
নাজমুল ইসলাম হৃদয়

জুলাই অভ্যুত্থানের নেতৃত্বস্থানীয়দের হাত ধরে গড়ে ওঠা জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল রাজপথ থেকে উঠে আসা ‘অভ্যুত্থানের স্পিরিট’। ‘নতুন বন্দোবস্তে’র কথা বলে দলের নেতারা দেখিয়েছিলেন রাষ্ট্র সংস্কারের আকাশসম স্বপ্ন। এর মধ্যেই তফসিল ঘোষণার মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে নির্বাচনের ট্রেন। ভোট সামনে রেখে সে নির্বাচনের ট্রেনে উঠেছে এনসিপিও, তবে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট বেঁধে।
জোটের পক্ষের নেতারা বলছেন, ভোট সামনে রেখে এটি কেবল একটি ‘কৌশলগত নির্বাচনি জোট’। তবে তাদের বক্তব্য দলের নেতাদেরই সন্তুষ্ট করতে পারছে না। যার প্রমাণ— এরই মধ্যে দলের কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে অন্তত পাঁচ নারীসহ এক ডজনের বেশি নেতা পদত্যাগ করেছেন, যারা কি না আবার দলটির মধ্যে ‘প্রগতিশীল রাজনীতির পক্ষের’ বলে পরিচিত। তাদের অনেকেই বলছেন, এর মাধ্যমে এনসিপির একটি মধ্যপন্থি রাজনৈতিক দল হিসেবে গড়ে ওঠার পথ রুদ্ধ হলো, দলটি ডানপন্থার দিকে চূড়ান্তভাবে ঝুঁকে পড়ল।
দলের ভেতরেই যখন এ অবস্থা, স্বাভাবিকভাবেই তা আরও বেশি আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে দলের বাইরেও। এনসিপির এই ‘কৌশলগত ইউ টার্ন’ তাদের স্বাধীন রাজনীতির পথে প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়াতে পারে— এমন আশঙ্কা করছেন অনেকে। মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর ‘ধোঁয়াশাপূর্ণ’ অবস্থানের কারণে সেই দলটির সঙ্গে জোট এনসিপিরও মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই প্রসঙ্গে অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। আবার একেবারেই নবগঠিত দল হিসেবে পুরনো একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোট করাকে এনসিপির ‘নতুন বন্দোবস্তে’র সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে অভিহিত করছেন কেউ কেউ।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এনসিপির এই জোট নিয়ে এখনই মন্তব্য করার সময় আসেনি। এ জোটের ফলে এনসিপিকে নিয়ে জনমনে দ্বিধা-সংশয় তৈরি হওয়াটা অমূলক নয়। তবে এ জোট করে তারা নিজেরাই নিজেদের প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তারপরও তারা এ জোটকে নির্বাচনি জোটে সীমাবদ্ধ রেখে নিজেদের রাজনীতি চালিয়ে যেতে পারে কি না, সেটি সময় বলে দেবে।
গঠনের সময় থেকেই এনসিপির অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি ছিল পুরোনো ধারার ক্ষমতার রাজনীতির বাইরে গিয়ে একটি ‘স্বতন্ত্র রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী’ তৈরি করা। জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ার পর সেই প্রতিশ্রুতি ধুলিসাৎ হয়ে গেছে বলে মনে করছেন দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের একাংশ।
এনসিপির এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে গত কয়েক দিনে দল ছেড়েছেন তাসনিম জারা, তাজনূভা জাবীন, আরিফ সোহেল, খালেদ সাইফুল্লাহ, মীর আরশাদুল হক, খান মুহাম্মদ মুরসালীন, আজাদ খান ভাসানী, মুশফিক উস সালেহীন, ফরহাদ আলম ভূঁইয়া, আসিফ নেহাল, মীর হাবীব আল মানজুর, মারজুক আহমেদ, আল আমিন আহমেদ টুটুল, মো. ওয়াহিদুজ্জামান ও সৈয়দা নীলিমা দোলার মতো শীর্ষস্থানীয় নেতারা।
পদত্যাগ করা এসব নেতারা দলটির বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংগঠনিক চালিকাশক্তির অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। তাদের অনেকেই সরাসরি জানিয়েছেন এনসিপি নিয়ে গভীর হতাশার কথা। পদত্যাগের কারণ হিসেবে কেউ কেউ ‘প্রতারিত’ হওয়ার অনুভূতিও তুলে ধরেছেন। তাদের প্রায় সবাই-ই বলেছেন, জামায়াতের সঙ্গে দলটির নির্বাচনি জোটের প্রক্রিয়াটি ছিল অস্বচ্ছ ও অগণতান্ত্রিক।
জামায়াতের সঙ্গে জোট বাঁধার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘এনসিপি নির্বাচনের প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছে। আমরা বলেছিলাম নির্বাচন এককভাবে করব। পরে মনোনয়নপত্র বিতরণ করেছি। এরপর আমরা তিন-দলীয় জোট করি। কিন্তু শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় আমরা বুঝতে পারি, নতুন বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করা এবং জুলাই প্রজন্মকে ধ্বংস করার পরিকল্পনা চলছে।’
নাহিদ আরও বলেন, ‘আমাদের মনে হয়েছে, এই নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করার জন্য আমরা জামায়াতে ইসলামী ও সমমনা দলের সঙ্গে কথা বলেছি। তাদের সঙ্গে নির্বাচনি সমঝোতায় পৌঁছেছি। আমরা একসঙ্গে নির্বাচনে অংশ নেব।’
জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার ব্যাখ্যা দিয়ে দলের সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, ‘ঐকমত্য কমিশনে সংস্কার প্রশ্নে বিএনপির সঙ্গেই অন্য দলগুলোর মতভিন্নতা পরিলক্ষিত হতো। সেখানে সংস্কারের পয়েন্টগুলোতে স্বাভাবিকভাবেই এনসিপি, জামায়াত ও অন্য দলগুলো একমত হয়েছে। সেক্ষেত্রে সংস্কারের বিষয়, দেশটাকে নতুন করে গড়া, নতুনভাবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামোকে গড়ে তোলার জন্য যে রাজনীতি, সে রাজনীতির প্রতি যে কমিটমেন্ট সেটাকেই নির্বাচনি রাজনীতিতে জোটের বা সমঝোতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রধানতম বিবেচ্য বিষয় হিসেবে এটাকে মূল্যায়ন করছি।’
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক পদ থেকে সরে দাঁড়ানো তাজনূভা জাবীন স্পষ্ট অভিযোগ করেছেন, পুরো বিষয়টি ছিল একটি ‘পরিকল্পিত ডিজাইন’। কর্মীদের অন্ধকারে রেখে এবং মনোনয়ন দেওয়ার নাটক সাজিয়ে শেষ মুহূর্তে সবাইকে জোট মানতে বাধ্য করা হয়েছে।
একে এক শীর্ষ নেতার দ্বারা অন্য শীর্ষ নেতাকে সরানোর ‘মাইনাস পলিটিক্স’ বা নোংরা রাজনীতির চর্চা হিসেবে অভিহিত করেছেন তাজনূভা। তার মতে, এনসিপি তার ‘স্বকীয়তা’ বিসর্জন দিয়ে জামায়াতের ‘আরেকটি দোকানে’ পরিণত হয়েছে।
দলের অন্যতম তাত্ত্বিক নেতা আরিফ সোহেল মনে করেন, জুলাই অভ্যুত্থান একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করেছিল। কিন্তু এনসিপি ‘নেগোশিয়েটেড সেটেলমেন্ট’ বা সমঝোতার মাধ্যমে সেই পুরোনো স্বৈরাচারী কাঠামোর অংশ হয়ে গেছে। ক্ষমতার লোভে তারা গণমানুষের কাতার থেকে সরে গেছে, যা জুলাইয়ের শহিদদের রক্তের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল।
এই জোটের মাধ্যমে এনসিপি ডানপন্থি বলয়ে ঢুকে পড়েছে অভিহিত করে আরেক পদত্যাগী নেতা সৈয়দা নীলিমা দোলা বলেন, ‘এতদিন আমি এনসিপির সঙ্গে ছিলাম, কারণ আমি মনে করেছিলাম, দলটি জুলাই-পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় সংস্কারের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করবে। তবে সম্প্রতি দলটির নানা সিদ্ধান্তের পর আমার কাছে এটুকু স্পষ্ট, এই দলটি সম্পূর্ণভাবে ডানপন্থি ঘরানায় ঢুকে পড়ছে এবং সেই ধারার রাজনীতিকেই তারা পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে।’
শুধু তাই নয়, এর মাধ্যমে এনসিপি জুলাই অভ্যুত্থানকে ধর্মীয় মোড়কে ভরে আওয়ামী বয়ানকে প্রতিষ্ঠিত করার পথে রয়েছে বলেও মন্তব্য করেছেন সৈয়দা নীলিমা দোলা।
এনসিপির কৃষক উইংয়ের সাবেক প্রধান সমন্বয়ক আজাদ খান ভাসানীর পদত্যাগপত্রেও উঠে এসেছে এনসিপির ‘আদর্শিক দেউলিয়াত্বে’র চিত্র। তিনি উল্লেখ করেছেন, মওলানা ভাসানীর ‘আধিপত্যবাদ ও বৈষম্যবিরোধী’ রাজনীতির সঙ্গে এনসিপির বর্তমান কার্যক্রমের কোনো মিল নেই। নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত ও স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়ে এনসিপি পুরোনো ক্ষমতার রাজনীতিতেই ফিরে গেছে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি রিফাত রশিদ রাজনীতি ডটকমকে বলেন, “এনসিপির এই সিদ্ধান্ত আত্মঘাতী। এনসিপিকে নিয়ে বাজারে এতদিন প্রচলিত ছিল, তারা জামায়াতের ‘বি-টিম’, এই জোটের মাধ্যমে সেটিই সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলো। এনসিপির নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণ যে বাংলামোটর (এনসিপি কার্যালয়) থেকে নয়, বরং মগবাজারের শুরা কাউন্সিল (জামায়াত কার্যালয়) থেকে আসে— এই ধারণা এখন জনমনে বদ্ধমূল হবে।”
দল গঠনের এক বছরের মাথায় অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন এনসিপির জন্য অগ্নিপরীক্ষা হয়ে এসেছিল বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, এই নির্বাচনের মাধ্যমে এনসিপি নিজেদের নিজের আদর্শিক ভিত্তি ও সাংগঠনিক কাঠামো মজবুত করার পাশাপাশি জনভিত্তি গড়ে তোলার সুযোগ পেয়েছিল। বড় রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোট করার মাধ্যমে এনসিপি সে সুযোগ হারাল বলে মনে করছেন তারা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আয়নুল ইসলাম রাজনীতি ডটকমকে বলেন, “একটি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বস্থানীয় অংশ থেকে যখন বড় একটি গ্রুপ বেরিয়ে যায়, তখন সাংগঠনিকভাবে দলটি মানসিকভাবে ও কাঠামোগতভাবে ভেঙে পড়ে। এনসিপি এতদিন মানুষের কাছে যে গ্রহণযোগ্যতা বা ‘অ্যাকসেপ্টেন্স’ তৈরি করেছিল, এই ভাঙনের ফলে তা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।”
অধ্যাপক আয়নুল মনে করেন, এনসিপির সমর্থক গোষ্ঠীর একটি বড় অংশই বিএনপি-জামায়াত বা বাম দলগুলোর বাইরে একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক শক্তির প্রত্যাশা করত দলটির কাছে। জামায়াতের সঙ্গে জোট করার মাধ্যমে এনসিপির এই সমর্থক গোষ্ঠী হতাশার মধ্যে পড়েছে।
জোটের পক্ষে থাকা এনসিপি নেতাদের দাবি, জামায়াতের সঙ্গে তাদের জোটটি আদর্শিক নয়, কেবল নির্বাচনি সমঝোতা মাত্র। তবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে অধ্যাপক আয়নুল বলেন, ‘নির্বাচনি সমঝোতা করতে গেলেও এক ধরনের আদর্শিক মিল থাকতে হয়। বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসেও সমমনা দলগুলোকেই সাধারণত জোট করতে দেখা যায়।’ ফলে এনসিপির এই ব্যাখ্যা তাই রাজনীতির ব্যাকরণ ও সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হচ্ছে না বলেই মন্তব্য অধ্যাপক আয়নুলের।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের আরেক অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমানের কাছে অবশ্য এই জোট এনসিপির আদর্শচ্যুতির প্রতিফলন বলে মনে হচ্ছে না। রাজনীতি ডটকমকে তিনি বলেন, ‘একটি দল সাধারণত নির্বাচনে জোট করে আসন সংখ্যা বাড়ানো এবং জয়ের সম্ভাবনা বা ভবিষ্যতে সরকার গঠনে ভূমিকা রাখার সুযোগ নিশ্চিত করার জন্য। এনসিপির ক্ষেত্রেও মনে হচ্ছে, তারা এই জোটে গিয়ে তুলনামূলক বেশি আসন পাওয়ার বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়েছে এবং তাদের কৌশলে এটি সুবিধাজনক মনে হয়েছে।’
অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান আরও বলেন, ‘এনসিপি একটি মধ্যপন্থি দল হয়ে ইসলামপন্থি দলের সঙ্গে জোট করায় দলের অভ্যন্তরীণ বা আদর্শিক অবস্থানে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়ার কারণ নেই। কারণ নির্বাচনি জোট ও দলের নিজস্ব আদর্শ দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। অতীতেও দেখা গেছে, নির্বাচনি স্বার্থে দলগুলো জোট বাঁধে, নির্বাচন শেষে স্বকীয়তায় ফিরে আসে। তাই একে আদর্শিক বিচ্যুতি হিসেবে দেখার চেয়ে নির্বাচনি সমঝোতা হিসেবে দেখাই যৌক্তিক।’
এর আগে নির্বাচন সামনে রেখে এনসিপি ১২৫টি আসনের জন্য প্রার্থী মনোনয়ন চূড়ান্ত করেছিল। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে দলটির ৩০টি আসনে সমঝোতার কথা জানা যাচ্ছে। সে ক্ষেত্রে সমঝোতার বাইরে থাকা আসনগুলোতে এনসিপি কোনো প্রার্থী দেবে না। ফলে এসব আসনে এনসিপির মনোনয়ন যারা পেয়েছিলেন, তারা বিদ্রোহী হয়ে উঠতে পারেন বলে আশঙ্কা রয়েছে।
রিফাত রশিদ রাজনীতি ডটকমকে বলেন, যারা এলাকায় নির্বাচনি প্রচার শুরু করেছিলেন, তারা নির্বাচন না করতে পারলে তাদের রাজনীতি নষ্ট হয়ে যাবে। এতে এনসিপির নিজস্ব সাংগঠনিক ভিত্তি ভেঙেচুরে যাবে। আবার এনসিপির ছাত্র সংগঠন ‘জাতীয় ছাত্রশক্তি’ ক্যাম্পাসে জামায়াতবিরোধী হিসেবে দাঁড়িয়েছিল। এই জোটের ফলে তারা ক্যাম্পাসে অকার্যকর হয়ে পড়বে। ফলে এই জোটের মাধ্যমে জুলাই অভ্যুত্থান ও তার রাজনীতিকে পুরোপুরি জামায়াতের কাছে ‘হ্যান্ডওভার’ করে দেওয়া হয়েছে।
এনসিপিতে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব নিয়েও উঠে এসেছে নানা তথ্য। এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম দাবি করেছিলেন, ১৭০ জন নেতার সমর্থনে ও সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে জামায়াতের সঙ্গে জোটের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছিল। দলের ১৮৪ জন সদস্য এই জোটের পক্ষে— সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন দাবিও ছড়িয়ে পড়েছিল।
এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক নাভিদ নওরোজ শাহ্ এই দাবিকে ‘ভুয়া’ ও ‘বিভ্রান্তিকর’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। ফেসবুকে এক পোস্টে তিনি বলেন, ‘এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটিতে ২১৪ জন সদস্যই নেই, তাই ১৮৪ জনের সমর্থনের হিসাবটি কাল্পনিক। সময় স্বল্পতার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে জোটের বিপক্ষে আমরা ৩০ জন চিঠি দিলেও দলটির অভ্যন্তরে এই জোটবিরোধীদের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি।’
নাভিদ নওরোজ শাহের মতে, একাত্তরের স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকা, নারী অধিকার নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ অবস্থান ও ধর্মীয় উগ্রপন্থার আশঙ্কায় এনসিপির প্রগতিশীল অংশ জামায়াতের সঙ্গে রাজনীতি করতে মানসিকভাবে প্রস্তুত নয়। দলের ভেতরে থেকেও যারা এখনো পদত্যাগ করেননি, তারাও পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছেন এবং ভবিষ্যতে বড় ধরনের ভাঙনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
অভ্যন্তরীণ এই রক্তক্ষরণের পাশাপাশি জোট শরিকদের সঙ্গেও এনসিপির সম্পর্ক সুখকর নয়। বিশেষ করে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সঙ্গে এনসিপির আসন ভাগাভাগি নিয়ে চলছে প্রকাশ্য স্নায়ুযুদ্ধ।
এনসিপি ও এবি পার্টি এর আগেই আলাদা জোট করেছিল। এখন এনসিপি জামায়াতের সঙ্গে জোটে যুক্ত হওয়ায় ইসলামী আন্দোলন তাদের প্রাপ্য আসন কমে যাওয়ার শঙ্কার কথা জানিয়েছে। তারা এরই মধ্যে ২৬৮টি আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে এবং সম্মানজনক সমঝোতা না হলে একক নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলেও জানিয়েছে।
এনসিপি নিজেদের জোটে ‘দ্বিতীয় বৃহত্তম দল’ দাবি করে ৩০টি আসন চাইলেও ইসলামী আন্দোলনের নায়েবে আমির সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম প্রকাশ্যে এনসিপির সাংগঠনিক শক্তি ও ভোটভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। জামায়াত নেতাদের দাবি অনুযায়ী, এনসিপির ৬ শতাংশ জনসমর্থন রয়েছে। কিন্তু মাঠের রাজনীতিতে শরিকরা এনসিপিকে কোনো ছাড় দিতে নারাজ। ফলে জামায়াত ১৭১টি আসনে লড়তে চাইলেও শরিকদের চাপে এবং এনসিপির জন্য আসন বের করতে গিয়ে তাদেরও হিমশিম খেতে হচ্ছে।

জুলাই অভ্যুত্থানের নেতৃত্বস্থানীয়দের হাত ধরে গড়ে ওঠা জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল রাজপথ থেকে উঠে আসা ‘অভ্যুত্থানের স্পিরিট’। ‘নতুন বন্দোবস্তে’র কথা বলে দলের নেতারা দেখিয়েছিলেন রাষ্ট্র সংস্কারের আকাশসম স্বপ্ন। এর মধ্যেই তফসিল ঘোষণার মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে নির্বাচনের ট্রেন। ভোট সামনে রেখে সে নির্বাচনের ট্রেনে উঠেছে এনসিপিও, তবে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট বেঁধে।
জোটের পক্ষের নেতারা বলছেন, ভোট সামনে রেখে এটি কেবল একটি ‘কৌশলগত নির্বাচনি জোট’। তবে তাদের বক্তব্য দলের নেতাদেরই সন্তুষ্ট করতে পারছে না। যার প্রমাণ— এরই মধ্যে দলের কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে অন্তত পাঁচ নারীসহ এক ডজনের বেশি নেতা পদত্যাগ করেছেন, যারা কি না আবার দলটির মধ্যে ‘প্রগতিশীল রাজনীতির পক্ষের’ বলে পরিচিত। তাদের অনেকেই বলছেন, এর মাধ্যমে এনসিপির একটি মধ্যপন্থি রাজনৈতিক দল হিসেবে গড়ে ওঠার পথ রুদ্ধ হলো, দলটি ডানপন্থার দিকে চূড়ান্তভাবে ঝুঁকে পড়ল।
দলের ভেতরেই যখন এ অবস্থা, স্বাভাবিকভাবেই তা আরও বেশি আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে দলের বাইরেও। এনসিপির এই ‘কৌশলগত ইউ টার্ন’ তাদের স্বাধীন রাজনীতির পথে প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়াতে পারে— এমন আশঙ্কা করছেন অনেকে। মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর ‘ধোঁয়াশাপূর্ণ’ অবস্থানের কারণে সেই দলটির সঙ্গে জোট এনসিপিরও মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই প্রসঙ্গে অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। আবার একেবারেই নবগঠিত দল হিসেবে পুরনো একটি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোট করাকে এনসিপির ‘নতুন বন্দোবস্তে’র সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে অভিহিত করছেন কেউ কেউ।
তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এনসিপির এই জোট নিয়ে এখনই মন্তব্য করার সময় আসেনি। এ জোটের ফলে এনসিপিকে নিয়ে জনমনে দ্বিধা-সংশয় তৈরি হওয়াটা অমূলক নয়। তবে এ জোট করে তারা নিজেরাই নিজেদের প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তারপরও তারা এ জোটকে নির্বাচনি জোটে সীমাবদ্ধ রেখে নিজেদের রাজনীতি চালিয়ে যেতে পারে কি না, সেটি সময় বলে দেবে।
গঠনের সময় থেকেই এনসিপির অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি ছিল পুরোনো ধারার ক্ষমতার রাজনীতির বাইরে গিয়ে একটি ‘স্বতন্ত্র রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী’ তৈরি করা। জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ার পর সেই প্রতিশ্রুতি ধুলিসাৎ হয়ে গেছে বলে মনে করছেন দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের একাংশ।
এনসিপির এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে গত কয়েক দিনে দল ছেড়েছেন তাসনিম জারা, তাজনূভা জাবীন, আরিফ সোহেল, খালেদ সাইফুল্লাহ, মীর আরশাদুল হক, খান মুহাম্মদ মুরসালীন, আজাদ খান ভাসানী, মুশফিক উস সালেহীন, ফরহাদ আলম ভূঁইয়া, আসিফ নেহাল, মীর হাবীব আল মানজুর, মারজুক আহমেদ, আল আমিন আহমেদ টুটুল, মো. ওয়াহিদুজ্জামান ও সৈয়দা নীলিমা দোলার মতো শীর্ষস্থানীয় নেতারা।
পদত্যাগ করা এসব নেতারা দলটির বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংগঠনিক চালিকাশক্তির অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। তাদের অনেকেই সরাসরি জানিয়েছেন এনসিপি নিয়ে গভীর হতাশার কথা। পদত্যাগের কারণ হিসেবে কেউ কেউ ‘প্রতারিত’ হওয়ার অনুভূতিও তুলে ধরেছেন। তাদের প্রায় সবাই-ই বলেছেন, জামায়াতের সঙ্গে দলটির নির্বাচনি জোটের প্রক্রিয়াটি ছিল অস্বচ্ছ ও অগণতান্ত্রিক।
জামায়াতের সঙ্গে জোট বাঁধার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘এনসিপি নির্বাচনের প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছে। আমরা বলেছিলাম নির্বাচন এককভাবে করব। পরে মনোনয়নপত্র বিতরণ করেছি। এরপর আমরা তিন-দলীয় জোট করি। কিন্তু শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় আমরা বুঝতে পারি, নতুন বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করা এবং জুলাই প্রজন্মকে ধ্বংস করার পরিকল্পনা চলছে।’
নাহিদ আরও বলেন, ‘আমাদের মনে হয়েছে, এই নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করার জন্য আমরা জামায়াতে ইসলামী ও সমমনা দলের সঙ্গে কথা বলেছি। তাদের সঙ্গে নির্বাচনি সমঝোতায় পৌঁছেছি। আমরা একসঙ্গে নির্বাচনে অংশ নেব।’
জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার ব্যাখ্যা দিয়ে দলের সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, ‘ঐকমত্য কমিশনে সংস্কার প্রশ্নে বিএনপির সঙ্গেই অন্য দলগুলোর মতভিন্নতা পরিলক্ষিত হতো। সেখানে সংস্কারের পয়েন্টগুলোতে স্বাভাবিকভাবেই এনসিপি, জামায়াত ও অন্য দলগুলো একমত হয়েছে। সেক্ষেত্রে সংস্কারের বিষয়, দেশটাকে নতুন করে গড়া, নতুনভাবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামোকে গড়ে তোলার জন্য যে রাজনীতি, সে রাজনীতির প্রতি যে কমিটমেন্ট সেটাকেই নির্বাচনি রাজনীতিতে জোটের বা সমঝোতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে প্রধানতম বিবেচ্য বিষয় হিসেবে এটাকে মূল্যায়ন করছি।’
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক পদ থেকে সরে দাঁড়ানো তাজনূভা জাবীন স্পষ্ট অভিযোগ করেছেন, পুরো বিষয়টি ছিল একটি ‘পরিকল্পিত ডিজাইন’। কর্মীদের অন্ধকারে রেখে এবং মনোনয়ন দেওয়ার নাটক সাজিয়ে শেষ মুহূর্তে সবাইকে জোট মানতে বাধ্য করা হয়েছে।
একে এক শীর্ষ নেতার দ্বারা অন্য শীর্ষ নেতাকে সরানোর ‘মাইনাস পলিটিক্স’ বা নোংরা রাজনীতির চর্চা হিসেবে অভিহিত করেছেন তাজনূভা। তার মতে, এনসিপি তার ‘স্বকীয়তা’ বিসর্জন দিয়ে জামায়াতের ‘আরেকটি দোকানে’ পরিণত হয়েছে।
দলের অন্যতম তাত্ত্বিক নেতা আরিফ সোহেল মনে করেন, জুলাই অভ্যুত্থান একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করেছিল। কিন্তু এনসিপি ‘নেগোশিয়েটেড সেটেলমেন্ট’ বা সমঝোতার মাধ্যমে সেই পুরোনো স্বৈরাচারী কাঠামোর অংশ হয়ে গেছে। ক্ষমতার লোভে তারা গণমানুষের কাতার থেকে সরে গেছে, যা জুলাইয়ের শহিদদের রক্তের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল।
এই জোটের মাধ্যমে এনসিপি ডানপন্থি বলয়ে ঢুকে পড়েছে অভিহিত করে আরেক পদত্যাগী নেতা সৈয়দা নীলিমা দোলা বলেন, ‘এতদিন আমি এনসিপির সঙ্গে ছিলাম, কারণ আমি মনে করেছিলাম, দলটি জুলাই-পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় সংস্কারের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করবে। তবে সম্প্রতি দলটির নানা সিদ্ধান্তের পর আমার কাছে এটুকু স্পষ্ট, এই দলটি সম্পূর্ণভাবে ডানপন্থি ঘরানায় ঢুকে পড়ছে এবং সেই ধারার রাজনীতিকেই তারা পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে।’
শুধু তাই নয়, এর মাধ্যমে এনসিপি জুলাই অভ্যুত্থানকে ধর্মীয় মোড়কে ভরে আওয়ামী বয়ানকে প্রতিষ্ঠিত করার পথে রয়েছে বলেও মন্তব্য করেছেন সৈয়দা নীলিমা দোলা।
এনসিপির কৃষক উইংয়ের সাবেক প্রধান সমন্বয়ক আজাদ খান ভাসানীর পদত্যাগপত্রেও উঠে এসেছে এনসিপির ‘আদর্শিক দেউলিয়াত্বে’র চিত্র। তিনি উল্লেখ করেছেন, মওলানা ভাসানীর ‘আধিপত্যবাদ ও বৈষম্যবিরোধী’ রাজনীতির সঙ্গে এনসিপির বর্তমান কার্যক্রমের কোনো মিল নেই। নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত ও স্বতন্ত্র পরিচয় গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়ে এনসিপি পুরোনো ক্ষমতার রাজনীতিতেই ফিরে গেছে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি রিফাত রশিদ রাজনীতি ডটকমকে বলেন, “এনসিপির এই সিদ্ধান্ত আত্মঘাতী। এনসিপিকে নিয়ে বাজারে এতদিন প্রচলিত ছিল, তারা জামায়াতের ‘বি-টিম’, এই জোটের মাধ্যমে সেটিই সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলো। এনসিপির নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণ যে বাংলামোটর (এনসিপি কার্যালয়) থেকে নয়, বরং মগবাজারের শুরা কাউন্সিল (জামায়াত কার্যালয়) থেকে আসে— এই ধারণা এখন জনমনে বদ্ধমূল হবে।”
দল গঠনের এক বছরের মাথায় অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন এনসিপির জন্য অগ্নিপরীক্ষা হয়ে এসেছিল বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, এই নির্বাচনের মাধ্যমে এনসিপি নিজেদের নিজের আদর্শিক ভিত্তি ও সাংগঠনিক কাঠামো মজবুত করার পাশাপাশি জনভিত্তি গড়ে তোলার সুযোগ পেয়েছিল। বড় রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোট করার মাধ্যমে এনসিপি সে সুযোগ হারাল বলে মনে করছেন তারা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আয়নুল ইসলাম রাজনীতি ডটকমকে বলেন, “একটি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বস্থানীয় অংশ থেকে যখন বড় একটি গ্রুপ বেরিয়ে যায়, তখন সাংগঠনিকভাবে দলটি মানসিকভাবে ও কাঠামোগতভাবে ভেঙে পড়ে। এনসিপি এতদিন মানুষের কাছে যে গ্রহণযোগ্যতা বা ‘অ্যাকসেপ্টেন্স’ তৈরি করেছিল, এই ভাঙনের ফলে তা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।”
অধ্যাপক আয়নুল মনে করেন, এনসিপির সমর্থক গোষ্ঠীর একটি বড় অংশই বিএনপি-জামায়াত বা বাম দলগুলোর বাইরে একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক শক্তির প্রত্যাশা করত দলটির কাছে। জামায়াতের সঙ্গে জোট করার মাধ্যমে এনসিপির এই সমর্থক গোষ্ঠী হতাশার মধ্যে পড়েছে।
জোটের পক্ষে থাকা এনসিপি নেতাদের দাবি, জামায়াতের সঙ্গে তাদের জোটটি আদর্শিক নয়, কেবল নির্বাচনি সমঝোতা মাত্র। তবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে অধ্যাপক আয়নুল বলেন, ‘নির্বাচনি সমঝোতা করতে গেলেও এক ধরনের আদর্শিক মিল থাকতে হয়। বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসেও সমমনা দলগুলোকেই সাধারণত জোট করতে দেখা যায়।’ ফলে এনসিপির এই ব্যাখ্যা তাই রাজনীতির ব্যাকরণ ও সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হচ্ছে না বলেই মন্তব্য অধ্যাপক আয়নুলের।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের আরেক অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমানের কাছে অবশ্য এই জোট এনসিপির আদর্শচ্যুতির প্রতিফলন বলে মনে হচ্ছে না। রাজনীতি ডটকমকে তিনি বলেন, ‘একটি দল সাধারণত নির্বাচনে জোট করে আসন সংখ্যা বাড়ানো এবং জয়ের সম্ভাবনা বা ভবিষ্যতে সরকার গঠনে ভূমিকা রাখার সুযোগ নিশ্চিত করার জন্য। এনসিপির ক্ষেত্রেও মনে হচ্ছে, তারা এই জোটে গিয়ে তুলনামূলক বেশি আসন পাওয়ার বিষয়টিকে প্রাধান্য দিয়েছে এবং তাদের কৌশলে এটি সুবিধাজনক মনে হয়েছে।’
অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান আরও বলেন, ‘এনসিপি একটি মধ্যপন্থি দল হয়ে ইসলামপন্থি দলের সঙ্গে জোট করায় দলের অভ্যন্তরীণ বা আদর্শিক অবস্থানে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়ার কারণ নেই। কারণ নির্বাচনি জোট ও দলের নিজস্ব আদর্শ দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। অতীতেও দেখা গেছে, নির্বাচনি স্বার্থে দলগুলো জোট বাঁধে, নির্বাচন শেষে স্বকীয়তায় ফিরে আসে। তাই একে আদর্শিক বিচ্যুতি হিসেবে দেখার চেয়ে নির্বাচনি সমঝোতা হিসেবে দেখাই যৌক্তিক।’
এর আগে নির্বাচন সামনে রেখে এনসিপি ১২৫টি আসনের জন্য প্রার্থী মনোনয়ন চূড়ান্ত করেছিল। জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে দলটির ৩০টি আসনে সমঝোতার কথা জানা যাচ্ছে। সে ক্ষেত্রে সমঝোতার বাইরে থাকা আসনগুলোতে এনসিপি কোনো প্রার্থী দেবে না। ফলে এসব আসনে এনসিপির মনোনয়ন যারা পেয়েছিলেন, তারা বিদ্রোহী হয়ে উঠতে পারেন বলে আশঙ্কা রয়েছে।
রিফাত রশিদ রাজনীতি ডটকমকে বলেন, যারা এলাকায় নির্বাচনি প্রচার শুরু করেছিলেন, তারা নির্বাচন না করতে পারলে তাদের রাজনীতি নষ্ট হয়ে যাবে। এতে এনসিপির নিজস্ব সাংগঠনিক ভিত্তি ভেঙেচুরে যাবে। আবার এনসিপির ছাত্র সংগঠন ‘জাতীয় ছাত্রশক্তি’ ক্যাম্পাসে জামায়াতবিরোধী হিসেবে দাঁড়িয়েছিল। এই জোটের ফলে তারা ক্যাম্পাসে অকার্যকর হয়ে পড়বে। ফলে এই জোটের মাধ্যমে জুলাই অভ্যুত্থান ও তার রাজনীতিকে পুরোপুরি জামায়াতের কাছে ‘হ্যান্ডওভার’ করে দেওয়া হয়েছে।
এনসিপিতে নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব নিয়েও উঠে এসেছে নানা তথ্য। এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম দাবি করেছিলেন, ১৭০ জন নেতার সমর্থনে ও সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে জামায়াতের সঙ্গে জোটের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছিল। দলের ১৮৪ জন সদস্য এই জোটের পক্ষে— সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন দাবিও ছড়িয়ে পড়েছিল।
এনসিপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক নাভিদ নওরোজ শাহ্ এই দাবিকে ‘ভুয়া’ ও ‘বিভ্রান্তিকর’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। ফেসবুকে এক পোস্টে তিনি বলেন, ‘এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটিতে ২১৪ জন সদস্যই নেই, তাই ১৮৪ জনের সমর্থনের হিসাবটি কাল্পনিক। সময় স্বল্পতার কারণে তাৎক্ষণিকভাবে জোটের বিপক্ষে আমরা ৩০ জন চিঠি দিলেও দলটির অভ্যন্তরে এই জোটবিরোধীদের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি।’
নাভিদ নওরোজ শাহের মতে, একাত্তরের স্বাধীনতাবিরোধী ভূমিকা, নারী অধিকার নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ অবস্থান ও ধর্মীয় উগ্রপন্থার আশঙ্কায় এনসিপির প্রগতিশীল অংশ জামায়াতের সঙ্গে রাজনীতি করতে মানসিকভাবে প্রস্তুত নয়। দলের ভেতরে থেকেও যারা এখনো পদত্যাগ করেননি, তারাও পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছেন এবং ভবিষ্যতে বড় ধরনের ভাঙনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
অভ্যন্তরীণ এই রক্তক্ষরণের পাশাপাশি জোট শরিকদের সঙ্গেও এনসিপির সম্পর্ক সুখকর নয়। বিশেষ করে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সঙ্গে এনসিপির আসন ভাগাভাগি নিয়ে চলছে প্রকাশ্য স্নায়ুযুদ্ধ।
এনসিপি ও এবি পার্টি এর আগেই আলাদা জোট করেছিল। এখন এনসিপি জামায়াতের সঙ্গে জোটে যুক্ত হওয়ায় ইসলামী আন্দোলন তাদের প্রাপ্য আসন কমে যাওয়ার শঙ্কার কথা জানিয়েছে। তারা এরই মধ্যে ২৬৮টি আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে এবং সম্মানজনক সমঝোতা না হলে একক নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলেও জানিয়েছে।
এনসিপি নিজেদের জোটে ‘দ্বিতীয় বৃহত্তম দল’ দাবি করে ৩০টি আসন চাইলেও ইসলামী আন্দোলনের নায়েবে আমির সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম প্রকাশ্যে এনসিপির সাংগঠনিক শক্তি ও ভোটভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। জামায়াত নেতাদের দাবি অনুযায়ী, এনসিপির ৬ শতাংশ জনসমর্থন রয়েছে। কিন্তু মাঠের রাজনীতিতে শরিকরা এনসিপিকে কোনো ছাড় দিতে নারাজ। ফলে জামায়াত ১৭১টি আসনে লড়তে চাইলেও শরিকদের চাপে এবং এনসিপির জন্য আসন বের করতে গিয়ে তাদেরও হিমশিম খেতে হচ্ছে।

বুধবার (৭ জানুয়ারি) বিকেলে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হুমায়ুন কবির উপস্থিত ছিলেন।
৩ ঘণ্টা আগে
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান আগামী ১৩ জানুয়ারি লালমনিরহাট সফরে যাচ্ছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে জেলা বিএনপির আয়োজিত দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠানে যোগ দিতেই তিনি লালমনিরহাট যাচ্ছেন বলে জানিয়েছে দলীয় সূত্র।
৩ ঘণ্টা আগে
হবিগঞ্জ-১ (নবীগঞ্জ-বাহুবল) আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ড. রেজা কিবরিয়াকে নির্বাচনি আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগে শোকজ নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
৫ ঘণ্টা আগে
জামায়াতে ইসলামের আমির ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) উচ্চ পর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দল।
৬ ঘণ্টা আগে