য কিংবা পুঁথির ভাষাতেও লেখা হতো বিজ্ঞাপন। গঙ্গাভক্তি তরঙ্গিনী বইয়ের নামপত্রে লেখা বিজ্ঞাপনের ভাষা ছিল এমন : ‘চিৎপুর রোড আছে সর্বলোকে জানে। দুই শত ছয়চল্লিশ নম্বর ভবনে ॥ /তার সঙ্গে বিদ্যারত্ন যন্ত্র পরিষ্কার। গোলাম তিতুর যার পেশী জমাদ্দার ॥ /সেই প্রেশে এই পুঁথি সংশোধন দ্বারে। মুদ্রাঙ্কিত হৈল পুনঃ উত্তম অক্ষরে ॥ /আবশ্যক হবে যার আসিবে হেথায় । লয়ে যাবে ভক্তিভাবে মজিবে মজা।’
বিজ্ঞাপনে বইয়ের ছবি বা প্রচ্ছদপট ছাপার চল কিছুদিন পরে শুরু হয়েছে। শুধু বিজ্ঞাপন কেন, খোদ বইয়ের প্রচ্ছদেও কিংবা ভেতরে ছবি ব্যবহারের চল শুরু হতে কয়েকবছর লেগে গেছে। বইয়ের নিজের মুখই হারিয়ে যেত বিজ্ঞাপনের আড়ালে। দুর্গেশন্দিনী কিংবা পদ্মা নদীর মাঝি উপন্যাসের মতো এক-দুই কিংবা তিন-চার শব্দে বইয়ের নাম দেওয়ার চল তখনই শুরু হয়েছিল বটে, তেমনি অনেক বইয়ে নামের বদলে প্রচ্ছদপটে থাকত ‘নামপত্রের’ আড়ালে বিজ্ঞাপন। পঞ্জিকায় বিজ্ঞাপনের ভাষাটা যেমন, এখানেও তাঁর ব্যতিক্রম নয়। তখনকার বেশিরভাগ জনপ্রিয় কেচ্ছাই ছাপা হতো ধারাবাহিকভাবে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এক ফর্মা এক সপ্তাহ, পক্ষে কিংবা মাসে। জনপ্রিয় কাহিনিগুলো তাই চলত কয়েকমাস বা বছর ধরে। তাই বইয়ের প্রতিটা খণ্ডের পেছনে থাকত পরবর্তী খণ্ডের বিজ্ঞাপন।
বটতলার বিজ্ঞাপনের বড় একটা মাধ্যম ছিল ফেরিওয়ালা। কলকাতা কিংবা ঢাকা, তখনো কোনো বইয়ের দোকান গড়ে ওঠেনি। ‘শুধুমাত্র কোম্পানির প্রচারের স্বার্থে’ ঢাকা শহরে অলিতে গলিতে যেমন তিন শ টাকার পণ্য এক শ টাকায় বিকোচ্ছে দেদারসে, সেকালে ফেরিওয়ালারা তেমনি তুলনামূলক কম দামে বই ফেরি করে বেড়াত একইভাবে। বিংশ শতব্দীতে যদি বইয়ের বিকিকিনি দোকানকেন্দ্রি হয়, একবিংশ শতাব্দী হয়ে উঠেছে অনলাইনকেন্দ্রিক; গ্রাহকের ঘরের দরজায় বই পৌঁছে দেয় অনলাইন শপগুলির ডেলিভারি ম্যান, ২০০ বছর আগে ঠিক এই কাজটিই করতেন ফেরিওয়ালারা। বাঁশের ঝুড়িতে বই বোঝায় করে, হেঁকে হেঁকে বই ফেরি করে বেড়াতেন।
কখনো-কখনো জিরিয়ে নেওয়ার জন্য একটু ছায়াতলে থমকে দাঁড়ান ফেরিওয়ালা, তখন চারপাশে লোক জুটে যায়, গোল হয়ে ঘিরে ধরে ফেরিওয়ালাকে। তখন বইয়ের প্রকাশকের প্রচারের স্বার্থে আর নিজের বিক্রিবাট্টা বাড়াতে কাহিনির চুম্বক অংশ কখনো গল্পের ছলে, কখনো পুঁথিপাঠের মতো করে গেয়ে শোনান ফেরিওয়ালা। তাঁকে ঘিরে লোক বাড়ে, লোকে বই নেড়ে-চেড়ে দেখে, পছন্দ হলে হলে কেনে। সে যুগে এই ফেরিওয়ালারাই ছিল বটতলার বইয়ের শোরুম, প্রচারক এবং বড় বিজ্ঞাপনও বটে। এসব বিজ্ঞাপনের যে জোর ছিল, বইয়ের কাটতি দেখেই বোঝা যায়। প্রকাশকেরা নাকি মাসে ৫০০ টাকা আয় করতেন। আর ফেরিওয়ালাদের আয় ২০০ টাকার মতো। ২০০ বছর আগে যখন একজন লেখাপড়া জানা চাকুরে মাসে ৫০ টাকা মাইনে পেলে বর্তে যান, সেখানে একজন প্রকাশকের ৫০০ টাকা আয় কিংবা ফেরিওয়ালার ২০০ টাকার অংকটা মোটাসোটা না বলে উপায় আছে?
ফেরিওয়ালাদের প্রসঙ্গে শ্রীপান্থ রেভারেন্ড লঙের উদ্ধৃতি সহকারে বলেছেন, ‘শুধু কলকাতা আর কাছাকাছি এলাকায় বটতলার ফেরিওয়ালারা বই নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন গ্রামে-গঞ্জে। হাটে-বাজারে, মেলায় পশরা সাজিয়ে বসতেন তাঁরা। এভাবে বছরে ৮ থেকে ৯ মাস সরস্বতীর সেবা করে যে যাঁর গ্রামে ফিরে চাষবাসের দিকে নজর দিতেন। লঙ বলেছেন, ‘এরা বাংলা বইয়ের সেরা বিজ্ঞাপন। পাঠকেরা জীবন্ত একজন প্রতিনিধিকে দেখতে পান, এমন একজন যিনি বইটি দেখাতে পারেন। বটতলা অতএব শুধু বই প্রকাশ নয়, প্রচারেও সমান উৎসাহী।’
বিজ্ঞাপনের আরও এক কার্যকর পদ্ধতি ছিল- হ্যান্ডবিল ছেপে বিলি করতেন লেখক-প্রকাশকেরা। বইয়ের আখ্যানপত্রে, কিংবা পেছনের পাতায় কিংবা পঞ্জিকাতে যে ভাষাতে, যে ঢঙে ছাপানো হতো বিজ্ঞাপন, একই ছিরি-ছাঁদে হ্যান্ডবিলের বিজ্ঞাপন বিলি হতো। সুকুমার সেন বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস বইয়ের মাধ্যমে জানিয়েছেন, ‘এক ব্যক্তি আসিয়া তাঁহাদের হাতে কতকগুলো রাঙা ছাপানো কাগজ দিয়া যায়। তাঁহারা পাঠ করিয়া দেখেন—নূতন পুস্তক, নূতন পুস্তক, সংসার-সহচরী মূল্য ৩ টাকা, পৌষ মাস মধ্যে লইলে তৎসহ উপহার দেওয়া যাইবে।’
বিজ্ঞাপনের আরেকটা জনপ্রিয় ধারা ছিল বন্ধুর প্রতি ভালোবাসা। লেখকদের মধ্যে সদ্ভাব ছিল বেশ, ঢাকার চকবাজারের কেতাবপট্টি থেকে যেসব বই বের হতো, সে বইয়ের বেশকিছুতে দেখা যায় এক লেখক আরেক লেখকের বন্দনা করছেন। সরসরি বইয়ের বিজ্ঞাপন হয়তো এ নয়, কিন্ত লেখককে বিজ্ঞাপিত করার মধ্যে তাঁর বইয়ের কাটতি বাড়িয়ে দেওয়ার এক অনন্য কৌশল। চকবাজারের কেতাবপট্টি নামের বইটিতে মোহাম্মদ আবদুল কায়উম, জনৈক কবি শেখ ঘিনুর বন্ধুপ্রীতির উদাহরণ দিয়েছেন এই বলে :
‘আর এক দোস্ত মুন্সি জহিরুদ্দিন নামেতে।
কি কব তারিফ তার রচনার বাতে।।
শুনিলে রচনা তার দেলে হয় খোস।
যত শুনি তত খুশি বাড়ে খোস জোশ।।’
তবে বই-ই সবসময় বিজ্ঞাপনের পণ্য হতো তা নয়, কখনো কখনো বই হয়ে ওঠে অন্য পণ্যের বিজ্ঞাপনের মাধ্যম। ব্রিটিশ সরকার রীতিমতো অশ্লীলতা বিরোধী আইন পাস করে বটতালার সাহিত্যের নিজস্ব ঢঙে যখন সেন্সরের কাঁচি চালাতে চাইছে, বঙ্কিমের মতো কুলীন লেখকরা তাতে সাই দিচ্ছেন, বিদ্যাসাগরেরা যখন সরকারের এই নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াচ্ছেন, তখন স্বদেশি ভাবধারার কিছু শীল্পোদ্যোক্তা এগিয়ে আসেন বটতলার লেখক-প্রকাশকদের পাশে। কুন্তুলীন কেশ তেল এদের মধ্যে অগ্রগণ্য। বটতলায় লেখকদের উৎসাহিত করতে তারা চালু করে সাহিত্য পুরস্কার। তবে শুধু লেখার মান যাচাই করে এই পুরস্কার দেওয়া হতো না। শর্ত ছিল, যিনি যত ভালোভাবে কুন্তুলীন কেশ তেলকে ঢুকিয়ে দিতে পারবেন কাহিনির ভেতর, তিনিই পাবেন এই পুরস্কার।
বিখ্যাত সাহিত্য গবেষক সুকুমার সেন তাঁর ক্রাইম কাহিনির কালক্রান্তি বইয়ে জানাচ্ছেন, ‘১৩০৩ সালের কথা। তখন স্বদেশি হাওয়া দেশে সবে বইতে শুরু করেছে। স্বদেশি কেশতৈল কুন্তলীন ও এসেন্স প্রস্তুতকারক ও বিক্রেতা হেমেন্দ্রমোহন বসু এই পুরস্কারটি প্রবর্তন করেছিলেন দুটি উদ্দেশ্যে। এক, নবীন গল্প লেখকদের সাহিত্য সৃষ্টিতে উৎসাহ দেওয়া আর দুই, স্বদেশি দ্রব্যকে শিক্ষিত সমাজে বিজ্ঞাপিত করা। বছর বছর কয়েকটি পুরস্কার দেওয়া হত শ্রেষ্ঠ গল্প লেখকদের, যাঁরা তাদের গল্পের মধ্যে সুকৌশলে কুন্তলীন তৈল ও দেলখোস এসেন্সের নাম ঢুকিয়ে দিতে পারবেন।’
মুখের কথা একলা হয়ে গলির কোণে পড়ে থাকে বলেই বিজ্ঞাপনের দরকার হয়। বইয়ের ক্ষেত্রে সেটা আরও বেশি। সমাজের বইবিমুখ শিক্ষিত অংশটিকে বিনোদনের জন্যও যদি বই পড়ানোরে চেষ্টা করা যায়, তো ক্ষতি কী? আর সেটা চটকদার বিজ্ঞাপনের মাধ্যমেই কেবল সম্ভব। এ কথা বুঝেছিলেন বলেই দুই শতাব্দী আগের কলকাতার বটতলা কিংবা ঢাকার চকবাজারকেন্দ্রিক প্রকশকেরা বইয়ের মুখোশ বিজ্ঞাপনে ঝোলানোর সেকেলে পদ্ধতি আবিষ্কার করে নিয়েছিলেন।

বিজ্ঞাপনে মুখ ঢেকে যায় বলে বিব্রত হয়েছিলেন শঙ্খ ঘোষ। বিজ্ঞাপনে বিব্রতকর পরিস্থতি তৈরি হয় বটে, কিন্তু কখনো কখনো স্বপ্নালু আবেশও তৈরি করতে পারে পড়ুয়াদের মনে, সেটা যদি হয় বইয়ের বিজ্ঞাপন। কনকনে শীতের বুড়ি সদ্য যখন বিদায় নেয়, আড়মোড়া ভেঙে যখন গাছেরা জাগে, শিমুল-পলাশের ডালে ডালে আগুনের আভা দেখা দেয়, ভ্রমরের গুঞ্জরন বসন্ত বাতাসে ভাসে, বাংলা একাডেমি কিংবা সোহরাওয়ার্দি উদ্যানের ঘাসগুলো ঢেকে যায় পাঠকের পদধূলিতে, জাতীয় দৈনিকের মুখ তখন আক্ষরিক অর্থেই ঢেকে যায় বইয়ের বিজ্ঞাপনে।
অনলাইনের এই যুগে বইয়ের বিজ্ঞাপনের বড় মাধ্যম উঠেছে ফেসবুক আর ইউটিউব। কিন্ত আজ থেকে ২০০ বছর আগে, হুগলির শ্রীরামপুরের মিশনারির বাইরে, কলকাতার কলুটোলা কিংবা শোভাবাজারের বটতলাকে ঘিরে আমজনতার মনের খোরাক মেটাতে যে বইয়ের দুনিয়া গড়ে ওঠে, বঙ্কিমচন্দ্র যেগুলোকে ‘রুচিহীন’, ‘অশ্লীল’ বলে ভর্ৎসনা করেছেন, বিদ্যাসাগর আবার সেই বইগুলোকেই ‘ভারতীয় সাংস্কৃতির চিরকালীন উপাদান’ বলে বঙ্কিমের বিরোধিতায় বিকল্প সুর চড়িয়েছেন, বটতলাকেন্দ্রিক সেই হাটুরে সস্তা বইয়ের জন্যও বিজ্ঞাপনের দরকার পড়েছিল।
আর সেই বিজ্ঞাপন প্রচারের মাধ্যম হিসেবে সত্যিকার্থে কোনো মিডিয়ার আবির্ভাব হয়নি, সমাচার দর্পণ-এর মতো সদ্যজাত কিছু পত্রিকা ছিল, কিংবা সাময়িকী— সেগুলোতেও বইয়ের বিজ্ঞাপন দেওয়া হতো, তবে সে সংখ্য নগণ্য। কইয়ের তেলে কই ভাজতেই প্রকাশকদের ভরসা ছিল ষোলআনা। অর্থাৎ একই মলাটের ভেতরেই থাকতে আরেক বইয়ের বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপনের লক্ষ্য যখন সর্বাধিক গ্রাহকের কাছে নিজের পণ্যের কথা প্রচার করা, তাই পঞ্জিকাই ছিল এক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপনী মাধ্যম। আদিরসাত্মক, হিতোপদেশ, ধর্মকাহিনির বইয়ের চেয়েও পঞ্জিকার কাটতি ছিল বেশি। হাটে, ঘাটে, পথে-প্রান্তরে, নিভৃত পল্লিতেও পৌঁছে যেত বটতলায় প্রকাশিত পঞ্জিকা। তাই রসিয়ে রঙচঙ মাখিয়ে তথাকথিত সস্তা ভাষাতেই পঞ্জিকার পেছনের পাতায় প্রচারিত হত প্রকাশকদের চোখে ‘জমজমাট’ বিজ্ঞাপন।
বিখ্যাত গবেষক, নন ফিকশন লেখক শ্রীপান্থ তার বটতলা নামের বইটিতে লিখেছেন, ‘বটতলার প্রকাশিত পঞ্জিকার আরও একটি বৈশিষ্ট্য আমাদের নজরে পড়ে। সেটি হচ্ছে বইয়ের বিজ্ঞাপন। নতুন বাংলা বইয়ের সংবাদ সমাচার দর্পণের কাল থেকে কিছু কিছু কাগজে ছাপা হতো। কোনও কোনও সাময়িকপত্রে বইয়ের বিজ্ঞাপনও দেখা যায়। যেমন ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের এডুকেশন গেজেট। কিন্তু পঞ্জিকার বইয়ের বিজ্ঞাপনের সঙ্গে এসবের তুলনাই চলে না। বটতলার প্রকাশকেরা পাতার পর পাতাজুড়ে প্রকাশ করতেন নিজেদের বইয়ের বিজ্ঞাপন। কখনও কখনও সচিত্র বিজ্ঞাপন পর্যন্ত।’
বিজ্ঞাপন ছাপা হতো পাঠকরের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য। বিজ্ঞাপনের ভাষাটাই তাই গুরুত্বপূর্ণ, ভাষা চটকদার বা আকর্ষণীয় করতে যতরকম চেষ্টা, তার সবই করতেন লেখক-প্রকাশকেরা। চলতি গদ্যের পাশাপাশি হাটুরে পদ্য কিংবা পুঁথির ভাষাতেও লেখা হতো বিজ্ঞাপন। গঙ্গাভক্তি তরঙ্গিনী বইয়ের নামপত্রে লেখা বিজ্ঞাপনের ভাষা ছিল এমন : ‘চিৎপুর রোড আছে সর্বলোকে জানে। দুই শত ছয়চল্লিশ নম্বর ভবনে ॥ /তার সঙ্গে বিদ্যারত্ন যন্ত্র পরিষ্কার। গোলাম তিতুর যার পেশী জমাদ্দার ॥ /সেই প্রেশে এই পুঁথি সংশোধন দ্বারে। মুদ্রাঙ্কিত হৈল পুনঃ উত্তম অক্ষরে ॥ /আবশ্যক হবে যার আসিবে হেথায় । লয়ে যাবে ভক্তিভাবে মজিবে মজা।’
বিজ্ঞাপনে বইয়ের ছবি বা প্রচ্ছদপট ছাপার চল কিছুদিন পরে শুরু হয়েছে। শুধু বিজ্ঞাপন কেন, খোদ বইয়ের প্রচ্ছদেও কিংবা ভেতরে ছবি ব্যবহারের চল শুরু হতে কয়েকবছর লেগে গেছে। বইয়ের নিজের মুখই হারিয়ে যেত বিজ্ঞাপনের আড়ালে। দুর্গেশন্দিনী কিংবা পদ্মা নদীর মাঝি উপন্যাসের মতো এক-দুই কিংবা তিন-চার শব্দে বইয়ের নাম দেওয়ার চল তখনই শুরু হয়েছিল বটে, তেমনি অনেক বইয়ে নামের বদলে প্রচ্ছদপটে থাকত ‘নামপত্রের’ আড়ালে বিজ্ঞাপন। পঞ্জিকায় বিজ্ঞাপনের ভাষাটা যেমন, এখানেও তাঁর ব্যতিক্রম নয়। তখনকার বেশিরভাগ জনপ্রিয় কেচ্ছাই ছাপা হতো ধারাবাহিকভাবে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এক ফর্মা এক সপ্তাহ, পক্ষে কিংবা মাসে। জনপ্রিয় কাহিনিগুলো তাই চলত কয়েকমাস বা বছর ধরে। তাই বইয়ের প্রতিটা খণ্ডের পেছনে থাকত পরবর্তী খণ্ডের বিজ্ঞাপন।
বটতলার বিজ্ঞাপনের বড় একটা মাধ্যম ছিল ফেরিওয়ালা। কলকাতা কিংবা ঢাকা, তখনো কোনো বইয়ের দোকান গড়ে ওঠেনি। ‘শুধুমাত্র কোম্পানির প্রচারের স্বার্থে’ ঢাকা শহরে অলিতে গলিতে যেমন তিন শ টাকার পণ্য এক শ টাকায় বিকোচ্ছে দেদারসে, সেকালে ফেরিওয়ালারা তেমনি তুলনামূলক কম দামে বই ফেরি করে বেড়াত একইভাবে। বিংশ শতব্দীতে যদি বইয়ের বিকিকিনি দোকানকেন্দ্রি হয়, একবিংশ শতাব্দী হয়ে উঠেছে অনলাইনকেন্দ্রিক; গ্রাহকের ঘরের দরজায় বই পৌঁছে দেয় অনলাইন শপগুলির ডেলিভারি ম্যান, ২০০ বছর আগে ঠিক এই কাজটিই করতেন ফেরিওয়ালারা। বাঁশের ঝুড়িতে বই বোঝায় করে, হেঁকে হেঁকে বই ফেরি করে বেড়াতেন।
কখনো-কখনো জিরিয়ে নেওয়ার জন্য একটু ছায়াতলে থমকে দাঁড়ান ফেরিওয়ালা, তখন চারপাশে লোক জুটে যায়, গোল হয়ে ঘিরে ধরে ফেরিওয়ালাকে। তখন বইয়ের প্রকাশকের প্রচারের স্বার্থে আর নিজের বিক্রিবাট্টা বাড়াতে কাহিনির চুম্বক অংশ কখনো গল্পের ছলে, কখনো পুঁথিপাঠের মতো করে গেয়ে শোনান ফেরিওয়ালা। তাঁকে ঘিরে লোক বাড়ে, লোকে বই নেড়ে-চেড়ে দেখে, পছন্দ হলে হলে কেনে। সে যুগে এই ফেরিওয়ালারাই ছিল বটতলার বইয়ের শোরুম, প্রচারক এবং বড় বিজ্ঞাপনও বটে। এসব বিজ্ঞাপনের যে জোর ছিল, বইয়ের কাটতি দেখেই বোঝা যায়। প্রকাশকেরা নাকি মাসে ৫০০ টাকা আয় করতেন। আর ফেরিওয়ালাদের আয় ২০০ টাকার মতো। ২০০ বছর আগে যখন একজন লেখাপড়া জানা চাকুরে মাসে ৫০ টাকা মাইনে পেলে বর্তে যান, সেখানে একজন প্রকাশকের ৫০০ টাকা আয় কিংবা ফেরিওয়ালার ২০০ টাকার অংকটা মোটাসোটা না বলে উপায় আছে?
ফেরিওয়ালাদের প্রসঙ্গে শ্রীপান্থ রেভারেন্ড লঙের উদ্ধৃতি সহকারে বলেছেন, ‘শুধু কলকাতা আর কাছাকাছি এলাকায় বটতলার ফেরিওয়ালারা বই নিয়ে ঘুরে বেড়াতেন গ্রামে-গঞ্জে। হাটে-বাজারে, মেলায় পশরা সাজিয়ে বসতেন তাঁরা। এভাবে বছরে ৮ থেকে ৯ মাস সরস্বতীর সেবা করে যে যাঁর গ্রামে ফিরে চাষবাসের দিকে নজর দিতেন। লঙ বলেছেন, ‘এরা বাংলা বইয়ের সেরা বিজ্ঞাপন। পাঠকেরা জীবন্ত একজন প্রতিনিধিকে দেখতে পান, এমন একজন যিনি বইটি দেখাতে পারেন। বটতলা অতএব শুধু বই প্রকাশ নয়, প্রচারেও সমান উৎসাহী।’
বিজ্ঞাপনের আরও এক কার্যকর পদ্ধতি ছিল- হ্যান্ডবিল ছেপে বিলি করতেন লেখক-প্রকাশকেরা। বইয়ের আখ্যানপত্রে, কিংবা পেছনের পাতায় কিংবা পঞ্জিকাতে যে ভাষাতে, যে ঢঙে ছাপানো হতো বিজ্ঞাপন, একই ছিরি-ছাঁদে হ্যান্ডবিলের বিজ্ঞাপন বিলি হতো। সুকুমার সেন বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস বইয়ের মাধ্যমে জানিয়েছেন, ‘এক ব্যক্তি আসিয়া তাঁহাদের হাতে কতকগুলো রাঙা ছাপানো কাগজ দিয়া যায়। তাঁহারা পাঠ করিয়া দেখেন—নূতন পুস্তক, নূতন পুস্তক, সংসার-সহচরী মূল্য ৩ টাকা, পৌষ মাস মধ্যে লইলে তৎসহ উপহার দেওয়া যাইবে।’
বিজ্ঞাপনের আরেকটা জনপ্রিয় ধারা ছিল বন্ধুর প্রতি ভালোবাসা। লেখকদের মধ্যে সদ্ভাব ছিল বেশ, ঢাকার চকবাজারের কেতাবপট্টি থেকে যেসব বই বের হতো, সে বইয়ের বেশকিছুতে দেখা যায় এক লেখক আরেক লেখকের বন্দনা করছেন। সরসরি বইয়ের বিজ্ঞাপন হয়তো এ নয়, কিন্ত লেখককে বিজ্ঞাপিত করার মধ্যে তাঁর বইয়ের কাটতি বাড়িয়ে দেওয়ার এক অনন্য কৌশল। চকবাজারের কেতাবপট্টি নামের বইটিতে মোহাম্মদ আবদুল কায়উম, জনৈক কবি শেখ ঘিনুর বন্ধুপ্রীতির উদাহরণ দিয়েছেন এই বলে :
‘আর এক দোস্ত মুন্সি জহিরুদ্দিন নামেতে।
কি কব তারিফ তার রচনার বাতে।।
শুনিলে রচনা তার দেলে হয় খোস।
যত শুনি তত খুশি বাড়ে খোস জোশ।।’
তবে বই-ই সবসময় বিজ্ঞাপনের পণ্য হতো তা নয়, কখনো কখনো বই হয়ে ওঠে অন্য পণ্যের বিজ্ঞাপনের মাধ্যম। ব্রিটিশ সরকার রীতিমতো অশ্লীলতা বিরোধী আইন পাস করে বটতালার সাহিত্যের নিজস্ব ঢঙে যখন সেন্সরের কাঁচি চালাতে চাইছে, বঙ্কিমের মতো কুলীন লেখকরা তাতে সাই দিচ্ছেন, বিদ্যাসাগরেরা যখন সরকারের এই নীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াচ্ছেন, তখন স্বদেশি ভাবধারার কিছু শীল্পোদ্যোক্তা এগিয়ে আসেন বটতলার লেখক-প্রকাশকদের পাশে। কুন্তুলীন কেশ তেল এদের মধ্যে অগ্রগণ্য। বটতলায় লেখকদের উৎসাহিত করতে তারা চালু করে সাহিত্য পুরস্কার। তবে শুধু লেখার মান যাচাই করে এই পুরস্কার দেওয়া হতো না। শর্ত ছিল, যিনি যত ভালোভাবে কুন্তুলীন কেশ তেলকে ঢুকিয়ে দিতে পারবেন কাহিনির ভেতর, তিনিই পাবেন এই পুরস্কার।
বিখ্যাত সাহিত্য গবেষক সুকুমার সেন তাঁর ক্রাইম কাহিনির কালক্রান্তি বইয়ে জানাচ্ছেন, ‘১৩০৩ সালের কথা। তখন স্বদেশি হাওয়া দেশে সবে বইতে শুরু করেছে। স্বদেশি কেশতৈল কুন্তলীন ও এসেন্স প্রস্তুতকারক ও বিক্রেতা হেমেন্দ্রমোহন বসু এই পুরস্কারটি প্রবর্তন করেছিলেন দুটি উদ্দেশ্যে। এক, নবীন গল্প লেখকদের সাহিত্য সৃষ্টিতে উৎসাহ দেওয়া আর দুই, স্বদেশি দ্রব্যকে শিক্ষিত সমাজে বিজ্ঞাপিত করা। বছর বছর কয়েকটি পুরস্কার দেওয়া হত শ্রেষ্ঠ গল্প লেখকদের, যাঁরা তাদের গল্পের মধ্যে সুকৌশলে কুন্তলীন তৈল ও দেলখোস এসেন্সের নাম ঢুকিয়ে দিতে পারবেন।’
মুখের কথা একলা হয়ে গলির কোণে পড়ে থাকে বলেই বিজ্ঞাপনের দরকার হয়। বইয়ের ক্ষেত্রে সেটা আরও বেশি। সমাজের বইবিমুখ শিক্ষিত অংশটিকে বিনোদনের জন্যও যদি বই পড়ানোরে চেষ্টা করা যায়, তো ক্ষতি কী? আর সেটা চটকদার বিজ্ঞাপনের মাধ্যমেই কেবল সম্ভব। এ কথা বুঝেছিলেন বলেই দুই শতাব্দী আগের কলকাতার বটতলা কিংবা ঢাকার চকবাজারকেন্দ্রিক প্রকশকেরা বইয়ের মুখোশ বিজ্ঞাপনে ঝোলানোর সেকেলে পদ্ধতি আবিষ্কার করে নিয়েছিলেন।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান গণমাধ্যমকে জানান, আগামী সপ্তাহের মধ্যবর্তী সময়ে (১৯ থেকে ২৩ জুলাই) উজানের ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাতের কারণে দেশের উত্তরাঞ্চলের প্রধান নদীগুলোর পানি দ্রুত বাড়তে পারে। বিশেষ করে তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদের পানি বৃদ্ধি পেয়ে লাল
১৯ ঘণ্টা আগে
দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার প্রভাবে বরগুনার প্রধান তিন নদী—পায়রা, বিষখালী ও বলেশ্বরের পানি স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে প্রায় দুই থেকে তিন ফুট বৃদ্ধি পেয়েছে। পানির তোড়ে বরগুনার বড়ইতলা ও পুরকাটা ফেরিঘাটের গ্যাংওয়ে সড়ক সম্পূর্ণ তলিয়ে গেছে।
২০ ঘণ্টা আগে
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দেশের যেসব এলাকা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেসব এলাকায় সরকারের পক্ষ থেকে জরিপ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। জরিপ শেষে ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বেড়িবাঁধসহ বিভিন্ন অবকাঠামোর পুনর্বাসন এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে তারা দ্রুত
২০ ঘণ্টা আগে
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সঙ্গে জাতিসংঘে ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রতিনিধিদলের প্রধান রাষ্ট্রদূত স্তাভরস লামব্রিনিদিস এবং জি৭৭ ও চীনের চেয়ার ও জাতিসংঘে উরুগুয়ের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত লরা দুপুই লাসেরের মধ্যে বৈঠকগুলো অনুষ্ঠিত হয়।
১ দিন আগে