সেনানিবাসে বৈঠক: হাসনাতের বক্তব্যে দ্বিমত করে সারজিসের পোস্ট

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ২৩ মার্চ ২০২৫, ১৫: ০১

সেনানিবাসে ১১ মার্চের বৈঠক নিয়ে নতুন করে কথা বলেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম। আজ রোববার সকালের দিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজের ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্টে ‘১১ মার্চ সেনাপ্রধানের সাথে সাক্ষাৎ নিয়ে আমার জায়গা থেকে কিছু সংশোধন, সংযোজন ও বিয়োজন’—শীর্ষক একটি স্ট্যাটাসের অবতারণা করেন তিনি।

সারজিস আলম বলেন, ‘সেদিন (১১ মার্চ) আমি এবং হাসনাত (আব্দুল্লাহ) সেনাপ্রধানের সাথে গিয়ে কথা বলি। আমাদের সাথে আমাদের দলের গুরুত্বপূর্ণ আরেকজন সদস্যেরও যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু যাওয়ার পূর্ব মুহূর্তে ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে তিনি যেতে পারেননি। প্রথমেই স্পষ্ট করে জানিয়ে রাখি, সেদিন সেনানিবাসে আমাদের ডেকে নেওয়া হয়নি বরং সেনাপ্রধানের মিলিটারি অ্যাডভাইজারের সাথে যখন প্রয়োজন হতো তখন ম্যাসেজের মাধ্যমে আমাদের কিছু জিজ্ঞাসা ও উত্তর আদান-প্রদান হতো।’

সারজিস আলম তাঁর স্ট্যাটাসে লেখেন, ‘যেদিন সেনাপ্রধান পিলখানা হত্যাকাণ্ড দিবসে অনেকটা কড়া ভাষায় বক্তব্য দিলেন এবং বললেন “এনাফ ইজ এনাফ” তখন আমি সেনাপ্রধানের মিলিটারি অ্যাডভাইজরকে জিজ্ঞাসা করি—আপনাদের দৃষ্টিতে অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু দেখছেন কিনা? সেনাপ্রধানের বক্তব্য তুলনামূলক স্ট্রেইট ফরওয়ার্ড (straight-forward) এবং হার্শ (harsh) মনে হচ্ছে। তিনি আমাকে বললেন, তোমরা কি এ বিষয়ে সরাসরি কথা বলতে চাও? আমি বললাম—বলা যেতে পারে। এরপরে সেদিন সেনাপ্রধানের সাথে আমাদের সাক্ষাৎ হয়। সেনাভবনে সেই রুমে আমরা তিনজনই ছিলাম। সেনাপ্রধান, হাসনাত এবং আমি।’

সারজিস আলম বলেন, ‘মানুষ হিসেবে যেকোনো ব্যক্তি বা ব্যক্তির অভিমতকে একেকজন একেকভাবে অবজার্ভ করে। হাসনাত সেদিন তাঁর জায়গা থেকে যেভাবে সেনাপ্রধানের বক্তব্যকে অবজার্ভ ও রিসিভ করেছে এবং ফেসবুকে লিখেছে, আমার সে ক্ষেত্রে কিছুটা দ্বিমত আছে।’

তিনি বলেন, ‘আমার জায়গা থেকে আমি সেদিনের বক্তব্যকে সরাসরি “প্রস্তাব” দেওয়ার আঙ্গিকে দেখি না বরং “সরাসরি অভিমত প্রকাশের” মতো করে দেখি। “অভিমত প্রকাশ” এবং “প্রস্তাব দেওয়া” দুটি বিষয়ের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। যদিও পূর্বের তুলনায় সেদিন সেনাপ্রধান অনেকটা স্ট্রেইট-ফরওয়ার্ড ভাষায় কথা বলছিলেন। পাশাপাশি রিফাইন্ড আওয়ামী লীগের জন্য “চাপ দেওয়ার” যে বিষয়টি এসেছে, সেখানে “চাপ দেওয়া হয়েছে” এমনটি আমার মনে হয়নি। বরং রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ না আসলে দীর্ঘ মেয়াদে দেশের পরিস্থিতি এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে সমস্যার সৃষ্টি হবে, সেটা তিনি অতি আত্মবিশ্বাসের সাথে বলছিলেন।’

আওয়ামী লীগ ইস্যুতে হাসনাত আব্দুল্লাহর বক্তব্য প্রসঙ্গে সারজিস আলম তাঁর স্ট্যাটাসে লেখেন, ‘হাসনাতের বক্তব্যে যে টপিকগুলো এসেছিল, যেমন—রিফাইন্ড আওয়ামী লীগ, সাবের হোসেন, শিরিন শারমিন চৌধুরী, সোহেল তাজ, এসব নিয়ে কথা হয়েছিল। আওয়ামী লীগ ফিরে আসবে কি না, এই ইলেকশনে আওয়ামী লীগ থাকলে কি হবে, না থাকলে কি হবে, আওয়ামী লীগ এই ইলেকশন না করলে কবে ফিরে আসতে পারে কিংবা আদৌ আসবে কি না—এসব বিষয় নিয়ে কথা হয়েছিল। এসব সমীকরণে দেশের ওপরে কি প্রভাব পড়তে পারে, স্থিতিশীলতা কিংবা অস্থিতিশীলতা কোন পর্যায়ে যেতে পারে সেসব নিয়ে কথা হয়েছিল।’

হাসনাত আব্দুল্লাহর বক্তব্যের টোন প্রসঙ্গে সারজিস আলম বলেন, ‘কিন্তু যেই টোনে হাসনাতের ফেসবুক লেখা উপস্থাপন করা হয়েছে, আমি মনে করি কনভারসেশন ততটা এক্সট্রিম ছিল না। তবে অন্য কোনো একদিনের চেয়ে অবশ্যই স্ট্রেইট-ফরওয়ার্ড এবং সো-কনফিডেন্ট ছিল। দেশের স্থিতিশীলতার জন্য রিফাইন্ড আওয়ামী লীগের ইলেকশনে অংশগ্রহণ করা যে প্রয়োজনীয়, সে বিষয়ে সরাসরি অভিমত ছিল।’

এনসিপির এই মুখ্য সংগঠক আরও বলেন, ‘হাসনাত তাঁর বক্তব্যে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করেছে—“আলোচনার একপর্যায়ে বলি, যেই দল এখনো ক্ষমা চায় নাই, অপরাধ স্বীকার করে নাই, সেই দলকে আপনারা কীভাবে ক্ষমা করে দিবেন! অপর পক্ষ থেকে রেগে গিয়ে উত্তর আসে, “ইউ পিপল নো নাথিং। ইউ ল্যাক উইজডোম অ্যান্ড এক্সপেরিয়েন্স। উই আর ইন দিজ সার্ভিস ফর এটলিস্ট ফোর্টি ইয়ার্স। তোমার বয়সের থেকে বেশি”।’

উল্লিখিত বক্তব্য প্রসঙ্গে সারজিস বলেন, ‘এই কনভারসেশনটা হয়েছে, এটা সত্য। কিন্তু আমাদের রুমে বসে হওয়া কনভারসেশন হঠাৎ এককভাবে শেষ করে যখন সেনাপ্রধান উঠে দাঁড়ালেন এবং রুম থেকে কথা বলতে বলতে বের হয়ে এসে যখন আমরা গাড়িতে করে ফিরব, তার পূর্বে বিদায় নেওয়ার সময় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এই কনভারসেশন হয়েছে। সেনাপ্রধান রেগে যাওয়ার সুরে এই কথা বলেছেন বলে আমার মনে হয়নি, বরং বয়সে তুলনামূলক বেশ সিনিয়র কেউ জুনিয়রদের যেভাবে অভিজ্ঞতার ভারের কথা ব্যক্ত করে, সেই টোন এবং এক্সপ্রেশনে বলেছেন।’

হাসনাত আব্দুল্লাহর সমর্থনে স্লোগান দেওয়া প্রসঙ্গে এনসিপির এই নেতা বলেন, “‘হাসনাত না ওয়াকার”—এই ন্যারেটিভ এবং স্লোগান আমি প্রত্যাশা করি না। হাসনাতের জায়গা ভিন্ন এবং সেনাপ্রধান জনাব ওয়াকারুজ্জামানের জায়গাও ভিন্ন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সঙ্গে জাতীয় নাগরিক পার্টি অন্যান্য রাজনৈতিক দল কিংবা জনগণকে মুখোমুখি দাঁড় করানোও কখনো প্রাসঙ্গিক নয়। পাশাপাশি সেনাপ্রধানের পদত্যাগ নিয়ে যে কথা দু-এক জায়গায় আসছে সেটিও আমাদের বক্তব্য নয়।’

স্ট্যাটাসে সারজিস আরও বলেন, ‘এসবের পাশাপাশি আমি আমার ব্যক্তিগত জায়গা থেকে একটি অভিমত প্রকাশ করতে চাই—আমি ভুল হতে পারি, কিন্তু এই মুহূর্তে আমার এটিই সঠিক মনে হচ্ছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাথে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের কেউ না কেউ যোগাযোগ রক্ষা করে। সেই প্রাইভেসি তারা বজায় রাখে। আমাদের সাথে সেনাপ্রধানের যে বিষয়গুলো নিয়ে কথা হয়েছে, সেগুলোর সাথে আমাদের সরাসরি দ্বিমত থাকলেও আমরা সেগুলো নিয়ে আমাদের দলের ফোরামে বিস্তারিত আলোচনা করতে পারতাম, সিদ্ধান্ত নিতে পারতাম, সে অনুযায়ী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে পারতাম। কিংবা অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনার মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে আওয়ামী লীগের যেকোনো ভার্সনের বিরুদ্ধে এখনকার মতোই রাজপথে নামতে পারতাম। অথবা অন্য রাজনৈতিক দলগুলো সরাসরি আমাদের সাথে ঐকমত্যে না পৌঁছালে আমরা শুধুমাত্র আমাদের দলের পক্ষ থেকেই এই দাবি নিয়ে রাজপথে নামতে পারতাম।’

তিনি বলেন, ‘কিন্তু যেভাবে এই কথাগুলো ফেসবুকে স্ট্যাটাসের মাধ্যমে এসেছে এই প্রক্রিয়াটি আমার সমীচীন মনে হয়নি বরং এর ফলে পরবর্তীতে যেকোনো স্টেকহোল্ডারের সাথে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা আস্থার সংকটে পড়তে পারে।

আমার এই বক্তব্যে আমার সহযোদ্ধা হাসনাতের বক্তব্যের সাথে বেশ কিছু ক্ষেত্রে দ্বিমত এসেছে। এটার জন্য অনেকে আমার সমালোচনা করতে পারেন, কিন্তু আমি বিশ্বাস করি আমাদের ব্যক্তিত্ব স্রোতে গা ভাসানোর মতো কখনোই ছিল না। ছিল না বলেই আমরা হাসিনা রেজিমের বন্দুকের সামনে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলাম।’

হাসনাতের পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে সারজিস আলম বলেন, ‘আজও কেউ হাসনাতের দিকে বন্দুক তাক করলে তার সামনে দাঁড়িয়ে যাওয়ার কমিটমেন্ট আমাদের আছে। কিন্তু সহযোদ্ধার কোনো বিষয় যখন নিজের জায়গা থেকে সংশোধন দেওয়ার প্রয়োজন মনে করি তখন সেটাও আমি করব। সেই বিবেকবোধটুকু ছিল বলেই ৬ জুন প্রথম যেদিন শহীদ মিনারে কয়েকজন কোটা প্রথার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায়, তাদের মধ্যে সামনের সারিতে আমরা ছিলাম।’

তিনি বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি আমাদের এই বিবেকবোধের জায়গাটুকুই আমাদের সঠিক পথে রাখবে। আত্মসমালোচনা করার এই মানসিকতাই আমাদের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে নিয়ে যাবে। জুলাই গণহত্যা, বিডিআর হত্যাকাণ্ড, শাপলা চত্বরের হত্যাকাণ্ড ঘটানো “আওয়ামী লীগের যেকোনো ভার্সনের” বাংলাদেশের রাজনীতিতে আসার বিরুদ্ধে। আমাদের লড়াই অব্যাহত থাকবে। Truth shall prevail. ’

Ad
Ad
ad
ad
ad

রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

মির্জা ফখরুলের সংসদীয় আসন শূন্য ঘোষণা

শনিবার (২২ আগস্ট) জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের লেজিসলেটিভ সাপোর্ট উইংয়ের আইন প্রণয়ন শাখা-২-এর সচিব ব্যারিস্টার মো. গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়।

২ দিন আগে

স্থানীয় সরকারে মঈন খান, খাদ্যে আফরোজা— মন্ত্রিসভায় রদবদল

শুক্রবার মন্ত্রিসভায় নতুন যুক্ত হওয়া মন্ত্রীদের সঙ্গে শপথ নিয়েছেন এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতও। তিনি মন্ত্রিসভায় প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। ছয় মাসের যাত্রায় ‘পদোন্নতি’ পেলেন তিনি। প্রতিমন্ত্রী হিসেবে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে ছিলেন তিনি, একই মন্ত্রণালয়ে তাকে পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব দে

২ দিন আগে

মির্জা ফখরুলের সঙ্গে ‘কাজ করতে উন্মুখ’ ভারতের রাষ্ট্রপতি

বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে অভিনন্দন জানিয়েছেন ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু। তিনি বলেছেন, ‘আমাদের দুই প্রতিবেশী দেশের অংশীদারত্ব আরও জোরদার করতে আপনার সঙ্গে কাজ করতে উন্মুখ হয়ে আছি।’

৩ দিন আগে

প্রতিমন্ত্রী হলেন হুমায়ুন কবিরও, মিল্লাতের ‘পদোন্নতি’

নতুন করে মন্ত্রিসভায় যুক্ত হওয়া পাঁচজন হলেন— বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও নরসিংদী-২ আসনের সংসদ সদস্য ড. আবদুল মঈন খান, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান ও ভোলা-১ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ, বান্দরবানের সংসদ সদস্য সাচিং প্রু জেরী, গাইবান্ধা-৪ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ

৩ দিন আগে