
প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম

নতুন সরকারের শপথের পর থেকেই আলোচনায় ছিল, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের পদে পরিবর্তন আসছে কি না। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে নিযুক্ত আহসান এইচ মনসুরকে নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরেই ছিল অসন্তোষ। এ নিয়ে এক পক্ষ আন্দোলনও করেছে। শেষ পর্যন্ত সরকারের শপথের নবম দিনে দেশের আর্থিক খাতের গুরুত্বপূর্ণ এ পদে পরিবর্তন এলো। আহসান এইচ মনসুরকে সরিয়ে নিয়োগ দেওয়া হলো নতুন গভর্নরকে।
তবে পুরনো গভর্নরের জায়গায় নতুন গর্ভনর নিয়োগই শেষ নয়, বিদায়ী গভর্নরের বিদায়ের প্রক্রিয়াটি দিনভর ছিল আলোচনায়। তার উপদেষ্টাকে ধাওয়া দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এদিকে নতুন গভর্নরের পরিচয় নিয়ে প্রথমে ধোঁয়াশা ছড়িয়েছে। পরে একজন ব্যবসায়ীকে গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায় সরকারের ব্যাংক খাতের সংস্কারের আন্তরিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হয়েছে, প্রয়োজনীয়তা থেকেই পরিবর্তন করা হয়েছে গভর্নরকে। নবনিযুক্ত গভর্নরও বলেছেন, ব্যাংকিং খাতে আস্থা বাড়ানোই হবে তার প্রথম চ্যালেঞ্জ।
বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) সকাল থেকেই চাউর হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পরিবর্তনের গুঞ্জন। এর মধ্যেই গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংকে শুরু হয় বিক্ষোভ। তার বিরুদ্ধে ‘স্বৈরাচারী আচরণের’ অভিযোগ তুলে তার পদত্যাগ চেয়ে বিক্ষোভ করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের একটি অংশ।
বুধবার সকাল ১১টার দিকে মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংক সদর দপ্তরের সামনে ‘বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের’ ব্যানারে বিক্ষোভকারীরা সমাবেশ করেন। দাবি আদায় না হলে ‘কলম বিরতি’ কর্মসূচির হুমকি দেন তারা।
এমন পরিস্থিতিতে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলন করে আহসান এইচ মনসুর বিক্ষোভকে ‘একটি স্বার্থান্বেষী মহলের ষড়যন্ত্র’ হিসেবে উল্লেখ করেন। ব্রিফিংয়ের কিছুক্ষণ পরেই তিনি অফিস ত্যাগ করে চলে যান।
এ সময় গণমাধ্যমের প্রশ্নের জবাবে আহসান এইচ মনসুর বলেন, তিনি পদত্যাগ করেননি। তার নিয়োগ বাতিল বা নতুন গভর্নরের নিয়োগ নিয়েও তার কাছে কোনো তথ্য নেই। তবে তিনি নতুন গভর্নরের নিয়োগের কথা শুনেছেন। সে কারণেই বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে চলে যাচ্ছেন।
এদিকে আহসান এইচ মনসুর বের হয়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতরে হট্টগোল করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স কাউন্সিলের নেতারা। এ সময় তারা বিদায়ী গভর্নরের উপদেষ্টাকেও ধাওয়া দিয়ে বের করে দেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক আহসান উল্লাহ এক বছরের চুক্তিতে গত বছরের জানুয়ারিতে এ পদে নিয়োগ পান।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন, অফিসার্স কাউন্সিলের নেতারা ‘মব’ করে গভর্নরের উপদেষ্টা আহসান উল্লাহকে বের করে দেন। আহসান উল্লাহ যখন গাড়িতে উঠে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন, এমন সময় এক ব্যক্তিকে তার দিকে তেড়েও যেতে দেখা যায়।
এ সময় অন্যরা ওই ব্যক্তিকে আক্রমণ করা থেকে বিরত রাখেন। তবে তিনি আঙুল উঁচিয়ে আহসান এইচ মনসুরের উপদেষ্টা আহসান উল্লাহকে শাসাচ্ছিলেন।
গভর্নর পরিবর্তনের গুঞ্জন ছড়িয়েছিল বুধবার সকাল থেকেই। নতুন গভর্নর কে হবেন, তা নিয়েও গুঞ্জনের ডালাপালা ডানা মেলেছে। এ সময় একাধিক ব্যক্তির নাম নবনিযুক্ত গভর্নর হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু গণমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে।
নতুন গভর্নর হিসেবে শুরুতেই ছড়িয়ে পড়ে মোশতাক আহমেদ নামের বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন পরিচালকের নাম। তার নাম ও ছবি ব্যবহার করে কিছু কিছু মাধ্যমে খবরও প্রচার করা হয়। মোশতাক আহমেদ নিজেই পরে জানান, তিনি নতুন করে কোনো নিয়োগ পাননি।
এর মধ্যেই অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সূত্র নিশ্চিত করে, নতুন গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন মোস্তাকুর রহমান। তবে তার পূর্ণ পরিচয় তখনো জানা যায়নি। এ সময় আরেক মোস্তাকুর রহমানের ছবিসহ তথ্য ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে।
এসব ঘটনার মধ্যেই বুধবার বিকেলে মোস্তাকুর রহমানকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কেন্দ্রীয় ব্যাংক শাখা। অন্য সব প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের সঙ্গে কর্ম-সম্পর্ক পরিত্যাগের শর্তে চার বছরের জন্য নিয়োগ পান তিনি।
নতুন গভর্নরের পূর্ণ পরিচয়ও প্রকাশ পায়। জানা যায়, তৈরি পোশাক খাতের ব্যবসায়ী মোস্তাকুর রহমান একসময় পুঁজিবাজারের ব্রোকারেজ হাউজ ও আবাসন ব্যবসাতেও যুক্ত ছিলেন। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ছিলেন তিনি।
মোস্তাকুর রহমান বর্তমানে হেরা সোয়েটার্স গার্মেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও। তার জন্ম ১৯৬৬ সালে, ঢাকায়। বাড়ি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলার জামপুর ইউনিয়নে। তার বড় ভাই মো. মোস্তাফিজুর রহমান মামুন ছিলেন থানা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাকাউন্টিংয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষে ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএমএবি) থেকে এফসিএমএ করেন মোস্তাকুর। ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে তিনি করপোরেট ফিন্যান্স, রপ্তানি, প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন, আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করছেন।
নতুন গভর্নরের নিয়োগের প্রজ্ঞাপনের সঙ্গে সঙ্গে বিদায়ী গভর্নরের নিয়োগের অবসানের প্রজ্ঞাপনও প্রকাশ করে অর্থ মন্ত্রণালয়। জুলাই অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার দ্বিতীয় সপ্তাহে ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট তাকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ দেয়।
দেড় বছরের মাথায় অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুরের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্বের অবসান ঘটল। বুধবার আলাদা প্রজ্ঞাপনে তার নিয়োগের অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করার কথা বলা হয়েছে।
ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ ও আমলার বাইরে দেশের ইতিহাসে এই প্রথম একজন ব্যবসায়ী পেলেন গভর্নরের দায়িত্ব। স্বাভাবিকভাবেই তার এ নিয়োগ বিস্ময় ছড়িয়েছে অর্থনীতি খাতের সব শাখায়। তার নিয়োগ ব্যাংকিং খাতের সঙ্গে ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’ তৈরি করে কি না, সে প্রশ্নও উঠেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য ছড়িয়েছে, ব্যবসায়ী মোস্তাকুর রহমান নিজেও ঋণখেলাপি ছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে বিশেষ সুবিধায় সে ঋণ পুনর্তফসিল করেছেন তিনি। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, খেলাপি ঋণ বা ব্যাংকিং নীতিমালা সংক্রান্ত বিভিন্ন ইস্যু ব্যবসায়ীদের প্রতিকূলে থাকলে একজন ব্যবসায়ী গভর্নরের পদে থেকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারবেন কি না।
বিরোধী দলীয় বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিমণ্ডল থেকে নতুন গভর্নরের নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন বেশিই উত্থাপিত হয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদ বা আর্থিক খাতের সংশ্লিষ্টরাও এ নিয়োগকে প্রশ্নের বাইরে রাখছেন না। অর্থনীতিবিদ সেলিম রায়হানই যেমন সরাসরি এই নিয়োগের সূত্র ধরে প্রশ্ন তুলেছেন— সরকার সত্যিই ব্যাংক খাত সংস্কারে আন্তরিক কি না।
বুধবার সেলিম রায়হান তার ফেসবুকে লিখেছেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক শুধু আর্থিক নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠান নয়, এটি ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রক ও তদারকি সংস্থা। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে ব্যবসায়িক পটভূমির কাউকে বসানো হলে স্বার্থের সংঘাত (কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট) তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ একজন ব্যবসায়ীর স্বাভাবিক প্রবণতা হতে পারে বাজার ও করপোরেট স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া, যেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান দায়িত্ব হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া।’
নতুন নিয়োগ ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের ধারাকে পিছিয়ে দেবে কি না— সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করেন সেলিম রায়হান। শঙ্কা রেখেই তিনি লিখেছেন, ‘আমরা কি আবার সেই পুরোনো অবস্থায় ফিরে যাচ্ছি, যেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতার বদলে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর স্বার্থই প্রাধান্য পাবে? সরকারের উচিত দ্রুতই স্পষ্ট করা যে এই সিদ্ধান্ত ব্যাংক খাত সংস্কারের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।’
এত সব আলোচনা-সমালোচনা অবশ্য খুব একটা গায়ে মাখছে না সরকার। অর্থমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা বিএনপির সিনিয়র নেতা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, প্রয়োজনীয়তা থেকেই এ নিয়োগ। আরও অন্য খাতেও এমন পরিবর্তন ও নতুন নিয়োগ আসতে পারে বলে জানিয়েছেন তিনি।
সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে অর্থমন্ত্রী বলেন, নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে। অনেক কিছুরই পরিবর্তন হবে। এখানেও পরিবর্তন হয়েছে। এটা নতুন কিছু না।
অর্থমন্ত্রী বলেন, নতুন সরকারের যে কর্মসূচি আছে, যে অগ্রাধিকার আছে এবং যে চিন্তাভাবনা আছে— এগুলো বাস্তবায়নের জন্য যেখানে যেখানে প্রয়োজন, সেখানেই পরিবর্তন হবে। প্রয়োজনে আরও অনেক জায়গায় পরিবর্তন হবে এবং এটা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা।
নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমানও সবাইকে নিয়ে কাজ করার প্রত্যয় জানিয়েছেন। একটি গণমাধ্যমকে গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার প্রতিক্রিয়ায় তিনি জানান, ব্যাংকিং খাতে আস্থা বাড়ানোকে প্রথম কাজ ধরে নিয়ে দায়িত্ব শুরু করতে চান তিনি। সুদের হার কমিয়ে আনাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও বলেন।
আহসান এইচ মনসুরের স্থলাভিষিক্ত মোস্তাকুর রহমান বলেন, ‘অর্থনীতির যে অবস্থা, ব্যাংকিং খাতের যে অবস্থা, এই সময়টায় গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে কাজ করাই একটি বড় চ্যালেঞ্জ।’ সবার সহযোগিতায় ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনার কাজ এগিয়ে নিতে চান বলে জানান তিনি।

নতুন সরকারের শপথের পর থেকেই আলোচনায় ছিল, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের পদে পরিবর্তন আসছে কি না। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে নিযুক্ত আহসান এইচ মনসুরকে নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের অভ্যন্তরেই ছিল অসন্তোষ। এ নিয়ে এক পক্ষ আন্দোলনও করেছে। শেষ পর্যন্ত সরকারের শপথের নবম দিনে দেশের আর্থিক খাতের গুরুত্বপূর্ণ এ পদে পরিবর্তন এলো। আহসান এইচ মনসুরকে সরিয়ে নিয়োগ দেওয়া হলো নতুন গভর্নরকে।
তবে পুরনো গভর্নরের জায়গায় নতুন গর্ভনর নিয়োগই শেষ নয়, বিদায়ী গভর্নরের বিদায়ের প্রক্রিয়াটি দিনভর ছিল আলোচনায়। তার উপদেষ্টাকে ধাওয়া দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এদিকে নতুন গভর্নরের পরিচয় নিয়ে প্রথমে ধোঁয়াশা ছড়িয়েছে। পরে একজন ব্যবসায়ীকে গভর্নর হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায় সরকারের ব্যাংক খাতের সংস্কারের আন্তরিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হয়েছে, প্রয়োজনীয়তা থেকেই পরিবর্তন করা হয়েছে গভর্নরকে। নবনিযুক্ত গভর্নরও বলেছেন, ব্যাংকিং খাতে আস্থা বাড়ানোই হবে তার প্রথম চ্যালেঞ্জ।
বুধবার (২৫ ফেব্রুয়ারি) সকাল থেকেই চাউর হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পরিবর্তনের গুঞ্জন। এর মধ্যেই গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংকে শুরু হয় বিক্ষোভ। তার বিরুদ্ধে ‘স্বৈরাচারী আচরণের’ অভিযোগ তুলে তার পদত্যাগ চেয়ে বিক্ষোভ করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের একটি অংশ।
বুধবার সকাল ১১টার দিকে মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংক সদর দপ্তরের সামনে ‘বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের’ ব্যানারে বিক্ষোভকারীরা সমাবেশ করেন। দাবি আদায় না হলে ‘কলম বিরতি’ কর্মসূচির হুমকি দেন তারা।
এমন পরিস্থিতিতে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলন করে আহসান এইচ মনসুর বিক্ষোভকে ‘একটি স্বার্থান্বেষী মহলের ষড়যন্ত্র’ হিসেবে উল্লেখ করেন। ব্রিফিংয়ের কিছুক্ষণ পরেই তিনি অফিস ত্যাগ করে চলে যান।
এ সময় গণমাধ্যমের প্রশ্নের জবাবে আহসান এইচ মনসুর বলেন, তিনি পদত্যাগ করেননি। তার নিয়োগ বাতিল বা নতুন গভর্নরের নিয়োগ নিয়েও তার কাছে কোনো তথ্য নেই। তবে তিনি নতুন গভর্নরের নিয়োগের কথা শুনেছেন। সে কারণেই বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে চলে যাচ্ছেন।
এদিকে আহসান এইচ মনসুর বের হয়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতরে হট্টগোল করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স কাউন্সিলের নেতারা। এ সময় তারা বিদায়ী গভর্নরের উপদেষ্টাকেও ধাওয়া দিয়ে বের করে দেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক আহসান উল্লাহ এক বছরের চুক্তিতে গত বছরের জানুয়ারিতে এ পদে নিয়োগ পান।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন, অফিসার্স কাউন্সিলের নেতারা ‘মব’ করে গভর্নরের উপদেষ্টা আহসান উল্লাহকে বের করে দেন। আহসান উল্লাহ যখন গাড়িতে উঠে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন, এমন সময় এক ব্যক্তিকে তার দিকে তেড়েও যেতে দেখা যায়।
এ সময় অন্যরা ওই ব্যক্তিকে আক্রমণ করা থেকে বিরত রাখেন। তবে তিনি আঙুল উঁচিয়ে আহসান এইচ মনসুরের উপদেষ্টা আহসান উল্লাহকে শাসাচ্ছিলেন।
গভর্নর পরিবর্তনের গুঞ্জন ছড়িয়েছিল বুধবার সকাল থেকেই। নতুন গভর্নর কে হবেন, তা নিয়েও গুঞ্জনের ডালাপালা ডানা মেলেছে। এ সময় একাধিক ব্যক্তির নাম নবনিযুক্ত গভর্নর হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু গণমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে।
নতুন গভর্নর হিসেবে শুরুতেই ছড়িয়ে পড়ে মোশতাক আহমেদ নামের বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন পরিচালকের নাম। তার নাম ও ছবি ব্যবহার করে কিছু কিছু মাধ্যমে খবরও প্রচার করা হয়। মোশতাক আহমেদ নিজেই পরে জানান, তিনি নতুন করে কোনো নিয়োগ পাননি।
এর মধ্যেই অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সূত্র নিশ্চিত করে, নতুন গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন মোস্তাকুর রহমান। তবে তার পূর্ণ পরিচয় তখনো জানা যায়নি। এ সময় আরেক মোস্তাকুর রহমানের ছবিসহ তথ্য ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে।
এসব ঘটনার মধ্যেই বুধবার বিকেলে মোস্তাকুর রহমানকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কেন্দ্রীয় ব্যাংক শাখা। অন্য সব প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের সঙ্গে কর্ম-সম্পর্ক পরিত্যাগের শর্তে চার বছরের জন্য নিয়োগ পান তিনি।
নতুন গভর্নরের পূর্ণ পরিচয়ও প্রকাশ পায়। জানা যায়, তৈরি পোশাক খাতের ব্যবসায়ী মোস্তাকুর রহমান একসময় পুঁজিবাজারের ব্রোকারেজ হাউজ ও আবাসন ব্যবসাতেও যুক্ত ছিলেন। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য ছিলেন তিনি।
মোস্তাকুর রহমান বর্তমানে হেরা সোয়েটার্স গার্মেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও। তার জন্ম ১৯৬৬ সালে, ঢাকায়। বাড়ি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলার জামপুর ইউনিয়নে। তার বড় ভাই মো. মোস্তাফিজুর রহমান মামুন ছিলেন থানা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাকাউন্টিংয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষে ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএমএবি) থেকে এফসিএমএ করেন মোস্তাকুর। ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে তিনি করপোরেট ফিন্যান্স, রপ্তানি, প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন, আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করছেন।
নতুন গভর্নরের নিয়োগের প্রজ্ঞাপনের সঙ্গে সঙ্গে বিদায়ী গভর্নরের নিয়োগের অবসানের প্রজ্ঞাপনও প্রকাশ করে অর্থ মন্ত্রণালয়। জুলাই অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার দ্বিতীয় সপ্তাহে ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট তাকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ দেয়।
দেড় বছরের মাথায় অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুরের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্বের অবসান ঘটল। বুধবার আলাদা প্রজ্ঞাপনে তার নিয়োগের অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করার কথা বলা হয়েছে।
ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ ও আমলার বাইরে দেশের ইতিহাসে এই প্রথম একজন ব্যবসায়ী পেলেন গভর্নরের দায়িত্ব। স্বাভাবিকভাবেই তার এ নিয়োগ বিস্ময় ছড়িয়েছে অর্থনীতি খাতের সব শাখায়। তার নিয়োগ ব্যাংকিং খাতের সঙ্গে ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’ তৈরি করে কি না, সে প্রশ্নও উঠেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য ছড়িয়েছে, ব্যবসায়ী মোস্তাকুর রহমান নিজেও ঋণখেলাপি ছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে বিশেষ সুবিধায় সে ঋণ পুনর্তফসিল করেছেন তিনি। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, খেলাপি ঋণ বা ব্যাংকিং নীতিমালা সংক্রান্ত বিভিন্ন ইস্যু ব্যবসায়ীদের প্রতিকূলে থাকলে একজন ব্যবসায়ী গভর্নরের পদে থেকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারবেন কি না।
বিরোধী দলীয় বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিমণ্ডল থেকে নতুন গভর্নরের নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন বেশিই উত্থাপিত হয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদ বা আর্থিক খাতের সংশ্লিষ্টরাও এ নিয়োগকে প্রশ্নের বাইরে রাখছেন না। অর্থনীতিবিদ সেলিম রায়হানই যেমন সরাসরি এই নিয়োগের সূত্র ধরে প্রশ্ন তুলেছেন— সরকার সত্যিই ব্যাংক খাত সংস্কারে আন্তরিক কি না।
বুধবার সেলিম রায়হান তার ফেসবুকে লিখেছেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংক শুধু আর্থিক নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠান নয়, এটি ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রক ও তদারকি সংস্থা। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে ব্যবসায়িক পটভূমির কাউকে বসানো হলে স্বার্থের সংঘাত (কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট) তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কারণ একজন ব্যবসায়ীর স্বাভাবিক প্রবণতা হতে পারে বাজার ও করপোরেট স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া, যেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান দায়িত্ব হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং দুর্বল ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া।’
নতুন নিয়োগ ব্যাংকিং খাতের সংস্কারের ধারাকে পিছিয়ে দেবে কি না— সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করেন সেলিম রায়হান। শঙ্কা রেখেই তিনি লিখেছেন, ‘আমরা কি আবার সেই পুরোনো অবস্থায় ফিরে যাচ্ছি, যেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতার বদলে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর স্বার্থই প্রাধান্য পাবে? সরকারের উচিত দ্রুতই স্পষ্ট করা যে এই সিদ্ধান্ত ব্যাংক খাত সংস্কারের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।’
এত সব আলোচনা-সমালোচনা অবশ্য খুব একটা গায়ে মাখছে না সরকার। অর্থমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা বিএনপির সিনিয়র নেতা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, প্রয়োজনীয়তা থেকেই এ নিয়োগ। আরও অন্য খাতেও এমন পরিবর্তন ও নতুন নিয়োগ আসতে পারে বলে জানিয়েছেন তিনি।
সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে অর্থমন্ত্রী বলেন, নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে। অনেক কিছুরই পরিবর্তন হবে। এখানেও পরিবর্তন হয়েছে। এটা নতুন কিছু না।
অর্থমন্ত্রী বলেন, নতুন সরকারের যে কর্মসূচি আছে, যে অগ্রাধিকার আছে এবং যে চিন্তাভাবনা আছে— এগুলো বাস্তবায়নের জন্য যেখানে যেখানে প্রয়োজন, সেখানেই পরিবর্তন হবে। প্রয়োজনে আরও অনেক জায়গায় পরিবর্তন হবে এবং এটা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা।
নতুন গভর্নর মোস্তাকুর রহমানও সবাইকে নিয়ে কাজ করার প্রত্যয় জানিয়েছেন। একটি গণমাধ্যমকে গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার প্রতিক্রিয়ায় তিনি জানান, ব্যাংকিং খাতে আস্থা বাড়ানোকে প্রথম কাজ ধরে নিয়ে দায়িত্ব শুরু করতে চান তিনি। সুদের হার কমিয়ে আনাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও বলেন।
আহসান এইচ মনসুরের স্থলাভিষিক্ত মোস্তাকুর রহমান বলেন, ‘অর্থনীতির যে অবস্থা, ব্যাংকিং খাতের যে অবস্থা, এই সময়টায় গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে কাজ করাই একটি বড় চ্যালেঞ্জ।’ সবার সহযোগিতায় ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনার কাজ এগিয়ে নিতে চান বলে জানান তিনি।

ভোক্তাপর্যায়ে ১২ কেজি এলপি গ্যাসের দাম ১৫ টাকা কমিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। নতুন দাম অনুযায়ী, এখন থেকে একটি ১২ কেজি সিলিন্ডার ১ হাজার ৩৪১ টাকায় বিক্রি হবে।
১ দিন আগে
আব্দুল মুক্তাদির বলেন, বাজারে পণ্যের পর্যাপ্ত সরবরাহ আছে। খুব শিগগিরই বাজার ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। কিছু মানুষ রোজার মাসের সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করছে। যারা মূল্য বৃদ্ধির কারসাজিতে জড়িত থাকবে তাদের বিরুদ্ধে আইন নিজের গতিতে চলবে।
২ দিন আগে
তিনি আরো বলেন, আমি মাত্রই এসেছি। আগেভাগেই বেশি কথা বলে কোনো লাভ নেই। আমাকে থিতু হতে দিন, পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করতে দিন। যথাসময়ে সবকিছু জানানো হবে।
৩ দিন আগে
শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) সকালে জনতা ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান মুহ. ফজলুর রহমান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মজিবর রহমানের নেতৃত্বে জনতা ব্যাংকের পক্ষ থেকে শহিদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়।
৫ দিন আগে