
ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম

২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর প্রথমবারের মতো এ সপ্তাহে প্রতি৷ ব্যারেল তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্যমে শুরু হওয়া যুদ্ধ ঘিরে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার কারণে এ দাম বেড়েছে।
এ অস্থিরতার পেছনে রয়েছে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজের চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়া, যেটি গোটা বিশ্বের তেল পরিবহয়ে অন্যতম একটি রুট। ফলে ইরান যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এর প্রভাবে তেলের দাম সব রেকর্ড ভেঙে ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের। আর এর প্রভাব গিয়ে পড়বে খাদ্যের দামেও, যা তেলের দামের অনুপাতেই বাড়তে থাকে।
বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ আসে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে, এবং এর বেশির ভাগই বিশাল ট্যাংকারে করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরান ও ওমানের মাঝখানে অবস্থিত এই সরু জলপথটির সবচেয়ে সরু অংশের প্রস্থ মাত্র ২১ নটিক্যাল মাইল (প্রায় ৩৯ কিলোমিটার)।
প্রতিদিন দুই কোটিরও বেশি ব্যারেল তেল এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়, যা বিশ্বব্যাপী ব্যবহৃত মোট পেট্রোলিয়ামের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং সমুদ্রপথে বাণিজ্য হওয়া তেলের এক-চতুর্থাংশের সমান।
যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ইআইএ) তথ্য, বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের তিন-চতুর্থাংশেরও বেশি, প্রতিদিন প্রায় সাত কোটি ৯৮ লাখ ব্যারেল, সমুদ্রপথে পরিবাহিত হয়। এ সরবরাহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে যায়, যেগুলোর সহজ বিকল্প পথ নেই।
ইরান যুদ্ধ শুরুর পরপরই হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। জাহাজে হামলা ও নেভিগেশন যন্ত্রে বিঘ্ন ঘটার কারণে অধিকাংশ অপারেটর ঝুঁকি না নিয়ে প্রণালির কিনারায় জাহাজ নোঙর করে অপেক্ষা করছে।
এই তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। সরবরাহ কমে গেলে এবং চাহিদা বাড়তে থাকলে তেলের দাম বাড়ার সম্ভাবনা থাকে, যা ভোক্তা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান উভয়ের ওপর চাপ তৈরি করে।

সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, “যুদ্ধ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে।” তার এই মন্তব্যের পর সাময়িকভাবে তেলের দাম কিছুটা কমে যায়। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটন, তেল আবিব ও তেহরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধে কোনো সমঝোতা না হলে তেলের উচ্চ মূল্য দীর্ঘ সময় ধরে স্থায়ী হতে পারে।
বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান কার্বনচেইনের সাপ্লাই-চেইল বিশ্লেষক ইসমাইল জাবিয়েভ বলেন, ইরান সমুদ্রে কোনো দেয়াল তৈরি করেনি। কিন্তু তাদের রয়েছে ড্রোন, যা সবসময়ই ঝুঁকির কারণ। সব ঘাঁটি ধ্বংস করলেও লুকানো জায়গা থেকে ড্রোন হামলা মাসের পর মাস চলতে পারে। আর যতদিন সংঘাত চলবে, ততদিন এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ পরিবহনও স্বাভাবিক হবে না। দ্রুতই এ পরিস্থিতির কোনো সমাধান দেখছি না।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে যে তেল পরিবাহিত হয় তার প্রায় ৮৯ শতাংশই এশিয়ার বাজারে যায়। এর প্রধান ক্রেতা দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া।
এ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সীমিত হয়ে পড়লে উপসাগরীয় তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোকে বিকল্প রুট খুঁজতে হবে। তবে বিকল্প পথ খুবই সীমিত। সৌদি আরামকোর ইস্ট-ওয়েস্ট ক্রুড অয়েল পাইপলাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি ক্রুড অয়েল পাইপলাইনের সম্মিলিত পরিবহন ক্ষমতা প্রতিদিন প্রায় ৪৭ লাখ ব্যারেল।
সৌদি আরবের এই পাইপলাইন পূর্বাঞ্চলের তেলক্ষেত্র থেকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে তেল নিয়ে যায়, যা হরমুজ প্রণালিকে পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়ার কয়েকটি পথের একটি।
তবে বৈশ্বিক বাণিজ্য বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ক্লেপারের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারিতে সৌদি আরব যে ৭২ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করেছিল, তার মধ্যে ৬৩ লাখ ৮০ হাজার ব্যারেল তথা ৮৮ শতাংশেরও বেশি হরমুজ প্রণালি দিয়ে গেছে।
গাভেকাল রিসার্চের হিসাব অনুযায়ী, ইরানসহ উপসাগরীয় রপ্তানিকারক দেশগুলো প্রণালির বাইরে বিকল্প পথে সর্বোচ্চ আরও প্রায় ৩৫ লাখ ব্যারেল তেল সরিয়ে নিতে পারে। কিন্তু যদি ট্যাংকার চলাচলের বড় অংশ স্থগিত থাকে, তাহলে বিশ্ববাজারে প্রতিদিন প্রায় দেড় কোটি ব্যারেল তেলের ঘাটতি তৈরি হতে পারে।
জাবিয়েভ বলেন, এই বিকল্পগুলো নিয়ে আমি কিছুটা সন্দিহান। ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন ও ফুজাইরাহ পাইপলাইন আছে ঠিকই, কিন্তু সক্ষমতার দিক থেকে এগুলো মূল রুটের কাছাকাছিও নয়। ইরাকের উত্তরাঞ্চল থেকে তুরস্ক পর্যন্ত কিরকুক-সেইহান পাইপলাইনও আছে, তবে সেটি শুধু উত্তরাঞ্চলের তেলক্ষেত্রের জন্য। ইরাকের বড় উৎপাদন দক্ষিণে, তাই এটিও আংশিক বিকল্প, পূর্ণ নয়।
এ শতকের শুরুর দশকে বৈশ্বিক মহামন্দার সময় তেলের দাম ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। ২০০৮ সালের ১১ জুলাই ইউরোপীয় মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের প্রতি ব্যারেলের দাম ১৪৭ দশমিক ৫০ ডলার ও যুক্তরাষ্ট্রের মানদণ্ড ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের দাম ১৪৭ দশিক ২৭ ডলারে পৌঁছেছিল।
তবে সেই দাম বাড়ার কারণ ছিল দুর্বল মার্কিন ডলার এবং জল্পনামূলক বিনিয়োগের প্রবাহ। সরাসরি তেল সরবরাহে বিঘ্ন হওয়ার কারণে সেবার তেলের দাম বাড়েনি। এর বাইরে গত পাঁচ দশকে বৈশ্বিক বেশ কয়েকটি বড় ঘটনাই সরাসরি তেলের বাজারে ধাক্কা দিয়েছে।
এসব ঘটনার মধ্যে রয়েছে— ১৯৭৩ সালের তেল নিষেধাজ্ঞা; ১৯৮০-এর দশকের ইরান-ইরাক যুদ্ধ; ১৯৯০-৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধ; ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইরাক আক্রমণ; এবং ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ।
জাবিয়েভ বলেন, ১৯৯০-৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধ বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সবচেয়ে ভালো তুলনা হতে পারে। তখন ইরাক ও কুয়েত দুই বড় উৎপাদক যুদ্ধরত ছিল এবং সরবরাহে বিঘ্ন প্রায় ছয় মাস বা তার বেশি সময় স্থায়ী হয়েছিল। তখন বিশ্ব দীর্ঘ সময় উচ্চ তেলের দাম দেখেছিল এবং পরে অর্থনৈতিক ধীরগতিও দেখা দেয়। বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গেও এর মিল রয়েছে— দীর্ঘমেয়াদি বিঘ্ন, উচ্চ মূল্য এবং অর্থনৈতিক মন্দার ঝুঁকি।

অপরিশোধিত তেল হলো হলুদ-কালো রঙের এক ধরনের জীবাশ্ম জ্বালানি, যা মাটি থেকে উত্তোলন করা হয় এবং পরে পরিশোধন করে পেট্রোল, ডিজেল ও জেট জ্বালানি তৈরি করা হয়। পরিশোধন প্রক্রিয়ায় আরও অনেক গৃহস্থালি পণ্য তৈরি হয়।
তেলকে সাধারণত এর ঘনত্ব ও সালফারের পরিমাণ অনুযায়ী শ্রেণিবদ্ধ করা হয়। হালকা ও কম সালফারযুক্ত তেল সহজে পরিশোধন করা যায়, তাই এর মূল্য বেশি। এক ব্যারেলে ১৫৯ লিটার বা ৪২ গ্যালন অপরিশোধিত তেল থাকে। পরিশোধনের পর সাধারণত একটি ব্যারেল থেকে প্রায় ৭৩ লিটার পেট্রোল পাওয়া যায়।
তেল ও গ্যাস শুধু জ্বালানি নয়; এগুলো হাজারো দৈনন্দিন পণ্যের কাঁচামাল। প্লাস্টিক পণ্য, যেমন— পানির বোতল, খাবারের প্যাকেট, ফোনের কভার ও চিকিৎসায় ব্যবহৃত সিরিঞ্জ— সবই অপরিশোধিত তেল থেকে তৈরি।
সিন্থেটিক কাপড়, যেমন— পলেস্টার, নাইলন ও অ্যাক্রিলিকও তেল থেকে তৈরি, যা খেলাধুলার পোশাক থেকে কার্পেট পর্যন্ত নানা পণ্যে ব্যবহৃত হয়।
কসমেটিক শিল্পেও তেলের ভূমিকা রয়েছে। যেমন— পেট্রোলিয়াম জেলি, লিপস্টিক ও কনসিলারের মতো পণ্য তেল থেকেই তৈরি হয়। আবার গৃহস্থালি মধ্যে ডিটারজেন্ট, ডিশওয়াশিং লিকুইড ও রং তৈরিতেও তেলভিত্তিক নানা উপাদান ব্যবহৃত হয়।
বিশ্বের খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থাও মূলত প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। কারণ কৃষিতে ব্যবহৃত সার প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে তৈরি হয়। ফসলের উৎপাদন বাড়াতে এসব সারের ভূমিকা অপরিসীম।
বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, তেলের দাম ও খাদ্যের দাম প্রায় একই প্রবণতায় ওঠানামা করে। কারণ খেতে ব্যবহৃত সার থেকে শুরু করে খাবার পরিবহনকারী ট্রাক পর্যন্ত খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি ধাপেই জ্বালানির ভূমিকা রয়েছে। ফলে তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ও শিপিং খরচও সরাসরি বেড়ে যায়।
অর্থনীতিবিদ ডেভিড ম্যাকউইলিয়ামস বলেন, বিশ্ব অর্থনীতির প্রাণ হলো পরিবহন। জিনিসপত্রকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিয়ে যাওয়া— এটাই মূল বিষয়। এটি মূলত লজিস্টিকস ও সরবরাহ শৃঙ্খলের সমস্যা, আর পরিবহনই হলো বিশ্ব অর্থনীতির শক্তি।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, বড় তেল সংকটের সময় সাধারণত মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি ও বেকারত্ব বৃদ্ধি একই সঙ্গে ঘটতে থাকে, অর্থনীতির পরিভাষায় যাকে বলা হয় স্ট্যাগফ্লেশন। ১৯৭৩, ১৯৭৮ ও ২০০৮ সালের সংকটের উদাহরণ দিয়ে অর্থনীতিবিদরা বলেন, তেলের দাম বড় আকারে বেড়ে যাওয়ার পর প্রায়ই কোনো না কোনোভাবে বৈশ্বিক মন্দা দেখা দিয়েছে, দেখা দিয়েছে স্ট্যাগফ্লেশন।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, নিম্ন-আয়ের দেশগুলোতে পরিস্থিতি আরও গুরুতর হতে পারে। এসব দেশে মানুষ তাদের আয়ের বড় অংশ খাদ্যে ব্যয় করে এবং অনেক খাদ্যশস্য ও সার আমদানি করতে হয়। ফলে তেলের দাম বাড়লে দ্রুত খাদ্য সংকট দেখা দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, যার জন্য সবচেয়ে বেশি ভুগতে হতে পারে নিম্ন আয়ের দেশগুলোকে।
আল-জাজিরার বিশ্লেষণ অবলম্বনে

২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর প্রথমবারের মতো এ সপ্তাহে প্রতি৷ ব্যারেল তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্যমে শুরু হওয়া যুদ্ধ ঘিরে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতার কারণে এ দাম বেড়েছে।
এ অস্থিরতার পেছনে রয়েছে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজের চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়া, যেটি গোটা বিশ্বের তেল পরিবহয়ে অন্যতম একটি রুট। ফলে ইরান যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে এর প্রভাবে তেলের দাম সব রেকর্ড ভেঙে ফেলতে পারে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের। আর এর প্রভাব গিয়ে পড়বে খাদ্যের দামেও, যা তেলের দামের অনুপাতেই বাড়তে থাকে।
বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ আসে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে, এবং এর বেশির ভাগই বিশাল ট্যাংকারে করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরান ও ওমানের মাঝখানে অবস্থিত এই সরু জলপথটির সবচেয়ে সরু অংশের প্রস্থ মাত্র ২১ নটিক্যাল মাইল (প্রায় ৩৯ কিলোমিটার)।
প্রতিদিন দুই কোটিরও বেশি ব্যারেল তেল এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়, যা বিশ্বব্যাপী ব্যবহৃত মোট পেট্রোলিয়ামের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এবং সমুদ্রপথে বাণিজ্য হওয়া তেলের এক-চতুর্থাংশের সমান।
যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ইআইএ) তথ্য, বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের তিন-চতুর্থাংশেরও বেশি, প্রতিদিন প্রায় সাত কোটি ৯৮ লাখ ব্যারেল, সমুদ্রপথে পরিবাহিত হয়। এ সরবরাহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে যায়, যেগুলোর সহজ বিকল্প পথ নেই।
ইরান যুদ্ধ শুরুর পরপরই হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। জাহাজে হামলা ও নেভিগেশন যন্ত্রে বিঘ্ন ঘটার কারণে অধিকাংশ অপারেটর ঝুঁকি না নিয়ে প্রণালির কিনারায় জাহাজ নোঙর করে অপেক্ষা করছে।
এই তেল সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। সরবরাহ কমে গেলে এবং চাহিদা বাড়তে থাকলে তেলের দাম বাড়ার সম্ভাবনা থাকে, যা ভোক্তা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান উভয়ের ওপর চাপ তৈরি করে।

সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, “যুদ্ধ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে।” তার এই মন্তব্যের পর সাময়িকভাবে তেলের দাম কিছুটা কমে যায়। তবে বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটন, তেল আবিব ও তেহরানের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধে কোনো সমঝোতা না হলে তেলের উচ্চ মূল্য দীর্ঘ সময় ধরে স্থায়ী হতে পারে।
বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান কার্বনচেইনের সাপ্লাই-চেইল বিশ্লেষক ইসমাইল জাবিয়েভ বলেন, ইরান সমুদ্রে কোনো দেয়াল তৈরি করেনি। কিন্তু তাদের রয়েছে ড্রোন, যা সবসময়ই ঝুঁকির কারণ। সব ঘাঁটি ধ্বংস করলেও লুকানো জায়গা থেকে ড্রোন হামলা মাসের পর মাস চলতে পারে। আর যতদিন সংঘাত চলবে, ততদিন এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ পরিবহনও স্বাভাবিক হবে না। দ্রুতই এ পরিস্থিতির কোনো সমাধান দেখছি না।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে যে তেল পরিবাহিত হয় তার প্রায় ৮৯ শতাংশই এশিয়ার বাজারে যায়। এর প্রধান ক্রেতা দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া।
এ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সীমিত হয়ে পড়লে উপসাগরীয় তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোকে বিকল্প রুট খুঁজতে হবে। তবে বিকল্প পথ খুবই সীমিত। সৌদি আরামকোর ইস্ট-ওয়েস্ট ক্রুড অয়েল পাইপলাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি ক্রুড অয়েল পাইপলাইনের সম্মিলিত পরিবহন ক্ষমতা প্রতিদিন প্রায় ৪৭ লাখ ব্যারেল।
সৌদি আরবের এই পাইপলাইন পূর্বাঞ্চলের তেলক্ষেত্র থেকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে তেল নিয়ে যায়, যা হরমুজ প্রণালিকে পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়ার কয়েকটি পথের একটি।
তবে বৈশ্বিক বাণিজ্য বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ক্লেপারের তথ্য অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারিতে সৌদি আরব যে ৭২ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করেছিল, তার মধ্যে ৬৩ লাখ ৮০ হাজার ব্যারেল তথা ৮৮ শতাংশেরও বেশি হরমুজ প্রণালি দিয়ে গেছে।
গাভেকাল রিসার্চের হিসাব অনুযায়ী, ইরানসহ উপসাগরীয় রপ্তানিকারক দেশগুলো প্রণালির বাইরে বিকল্প পথে সর্বোচ্চ আরও প্রায় ৩৫ লাখ ব্যারেল তেল সরিয়ে নিতে পারে। কিন্তু যদি ট্যাংকার চলাচলের বড় অংশ স্থগিত থাকে, তাহলে বিশ্ববাজারে প্রতিদিন প্রায় দেড় কোটি ব্যারেল তেলের ঘাটতি তৈরি হতে পারে।
জাবিয়েভ বলেন, এই বিকল্পগুলো নিয়ে আমি কিছুটা সন্দিহান। ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন ও ফুজাইরাহ পাইপলাইন আছে ঠিকই, কিন্তু সক্ষমতার দিক থেকে এগুলো মূল রুটের কাছাকাছিও নয়। ইরাকের উত্তরাঞ্চল থেকে তুরস্ক পর্যন্ত কিরকুক-সেইহান পাইপলাইনও আছে, তবে সেটি শুধু উত্তরাঞ্চলের তেলক্ষেত্রের জন্য। ইরাকের বড় উৎপাদন দক্ষিণে, তাই এটিও আংশিক বিকল্প, পূর্ণ নয়।
এ শতকের শুরুর দশকে বৈশ্বিক মহামন্দার সময় তেলের দাম ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। ২০০৮ সালের ১১ জুলাই ইউরোপীয় মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের প্রতি ব্যারেলের দাম ১৪৭ দশমিক ৫০ ডলার ও যুক্তরাষ্ট্রের মানদণ্ড ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের দাম ১৪৭ দশিক ২৭ ডলারে পৌঁছেছিল।
তবে সেই দাম বাড়ার কারণ ছিল দুর্বল মার্কিন ডলার এবং জল্পনামূলক বিনিয়োগের প্রবাহ। সরাসরি তেল সরবরাহে বিঘ্ন হওয়ার কারণে সেবার তেলের দাম বাড়েনি। এর বাইরে গত পাঁচ দশকে বৈশ্বিক বেশ কয়েকটি বড় ঘটনাই সরাসরি তেলের বাজারে ধাক্কা দিয়েছে।
এসব ঘটনার মধ্যে রয়েছে— ১৯৭৩ সালের তেল নিষেধাজ্ঞা; ১৯৮০-এর দশকের ইরান-ইরাক যুদ্ধ; ১৯৯০-৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধ; ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইরাক আক্রমণ; এবং ২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ।
জাবিয়েভ বলেন, ১৯৯০-৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধ বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সবচেয়ে ভালো তুলনা হতে পারে। তখন ইরাক ও কুয়েত দুই বড় উৎপাদক যুদ্ধরত ছিল এবং সরবরাহে বিঘ্ন প্রায় ছয় মাস বা তার বেশি সময় স্থায়ী হয়েছিল। তখন বিশ্ব দীর্ঘ সময় উচ্চ তেলের দাম দেখেছিল এবং পরে অর্থনৈতিক ধীরগতিও দেখা দেয়। বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গেও এর মিল রয়েছে— দীর্ঘমেয়াদি বিঘ্ন, উচ্চ মূল্য এবং অর্থনৈতিক মন্দার ঝুঁকি।

অপরিশোধিত তেল হলো হলুদ-কালো রঙের এক ধরনের জীবাশ্ম জ্বালানি, যা মাটি থেকে উত্তোলন করা হয় এবং পরে পরিশোধন করে পেট্রোল, ডিজেল ও জেট জ্বালানি তৈরি করা হয়। পরিশোধন প্রক্রিয়ায় আরও অনেক গৃহস্থালি পণ্য তৈরি হয়।
তেলকে সাধারণত এর ঘনত্ব ও সালফারের পরিমাণ অনুযায়ী শ্রেণিবদ্ধ করা হয়। হালকা ও কম সালফারযুক্ত তেল সহজে পরিশোধন করা যায়, তাই এর মূল্য বেশি। এক ব্যারেলে ১৫৯ লিটার বা ৪২ গ্যালন অপরিশোধিত তেল থাকে। পরিশোধনের পর সাধারণত একটি ব্যারেল থেকে প্রায় ৭৩ লিটার পেট্রোল পাওয়া যায়।
তেল ও গ্যাস শুধু জ্বালানি নয়; এগুলো হাজারো দৈনন্দিন পণ্যের কাঁচামাল। প্লাস্টিক পণ্য, যেমন— পানির বোতল, খাবারের প্যাকেট, ফোনের কভার ও চিকিৎসায় ব্যবহৃত সিরিঞ্জ— সবই অপরিশোধিত তেল থেকে তৈরি।
সিন্থেটিক কাপড়, যেমন— পলেস্টার, নাইলন ও অ্যাক্রিলিকও তেল থেকে তৈরি, যা খেলাধুলার পোশাক থেকে কার্পেট পর্যন্ত নানা পণ্যে ব্যবহৃত হয়।
কসমেটিক শিল্পেও তেলের ভূমিকা রয়েছে। যেমন— পেট্রোলিয়াম জেলি, লিপস্টিক ও কনসিলারের মতো পণ্য তেল থেকেই তৈরি হয়। আবার গৃহস্থালি মধ্যে ডিটারজেন্ট, ডিশওয়াশিং লিকুইড ও রং তৈরিতেও তেলভিত্তিক নানা উপাদান ব্যবহৃত হয়।
বিশ্বের খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থাও মূলত প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল। কারণ কৃষিতে ব্যবহৃত সার প্রাকৃতিক গ্যাস থেকে তৈরি হয়। ফসলের উৎপাদন বাড়াতে এসব সারের ভূমিকা অপরিসীম।
বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, তেলের দাম ও খাদ্যের দাম প্রায় একই প্রবণতায় ওঠানামা করে। কারণ খেতে ব্যবহৃত সার থেকে শুরু করে খাবার পরিবহনকারী ট্রাক পর্যন্ত খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার প্রতিটি ধাপেই জ্বালানির ভূমিকা রয়েছে। ফলে তেলের দাম বাড়লে পরিবহন ও শিপিং খরচও সরাসরি বেড়ে যায়।
অর্থনীতিবিদ ডেভিড ম্যাকউইলিয়ামস বলেন, বিশ্ব অর্থনীতির প্রাণ হলো পরিবহন। জিনিসপত্রকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিয়ে যাওয়া— এটাই মূল বিষয়। এটি মূলত লজিস্টিকস ও সরবরাহ শৃঙ্খলের সমস্যা, আর পরিবহনই হলো বিশ্ব অর্থনীতির শক্তি।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, বড় তেল সংকটের সময় সাধারণত মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি ও বেকারত্ব বৃদ্ধি একই সঙ্গে ঘটতে থাকে, অর্থনীতির পরিভাষায় যাকে বলা হয় স্ট্যাগফ্লেশন। ১৯৭৩, ১৯৭৮ ও ২০০৮ সালের সংকটের উদাহরণ দিয়ে অর্থনীতিবিদরা বলেন, তেলের দাম বড় আকারে বেড়ে যাওয়ার পর প্রায়ই কোনো না কোনোভাবে বৈশ্বিক মন্দা দেখা দিয়েছে, দেখা দিয়েছে স্ট্যাগফ্লেশন।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, নিম্ন-আয়ের দেশগুলোতে পরিস্থিতি আরও গুরুতর হতে পারে। এসব দেশে মানুষ তাদের আয়ের বড় অংশ খাদ্যে ব্যয় করে এবং অনেক খাদ্যশস্য ও সার আমদানি করতে হয়। ফলে তেলের দাম বাড়লে দ্রুত খাদ্য সংকট দেখা দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, যার জন্য সবচেয়ে বেশি ভুগতে হতে পারে নিম্ন আয়ের দেশগুলোকে।
আল-জাজিরার বিশ্লেষণ অবলম্বনে

ডিএমডি (উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক) হিসেবে অন্তত দুই বছরের অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক করায় আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পদোন্নতি পাওয়া একাধিক বিতর্কিত কর্মকর্তা এমডি হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে থাকলেও, সরকার পরিবর্তনের পর ডিএমডি হওয়া কর্মকর্তারা যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বর্তমান নিয়োগ প্রক্রিয়ার বাইরে চলে গেছেন। ফলে নতুন নীতিমাল
১৫ ঘণ্টা আগে
আগামী করবর্ষে ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা ২৫ হাজার টাকা বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ফলে ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সময়ে একজন ব্যক্তি বছরে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করলে তাকে কোনো আয়কর দিতে হবে না।
১৬ ঘণ্টা আগে
পুঁজিবাজারকে আরও টেকসই করার লক্ষ্য তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, “লিস্টেড বা নন-লিস্টেড যে কোনো কোম্পানি তাদের সকল লেনদেন ব্যাংকিং চ্যানেলে সম্পাদন করলে অতিরিক্ত ২.৫ শতাংশ কর সুবিধা প্রদানের প্রস্তাব করছি।”
১৭ ঘণ্টা আগে
পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতি, দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সংকট এবং সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্নের কারণে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। মে মাসে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাবে খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত উভয় খাতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছায়।
১৮ ঘণ্টা আগে