গাইবান্ধায় রাম বিগ্রহ নির্মাণ স্থগিত ঘোষণা, অপসারণে ৭২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম

গাইবান্ধা প্রতিনিধি
পলাশবাড়ী উপজেলায় অবস্থিত শ্রীশ্রী রাধা গোবিন্দ ও কালী মন্দির। ছবি: সংগৃহীত

গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলায় শ্রীশ্রী রাধা গোবিন্দ ও কালী মন্দির চত্বরে রামের বিগ্রহ নির্মাণকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট উত্তেজনার মধ্যে নির্মাণকাজ স্থগিত ঘোষণা করেছে মন্দির কর্তৃপক্ষ। তবে এর মধ্যেই নির্মাণাধীন বিগ্রহ অপসারণের দাবিতে মাঠে নেমেছে ইমাম ওলামা পরিষদ। সংগঠনটি ৭২ ঘণ্টার মধ্যে বিগ্রহ অপসারণের দাবি জানিয়ে কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।

শুক্রবার (১২ জুন) জুমার নামাজের পর পলাশবাড়ী উপজেলা সদরের চারমাথা মোড়ে ঢাকা-রংপুর মহাসড়কে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে উপজেলা ইমাম ওলামা পরিষদ। কর্মসূচি থেকে নির্মাণাধীন রাম বিগ্রহ অপসারণের দাবি জানানো হয়।

ইমাম ওলামা পরিষদের মানববন্ধন কর্মসূচি। ছবি: সংগৃহীত
ইমাম ওলামা পরিষদের মানববন্ধন কর্মসূচি। ছবি: সংগৃহীত

সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, একই দাবিতে জেলা সদরসহ অন্যান্য উপজেলাতেও বিভিন্ন কর্মসূচি পালিত হয়েছে।

এর আগে গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে উপজেলার মধ্য রামচন্দ্রপুর মন্দির ভবনে সংবাদ সম্মেলন করে মন্দির কমিটির উপদেষ্টা শ্যামল কুমার মহন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে রামের বিগ্রহ নির্মাণকাজ আপাতত স্থগিত করার ঘোষণা দেন।

শ্রীশ্রী রাধা গোবিন্দ ও কালী মন্দির চত্বরে নির্মাণাধীন রাম বিগ্রহ। ছবি: সংগৃহীত
শ্রীশ্রী রাধা গোবিন্দ ও কালী মন্দির চত্বরে নির্মাণাধীন রাম বিগ্রহ। ছবি: সংগৃহীত

রাম বিগ্রহ নির্মাণকে কেন্দ্র করে কয়েকদিন ধরেই এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে শুক্রবার সকাল থেকে পলাশবাড়ী উপজেলার চারমাথা মোড়, কোমড়পুর মোড় ও হাসবাড়ী এলাকায় বিপুল সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়।

‘ধর্মীয় সম্প্রীতির স্বার্থে নির্মাণকাজ স্থগিত’

সম্প্রতি পলাশবাড়ী উপজেলার শ্রীশ্রী রাধা গোবিন্দ ও কালী মন্দির চত্বরে রামের একটি বৃহৎ বিগ্রহ নির্মাণকাজ শুরু করে মন্দির কর্তৃপক্ষ। ইতোমধ্যে নির্মাণকাজের কিছু অংশও সম্পন্ন হয়েছে। মন্দির কর্তৃপক্ষের দাবি, এটি ‘এশিয়ার সর্ববৃহৎ’ রাম বিগ্রহ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে।

বিষয়টি সামনে আসার পর এলাকায় আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। একই সঙ্গে ইমাম ওলামা পরিষদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে নির্মাণকাজ বন্ধের দাবি জানানো হতে থাকে।

এই প্রেক্ষাপটে বৃহস্পতিবার বিকেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করে রাম বিগ্রহের নির্মাণকাজ স্থগিতের ঘোষণা দেন মন্দির কমিটির উপদেষ্টা শ্যামল কুমার মহন্ত। তিনি বলেন, ‘কোনো রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক চাপে নয়, ধর্মীয় সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সৌহার্দ্যের প্রতি সম্মান জানিয়ে আমরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা বাঙালি। সকল ধর্মের মানুষের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে বিশ্বাস করি। ভবিষ্যতে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। তবে মন্দিরের নিয়মিত ধর্মীয় ও সামাজিক কার্যক্রম চলমান থাকবে।’

সংবাদ সম্মেলনে মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিপিন চন্দ্র বর্মণ, সহসাধারণ সম্পাদক সুভাষ চন্দ্র বর্মণ এবং মন্দির প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্যোক্তা হরিদাস চন্দ্র তরণী দাস উপস্থিত ছিলেন।

ইমাম ওলামা পরিষদের ৮ দফা দাবি

অন্যদিকে বৃহস্পতিবার বিকেলে গাইবান্ধা ও পলাশবাড়ীতে পৃথক সংবাদ সম্মেলন করে নির্মাণাধীন রাম বিগ্রহ অপসারণের দাবি জানায় ইমাম ওলামা পরিষদ।

পলাশবাড়ী উপজেলা মডেল মসজিদের হলরুম এবং গাইবান্ধা পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির নেতারা বিগ্রহ নির্মাণ কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে বন্ধ এবং সংশ্লিষ্ট সব উদ্যোগ বাতিলের দাবি জানান।

এর আগে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আট দফা দাবি সম্বলিত একটি স্মারকলিপিও জমা দেওয়া হয়।

ইমাম ওলামা পরিষদের সংবাদ সম্মেলন। ছবি: সংগৃহীত
ইমাম ওলামা পরিষদের সংবাদ সম্মেলন। ছবি: সংগৃহীত

সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন ইমাম ওলামা পরিষদের জেলা সেক্রেটারি মুফতি মানছুর রহমান খান।

তিনি বলেন, ‘জনশ্রুতি অনুযায়ী এটি বিশ্বের সর্ববৃহৎ রাম মূর্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি ইতোমধ্যে স্থানীয় জনগণের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা, উদ্বেগ, ক্ষোভ ও নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি সৃষ্টি করেছে। রংপুর বিভাগের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর অঞ্চলে এত বৃহৎ মন্দির ও এর বাইরে রিসোর্ট স্পট নির্মাণ এবং প্রকাশ্যে মূর্তি স্থাপনকে কেন্দ্র করে ভবিষ্যতে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, সামাজিক অস্থিরতা ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা রয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এই প্রকল্পের মূল উদ্যোক্তা সম্পর্কে বিভিন্ন মহলে নানা অভিযোগ, বিতর্ক ও প্রশ্ন রয়েছে। তার বিরুদ্ধে অতীতে উগ্রবাদী আচরণসহ বিভিন্ন অনিয়ম ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা ও প্রকৃত অবস্থা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।’

সংগঠনটির আট দফা দাবির মধ্যে রয়েছে— নির্মাণাধীন বৃহৎ রাম মূর্তি প্রকল্পের সব কার্যক্রম বন্ধ করা; প্রকল্পের অর্থায়নের উৎস, ব্যয়ের পরিমাণ, দেশি-বিদেশি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা এবং আর্থিক লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করা; সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব, সম্পদের উৎস ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য আইনানুগভাবে তদন্ত ও নিরীক্ষার আওতায় আনা; কোনো বিদেশি রাষ্ট্র, সংস্থা বা ব্যক্তির প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অর্থায়ন বা প্রভাব রয়েছে কি না তা গোয়েন্দা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করা।

এ ছাড়া প্রকল্পটিকে কেন্দ্র করে দেশের সার্বভৌমত্ব, জাতীয় নিরাপত্তা, সামাজিক স্থিতিশীলতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জন্য কোনো ঝুঁকি রয়েছে কি না তা তদন্ত করা; সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রচলিত অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রমাণিত হলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা; প্রকল্পের সঙ্গে বিদেশি কূটনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা; বিদেশি হস্তক্ষেপ বা কূটনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত কর্মকাণ্ডের প্রমাণ পাওয়া গেলে সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ এবং বিদেশি মিশনের কাছে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ ও ব্যাখ্যা চাওয়া; এবং গাইবান্ধা জেলা ও রংপুর বিভাগের শান্তি-শৃঙ্খলা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রয়োজনীয় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ইমাম ওলামা পরিষদের জেলা সভাপতি মুফতি মাহমুদুল হাসান কাসেমী, জেলা হেফাজতে ইসলামের সভাপতি মাওলানা আব্দুল বাসেত, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জেলা সভাপতি আব্দুল মাজেদ, খেলাফত মজলিস জেলা সভাপতি মুফতি ইউসুফ কাসেমী এবং পলাশবাড়ী ওলামা পরিষদের সভাপতি মাওলানা ছাদেকুল ইসলাম।

৭২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম

এদিকে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে শুক্রবার দুপুরে পলাশবাড়ীতে প্রায় দেড় ঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে উপজেলা ইমাম ওলামা পরিষদ।

এ সময় বক্তারা বলেন, ৭২ ঘণ্টার মধ্যে নির্মাণাধীন রাম মূর্তি অপসারণ এবং মূর্তি নির্মাণের প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করা না হলে আরও কঠোর আন্দোলনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

মানববন্ধনে বক্তব্য দেন উপজেলা ইমাম ওলামা পরিষদের সভাপতি মাওলানা ছাদেকুল ইসলাম, সেক্রেটারি রফিকুল ইসলাম, বাংলাদেশ হেফাজতে ইসলামী পলাশবাড়ী উপজেলা শাখার সভাপতি মাওলানা শাহ আলম ফয়েজি, উপজেলা জামায়াতের নেতা ও উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আবু তালেব মাস্টার, জামায়াত নেতা অধ্যক্ষ গোলাম মোস্তফা এবং খাইরুল ইসলাম চান।

ad
ad

মাঠের রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

কুষ্টিয়া সীমান্তে নারী-শিশুসহ ১২ জনকে ‘পুশইন’ চেষ্টা, বিজিবির বাধা

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলা সীমান্ত দিয়ে নারী ও শিশুসহ ১২ জনকে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) ‘পুশইন’ চেষ্টা ঠেকিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি)। ভুক্তভোগীরা এখন সীমান্তের নো ম্যানস ল্যান্ডে শূন্যরেখায় অবস্থান করছেন।

৯ ঘণ্টা আগে

একই আকাশ একই বাতাস, মিলেমিশে ভিসার সমাধান করব: ভারতীয় হাইকমিশনার

বাংলাদেশে নবনিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বলেছেন, দুই দেশের মানুষের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ক আরও গভীর করতে কাজ করবেন তিনি। ভিসাসহ বিভিন্ন বিষয়ে পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছানোর আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘আমাদের একই আকাশ একই বাতাস। আমরা মিলেমিশে ভিসার সমাধান করব।’

১০ ঘণ্টা আগে

রোববার থেকে খুলনা-বরিশালের ৫ জেলায় অনির্দিষ্টকালের পরিবহন ধর্মঘট

ধর্মঘট শুরু হলে বাগেরহাট, খুলনা, পিরোজপুর, ঝালকাঠি ও বরিশাল জেলায় সব ধরনের গণপরিবহন চলাচল বন্ধ থাকবে বলে জানিয়েছেন বাগেরহাট আন্তঃজেলা বাস, মিনিবাস, কোচ ও মাইক্রোবাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম।

১০ ঘণ্টা আগে

খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নতুন চেয়ারম্যান বিএনপি নেতা মনা

উপসচিব মো. গোলাম রব্বানীর সই করা প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ আইন ২০১৮-এর ধারা ৭(১) অনুযায়ী এস এম শফিকুল আলমকে এই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে এ নিয়োগের জন্য তাকে অন্য যেকোনো পেশা, ব্যবসা কিংবা সরকারি, আধা সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনের সঙ্গে সব ধরনের কর্ম-সম্পর্ক ত্যাগ করতে হ

১২ ঘণ্টা আগে