হাওরে বাড়ছে পানি, কমছে কৃষকের বাঁচার আশা

কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি
হাওরে পানিতে ডুবে গেছে ধান (বাঁয়ে), কোনোমতে সেই ধান কেটে ঘরে আনলেও তা শুকাতে বহু কাঠখড় পোহাতে হচ্ছে (ডানে)। ছবি: সংগৃহীত

কিশোরগঞ্জের হাওর জুড়ে এখন আর নতুন ধানের ঘ্রাণ নেই, নেই ফসল ঘরে তোলার উৎসবের আমেজ। চারদিকে শুধু পানি আর পানি। যে মাঠে কিছুদিন আগেও সোনালি ধানে দুলছিল বাতাস, আজ সেই মাঠে পানির উচ্চতা বুকসমান। পানির তোড়ে কৃষকের চোখে এখন স্বপ্ন নয়, জমছে হতাশা আর অনিশ্চয়তার কালো ছায়া।

গত দুদিন ভারী বৃষ্টি না হলেও মাঝে-মধ্যে রোদ উঠেছিল। এতে কৃষকের মনে ক্ষীণ আশার আলো জেগেছিল— হয়তো পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হবে। কিন্তু সেই আশার গুড়ে বালি।

শনিবার (২ মে) সকাল থেকে ফের শুরু হয়েছে বৃষ্টি। থেমে থেমে চলছে বৃষ্টি। আগের তুলনায় বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমলেও হাওরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকার বোরো ক্ষেত নতুন করে পানির নিচে তলিয়ে গেছে। সেই সঙ্গে তলিয়ে যাচ্ছে কৃষকদের স্বপ্নও।

কৃষি বিভাগের সবশেষ তথ্য বলছে, গত ২৪ ঘণ্টায় কিশোরগঞ্জে নতুন করে আরও দুই হাজার হেক্টর বোরো জমি প্লাবিত হয়েছে। এ নিয়ে জেলায় মোট ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৪৫ হেক্টরে। এতে সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়েছেন অন্তত ৩২ হাজার কৃষক। বছরের একমাত্র ফসল হারানোর শঙ্কায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন তারা।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান বলেন, এবার জেলায় এক লাখ ৬৮ হাজার ৩৬০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে হাওরাঞ্চলেই চাষ হয়েছে এক লাখ চার হাজার ৫৮১ হেক্টর জমিতে।

উপপরিচালকের তথ্য বলছে, এরই মধ্যে ৫৯ শতাংশ জমির ধান কাটা শেষ হলেও বাকি জমিগুলো রয়েছে ঝুঁকিতে। বিশেষ করে ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম উপজেলার হাওর এলাকায় ক্ষতির পরিমাণ বেশি। এর মধ্যে শুধু ইটনা উপজেলাতেই প্রায় তিন হাজার হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে।

স্থানীয় কৃষকরা জানান, মাঠের ধান চোখের সামনেই বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। বৃষ্টির কারণে জমির কোথাও কোমর পানি, কোথাও বুকসমান পানি। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা আধাপাকা ধান কেটে ছোট ছোট নৌকায় করে বাড়ি নিয়ে আসছেন।

শ্রমিক সংকটও এখন বড় দুশ্চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে কৃষকদের জন্য। জলাবদ্ধতার কারণে অনেক শ্রমিক হাওরে যেতে চাইছেন না। যারা যাচ্ছেন, তারা নিচ্ছেন দ্বিগুণ-তিনগুণ মজুরি। এত খরচ করেও কৃষকরা কষ্টে ফলানো সোনালি ধান ঘরে তোলার নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না।

শুধু ধান কাটা নয়, কাটা ধান মাড়াই, শুকানো ও ঘরে তোলা নিয়েও রয়েছে অনিশ্চিয়তা। বৃষ্টিতে ধান শুকানোর মাঠ তলিয়ে গেছে। খলায় রাখা কাটা ধানও পানিতে ভিজে নষ্ট হচ্ছে, কোথাও আবার পানির স্রোতে ভেসে যাচ্ছে। এতে লোকসানের পরিমাণ আরও বাড়ছে।

এদিকে হাওরে বৃষ্টি ও পানি বেশি হওয়ায় ধান কাটার হারভেস্টার মেশিন নিয়ে জমিতে পৌঁছানো কঠিন হয়ে গেছে। ফলে যান্ত্রিকভাবে ধান কাটার সুযোগও সীমিত হয়ে পড়েছে। যেসব জমিতে ধান এখনো দাঁড়িয়ে আছে, সেগুলো দ্রুত কেটে ঘরে তুলতে না পারলে পুরো ফসল পানির নিচে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকরা।

জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ইটনা পয়েন্টে ধনু ও বৌলাই নদীর পানি, চামড়াঘাটে মগরা নদীর পানি এবং অষ্টগ্রামে কালনী নদীর পানি বেড়েছে। এখনো নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে বৃষ্টিপাত ও উজানের ঢল অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ অবস্থায় আগাম বন্যার ঝুঁকিও উড়িয়ে দিচ্ছে না কৃষি বিভাগ। স্থানীয়রাও বলছেন, মেঘনা, কালনী, কুশিয়ারা, ধনু, বৌলাই, মগরা, দাইরা, ঘোড়াউত্রা, ধলেশ্বরী, করাতিয়া, কলকলিয়া, বৈঠাখালী ও কলমারবাকসহ জেলার প্রায় সব নদ-নদীর পানি বাড়ছে। এসব নদীর পানি উপচে হাওরে ঢুকে একের পর এক ফসলি জমি পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে।

ad
ad

মাঠের রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

মধ্যনগরে বাঁধ ভেঙে পানির নিচে হাজারো কৃষকের স্বপ্ন

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা জানান, শনিবার ভোর থেকে প্রবল দমকা বাতাস ও বৃষ্টিপাত শুরু হয়। ফলে সোমেশরী নদীর পানি বেড়ে মধ্যনগর জামে মসজিদের পাশের কালভার্টের সামনের পাউবোর দেওয়া বাঁধ ভেঙে প্রবল বেগে হাওরে পানি প্রবেশ করতে শুরু করে। এসময় হাওরে ধান কাটতে গিয়েছিলেন কৃষকরা। কষ্টে ফলানো একমাত্র বোরো ফসল চোখের সামনে ড

১ দিন আগে

কিশোরগঞ্জে তলিয়েছে ৭ হাজার হেক্টর ধানখেত, ক্ষতিগ্রস্ত ২৫ হাজার কৃষক

কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে আবারও নদ-নদীর পানি বাড়ায় ও পাহাড়ি ঢলে নতুন করে বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা। পাকা ধান তলিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি কাটা ধানের স্তূপেও চারা গজিয়ে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। গতকাল শুক্রবার বিকেল থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টির পানিতে নতুন করে প্লাবিত হয়েছে বিস্তীর্ণ হাওর এলাকা। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন অন্তত ২৫ হ

১ দিন আগে

রৌমারীতে হাটের জমিতে অবৈধ স্থাপনা, ২ সপ্তাহেও কার্যকর হয়নি অপসারণের নির্দেশ

কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার যাদুরচর ইউনিয়নের খেওয়ারচর হাটে উপজেলা প্রশাসনের নোটিশের দুই সপ্তাহ পার হলেও স্থানীয় বিএনপি নেতাদের নেতৃত্বে নির্মাণাধীন অবৈধ দোকানঘর এখনো অপসারণ করা হয়নি। এতে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।

১ দিন আগে

নদী যে জায়গায় সেই জায়গায়ই খনন হবে: প্রতিমন্ত্রী টুকু

নদী যে জায়গায় সেই জায়গায়ই খনন হবে, আশেপাশে যদি কেউ এটি দখল করে থাকে অবশ্যই প্রশাসন তা দখলমুক্ত করবে বলে জানিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু।

১ দিন আগে