যেভাবে লেখা হয়েছিল পথের পাঁচালী উপন্যাস

শাহরিয়ার শরীফ
সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালী চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্য নিয়ে তৈরি পথের পাঁচালী উপন্যাসের এই প্রচ্ছদ। ছবি : সংগৃহীত

বিহারের ভাগলপুরের বাঙালিপাড়ায় এক বাঙালি পরিবার বাস করে। মস্ত বাড়ি। সাহিত্যের তীর্থভূমি, বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মামার বাড়ি। শরতের ছেলেবেলার একটা বড় সময় সেখানেই কেটেছে। সেই বাড়িতে বাস করেন পেশায় আইনজীবী উপেন্দ্রনাথ গাঙ্গুলি। শরৎচন্দ্রের মামা। উপেন্দ্রনাথকে শুধু উকিল বললে কম বলা হয়। তিনি তখন সাহিত্যের সাধক। কলকাতার বিখ্যাত সব পত্রিকায় তাঁর লেখা বেরোচ্ছে।

এহেন সাহিত্যমনা মানুষটি বিহারে গিয়েও সাহিত্য থেকে দূরে থাকতে পারেনি। তাঁর বাড়িতেই তৈরি হয় সাহিত্যবলয়। নিয়মিত বসান সাহিত্যের আসর। বাঙালিপাড়ার যেসব লোক বাংলা সাহিত্যের অনুরাগী, তাঁরা রোজই সন্ধ্যায় জড়ো হন উপেন্দ্রনাথের বাড়িতে। এসব লোকের জন্য চেয়ার সাজানোই থাকে বৈঠকখানায়। বাংলা সাহিত্যের অতীত-বর্তমান নিয়ে আলোচনা চলে, সাহিত্য পত্রিকাগুলোতে কী বেরোচ্ছে, সেসব নিয়ে চলে চুলচেরা বিশ্লেষণ।

আসরের সবাই একেকজন পণ্ডিত। তাঁদের মধ্যেই একজন অচেনা যুবক এসে গুটিসুটি মেরে বসে থাকেন, আসরের একেবারে পেছনের সারিতে। হাঁটুসমান উঁচু ধুতি, কোঁচকানো-তালিমারা পাঞ্জাবি পরে লাঠি হাতে কোথা থেকে আসেন যুবকটি, সে নিয়ে কারও মাথাব্যথা নেই। এভাবেই মাস ছয়েক কেটে গেল।

কালবৈশাখের এক সন্ধ্যা। প্রবল বিক্রমে ঝড় আসে, সঙ্গে তুমুল বৃষ্টি। উপেন্দ্রনাথ ভাবলেন, এই ঝড়বৃষ্টিতে ভিজে আজ আর কি কেউ আসবে? কিন্তু জানালা দিয়ে দূরের ওই পথ ধরে একটা আলো এগিয়ে আসছে। সঙ্গে ছাতা মাথায় এক ছায়ামূর্তি। উপেন্দ্রনাথ অবাক। পথের দিকে অপলকে চেয়ে থাকেন। ধীরে ধীরে হারিকেনের আলো আর ছায়ামূর্তিটা এগিয়ে আসে। তারপর একসময় পৌঁছে যায় সভাকক্ষে।

‘আসুন, আসুন’ বলে তাঁকে অভ্যর্থনা জানান উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়। যুবকটি কাঁচুমাচু ভঙ্গিতে পেছনের সারিতে গিয়ে বসেন। উপেন্দ্রনাথ বলেন, ‘পেছনে কেন, সামনে এসে বসুন।’ ‘আজ্ঞে, এখানে সব মশাইরা বসবেন। আমি কী করে বসি, বলুন?’

‘উনারা কি আজ আর আসবেন? আপনি সামনে বসুন। আপনাকে রোজই দেখি সভায় এসে পেছনে চুপটি করে বসে থাকেন। কিন্তু কোনো কথা-টথা বলেন না। তা, মশাইয়ের নামটা কী? থাকেন কোথায়?’

‘আজ্ঞে, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়। সেরেত ঘোষালের জমিদারি দেখাশোনা করি।’

‘বলেন কী মশাই! সেরেত ঘোষালের জমিদারি, সে তো পাঁচ-ছয় মাইল দূরের পথ। তার ওপর পথে বাঘ, সাপখোপের ভয় আছে!’

‘এটা আছে না!’ হাতের লাঠিখানা দেখিয়ে বলেন বিভূতিভূষণ। উপেন্দ্রনাথের চোখে বিস্ময়!

‘এত আগ্রহ নিয়ে রোজই যখন সভায় আসেন, তখন নিশ্চয়ই লেখালেখির বাতিক আছে?’

বিভূতিভূষণ ভীরু কণ্ঠে জবাব দেন, ‘একটা উপন্যাস লিখছি।’

উপেন্দ্রনাথ একটু বিদ্রূপের সুরে বললেন, ‘কোনো কবিতা নয়, একেবারে উপন্যাস! তা অঙ্ক–টঙ্ক মিলিয়ে লিখেছেন তো।’

বিভূতিভূষণ তো অবাক। উপন্যাসের আবার অঙ্ক-নিয়ম এসব আছে নাকি? উপেন্দ্রনাথ উপন্যাসের অঙ্ক-নিয়ম এসব বুঝিয়ে দিলেন এবং বললেন পরদিন সেটা যেন নিয়ে আসেন।

পরদিন বিভূতিভূষণ পাণ্ডুলিপিখানা নিয়ে হাজির। কাঁপা কাঁপা হাতে সেটা তুলে দেন উপেন্দ্রনাথের হাতে। উপেন্দ্রনাথ দেখলেন আসলেই এই উপন্যাসে অঙ্ক-নিয়মের কোনো বালাই নেই। তবু সেটা রেখে দিলেন। তারপর জানতে চাইলেন, উপন্যাসখানা কোনো পত্রিকায় ছাপানোর ইচ্ছে আছে কি না। বিভূতিভূষণ জানালেন, সেটা প্রবাসী পত্রিকায় পাঠিয়েছিলেন। মনোনীত হয়নি, তাই ফেরত পাঠিয়েছেন। উপেন্দ্রনাথ শুনে চুপ মেরে গেলেন। তবু নিলেন। নিলেন তো নিলেনই। দিন যায়, সপ্তাহ যায়, মাস যায়, সেটা নিয়ে টুঁ শব্দটি করেন না। বিভূতিভূষণও ভয়ে কিছু বলেন না। তাঁর ভয় হচ্ছিল, ভেবেছিলেন আসলেই বোধ হয় খুব খারাপ উপন্যাস লিখেছেন।

পাক্কা দুই মাস পরে একদিন সাহিত্য সভা শেষে উপেন্দ্রনাথ বিভূতিকে বলেন, ‘আপনি যাবেন না। বসুন, কথা আছে।’

বিভূতিভূষণ ভয়ে ভয়ে বসলেন, ভাবলেন, হতাশার কথা শোনাবেন উপেন্দ্রনাথ। তাঁকে অবাক করে দিয়ে উপেন্দ্রনাথ বলে ওঠেন, ‘আপনার হবে। হবে কী? হয়েছে।’

কিন্তু ছাপবে কে? উপেন্দ্রনাথ জানালেন, তিনি শিগগিরই কলকাতায় ফিরে যাবেন এবং একটা পত্রিকা বের করবেন। সত্যিই কিছুদিনের মধ্যে ঢাকঢোল পিটিয়ে বিচিত্রা নামের একটা পত্রিকা বের করলেন। এবং কয়েক মাস পর থেকেই বিচিত্রায় ধারাবাহিকভাবে ছাপা হলো অঙ্ক-নিয়ম মেনে না লেখা কালজয়ী উপন্যাস পথের পাঁচালী। বাঙালি পেল অপু-দুর্গার মতো দুটি কল্পচরিত্র। ‘নিশ্চিন্দপুর’ নামের একটি কল্পিত নাম হয়ে উঠল রূপকথার রাজ্য আর সাত সমুদ্র তেরো নদীর ভূমিকায় ইছামতী নদী। আর সেই উপন্যাসটিই এখন বাংলা সাহিত্যে সবচেয়ে বেশি পড়া উপন্যাসের একটি।

পথের পাঁচালী উপন্যাস তখনো বিচিত্রায় ধারাবাহিক ছাপা হচ্ছে। উপেন্দ্রনাথকে ধরে শনিবারের চিঠি নামের আরেক বিখ্যাত সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক সজনীকান্ত দাস খুঁজে বের করলেন বিভূতিভূষণকে। তাঁর হাতে ৯০টি টাকা গুঁজে দিয়ে বললেন, এই উপন্যাস তিনি বই আকারে বের করতে চান।

ad
ad

খবরাখবর থেকে আরও পড়ুন

কক্সবাজার সৈকতে হঠাৎ টর্নেডো, আতঙ্কে পর্যটকদের ছোটাছুটি

বিশ্বে সবচেয়ে বেশি টর্নেডো দেখা যায় যুক্তরাষ্ট্রে। তবে বাংলাদেশও টর্নেডোপ্রবণ দেশগুলোর একটি। বিশ্বের অন্যতম প্রাণঘাতী টর্নেডোর ঘটনাও ঘটেছে বাংলাদেশে। ১৯৮৯ সালের ২৬ এপ্রিল মানিকগঞ্জ জেলার দৌলতপুর ও সাটুরিয়া উপজেলায় এই ভয়াবহ টর্নেডো আঘাত হানে, যা ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ টর্নেডো হিসেবে স্বীকৃত।

১৬ ঘণ্টা আগে

১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করবে সরকার: জ্বালানিমন্ত্রী

তিনি বলেন, গ্রামে মাসে ৭৫ ইউনিটের বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার হয় না। এ কারণে যারা মাসে ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, তাদের জন্য বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়নি। প্রান্তিক মানুষ যাতে কষ্ট না পান, সে বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হয়েছে।

১৯ ঘণ্টা আগে

উত্তরাঞ্চলের ৭ জেলায় বন্যার শঙ্কা

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান গণমাধ্যমকে জানান, আগামী সপ্তাহের মধ্যবর্তী সময়ে (১৯ থেকে ২৩ জুলাই) উজানের ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাতের কারণে দেশের উত্তরাঞ্চলের প্রধান নদীগুলোর পানি দ্রুত বাড়তে পারে। বিশেষ করে তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদের পানি বৃদ্ধি পেয়ে লাল

২১ ঘণ্টা আগে

বঙ্গোপসাগরে সুস্পষ্ট লঘুচাপ: সমুদ্র বন্দরে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত

দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার প্রভাবে বরগুনার প্রধান তিন নদী—পায়রা, বিষখালী ও বলেশ্বরের পানি স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে প্রায় দুই থেকে তিন ফুট বৃদ্ধি পেয়েছে। পানির তোড়ে বরগুনার বড়ইতলা ও পুরকাটা ফেরিঘাটের গ্যাংওয়ে সড়ক সম্পূর্ণ তলিয়ে গেছে।

১ দিন আগে