৩০০ ফিট-পূর্বাচলে তেল নিতে বাড়তি পথ, বাড়ছে জ্বালানি অপচয়

প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ১৮: ৩৪
জ্বালানি তেল। প্রতীকী ছবি
জ্বালানি তেল। প্রতীকী ছবি

ঢাকার পূর্বাঞ্চলে নতুন নতুন আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকা গড়ে উঠলেও বাড়েনি জ্বালানি সরবরাহের অবকাঠামো। ফলে ৩০০ ফিট সড়ক ও পূর্বাচলসংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের গাড়িতে তেল নিতে কয়েক কিলোমিটার দূরের ফিলিং স্টেশনে যেতে হচ্ছে। এতে বাড়তি জ্বালানি ও সময় ব্যয়ের পাশাপাশি এসব সড়কে তৈরি হচ্ছে অতিরিক্ত যান চলাচল।

সম্প্রতি ৩০০ ফিট সড়কের কাছে একটি গাড়ি তেল রিজার্ভে চলে গেলে কাছাকাছি পেট্রোলপাম্প খুঁজতে গিয়ে দেখা যায়, কুড়িল এলাকার পাম্পটি প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে। খিলক্ষেতের পাম্প প্রায় ১৩ কিলোমিটার এবং জলসিঁড়ি এলাকার পাম্পে যেতে প্রায় ১৮ কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ পাড়ি দিতে হয়। চালক ও মালিকের তখন একমাত্র স্বস্তি ছিল, সড়কে যানজট না থাকায় রিজার্ভের তেলেই পাম্প পর্যন্ত যাওয়া সম্ভব হবে।

৩০০ ফিট সড়কসংলগ্ন একটি আবাসন প্রকল্পের বাসিন্দা কুতুব আহমেদ নিয়মিত কুড়িল কিংবা বিমানবন্দর সড়কের ফিলিং স্টেশনে যান। তার ভাষ্য, গাড়িতে কয়েক লিটার তেল নিতে বের হলেও যাতায়াতের পথেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জ্বালানি শেষ হয়ে যায়। আশপাশে পর্যাপ্ত ফিলিং স্টেশন থাকলে এত দূরে যেতে হতো না।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কুড়িল থেকে ৩০০ ফিট সড়ক হয়ে পূর্বাচল প্রকল্পের আগ পর্যন্ত বসুন্ধরা, পুলিশ হাউজিং সোসাইটি, নৌবাহিনী, স্বদেশ স্বর্ণালী, স্বদেশ সানভ্যালি, ইউনাইটেডসহ বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় বিপুলসংখ্যক মানুষ বসবাস করছেন। কিন্তু এসব এলাকার বাসিন্দাদের গাড়ির জ্বালানি সংগ্রহে তুলনামূলক দূরের স্টেশনগুলোর ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

ফলে প্রতিদিন কয়েক হাজার যানবাহনকে শুধু জ্বালানি সংগ্রহের জন্য অতিরিক্ত পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে বলে দাবি স্থানীয়দের। এতে বাড়ছে জ্বালানি খরচ ও কর্মঘণ্টার অপচয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে যাতায়াতে অতিরিক্ত ৩০ থেকে ৬০ মিনিট সময় লাগছে। ব্যক্তিগত গাড়ির পাশাপাশি গণপরিবহন, পণ্যবাহী যান, রাইড শেয়ারিংয়ের গাড়ি ও মোটরসাইকেলও এর আওতায় পড়ছে।

এর প্রভাব পড়ছে কুড়িল, খিলক্ষেতসহ আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ সড়কেও। স্থানীয়দের মতে, জ্বালানি সংগ্রহের জন্য তৈরি হওয়া এই বাড়তি যান চলাচল অপ্রয়োজনীয় চাপ তৈরি করছে। গুলশান-তেজগাঁও লিংক রোড থেকে সাতরাস্তা পর্যন্ত প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকায় একাধিক ফিলিং স্টেশন থাকলেও পূর্বাঞ্চলের দ্রুত সম্প্রসারিত আবাসিক এলাকাগুলোতে চাহিদার তুলনায় স্টেশনের সংখ্যা কম।

অতিরিক্ত চলাচলের একটি বড় প্রভাব জ্বালানি অপচয়। হিসাব অনুযায়ী, প্রতিদিন ৫০ হাজার যানবাহন যদি জ্বালানি সংগ্রহের জন্য গড়ে অতিরিক্ত ৭ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে, তাহলে মোট অতিরিক্ত চলাচল দাঁড়ায় প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার কিলোমিটার। প্রতি কিলোমিটারে গড়ে ০.১০ থেকে ০.১২ লিটার জ্বালানি খরচ হলে এর জন্য প্রতিদিন প্রায় ৩৫ হাজার থেকে ৪২ হাজার লিটার অতিরিক্ত জ্বালানি প্রয়োজন হতে পারে।

অর্থাৎ পর্যাপ্ত ফিলিং স্টেশন না থাকায় যে জ্বালানি সংগ্রহ করতে মানুষ বের হচ্ছে, তার একটি অংশ কার্যত তেল আনতেই খরচ হয়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে বাড়তি জ্বালানি পোড়ানোর কারণে কার্বন নিঃসরণ ও বায়ুদূষণ বাড়ছে। যানবাহনের চাপ বৃদ্ধির সঙ্গে শব্দদূষণের আশঙ্কাও রয়েছে।

স্থানীয়দের আশঙ্কা, পূর্ব ঢাকার আবাসিক ও বাণিজ্যিক সম্প্রসারণ অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে এ অঞ্চলে প্রতিদিন প্রায় তিন থেকে চার লাখ যানবাহনের চলাচল হতে পারে। মহাখালী বাস ডিপো পুরোপুরি স্থানান্তর হলে চাপ আরও বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

এই পরিস্থিতির পেছনে নতুন ফিলিং স্টেশন অনুমোদনের দীর্ঘস্থায়ী স্থবিরতাকেও দায়ী করছেন স্থানীয়রা। তাদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিশেষ আদেশের মাধ্যমে নতুন ফিলিং স্টেশন স্থাপনের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। তবে একই সময়ে এলপিজি স্টেশন স্থাপনের কার্যক্রম চালু ছিল। ফলে দ্রুত সম্প্রসারিত আবাসিক এলাকাগুলোর ভবিষ্যৎ জ্বালানি চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিদ্যমান নীতিমালার আওতায় নতুন পেট্রোলপাম্প অনুমোদনের কার্যক্রম একটি বিশেষ অফিস আদেশের মাধ্যমে বন্ধ রাখা হয়েছে। ২০১৯-২০ সালের দিকে এ-সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছিল।

তিনি জানান, নতুন পেট্রোলপাম্প ও ফিলিং স্টেশন অনুমোদনের জন্য সরকার বিপিসির কাছে একটি খসড়া নীতিমালা চেয়েছে। বিপিসি আগে একটি খসড়া মন্ত্রণালয়ে পাঠালেও অধিকতর যাচাই-বাছাইয়ের জন্য সেটি আবার ফেরত পাঠানো হয়েছে। বিভিন্ন অংশীজনের মতামত নেওয়ার পর খসড়াটি এখন যাচাই-বাছাইয়ের শেষ পর্যায়ে রয়েছে। শিগগিরই নীতিমালা চূড়ান্ত হতে পারে বলে জানান তিনি।

এ অবস্থায় বসুন্ধরা ও আশপাশের আবাসিক এলাকার বর্তমান ও ভবিষ্যৎ জ্বালানি চাহিদা নিয়ে সমন্বিত সমীক্ষার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের প্রস্তাব, যানবাহনের সংখ্যা, জনসংখ্যা, ভবিষ্যৎ আবাসিক ও বাণিজ্যিক সম্প্রসারণ এবং সড়কের সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে অন্তত দুই থেকে তিনটি উপযুক্ত স্থানে পরিকল্পিত ফিলিং স্টেশন স্থাপন করা হোক।

তবে এসব স্টেশন স্থাপনে অগ্নিনিরাপত্তা, পরিবেশগত ছাড়পত্র, নগর পরিকল্পনা, সড়কের ধারণক্ষমতা, যানবাহনের প্রবেশ ও বের হওয়ার ব্যবস্থা এবং অপেক্ষমাণ গাড়ির জন্য পর্যাপ্ত জায়গা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ জন্য বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, বিপিসি, রাজউক, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্দিষ্ট এলাকার জনসংখ্যা ও প্রয়োজন বিবেচনা করেই নগর অবকাঠামোর পরিকল্পনা করতে হয়। পরিকল্পনার সঙ্গে বাস্তব সম্প্রসারণের সমন্বয় না থাকলে পরে এর চাপ বাসিন্দাদের পাশাপাশি আশপাশের এলাকাকেও বহন করতে হয়।

সংশ্লিষ্টদের মতে, পূর্ব ঢাকার দ্রুত সম্প্রসারিত আবাসিক এলাকার ভবিষ্যৎ জনসংখ্যা ও যানবাহনের সংখ্যা বিবেচনায় নিয়ে এখনই জ্বালানি সরবরাহের অবকাঠামো পরিকল্পনা করা জরুরি। তা না হলে তেল সংগ্রহের জন্য বাড়তি পথ পাড়ি দেওয়ার প্রবণতার সঙ্গে জ্বালানি অপচয়, যানজট ও পরিবেশদূষণের চাপও আরও বাড়তে পারে।

Ad
ad
Ad 300x250

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন

Ad 300x250
ad
Advertisement