বিজ্ঞান

কচ্ছপ কেন দীর্ঘজীবি হয়, বিজ্ঞান কী বলে?

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
চ্যাটজিপিটির চোখে একটি বয়স্ক কচ্ছপ

কচ্ছপের দীর্ঘজীবন নিয়ে বহুদিন ধরেই মানুষের আগ্রহ। কেউ কেউ ভাবেন, ওদের ধীর গতির জীবনই বুঝি এই দীর্ঘায়ুর রহস্য। কেউ বলেন, ওদের শরীরের গঠন এমনভাবে তৈরি যে ওরা সহজে অসুস্থ হয় না। তবে আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, কচ্ছপের দীর্ঘায়ুর পেছনে রয়েছে জিনগত গঠন, কোষের স্বাভাবিক কার্যকলাপ এবং বিপাক প্রক্রিয়ার ধীর গতি—এই তিনটির সম্মিলিত প্রভাব। বিজ্ঞানীরা নানা গবেষণার মাধ্যমে এখন এর পেছনের ব্যাখ্যা দিতে পারছেন আরও পরিষ্কারভাবে।

বিশ্বের অনেক প্রাচীনতম কচ্ছপের বয়স ১৫০ থেকে ২০০ বছরের মধ্যে। “জনাথন” নামে একটি জায়ান্ট কচ্ছপের বয়স ১৯০ বছরেরও বেশি বলে মনে করা হয়। এটি বর্তমানে সেন্ট হেলেনা দ্বীপে রয়েছে এবং বিশ্বের সবচেয়ে বয়সী জীব হিসেবে পরিচিত। প্রশ্ন হচ্ছে, এই অমিতায়ু জীবটির শরীরে এমন কী আছে যা আমাদের শরীরে নেই?

যুক্তরাষ্ট্রের “ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অন এজিং”–এর জীববিজ্ঞানী ড. ড্যানিয়েল প্রমিসলো বলেন, “দীর্ঘায়ু কেবল সময়ের ব্যাপার নয়, এটি শরীরের কোষ কীভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হয় বা হয় না—তা বোঝার একটি চাবিকাঠিও বটে।” তাঁর মতে, কচ্ছপের শরীরের কোষগুলো সাধারণ স্তন্যপায়ী প্রাণীর তুলনায় অনেক ধীরে বিভাজিত হয়, ফলে কোষের ক্ষয়প্রক্রিয়া অনেকটা ধীর হয় এবং বার্ধক্য অনেক দেরিতে আসে।

আরেক গবেষক, মার্কিন “ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয়”-এর জীববিজ্ঞানী ড. বেটি ডায়ামন্ড বলেন, “কচ্ছপের ইমিউন সিস্টেম অসাধারণ। ওরা যে শুধু কম অসুস্থ হয় তা-ই নয়, ওদের শরীরের কোষগুলো দীর্ঘদিন কার্যক্ষম থাকে এবং সহজে কোনো মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হয় না।” তাঁর মতে, কচ্ছপের শরীরে টিউমার দমনকারী এমন কিছু জিন সক্রিয় থাকে, যেগুলো মানুষের শরীরে অনেকটা নীরব থাকে। এসব জিন কোষে অস্বাভাবিক বিভাজন হলে সেটিকে চিহ্নিত করে ধ্বংস করতে পারে।

কচ্ছপের এই দীর্ঘজীবনের পেছনে আরেকটি বড় কারণ হলো ওদের বিপাক প্রক্রিয়ার গতি অত্যন্ত ধীর। বিজ্ঞানীরা বলেন, বিপাক বা “মেটাবলিজম” যত ধীর হয়, শরীরের কোষের উপর তত কম চাপ পড়ে। ফলে কোষের জীর্ণতা কম হয় এবং দীর্ঘদিন সুস্থ থাকে। “জার্নাল অব গ্রেটার ইভলিউশন”-এ প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, “বিপাকের ধীরতা ও দীর্ঘায়ুর মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে, আর কচ্ছপ এই দুই ক্ষেত্রেই অনন্য।”

ড. রিচার্ড ইভার্স, “ইউনিভার্সিটি অব এডিনবার্গ”-এর এক প্রাণিবিদ, কচ্ছপ নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করেছেন। তিনি বলেন, “যেসব প্রাণী ধীরে ধীরে পরিণত হয়, কম গতিতে চলে, কম খায় এবং কম বিপাক করে, তারা সাধারণত দীর্ঘজীবি হয়। কচ্ছপ এই নিখুঁত উদাহরণ। তারা ধীরে বাঁচে বলেই অনেকদিন বাঁচে।” তাঁর মতে, মানুষ যদি কচ্ছপের জীবনধারার কিছু বিষয় অনুসরণ করতো—যেমন ধীরে চলা, কম খাওয়া, মানসিক চাপ কম রাখা—তবে হয়তো আমাদের আয়ুও কিছুটা বাড়তো।

এক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা কচ্ছপের শরীর থেকে কিছু কোষ সংগ্রহ করে পরীক্ষা করেন। তাঁরা দেখেন, এসব কোষে বার্ধক্যজনিত সাধারণ প্রক্রিয়া—যেমন ডিএনএ-র ক্ষয়, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস ইত্যাদি—অন্যান্য প্রাণীর তুলনায় অনেক কম ঘটে। আর এটাই কচ্ছপকে বয়সের ছাপ থেকে অনেকখানি মুক্ত রাখে।

কচ্ছপের খোলসও দীর্ঘজীবনের আরেকটি বড় কারণ। খোলস কচ্ছপকে শুধু শারীরিক আঘাত থেকে রক্ষা করে না, বরং এটি শরীরের ভেতরে এক ধীর, রক্ষণশীল পরিবেশ বজায় রাখতে সাহায্য করে। শরীরের তাপমাত্রা, রক্তচাপ এবং অন্যান্য শারীরিক চাপের পরিবর্তন থেকে রক্ষা পায় বলেই ওরা দীর্ঘদিন সুস্থ থাকে।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, কচ্ছপের এই দীর্ঘজীবন মানুষের জন্য অনুপ্রেরণার মতো হতে পারে। আধুনিক ওষুধবিজ্ঞান এখন কচ্ছপের জিন বিশ্লেষণ করে মানুষের বার্ধক্য প্রতিরোধে কিছু পন্থা খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে। যেমন, “কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি”-র গবেষকরা কচ্ছপের শরীরে থাকা p53 নামের একধরনের টিউমার দমনকারী জিন নিয়ে গবেষণা করছেন, যেটি যদি মানুষের শরীরেও সক্রিয় করা যায়, তবে ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াই অনেকটাই সহজ হয়ে উঠবে।

তবে কচ্ছপের এই দীর্ঘজীবনের অর্থ এই নয় যে তারা কখনোই মারা যায় না বা অসুস্থ হয় না। প্রকৃতি, খাদ্যাভাব, পরিবেশ দূষণ, মানুষের হস্তক্ষেপ ইত্যাদি কারণে অনেক কচ্ছপও অল্প বয়সেই মারা যায়। কিন্তু, যদি নিরাপদ পরিবেশে রাখা যায়, তবে ওরা সত্যিই অবিশ্বাস্য সময় ধরে বাঁচে। এটা প্রমাণ করে, জীবনের গতি যত ধীর হয়, আয়ুও তত দীর্ঘ হতে পারে।

এ বিষয়ে ড. কার্লা ম্যাকিনটোশ, যিনি “সান দিয়েগো চিড়িয়াখানার” প্রাণী চিকিৎসা বিভাগে কাজ করেন, বলেন, “কচ্ছপ যেন এক জীবন্ত পাঠশালা। তারা আমাদের শেখায় ধৈর্য, স্থিরতা, এবং প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কীভাবে দীর্ঘ ও স্বাস্থ্যকর জীবন যাপন করা যায়।” তাঁর মতে, ভবিষ্যতে বার্ধক্যবিরোধী ওষুধ তৈরির ক্ষেত্রে কচ্ছপ হতে পারে এক মহামূল্যবান সূত্র।

সবশেষে বলা যায়, কচ্ছপের দীর্ঘজীবনের পেছনে কোনো একক কারণ নেই, বরং এটি অনেকগুলো বৈজ্ঞানিক এবং জৈবিক প্রক্রিয়ার সম্মিলন। জিনের গঠন, কোষীয় কর্মপ্রক্রিয়া, বিপাকের ধীর গতি, খোলসের সুরক্ষা—সব মিলিয়ে কচ্ছপ প্রকৃতির এক বিস্ময়। বিজ্ঞানীরা এখনও এই প্রাণীটির মধ্যে এমন কিছু রহস্যের খোঁজ চালিয়ে যাচ্ছেন, যেগুলোর মাধ্যমে হয়তো একদিন মানুষও পাবে দীর্ঘজীবনের সূত্র। কচ্ছপ তাই শুধু একটি প্রাণী নয়, এক জীবন্ত সম্ভাবনা, এক নিঃশব্দ জীববিজ্ঞানী।

ad
ad

খবরাখবর থেকে আরও পড়ুন

‘তেলের সংকট নেই, সেচ মৌসুমে কৃষকদের সমস্যা হবে না’

তিনি বলেন, বিশেষ করে এই অঞ্চলে যেমন পাট রয়েছে, এগুলো মাথায় রেখে আমাদের কৃষক ডিজেলের ক্ষেত্রে যেন কোনো ধরনের সমস্যায় না পড়ে এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে তারা যেন ডিজেল ও বিদ্যুৎ পায় সেক্ষেত্রে আমরা তৎপর আছি। কৃষকদের কোনো সমস্যা হবে না।

৭ ঘণ্টা আগে

চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল করল অধিদপ্তর

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রশাসন শাখা থেকে জারি করা অফিস আদেশে বলা হয়, আপৎকালীন সময়ে নিরবচ্ছিন্ন চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত এবং হামের টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

৮ ঘণ্টা আগে

যুদ্ধে অর্থনীতিতে কিছুটা চাপ বাড়ছে, তবে উন্নয়ন থেমে নেই: ত্রাণমন্ত্রী

মন্ত্রী বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার হিসেবে আমরা প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর। নির্বাচনের আঙুলের দাগ মুছে যাওয়ার আগেই ফ্যামিলি কার্ড চালু, ইমামদের ভাতা প্রদান এবং কৃষি ঋণ মওকুফের মতো গুরুত্বপূর্ণ জনকল্যাণমূলক সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন করা হয়েছে।

৯ ঘণ্টা আগে

পেট্রোল-অকটেনের উৎপাদন দেশেই, তবু সংকট কেন?

দেশের নিজস্ব গ্যাসক্ষেত্র থেকে আসা কনডেনসেট থেকে সবচেয়ে বেশি পেট্রোল ও অকটেন, কেরোসিন ও ডিজেল এবং অল্প পরিমাণ এলপিজি উৎপাদন করে হবিগঞ্জ অবস্থিত সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেডের (এসজিএফএল) ফ্র্যাকশনেশন প্ল্যান্ট ও ক্যাটালাইটিক রিফর্মিং ইউনিট বা সিআরইউ।

৯ ঘণ্টা আগে