পুনর্বাসন ছাড়া মিটফোর্ডের মিনিয়ালস কোয়ার্টারের হরিজনদের উচ্ছেদ না করার দাবি

রাজধানীর পুরান ঢাকায় অবস্থিত স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালের মিনিয়ালস কোয়ার্টারে (সুইপার কলোনি) বসবাসরত হরিজন সম্প্রদায় ও কর্মচারীদের পুনর্বাসন পরিকল্পনা ছাড়া উচ্ছেদ না করার দাবি জানিয়েছেন ১০৮ জন বিশিষ্ট নাগরিক। একই সঙ্গে কোয়ার্টারের বাসিন্দাদের পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংযোগ বিচ্ছিন্নের আদেশ প্রত্যাহারেরও দাবি জানিয়েছেন তারা।
শুক্রবার (২ অক্টোবর) ১০৮ জন বিশিষ্ট নাগরিকের পক্ষ থেকে এক প্রতিবাদলিপিতে এ দাবি জানানো হয়। বার্তা প্রেরক হিসেবে এতে সই করেছেন গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য মারজিয়া প্রভা।
প্রতিবাদলিপিতে নাগরিকরা বলেন, মেনিয়ালস কোয়ার্টারে বংশপরম্পরায় বসবাসরত পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও হরিজন সম্প্রদায়ের সদস্যসহ কর্মচারীদের কোনো বিকল্প পুনর্বাসন পরিকল্পনা ছাড়া উচ্ছেদের নোটিশ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ইউটিলিটি সংযোগ বিচ্ছিন্নের আদেশে তারা গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
এতে আরও বলা হয়, ১৮৫৮ সালে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই হরিজন সম্প্রদায়ের সদস্য ও তাদের পরিবারগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে প্রায় ১৬৮ বছর ধরে এই মিনিয়ালস কোয়ার্টারে বসবাস করছেন। তারা হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে সেখানে মোট ৬০টি পরিবার বসবাস করছে, যার মধ্যে চারটি মুসলিম পরিবার। এসব পরিবারের ৪২ জন শিক্ষার্থী বিভিন্ন স্কুল ও কলেজে পড়াশোনা করছে। বাসিন্দাদের মধ্যে ৩১ জন সরকারি স্থায়ী চাকরিজীবী, ২৮ জন সরকারি অবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবী এবং ১৯ জন আউটসোর্সিং কর্মচারী।
গত ৩০ জুলাই স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একটি প্রশাসনিক নোটিশ জারি করে। এতে ৩০ আগস্টের মধ্যে কলোনির সব বাসিন্দাকে কোয়ার্টার খালি করার চূড়ান্ত নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে ৩১ আগস্ট থেকে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানিসহ সব মৌলিক ইউটিলিটি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে ভবন অপসারণ কার্যক্রম শুরু করার কথা জানানো হয়।
প্রতিবাদলিপিতে বলা হয়েছে, মিনিয়ালস কোয়ার্টারের বাসিন্দাদের অভিযোগ, ভবনগুলো ঝুঁকিপূর্ণ বলা হলেও তাদের জন্য কোনো পুনর্বাসন পরিকল্পনা দেওয়া হয়নি। নোটিশ পাওয়ার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলে তাদের সঙ্গে অত্যন্ত দুর্ব্যবহার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।
প্রতিবাদলিপিতে তারা বলেন, বিকল্প পুনর্বাসন ছাড়া ১৬৮ বছর ধরে বসবাসরত হরিজনদের উচ্ছেদের নোটিশ ৬০টি পরিবারকে মানবিক সংকটে ফেলেছে। হরিজন সম্প্রদায় ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা শত বছর ধরে এই ঐতিহ্যবাহী হাসপাতালে পরিচ্ছন্নতা সেবা দিয়ে আসছেন। করোনা মহামারির মতো সংকটকালেও তারা নিজেদের জীবন ও স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে ফেলে নিরবচ্ছিন্নভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। অথচ বর্তমানে বিকল্প আবাসন ও স্থায়ী পুনর্বাসনের কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই এসব পরিবারকে গৃহহীন করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে প্রতিবাদলিপিতে উল্লেখ করা হয়।
নাগরিকদের পক্ষ থেকে বলা হয়, এ ধরনের পদক্ষেপ বাংলাদেশের সংবিধান, দেশের সুপ্রিম কোর্টের নজির এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতিমালার পরিপন্থি। প্রতিবাদলিপিতে তারা সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগের ১৫ অনুচ্ছেদের উল্লেখ করে বলেন, অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ এই অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন। হরিজন সম্প্রদায় দীর্ঘদিন ধরে সমাজে অবহেলিত ও প্রান্তিক। সংবিধানের ২৭ ও ২৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং জাতি, লিঙ্গ, ধর্ম বা পেশার ভিত্তিতে বৈষম্য করা নিষিদ্ধ বলেও এতে উল্লেখ করা হয়।
এতে আরও বলা হয়, উপযুক্ত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করে ঐতিহ্যবাহী হরিজন বাসিন্দাদের উচ্ছেদের নোটিশ দেওয়া সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে দেওয়া আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার এবং ৩২ অনুচ্ছেদে দেওয়া জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকারের পরিপন্থি। বাসিন্দারা দীর্ঘ প্রায় ১৬৮/১৭০ বছর ধরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অনুমতিতে সেখানে বসবাস করছেন। তাদের পূর্বপুরুষরা হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতাকর্মী (সুইপার) হিসেবে কর্মরত থাকার সময় কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে কোয়ার্টার বরাদ্দ পেয়ে সেখানে বসবাস শুরু করেন। পরবর্তী প্রজন্মগুলোও একই স্থানে বসবাসের পাশাপাশি হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা সেবায় নিয়োজিত থেকে আসছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দীর্ঘদিন ধরে তাদের বসবাসের বিষয়টি স্বীকার করে আসায় কোয়ার্টারটিই তাদের একমাত্র স্থায়ী ঠিকানা হয়ে উঠেছে বলে প্রতিবাদলিপিতে উল্লেখ করা হয়। বলা হয়, তাদের গ্রামের কোনো বিকল্প বাড়ি বা জমি নেই। ফলে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা ছাড়া উচ্ছেদ করা হলে তারা কার্যত গৃহহীন ও চরম মানবিক সংকটে পড়বেন।
নাগরিকদের বক্তব্য, দীর্ঘস্থায়ী ও অনুমোদিত বসবাস, হাসপাতালের প্রতি প্রজন্মগত সেবা এবং কর্তৃপক্ষের দীর্ঘদিনের স্বীকৃতি ন্যায়সংগত প্রত্যাশার নীতি সৃষ্টি করেছে। রাষ্ট্র বা সরকারি কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যক্তির দীর্ঘদিনের স্বীকৃত অবস্থান ও জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করার আগে ন্যায্যতা, যৌক্তিকতা ও প্রাকৃতিক ন্যায়বিচারের নীতি অনুসরণ করতে বাধ্য। তাই যথাযথ নোটিশ, শুনানির সুযোগ এবং মানবিক পুনর্বাসনের ব্যবস্থা ছাড়া উচ্ছেদের উদ্যোগ আইনের শাসন ও ন্যায্য প্রশাসনিক কার্যক্রমের পরিপন্থি বলে তারা মনে করেন।
প্রতিবাদলিপিতে আরও বলা হয়, এসব বাসিন্দা সাধারণ অবৈধ দখলদার নন; বরং তারা হাসপাতালের অপরিহার্য পরিচ্ছন্নতা সেবার সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের উত্তরাধিকারী, যাদের বসবাসের সূচনা হয়েছিল কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের মাধ্যমে। তাই তাদের উচ্ছেদের ক্ষেত্রে শুধু সম্পত্তির মালিকানা বিবেচনা না করে দীর্ঘদিনের সেবা, সামাজিক অবস্থান, বিকল্প আবাসনের অনুপস্থিতি ও মানবিক পরিস্থিতি বিবেচনা করা প্রয়োজন। কোনো বিকল্প আবাসন বা পুনর্বাসনের ব্যবস্থা ছাড়া দীর্ঘদিনের বসবাসরত একটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে উচ্ছেদ করা ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতির পরিপন্থি বলেও এতে দাবি করা হয়।
বাংলাদেশ সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্রের ২৫ অনুচ্ছেদ এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার সনদের ১১ অনুচ্ছেদে স্বীকৃত পর্যাপ্ত জীবনযাত্রার মান ও আবাসনের অধিকারের নীতির প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেও প্রতিবাদলিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার সনদে (ICESCR) অনুস্বাক্ষরকারী দেশ। সনদের ১১ নম্বর ধারা অনুযায়ী উপযুক্ত আবাসন মানুষের অন্যতম অধিকার এবং বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া ‘জোরপূর্বক উচ্ছেদ’ (Forced Eviction) আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের গুরুতর লঙ্ঘন।
এ ছাড়া বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ ঐতিহাসিক রায়ে (Ain o Salish Kendra v. Government of Bangladesh, 19 BLD 1999) উপযুক্ত বিকল্প আবাসন ও পর্যায়ক্রমিক পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত না করে কাউকে বাসস্থান থেকে জোরপূর্বক উচ্ছেদ করা যাবে না বলে নির্দেশ দিয়েছেন বলে প্রতিবাদলিপিতে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবাদলিপিতে আরও বলা হয়, দীর্ঘ ১৬৮/১৭০ বছর ধরে নিরবচ্ছিন্ন বসবাস, হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা সেবায় ঐতিহাসিক অবদান, কর্তৃপক্ষের দীর্ঘদিনের অনুমোদন, বিকল্প আবাসনের সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি এবং পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদের সম্ভাবনা বিবেচনায় উচ্ছেদ নোটিশটি আইনগত, সাংবিধানিক ও মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্নবিদ্ধ। তাই যথাযথ পুনর্বাসন, ন্যায্য শুনানি ও মানবিক বিবেচনা ছাড়া কোনো উচ্ছেদ কার্যক্রম না চালানোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
নাগরিকদের দাবিগুলো হলো—
১. সিটি করপোরেশন ও সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে উচ্ছেদ নোটিশ কার্যকর স্থগিত করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য স্থায়ী ও উপযুক্ত পুনর্বাসনের ব্যবস্থা না করা পর্যন্ত কোনো উচ্ছেদ বা ভবন অপসারণ কার্যক্রম চালানো যাবে না।
২. বিভিন্ন স্থানে কর্মরত ও বসবাসরত হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষের সামাজিক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও আবাসনের অধিকার নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি বিশেষ উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এ কার্যক্রমে স্থানীয় হরিজন প্রতিনিধিদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
প্রতিবাদলিপিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে রয়েছেন অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, ড. সামিনা লুৎফা নিত্রা, মেঘনা গুহঠাকুরতা, জ্যোতির্ময় বড়ুয়া, কাজলী সেহরীন ইসলাম, ঈশিতা দস্তিদার, মোশাহিদা সুলতানা, সায়েমা খাতুন, বীথি ঘোষ, পাভেল পার্থ, সায়দিয়া গুলরুখ, ব্যারিস্টার সারা হোসেন, খুশী কবীর, শিরীন পারভিন হক, মুক্তাশ্রী চাকমা, নাসরিন সিরাজ, জাকির হোসেন, ড. স্বপন আদনান, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, হারুন-অর-রশিদ, আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন, ফেরদৌস আরা রুমী, সাদরুল হাসান রিপন, সত্যজিৎ বিশ্বাস, সীমা দত্ত, তমাশ্রী দাস, অমল ত্রিপুরা, রেহনুমা আহমেদ, মানস নন্দী ও অনুপ কুণ্ডুসহ আর ৭৮ জন বিশিষ্ট নাগরিক।















-635c44-256x144.webp)

