জীবনানন্দ সম্পর্কে শোনা কথা

প্রশান্ত মৃধা
ফাইল ছবি

প্রফুল্লচন্দ্র কলেজের একাদশ শ্রেণির ক্লাসে একদিন হঠাৎ এসেছেন ক্রীড়াশিক্ষক খোন্দকার গিয়াস উদ্দিন। গিয়াস স্যারের চেহারা নিরীহদর্শন, অথচ খেলার মাঠে যাদের উপস্থিতি তারা জানে সেখানে কী কড়া মানুষ তিনি, এমনিতে তাঁর আচরণ সব সময়ে খুবই স্নেহপ্রবণ। সেদিনের আগে শহরের অন্য কোনও দিনের বা সময়ের অনুষ্ঠানে, যেমন বিশ্বস্বাস্থ্য দিবস ইত্যাদিতে মানবশরীর শরীরচর্চা ও খেলাধুলার গুরুত্ব ইত্যাদি নিয়ে দু-একবার তাঁর কথা শোনার সুযোগ হয়েছে আমাদের কারও। সেখানে অনায়াসে পরিশ্রম বা অধ্যাবসায় নিয়ে তিনি ক্রীড়াসহ সাহিত্য-সাংস্কৃতি এমনকি রাজনৈতিক অঙ্গন থেকেও উদাহরণ দিতেন। বলতেন দারুণ গুছিয়ে ধীর ও অনুচ্চ কণ্ঠে, কথায় যুক্তি কখনও প্রসঙ্গ হারাত না। কিন্তু সেই শোনা তো কোনওভাবেই ক্লাসরুমের নয়, সাধারণ বক্তৃতা।

এখন এসেছেন ক্লাসে, নির্ধারিত শিক্ষক মহাশয় আসেননি, সেই সময়ে, হয়তো তপ্ত দুপুরে মাঠেও কোনও কাজ না থাকায়, (কারণ, বর্ষা বাদে কলেজ মাঠে ক্রিকেট লেগে থাকত, সারা বছর সকাল নটার আগে ফুটবল, বিকেলেও) গিয়াস স্যার এসেছেন একটি অনির্ধারিত ক্লাস নিতে। বিজ্ঞানের ছাত্রদের ক্লাস। একাদশ শ্রেণির চঞ্চলতা প্রতিটি ছাত্রছাত্রীর চোখেমুখে। সেটি তাঁর লক্ষ না-করার কোনও কারণ নেই। তিনি অধ্যাবসায় নিয়ে কথা বললেন। সে সবের আজ আর কিছুই মনে নেই। কিন্তু একটু বাদে শুরু করলেন একেবারেই ভিন্ন একটি প্রসঙ্গ।

একদিন এই কলেজ এসে হাজির এক সাহেব। তিনি এসে অধ্যক্ষ মহোদয়কে জানিয়েছেন, এই কলেজে এক সময়ে চাকরি করেছেন জীবনানন্দ দাশ। বেশি দিন নয়, মাত্র আড়াই-তিন মাসের মতো। এখন সাহেব সেই ১৯২৯ সালের কাগজপত্র দেখতে চান। গিয়াস স্যার কলেজের প্রবীণতম শিক্ষক, সরকারি হওয়ার আগে পরে মিলিয়ে তিরিশ বছরের বেশি এটাই তাঁর কর্মস্থল। ফলে তাঁর উপরে ভার পড়ছে কলেজের পুরনো সময়ের কাগজপত্র কিংবা সে সময়ের বিষয়ে কিছু যদি তিনি সাহেবকে জানাতে পারেন।

গিয়াসস্যার বিষয়টা ঘুরিয়ে নিয়েছেন, নিজে যে সেই কাজে অংশগ্রহণ করেছেন, তা আমাদের জানানো তাঁর উদ্দেশ্য নয়। তিনি জানিয়েছেন, এখন যতটা মনে আছে, জীবনানন্দ দাশের মতন একজন কবি, বরিশালের লোক, সেখানকার ব্রজমোহন কলেজ আর কলকাতা ও অন্যান্য জায়গায় কলেজে চাকরি করেছেন, তিনি তাঁর জীবনের খুবই অল্প সময় কাজ করেছেন এই কলেজে, ওই সাহেব গবেষক সেইটুকুও তাঁর কাজের বাইরে রাখতে চাননি, তাই খুঁজতে চলে এসেছেন এখানেও। এই হল উন্নত জাতির অধ্যবসায়। যে কাজ শুরু করবে একেবারে তার খোলনলচে-সমেত দেখে ছাড়বে। তাই তাঁরা জাতি হিসেবে এত বড়ো। এগিয়ে আছে। পৃথিবীকে শাসন করছে।

সেদিন গিয়াস স্যার তাঁর সঙ্গে স্বল্পকালীন পরিচয়ের সেই বিলেতি গবেষকের নাম বলেননি। বললেও মনে নেই কী বলেছিলেন। ঘটনাটি আজ থেকে অন্তত বছর পঁয়ত্রিশ কি তারও আগের, আমাদের বলেছিলেন তাও তো বত্রিশ-তেত্রিশ বছর হবে। অনুমান করি ভদ্রলোকের নাম ক্লিন্টন বি সিলি।

জীবনানন্দকে নিয়ে প্রামাণ্য জীবনী গ্রন্থটি তাঁর লেখা, আ পোয়েট অ্যাপার্ট, ফারুক মঈনউদ্দীনের অসাধারণ অনুবাদে অনন্য জীবনানন্দ।

তবে, আমাদের সেই বয়সে এসব কথা তো কানের পাশ দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ারই কথা। তাই গিয়েওছিল। কোথাকার কোন একজন সাহেব এসেছেন, কী পুরনো খাতাপত্তর দেখেছেন, তা জেনে আমাদের কী? তার চেয়ে স্যার যদি এই ক্লাসটা না নিতেন, তাহলে বাইরে ঘুরতে পারতাম, তাই ছিল ভালো। ক্লাস ফাঁকি দেওয়াই তখন আমাদের প্রাত্যহিক অধ্যাবসায়ের অংশ। শুধু গিয়াস স্যারের অসাধারণ বাচনিক ক্ষমতার কারণে পিছনের দরজা দিয়ে টুক করে বেরিয়ে যাওয়াও কোনওভাবেই সম্ভব হয়নি। ফলে মনোযোগ দিয়ে শোনা তাঁর এসব ‘অপ্রাসঙ্গিক’ কথার ভিতরে মনে থেকে গেল, জীবনানন্দ, এই কলেজে তাঁর চাকরি, একজন সাহেবের সে সব খুঁজতে আসা ইত্যাদি।

তাহলে, শহর থেকে কলেজে আসার মুখে, এই যে পাতলা আরসিসির রেলিংছাড়া পোল, আমাদের ছোটোবেলায় এখানে তা কাঠের ছিল, সেই পোলের উপরে দাঁড়িয়ে, বয়ে আসা খালের জলের দিকে তাকিয়েছেন জীবনানন্দ। দক্ষিণে খালটা সরু, উত্তরে চওড়া, সেদিকে যতদূর চোখ যায় ধান খেত, নিশ্চয়ই তিনি এইখানে দাঁড়িয়ে দেখেছেন সে সব। পরে জেনেছি, জীবনানন্দের পদটি ছিল লিভভ্যাকেন্সি আর বাগেরহাট তাঁর ভালো লাগেনি। এমন কালটে সবুজ গ্রাম্যশহর ভূভারতে দ্বিতীয়টি নেই, তাও ভালো লাগেনি? নিশ্চয়ই এই কলেজ স্টেশন থেকে খুলনার উদ্দেশ্যে ট্রেন ধরে, রূপসা স্টেশনে নেমে, তারপর প্রমত্ত রূপসা পাড়ি দিয়ে, খুলনা থেকে কলকাতার ট্রেন তিনি ধরছেন, কেননা কাছাকাছি সময়েই তো তাঁর লেখা, ‘রূপ্সার ঘোলা জলে হয়তো কিশোর এক শাদা ছেঁড়া পালে ডিঙা বায়’। রূপসার জল সত্যি ভীষণ ঘোলা। কিন্তু বাগেরহাটের প্রফুল্লচন্দ্র কলেজে তিনি স্বল্পকালীন চাকরি করতে না এলে নিশ্চয় এমন পঙক্তি কখনও লেখা হত না।

‘আবার আসিব ফিরে’ শিরোনামের একটি কবিতাই জীবনানন্দের, আমাদের পাঠ্য ছিল প্রথম থেকে একাদশের ভিতরে, ক্লাস সেভেনে। আর জীবনানন্দ যখন বাগেরহাটে এসেছিলেন, তখন কলেজটির নাম বাগেরহাট কলেজ, দ্বাদশ বর্ষীয় প্রতিষ্ঠানটি অর্থনৈতিকভাবে ধুঁকছে। তখন প্রতিষ্ঠাকালীন কর্তব্যক্তিরা শরণাপন্ন হন এই জেলা (খুলনা) তথা সারা ভারতের কৃতিসন্তান আচার্য (স্যার) প্রফুল্ল চন্দ্রের, বিশ্ববিশ্রুত এই রসায়নবিদ তাদের ফেরাননি, সাহায্য করেন, কর্তকর্তারা ফিরে এসে কলেজটি তাঁর নামে নামকরণ করেন। হতে পারে কলেজটির সেই নাজুক অবস্থায় এখানে কাজের সূত্রে এসেছিলেন জীবনানন্দ।

গিয়াস স্যারের মুখে সেই কথা শোনার বেশ পরে, আমরা একে-ওকে জিজ্ঞাসা করেছি, যখন জীবনানন্দ দাশ ছিলেন এই কলেজের শিক্ষক তখনকার কোনও ছাত্র বেঁচে আছেন কি? থাকলেও সে সময়ে তার বয়েস হবে আশির এপাশে ওপাশে। বলতে গেলে পাওয়া যায়নি। শুধু এক বড়োভাই বলেছিলেন, বেশ আগে তাকে পরিচিত এক প্রবীণ বলেছিলেন, একজন ইংরেজি স্যার এসেছিলেন, বাড়ি বরিশালে, বেশিদিন থাকেননি। তিনি যে পরবর্তীকালের বিখ্যাত কবি, সে কথা নিশ্চিত সেই সময়ের কোনও ছাত্রর নিশ্চয়ই জানা বা বোঝার কথা নয়। শুধু আমরা কয়েকজন ওই কথা শুনে পরস্পরের কাছে জানতে চেয়েছিলেন, আচ্ছা, সেই কাঠের পোলে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি?

দ্বিতীয় জানাটি এর একটু আগের। আমাদের পাড়ার মাথায় থাকতেন এক নিঃসন্তান দম্পত্তি। একটি বড়োসড়ো বাড়ির ভিতরে দু-কামরার টিনের ঘরে। ভীষণ পরিচ্ছন্ন জীবনযাপন তাঁদের। পাড়ায় বন্ধুজন প্রায় কেউ নেই। ভদ্রলোক স্থানীয় একটি স্কুলে ইংরেজি পড়ান, বেশ প্রবীণ বয়সেও। পরিষ্কার ধুতিপাঞ্জাবি পরনে তার। পোশাকে বিশ শতকের প্রথম দিকের বাঙালি হিন্দু ভদ্রলোকদের প্রতিনিধি। প্রফুল্লচন্দ্র কলেজের চল্লিশের দশকের গোড়ার দিককার ছাত্র তিনি। ফলে, ইংরেজিজ্ঞান সেকালের ভালো ছাত্রদের মতন। তাঁর কাছে কিছুদিন ইংরেজি পড়তে গিয়েছি। ইস্কুলের শেষ দিক তখন। অজ্ঞাত কারণে ভদ্রলোক আমাকে পছন্দ করতেন, তাঁর স্ত্রীও। অনেকটা নাতিসুলভ আচরণ ছিল তাঁদের আমার প্রতি। ভদ্রলোকের স্ত্রী একদিন হঠাৎ কথাপ্রসঙ্গে বলেছিলেন, লাবণ্যদি। তখনও জীবনানন্দ দাশকে চিনলেও লাবণ্য দাশ যে তাঁর স্ত্রী তা জানতাম না। তিনি তাঁর স্বামীকে কথাটা বলেছিলেন।

তাঁদের সেই কথা ছিল ভদ্রমহিলার বাবার বাড়ির দিককার কোনও প্রসঙ্গ। কিন্তু সে কথাটা আমি বুঝতে পারছি না, কিন্তু তাঁর ওই লাবণ্যদি কথাটায় তাঁর দিকে তাকাতেই তিনি জানিয়েছিলেন, লাবণ্যদি জীবনানন্দ দাশের স্ত্রী। জীবনানন্দ দাশকে ‘আবার আসিব ফিরে’ কবিতাটার সুবাদে চিনি। অথবা, পরিচিত বড়োভাই যখন বলেন, ‘সুরঞ্জনা, ওইখানে যেয়ো নাকো তুমি’ কিংবা ‘তোমার হৃদয় আজ ঘাস’, তখন এমন অদ্ভুত লাইন শুনে পরস্পরের মুখে তাকিয়ে জানতে পারি এটাও জীবনানন্দের লেখা। তখনও ‘আট বছর আগের একদিন’ পড়িনি, যদিও শহরের লাশকাটা ঘরটা চিনি; এমনকি পড়িনি কায়েস আহমেদের গল্পগ্রন্থ লাশকাটা ঘরও।

এরপরে ভদ্রমহিলা বললেন, লাবণ্য দাশের কাছে তাঁরা যেতেন। আড্ডা দিতেন। তখন দেখতেন জীবনানন্দকে। ভীষণ চুপচাপ। একা একা থাকতেন। কখনও তাঁদের সামনে দিয়ে হেঁটে যেতেন। এইটুকু। তিনি জানিয়েছেন, তখনও তাঁরা কেউ জানেন না যে মাস্টারমশাই এত বড়ো কবি। শুধু দেখতেন একজন নীরব মানুষকে।

ভদ্রমহিলা বলেছিলেন, তখন তাঁরা ইস্কুলের উপরের ক্লাসে পড়েন। দেশভাগের ক বছর আগে। তখনও জানি না যে এমন অনেক তরুণীর সঙ্গে লাবণ্য দাশের যোগাযোগের কারণে একবার পুলিশ এসেছিল বরিশালের বাড়িতে। কর্মকর্তা বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে জীবনানন্দের কিছু বইপত্র দেখে, কার বই সেটা জানতে চেয়েছিলেন, তারপর চলে গিয়েছিলেন।

এরও অনেকদিন পরে, যখন মনে হয়েছিল এই কথাগুলো আবারও শুনতে পারলে হত, বিশ্ববিদ্যালয়ে বন্ধুবৃত্তের আড্ডায় এক আধবার মনে এসেছে সে কথা। বন্ধুরা বলেছে, শহরে গেলে যেন তাঁর কাছে যাই আবার।

কিন্তু তাও আর যাওয়া হয়নি। আর ততদিন তারাও আর বেঁচে নেই। ভদ্রমহিলার বলা সেই লাবণ্যদি আর মাস্টারমশাই শব্দ দুটো মনে আছে।

[জীবনানন্দ দাশের জন্মদিনে কথাপ্রকাশ থেকে প্রকাশিতব্য ‘দড়াটানা ঘাট: সাহিত্যের ইশারা কিংবা হাতছানি’ থেকে একটি লেখা। লেখকের ফেসবুক থেকে নেয়া]

ad
ad

খবরাখবর থেকে আরও পড়ুন

বন্যাদুর্গতদের সহায়তায় সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ অব্যাহত: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দেশের যেসব এলাকা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেসব এলাকায় সরকারের পক্ষ থেকে জরিপ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। জরিপ শেষে ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বেড়িবাঁধসহ বিভিন্ন অবকাঠামোর পুনর্বাসন এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে, যাতে তারা দ্রুত

১৩ ঘণ্টা আগে

এলডিসি উত্তরণে বাংলাদেশকে ইইউ ও জি৭৭-এর সমর্থন

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সঙ্গে জাতিসংঘে ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রতিনিধিদলের প্রধান রাষ্ট্রদূত স্তাভরস লামব্রিনিদিস এবং জি৭৭ ও চীনের চেয়ার ও জাতিসংঘে উরুগুয়ের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত লরা দুপুই লাসেরের মধ্যে বৈঠকগুলো অনুষ্ঠিত হয়।

১৫ ঘণ্টা আগে

প্রাথমিক শিক্ষায় গবেষণা প্রস্তাব আহ্বান, প্রতিটিতে বরাদ্দ ২ লাখ টাকা

প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ক্ষুদ্র গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা একাডেমি (নেপ)। এ লক্ষ্যে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কাছ থেকে গবেষণা প্রস্তাব আহ্বান করা হয়েছে।

১৭ ঘণ্টা আগে

সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়ির খরচ কমছে না

এর ফলে উপসচিব থেকে সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের খরচ আগের মতো ৫০ হাজার টাকাই থাকছে। বেসামরিক প্রশাসনের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বিচার বিভাগ, নির্বাচন কমিশন ও সশস্ত্র বাহিনীর প্রাধিকারভুক্ত কর্মকর্তারাও গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের এ খরচ পেয়ে থাকেন। তাদের জন্যও এ খরচ কমানোর উদ্যোগ নিয়েও তা থেক

১৭ ঘণ্টা আগে