
প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম

সামষ্টিক অর্থনীতির বহুমাত্রিক চাপ, তীব্র তারল্য সংকট ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির এক রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জাতীয় বাজেট পেশ করতে যাচ্ছেন বিএনপি সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। দীর্ঘ ২০ বছরের বিরতিতে সরকার গঠনের পর বিএনপি সরকারের এটিই প্রথম বাজেট।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেল ৩টায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে শুরু হতে যাওয়া অধিবেশনে অর্থমন্ত্রী বাজেট প্রস্তাবনা পেশ করবেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনায় অর্থ বিভাগ চূড়ান্ত করেছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই প্রস্তাবিত বাজেট। এর শিরোনাম নির্ধারণ করা হয়েছে ‘অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ণ ও বিনিয়ন্ত্রণকরণ: ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির অভিযাত্রায় বাংলাদেশ’।
এই মেগা বাজেটের মোট আয়তন নির্ধারণ করা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা বাংলাদেশের ইতিহাসের ৫৫তম এবং এ যাবৎকালের সর্ববৃহৎ রেকর্ড ভাঙা বাজেট। অন্তর্বর্তী সরকারের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় এর আকার ও পরিধিতে প্রায় ১৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ।
বিশাল ব্যয়ের খাতের বিপরীতে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক খাত মিলিয়ে সরকারের সামগ্রিক আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ১০ দশমিক ২০ শতাংশ। কর আদায়ের এই বিশাল কর্মযজ্ঞের সিংহভাগ দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ওপর, যাদের একাই তুলতে হবে ছয় লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা।
মোট এনবিআর করের প্রায় অর্ধেক, তথা ৩ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকাই আদায়ের ছক কাটা হয়েছে মূল্যসংযোজন কর বা ভ্যাট খাত থেকে। এ ছাড়া প্রত্যক্ষ কর বা আয়কর থেকে ২ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা এবং আমদানি-রপ্তানি শুল্ক থেকে ৬৭ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এনবিআর-বহির্ভূত কর থেকে ২৫ হাজার কোটি এবং নন-ট্যাক্স রেভিনিউ খাত থেকে ৬৬ হাজার কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্য ঠিক করেছে সরকার। তবে চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসেই যেখানে রাজস্ব ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে, সেখানে এই লক্ষ্যমাত্রাকে অর্থনীতিবিদরা অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ বলে মনে করছেন।
আয়-ব্যয়ের বিশাল এই ব্যবধানের ফলে নতুন অর্থবছর শুরু হতে যাচ্ছে দুই লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার রেকর্ড বাজেট ঘাটতি নিয়ে, যা জিডিপির প্রায় ৪ শতাংশ। এই বিশাল ঘাটতি পূরণে সরকারকে একাধারে অভ্যন্তরীণ ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও বৈদেশিক ঋণের ওপর চরমভাবে নির্ভর করতে হচ্ছে।
ঘাটতি অর্থায়নের কৌশল হিসেবে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে এক লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে, যার সিংহভাগ অর্থাৎ এক লাখ ১২ হাজার কোটি টাকাই সরাসরি বিপর্যস্ত ব্যাংকিং খাত থেকে ধার করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। সঞ্চয়পত্র এবং অন্যান্য অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নেওয়া হবে বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা।
অন্যদিকে বৈদেশিক উৎস থেকে মোট ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে এক লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে ৪৬ হাজার কোটি টাকাই ব্যয় হয়ে যাবে পুরোনো ঋণের কিস্তি ও মূলধন পরিশোধে। ফলে সরকারের হাতে নিট বৈদেশিক অর্থায়ন অবশিষ্ট থাকবে এক লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে বৈদেশিক ঋণ এক লাখ ১১ হাজার কোটি এবং অনুদান হিসেবে পাওয়ার আশা করা হচ্ছে পাঁচ হাজার কোটি টাকা।
খেলাপি ঋণ ও তারল্য সংকটে ভুগতে থাকা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে সরকার নিজে এভাবে বড় অঙ্কের অর্থ তুলে নিলে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা মারাত্মক ঋণসংকটে পড়বেন, যা সামষ্টিক অর্থনীতিতে ‘ক্রাউডিং আউট’ প্রভাব তীব্র করে বিনিয়োগ ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতিকে পুরোপুরি স্তবির করে দিতে পারে।
নতুন বাজেটে ব্যয়ের খাতগুলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পরিচালন ও প্রশাসনিক খাতের অনুন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ছয় লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকার অনুমোদন করা হয়েছে তিন লাখ কোটি টাকা। এবারের বাজেটে সবচেয়ে বড় নীতিগত নতুনত্ব হিসেবে যুক্ত হচ্ছে ‘সৃজনশীল অর্থনীতি’ এবং ‘বিনিয়ন্ত্রণকরণ’ বা ডিরেগুলেশন নীতি।
তথ্যপ্রযুক্তি, ফ্রিল্যান্সিং, স্টার্টআপ ও সাংস্কৃতিক শিল্পের বিকাশ ঘটিয়ে তরুণদের ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে এই সৃজনশীল অর্থনীতি খাতের জন্য বিশেষ প্রণোদনা ও পৃথক তহবিল গঠন করা হচ্ছে। পাশাপাশি ব্যবসা সহজীকরণ ও বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করতে বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার কৌশল নেওয়া হয়েছে। বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে এবং পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার কার্যকর উপায় হিসেবে বাজেটে পুনরায় কালো টাকা সাদা করার বিশেষ সুযোগ রাখা হচ্ছে।
এ ছাড়া করপোরেট করের হার কিছুটা কমিয়ে করের জাল সম্প্রসারণের উদ্যোগ থাকছে।
মধ্যবিত্তের জন্য কিছুটা স্বস্তির বার্তা দিয়ে ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা বর্তমানে বিদ্যমান তিন লাখ ৭৫ হাজার টাকাতেই বহাল রাখছেন অর্থমন্ত্রী।
বাজেটের সামাজিক খতিয়ানে নতুন সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও নির্বাচনি ইশতেহারের স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। কল্যাণকর অর্থনীতির ভিত্তি স্থাপন ও সামাজিক সুরক্ষার ছাতা আরও বিস্তৃত করতে মোট এক লাখ ৩৮ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হচ্ছে, যা আগের বছরের চেয়ে অন্তত ১২ হাজার কোটি টাকা বেশি। এর বড় অংশ ব্যয় হবে সরকারের ফ্ল্যাগশিপ কর্মসূচি ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’ সম্প্রসারণের পেছনে, যার মাধ্যমে ওএমএস ও টিসিবি কার্যক্রম ধীরে ধীরে কমিয়ে এনে কার্ডধারীদের সরাসরি ভর্তুকি সুবিধা দেওয়া হবে।
একই সাথে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষতিগ্রস্ত নতুন আরও এক হাজার ৮৫৭ জনকে এই ভাতার আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে। সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নবম পে-স্কেল আংশিক বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে বাজেটে বাড়তি ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হতে পারে। খাতভিত্তিক বরাদ্দের ক্ষেত্রে শিক্ষা খাতে ৫০ হাজার ৩০২ কোটি টাকা এবং স্বাস্থ্য খাতে ৪৩ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা বরাদ্দের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকলেও অর্থনীতিবিদদের মতে, আমলাতান্ত্রিক গভীর সংস্কার না হলে সাধারণ মানুষের পকেট থেকে চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয় কমবে না।
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির অধীনে পরিবহন, যোগাযোগ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের মোট এক হাজার ৪০০’র বেশি প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে, যার মধ্যে নতুন প্রকল্পই থাকছে এক লাখ ২৭৭টি।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কঠিন শর্ত এবং ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের চলমান ঋণ কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় বাজেটে ভর্তুকি, প্রণোদনা ও নগদ সহায়তার জন্য মোট এক লাখ ১৭ হাজার ১২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হলেও ইউটিলিটি খাতে বড় ধরনের মূল্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত স্পষ্ট।
বাজেটে বিদ্যুৎ খাতে ৩৭ হাজার কোটি টাকা, সার ভর্তুকিতে ২৭ হাজার কোটি টাকা, গ্যাস খাতে সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা এবং খাদ্য খাতে ৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে আইএমএফের শর্ত মেনে আগামী অর্থবছরে তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম ধাপে ধাপে সরাসরি বাড়ানো। বাজেট ঘোষণার ঠিক আগের দিনই গ্রাহক পর্যায়ে খুচরা বিদ্যুতের দাম একলাফে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বাড়ানোর ঘটনা এই মূল্য সমন্বয়ের চেইন রিঅ্যাকশনকেই নির্দেশ করে।
এই সরাসরি মূল্যবৃদ্ধির ফলে দেশীয় শিল্পোৎপাদন খরচ বাড়বে এবং পরোক্ষভাবে নিত্যণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
সার্বিকভাবে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই রেকর্ড ভাঙা বাজেট বাস্তবায়নের পথে অর্থ বিভাগ সুনির্দিষ্ট আটটি বড় সামষ্টিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করেছে, যার শীর্ষে রয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি যেখানে ৯ দশমিক ৪৭ শতাংশে দাঁড়িয়ে, সেখানে আগামী অর্থবছরে তা ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে, যা জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির বাস্তবতায় সম্পূর্ণ অধরা থেকে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
এদিকে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি যথাক্রমে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ ও দশমিক ৩ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে বলে পূর্বাভাস দিলেও সরকার ৬৮ লাখ ৩১ হাজার ৬০০ কোটি টাকার উদীয়মান অর্থনীতির ওপর ভর করে উচ্চতর লক্ষ্যমাত্রায় বাজি ধরেছে।
একই সঙ্গে জিডিপির ৩১ দশমিক ৪০ শতাংশ বিনিয়োগের লক্ষ্য ধরা হয়েছে, যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ— ২৪ দশমিক ৯০ শতাংশ— আসতে হবে বেসরকারি খাত থেকে। বর্তমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, ডলার সংকট এবং উচ্চ সুদের হারের বাজারে বেসরকারি খাত কীভাবে এই বিনিয়োগের ঝুঁকি নেবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

সামষ্টিক অর্থনীতির বহুমাত্রিক চাপ, তীব্র তারল্য সংকট ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির এক রূঢ় বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জাতীয় বাজেট পেশ করতে যাচ্ছেন বিএনপি সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। দীর্ঘ ২০ বছরের বিরতিতে সরকার গঠনের পর বিএনপি সরকারের এটিই প্রথম বাজেট।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেল ৩টায় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে শুরু হতে যাওয়া অধিবেশনে অর্থমন্ত্রী বাজেট প্রস্তাবনা পেশ করবেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনায় অর্থ বিভাগ চূড়ান্ত করেছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই প্রস্তাবিত বাজেট। এর শিরোনাম নির্ধারণ করা হয়েছে ‘অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ণ ও বিনিয়ন্ত্রণকরণ: ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির অভিযাত্রায় বাংলাদেশ’।
এই মেগা বাজেটের মোট আয়তন নির্ধারণ করা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা বাংলাদেশের ইতিহাসের ৫৫তম এবং এ যাবৎকালের সর্ববৃহৎ রেকর্ড ভাঙা বাজেট। অন্তর্বর্তী সরকারের সংশোধিত বাজেটের তুলনায় এর আকার ও পরিধিতে প্রায় ১৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ।
বিশাল ব্যয়ের খাতের বিপরীতে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক খাত মিলিয়ে সরকারের সামগ্রিক আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ১০ দশমিক ২০ শতাংশ। কর আদায়ের এই বিশাল কর্মযজ্ঞের সিংহভাগ দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ওপর, যাদের একাই তুলতে হবে ছয় লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা।
মোট এনবিআর করের প্রায় অর্ধেক, তথা ৩ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকাই আদায়ের ছক কাটা হয়েছে মূল্যসংযোজন কর বা ভ্যাট খাত থেকে। এ ছাড়া প্রত্যক্ষ কর বা আয়কর থেকে ২ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা এবং আমদানি-রপ্তানি শুল্ক থেকে ৬৭ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এনবিআর-বহির্ভূত কর থেকে ২৫ হাজার কোটি এবং নন-ট্যাক্স রেভিনিউ খাত থেকে ৬৬ হাজার কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্য ঠিক করেছে সরকার। তবে চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসেই যেখানে রাজস্ব ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে, সেখানে এই লক্ষ্যমাত্রাকে অর্থনীতিবিদরা অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ বলে মনে করছেন।
আয়-ব্যয়ের বিশাল এই ব্যবধানের ফলে নতুন অর্থবছর শুরু হতে যাচ্ছে দুই লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার রেকর্ড বাজেট ঘাটতি নিয়ে, যা জিডিপির প্রায় ৪ শতাংশ। এই বিশাল ঘাটতি পূরণে সরকারকে একাধারে অভ্যন্তরীণ ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও বৈদেশিক ঋণের ওপর চরমভাবে নির্ভর করতে হচ্ছে।
ঘাটতি অর্থায়নের কৌশল হিসেবে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে এক লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নেওয়া হয়েছে, যার সিংহভাগ অর্থাৎ এক লাখ ১২ হাজার কোটি টাকাই সরাসরি বিপর্যস্ত ব্যাংকিং খাত থেকে ধার করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। সঞ্চয়পত্র এবং অন্যান্য অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে নেওয়া হবে বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকা।
অন্যদিকে বৈদেশিক উৎস থেকে মোট ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে এক লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে ৪৬ হাজার কোটি টাকাই ব্যয় হয়ে যাবে পুরোনো ঋণের কিস্তি ও মূলধন পরিশোধে। ফলে সরকারের হাতে নিট বৈদেশিক অর্থায়ন অবশিষ্ট থাকবে এক লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে বৈদেশিক ঋণ এক লাখ ১১ হাজার কোটি এবং অনুদান হিসেবে পাওয়ার আশা করা হচ্ছে পাঁচ হাজার কোটি টাকা।
খেলাপি ঋণ ও তারল্য সংকটে ভুগতে থাকা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে সরকার নিজে এভাবে বড় অঙ্কের অর্থ তুলে নিলে বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা মারাত্মক ঋণসংকটে পড়বেন, যা সামষ্টিক অর্থনীতিতে ‘ক্রাউডিং আউট’ প্রভাব তীব্র করে বিনিয়োগ ও নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতিকে পুরোপুরি স্তবির করে দিতে পারে।
নতুন বাজেটে ব্যয়ের খাতগুলোকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পরিচালন ও প্রশাসনিক খাতের অনুন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ছয় লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আকার অনুমোদন করা হয়েছে তিন লাখ কোটি টাকা। এবারের বাজেটে সবচেয়ে বড় নীতিগত নতুনত্ব হিসেবে যুক্ত হচ্ছে ‘সৃজনশীল অর্থনীতি’ এবং ‘বিনিয়ন্ত্রণকরণ’ বা ডিরেগুলেশন নীতি।
তথ্যপ্রযুক্তি, ফ্রিল্যান্সিং, স্টার্টআপ ও সাংস্কৃতিক শিল্পের বিকাশ ঘটিয়ে তরুণদের ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে এই সৃজনশীল অর্থনীতি খাতের জন্য বিশেষ প্রণোদনা ও পৃথক তহবিল গঠন করা হচ্ছে। পাশাপাশি ব্যবসা সহজীকরণ ও বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করতে বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার কৌশল নেওয়া হয়েছে। বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে এবং পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার কার্যকর উপায় হিসেবে বাজেটে পুনরায় কালো টাকা সাদা করার বিশেষ সুযোগ রাখা হচ্ছে।
এ ছাড়া করপোরেট করের হার কিছুটা কমিয়ে করের জাল সম্প্রসারণের উদ্যোগ থাকছে।
মধ্যবিত্তের জন্য কিছুটা স্বস্তির বার্তা দিয়ে ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা বর্তমানে বিদ্যমান তিন লাখ ৭৫ হাজার টাকাতেই বহাল রাখছেন অর্থমন্ত্রী।
বাজেটের সামাজিক খতিয়ানে নতুন সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও নির্বাচনি ইশতেহারের স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। কল্যাণকর অর্থনীতির ভিত্তি স্থাপন ও সামাজিক সুরক্ষার ছাতা আরও বিস্তৃত করতে মোট এক লাখ ৩৮ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হচ্ছে, যা আগের বছরের চেয়ে অন্তত ১২ হাজার কোটি টাকা বেশি। এর বড় অংশ ব্যয় হবে সরকারের ফ্ল্যাগশিপ কর্মসূচি ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’ সম্প্রসারণের পেছনে, যার মাধ্যমে ওএমএস ও টিসিবি কার্যক্রম ধীরে ধীরে কমিয়ে এনে কার্ডধারীদের সরাসরি ভর্তুকি সুবিধা দেওয়া হবে।
একই সাথে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষতিগ্রস্ত নতুন আরও এক হাজার ৮৫৭ জনকে এই ভাতার আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে। সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নবম পে-স্কেল আংশিক বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে বাজেটে বাড়তি ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হতে পারে। খাতভিত্তিক বরাদ্দের ক্ষেত্রে শিক্ষা খাতে ৫০ হাজার ৩০২ কোটি টাকা এবং স্বাস্থ্য খাতে ৪৩ হাজার ১৮৯ কোটি টাকা বরাদ্দের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকলেও অর্থনীতিবিদদের মতে, আমলাতান্ত্রিক গভীর সংস্কার না হলে সাধারণ মানুষের পকেট থেকে চিকিৎসা ও শিক্ষার ব্যয় কমবে না।
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির অধীনে পরিবহন, যোগাযোগ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের মোট এক হাজার ৪০০’র বেশি প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে, যার মধ্যে নতুন প্রকল্পই থাকছে এক লাখ ২৭৭টি।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কঠিন শর্ত এবং ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের চলমান ঋণ কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় বাজেটে ভর্তুকি, প্রণোদনা ও নগদ সহায়তার জন্য মোট এক লাখ ১৭ হাজার ১২৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হলেও ইউটিলিটি খাতে বড় ধরনের মূল্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত স্পষ্ট।
বাজেটে বিদ্যুৎ খাতে ৩৭ হাজার কোটি টাকা, সার ভর্তুকিতে ২৭ হাজার কোটি টাকা, গ্যাস খাতে সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা এবং খাদ্য খাতে ৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে আইএমএফের শর্ত মেনে আগামী অর্থবছরে তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম ধাপে ধাপে সরাসরি বাড়ানো। বাজেট ঘোষণার ঠিক আগের দিনই গ্রাহক পর্যায়ে খুচরা বিদ্যুতের দাম একলাফে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বাড়ানোর ঘটনা এই মূল্য সমন্বয়ের চেইন রিঅ্যাকশনকেই নির্দেশ করে।
এই সরাসরি মূল্যবৃদ্ধির ফলে দেশীয় শিল্পোৎপাদন খরচ বাড়বে এবং পরোক্ষভাবে নিত্যণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
সার্বিকভাবে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই রেকর্ড ভাঙা বাজেট বাস্তবায়নের পথে অর্থ বিভাগ সুনির্দিষ্ট আটটি বড় সামষ্টিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ চিহ্নিত করেছে, যার শীর্ষে রয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি যেখানে ৯ দশমিক ৪৭ শতাংশে দাঁড়িয়ে, সেখানে আগামী অর্থবছরে তা ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে, যা জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির বাস্তবতায় সম্পূর্ণ অধরা থেকে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
এদিকে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি যথাক্রমে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ ও দশমিক ৩ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে বলে পূর্বাভাস দিলেও সরকার ৬৮ লাখ ৩১ হাজার ৬০০ কোটি টাকার উদীয়মান অর্থনীতির ওপর ভর করে উচ্চতর লক্ষ্যমাত্রায় বাজি ধরেছে।
একই সঙ্গে জিডিপির ৩১ দশমিক ৪০ শতাংশ বিনিয়োগের লক্ষ্য ধরা হয়েছে, যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ— ২৪ দশমিক ৯০ শতাংশ— আসতে হবে বেসরকারি খাত থেকে। বর্তমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, ডলার সংকট এবং উচ্চ সুদের হারের বাজারে বেসরকারি খাত কীভাবে এই বিনিয়োগের ঝুঁকি নেবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মুজিবনগর সরকারের প্রথম বাজেট থেকে শুরু করে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের অন্তর্বর্তী সরকারের বাজেট পর্যন্ত মোট ৫৫টি বাজেট উপস্থাপন করা হয়েছে। এসব বাজেট দিয়েছেন ১৪ জন ব্যক্তি। তাদের কেউ ছিলেন নির্বাচিত সরকারের অর্থমন্ত্রী, কেউ সামরিক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা, কেউ আবার রাষ্ট্রপতি বা সা
২ ঘণ্টা আগে
যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠনমূলক বাজেট থেকে সর্বশেষ সংকটময় সময়ের সংকোচনমূলক ও ঘাটতি-নিয়ন্ত্রিত বাজেট — এই তুলনায় ফুটে ওঠে দেশের অর্থনৈতিক রূপান্তর, অগ্রগতি এবং নতুন চ্যালেঞ্জ।
২ ঘণ্টা আগে
গাবতলী বাস টার্মিনালের সামনে সিএনজি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আলমগীর হোসেনের কাছে বাজেট হলো প্রতিদিনের জমার টাকা আর গ্যাসের দাম। স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে তিনি বলেন, ‘ভাইজান, আমগো বাজেট প্রতিদিন সকালে গাড়ি নিয়া বাইর হওয়ার সময় শুরু হয়, আর রাইতে মালিকের জমা দিয়া ঘরে ফেরার সময় শেষ হয়।’
৩ ঘণ্টা আগে
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের মন্ত্রী বলেন, “অর্থনীতির সুফল যাতে সকলের কাছে যায় সেটাকে মাথায় রেখেই বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে, একটা সমাজকল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার একটা ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করার জন্য এই বাজেট করা হয়েছে।
৩ ঘণ্টা আগে