
নাজমুল ইসলাম হৃদয়

‘ছাগল’— নিছক একটি সাধারণ প্রাণী হলেও বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেশ আলোচিত এক নাম। সময়ের পরিক্রমায় এই প্রাণীটি বারবারই উঠে এসেছে আলোচনার কেন্দ্রে। সম্প্রতি এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারীর ‘ছাগলকাণ্ড’ থেকে শুরু করে প্রায় ৮০ বছর আগে মহাত্মা গান্ধীর ছাগল চুরির ঘটনা— রাজনৈতিক ইতিহাসের নানা অধ্যায়েই জড়িয়ে আছে ‘ছাগল’।
গল্পটা শুরু করা যাক গত সপ্তাহ থেকে।
২০২৪ সালের শেষ দিকে অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুলের সরকারি বাসভবন থেকে দুটি ছাগল খোয়া যায়। সরকারি বাসভবনের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, দেয়াল টপকে ছাগল দুটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। একটিকে জবাই করে ভোজের আয়োজন করা হয়, আর অন্যটির গলায় সরকারের পদত্যাগ দাবি করা স্লোগানসংবলিত একটি প্ল্যাকার্ড ঝুলিয়ে ফেরত পাঠানো হয়।
সেসময় একটি সংবাদমাধ্যম জানায়, ছাগল ‘চুরি’ করা ব্যক্তিদের একজন ছিলেন নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী, যিনি বর্তমানে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক।
ঘটনাটি তখন নিছক ‘মজা’ মনে হলেও ২০২৬ সালে এসে ড. আসিফ নজরুলের একটি বক্তব্যে তা নতুন করে আলোচনায় আসে। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের এই উপদেষ্টা এক টকশোতে জানান, ২০২৪ সালের শেষ দিকে তার ছোট মেয়ের পোষা একটি ছাগল চুরি হয়ে যায়। ঘটনাটি তার মেয়েকে গভীরভাবে মানসিক আঘাত করেছিল বলেও জানান তিনি।
ঘটনাটি পুরোনো হলেও নতুন করে আগুন জ্বলে ওঠে যখন আসিফ নজরুল তার শিশুকন্যার ‘নাজুক মানসিক পরিস্থিতির’ কথা জানালেও তা খুব একটা আমলে নেননি নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী।
আসিফ নজরুলের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ছাগল দুটোই খাওয়া উচিত ছিল। পাল্টা যুক্তি হিসেবে তিনি অভিযোগ করেন, আসিফ নজরুল অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা থাকাকালে সরকারি বাসভবনে পশুপালন করে সেই খামারের নিরাপত্তায় সরকারি পুলিশ ব্যবহার করেছিলেন।
এদিকে, ঘটনার রেশ লেগেছে অন্য রাজনৈতিক দলেও। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারীকে ‘একটা আস্ত জানোয়ারের বাচ্চা’ বলে ফেসবুকে পোস্ট করেন বিএনপির সংরক্ষিত আসনের এমপি মানসুরা আলম।
পোস্টটিতে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের জঞ্জাল আগামীর প্রজন্মকে নষ্ট করবে। করার আগেই এদের রাজনীতি বন্ধ করাইতে হবে। একটা সাধারণ নিরীহ প্রাণীর প্রতি যার হিংস্র আচরণ, দেশের মানুষের রাজনৈতিক দায়িত্ব এর কাছে ভয়ংকর।’ এ ছাড়া নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারীর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবিও করেন তিনি।
এই বাদানুবাদ থেকে স্পষ্ট, একটি শিশুর পোষা প্রাণীকে ঘিরে তৈরি হওয়া তিক্ততা প্রায় দুই বছর পরও পুরোপুরি প্রশমিত হয়নি। বরং তা এখন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার নতুন উপকরণ হয়ে উঠেছে। একটি শিশুর কষ্ট নিয়ে প্রকাশ্যে এমন কথার লড়াই কতটা সমীচীন, সে প্রশ্ন অবশ্য রাজনৈতিক মহলেও উঠেছে।
২০২৪ সালের কোরবানির ঈদ।
রাজধানীর একটি খামার থেকে একটি ছাগলের সঙ্গে সেলফি তুলে ফেসবুকে দিয়েছিলেন তরুণ মুশফিকুর রহমান, যাকে সবাই চেনে ‘ইফাত’ নামে। ছাগলটির দাম হাঁকা হয়েছিল ১৫ লাখ টাকা। যদিও পরে খামার কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রকৃত ক্রয়মূল্য ছিল ১২ লাখ টাকা, আর শেষ পর্যন্ত ইফাত ছাগলটি নেনওনি। ততক্ষণে অবশ্য কাজ হয়ে গেছে।
নেটিজেনরা খুঁজে বের করেন, ইফাতের বাবা মতিউর রহমান জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) একজন সদস্য। মতিউর প্রথমে দাবি করেন, ইফাত তাঁর ছেলেই নয়। কিন্তু অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, মতিউরের দ্বিতীয় সংসারের সন্তান এই ইফাত।
একটি ছাগল এখানে নিছক ছাগল থাকেনি। সে হয়ে ওঠে এমন এক চাবি, যা দিয়ে খুলে যায় একটি পুরো দুর্নীতির সিন্দুক। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন সংশ্লিষ্ট খামারে অভিযান চালিয়ে আমদানি-নিষিদ্ধ জাতের গরু উদ্ধার করে।
মতিউর এনবিআর থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নেন, এবং প্রতিবেদনসূত্রে জানা যায় পরে তিনি মাথার চুল ফেলে ছদ্মবেশে দেশ ছাড়েন। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও তথ্য গোপনের অভিযোগে মতিউর ও তাঁর প্রথম স্ত্রী গ্রেপ্তার হন, ছেলে-মেয়েরা হন মামলার আসামি বা পলাতক। আর যে ছাগলটি নিয়ে এত কাণ্ড, সে নিজে অবিক্রীত অবস্থায় ঠাঁই পায় সাভারের একটি খামারে, যেখানে মালিকপক্ষ পরে জানায় তারা এটি দরিদ্রদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়ার কথা ভাবছেন।
এক পরিবার কারাগারে আর আদালতে, অথচ ঘটনার কেন্দ্রে থাকা প্রাণীটিই রয়ে গেল সবচেয়ে নিরাপদ অবস্থানে।
ছাগল-কাণ্ডের ভূগোল অবশ্য শুধু ঢাকার খামার বা রাজনীতিকদের বাসভবনে সীমাবদ্ধ থাকেনি; সীমান্তেও তার নিয়মিত আনাগোনা। এমনকি একবার তো ছাগল তাড়াতে গিয়ে সীমান্তরক্ষীই বিপদে পড়েছিলেন।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ঠাকুরগাঁওয়ের এক সীমান্ত এলাকায় গরু-ছাগল তাড়াতে গিয়ে ভুলবশত শূন্যরেখা পেরিয়ে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে ঢুকে পড়েন বিএসএফের এক কনস্টেবল। বিজিবি তাকে আটক করে, এবং পরে আনুষ্ঠানিক পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে তাকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া হয়। অর্থাৎ, একটি ছাগলকে ঠিকমতো সামলাতে না পারার মাশুল গুনতে হয়েছিল খোদ একজন সীমান্তরক্ষীকেই।
এর ঠিক এক বছরের মাথায়, ২০২৫ সালের ৬ ডিসেম্বর, সীমান্তের শূন্যরেখা থেকে একটি ছাগল বিএসএফ সদস্যরা নিয়ে যাচ্ছেন, এমন একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়। স্থানীয় কয়েকজন যুবক মোবাইলে দৃশ্যটি ধারণ করেন, আর মুহূর্তেই তা ছড়িয়ে পড়ে, একাধিক টেলিভিশন চ্যানেলও খবরটি প্রচার করে।
এর মাত্র পাঁচ দিন পর, ১১ ডিসেম্বর, কুড়িগ্রামের রৌমারী সীমান্তে আরেকটি ঘটনা ঘটে। কৃষকের সাতটি ছাগল শূন্যরেখা পেরিয়ে ভারতের দিকে চলে গেলে আসামের গুটালু ক্যাম্পের বিএসএফ সদস্যরা সেগুলো আটক করে নিজেদের ক্যাম্পে নিয়ে যান।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বিষয়টি বিজিবিকে জানালে ১৮ ঘণ্টা পর আনুষ্ঠানিক পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে ছাগলগুলো ফেরত আনা হয়।
সীমান্তে কাঁটাতার, টহল, পুশ-ইন বিতর্কের মতো গুরুগম্ভীর প্রসঙ্গের মাঝে একটি ছাগলের এপার-ওপার হওয়াও যে সমান গুরুত্ব নিয়ে সংবাদ ও কূটনৈতিক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারে, তা বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত ছাড়া আর কোথাও কল্পনা করা কঠিন।
আর যদি প্রশ্ন হয়, ছাগল-কাণ্ডের শিকড় ঠিক কত পুরোনো, তাহলে তার উত্তর খুঁজতে যেতে হয় স্বাধীনতারও আগে, ১৯৪৬ সালে।
সেই বছরের নভেম্বরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-বিধ্বস্ত নোয়াখালীতে শান্তি স্থাপনের উদ্দেশ্যে চার মাসের সফরে আসেন মহাত্মা গান্ধী। জনশ্রুতি অনুযায়ী, ছাগলের দুধ পান করা গান্ধী তাঁর সফরসঙ্গী হিসেবে একটি ছাগল সঙ্গে এনেছিলেন, আর স্থানীয় কেউ কেউ সেই ছাগলটি চুরি করে খেয়ে ফেলেছিলেন। প্রায় ৮০ বছর ধরে এই গল্প নোয়াখালীর মুখে মুখে ফিরেছে, একাধিক সংবাদমাধ্যমেও এটি নানা সময়ে উল্লেখ পেয়েছে।
তবে এই দাবিটি ইতিহাসের নথিতে দাঁড়ায় না।
গান্ধী আশ্রম ট্রাস্টের সচিব ও একাধিক ইতিহাসবিদের বরাত দিয়ে সাম্প্রতিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলো জানাচ্ছে, গান্ধীর সেই সফরের সমসাময়িক নথিপত্র, সংবাদপত্র বা তার সফরসঙ্গীদের লেখায় ছাগল চুরির কোনো উল্লেখ নেই।
অর্থাৎ এটি ইতিহাস নয়, বরং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা একটি জনশ্রুতি বা গুজব, যা হয়তো নোয়াখালীর সেই উত্তাল সময়ের স্মৃতির সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। এই ঘটনা তাই ‘সত্য’ হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশের সামাজিক স্মৃতিতে ছাগলের অদ্ভুত সাংস্কৃতিক অবস্থানের একটি প্রমাণ হিসেবেই গুরুত্বপূর্ণ । এমনকি সবচেয়ে সম্মানিত অতিথির ছাগলও লোককথায় নিরাপদ থাকেনি।
এই চারটি সময়ের চারটি ঘটনা পাশাপাশি রাখলে একটা প্যাটার্ন স্পষ্ট হয়। এদেশে ছাগল আর নিছক একটি গৃহপালিত বা কোরবানির পশু নয়; সে হয়ে উঠেছে ক্ষমতা, অর্থবিত্ত, রাজনৈতিক তিক্ততা, সীমান্ত-কূটনীতি আর সামাজিক স্মৃতির এক আশ্চর্য মিলনস্থল।
একটি ছাগলের দাম দিয়ে বোঝা যায় একজন সরকারি কর্মকর্তার সম্পদের উৎস কতটা প্রশ্নবিদ্ধ। একটি ছাগলের সীমান্ত পারাপার দিয়ে ফুটে ওঠে দুই দেশের সম্পর্কের খুঁটিনাটি উত্তেজনা ও তার সমাধানের কূটনৈতিক প্রক্রিয়া। একটি ছাগলের গলায় প্ল্যাকার্ড থেকে বোঝা যায়, রাজনৈতিক প্রতিবাদ কতটা প্রতীকী ও নাটকীয় রূপ নিতে পারে। আর প্রায় আশি বছর আগের একটি ছাগলের গল্প থেকে বোঝা যায়, সত্যি ঘটনা আর জনশ্রুতির সীমারেখা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কতটা ঝাপসা হয়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে বহু বড় বড় ইস্যু আসবে, যাবে, ভুলে যাওয়া হবে। কিন্তু ছাগল সম্ভবত থেকে যাবে- কখনো কোরবানির হাটে দরদামের গল্পে, কখনো দুর্নীতির অনুসন্ধানের সূত্র হিসেবে, কখনো সীমান্তের পতাকা বৈঠকের আলোচ্যসূচিতে, আবার কখনো দুই রাজনীতিকের মধ্যে সবচেয়ে তীক্ষ্ণ খোঁচার অস্ত্র হয়ে।

‘ছাগল’— নিছক একটি সাধারণ প্রাণী হলেও বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেশ আলোচিত এক নাম। সময়ের পরিক্রমায় এই প্রাণীটি বারবারই উঠে এসেছে আলোচনার কেন্দ্রে। সম্প্রতি এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারীর ‘ছাগলকাণ্ড’ থেকে শুরু করে প্রায় ৮০ বছর আগে মহাত্মা গান্ধীর ছাগল চুরির ঘটনা— রাজনৈতিক ইতিহাসের নানা অধ্যায়েই জড়িয়ে আছে ‘ছাগল’।
গল্পটা শুরু করা যাক গত সপ্তাহ থেকে।
২০২৪ সালের শেষ দিকে অন্তর্বর্তী সরকারের আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুলের সরকারি বাসভবন থেকে দুটি ছাগল খোয়া যায়। সরকারি বাসভবনের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, দেয়াল টপকে ছাগল দুটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। একটিকে জবাই করে ভোজের আয়োজন করা হয়, আর অন্যটির গলায় সরকারের পদত্যাগ দাবি করা স্লোগানসংবলিত একটি প্ল্যাকার্ড ঝুলিয়ে ফেরত পাঠানো হয়।
সেসময় একটি সংবাদমাধ্যম জানায়, ছাগল ‘চুরি’ করা ব্যক্তিদের একজন ছিলেন নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী, যিনি বর্তমানে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক।
ঘটনাটি তখন নিছক ‘মজা’ মনে হলেও ২০২৬ সালে এসে ড. আসিফ নজরুলের একটি বক্তব্যে তা নতুন করে আলোচনায় আসে। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের এই উপদেষ্টা এক টকশোতে জানান, ২০২৪ সালের শেষ দিকে তার ছোট মেয়ের পোষা একটি ছাগল চুরি হয়ে যায়। ঘটনাটি তার মেয়েকে গভীরভাবে মানসিক আঘাত করেছিল বলেও জানান তিনি।
ঘটনাটি পুরোনো হলেও নতুন করে আগুন জ্বলে ওঠে যখন আসিফ নজরুল তার শিশুকন্যার ‘নাজুক মানসিক পরিস্থিতির’ কথা জানালেও তা খুব একটা আমলে নেননি নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী।
আসিফ নজরুলের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ছাগল দুটোই খাওয়া উচিত ছিল। পাল্টা যুক্তি হিসেবে তিনি অভিযোগ করেন, আসিফ নজরুল অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা থাকাকালে সরকারি বাসভবনে পশুপালন করে সেই খামারের নিরাপত্তায় সরকারি পুলিশ ব্যবহার করেছিলেন।
এদিকে, ঘটনার রেশ লেগেছে অন্য রাজনৈতিক দলেও। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারীকে ‘একটা আস্ত জানোয়ারের বাচ্চা’ বলে ফেসবুকে পোস্ট করেন বিএনপির সংরক্ষিত আসনের এমপি মানসুরা আলম।
পোস্টটিতে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের জঞ্জাল আগামীর প্রজন্মকে নষ্ট করবে। করার আগেই এদের রাজনীতি বন্ধ করাইতে হবে। একটা সাধারণ নিরীহ প্রাণীর প্রতি যার হিংস্র আচরণ, দেশের মানুষের রাজনৈতিক দায়িত্ব এর কাছে ভয়ংকর।’ এ ছাড়া নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারীর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবিও করেন তিনি।
এই বাদানুবাদ থেকে স্পষ্ট, একটি শিশুর পোষা প্রাণীকে ঘিরে তৈরি হওয়া তিক্ততা প্রায় দুই বছর পরও পুরোপুরি প্রশমিত হয়নি। বরং তা এখন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার নতুন উপকরণ হয়ে উঠেছে। একটি শিশুর কষ্ট নিয়ে প্রকাশ্যে এমন কথার লড়াই কতটা সমীচীন, সে প্রশ্ন অবশ্য রাজনৈতিক মহলেও উঠেছে।
২০২৪ সালের কোরবানির ঈদ।
রাজধানীর একটি খামার থেকে একটি ছাগলের সঙ্গে সেলফি তুলে ফেসবুকে দিয়েছিলেন তরুণ মুশফিকুর রহমান, যাকে সবাই চেনে ‘ইফাত’ নামে। ছাগলটির দাম হাঁকা হয়েছিল ১৫ লাখ টাকা। যদিও পরে খামার কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রকৃত ক্রয়মূল্য ছিল ১২ লাখ টাকা, আর শেষ পর্যন্ত ইফাত ছাগলটি নেনওনি। ততক্ষণে অবশ্য কাজ হয়ে গেছে।
নেটিজেনরা খুঁজে বের করেন, ইফাতের বাবা মতিউর রহমান জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) একজন সদস্য। মতিউর প্রথমে দাবি করেন, ইফাত তাঁর ছেলেই নয়। কিন্তু অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে, মতিউরের দ্বিতীয় সংসারের সন্তান এই ইফাত।
একটি ছাগল এখানে নিছক ছাগল থাকেনি। সে হয়ে ওঠে এমন এক চাবি, যা দিয়ে খুলে যায় একটি পুরো দুর্নীতির সিন্দুক। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন সংশ্লিষ্ট খামারে অভিযান চালিয়ে আমদানি-নিষিদ্ধ জাতের গরু উদ্ধার করে।
মতিউর এনবিআর থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নেন, এবং প্রতিবেদনসূত্রে জানা যায় পরে তিনি মাথার চুল ফেলে ছদ্মবেশে দেশ ছাড়েন। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও তথ্য গোপনের অভিযোগে মতিউর ও তাঁর প্রথম স্ত্রী গ্রেপ্তার হন, ছেলে-মেয়েরা হন মামলার আসামি বা পলাতক। আর যে ছাগলটি নিয়ে এত কাণ্ড, সে নিজে অবিক্রীত অবস্থায় ঠাঁই পায় সাভারের একটি খামারে, যেখানে মালিকপক্ষ পরে জানায় তারা এটি দরিদ্রদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়ার কথা ভাবছেন।
এক পরিবার কারাগারে আর আদালতে, অথচ ঘটনার কেন্দ্রে থাকা প্রাণীটিই রয়ে গেল সবচেয়ে নিরাপদ অবস্থানে।
ছাগল-কাণ্ডের ভূগোল অবশ্য শুধু ঢাকার খামার বা রাজনীতিকদের বাসভবনে সীমাবদ্ধ থাকেনি; সীমান্তেও তার নিয়মিত আনাগোনা। এমনকি একবার তো ছাগল তাড়াতে গিয়ে সীমান্তরক্ষীই বিপদে পড়েছিলেন।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ঠাকুরগাঁওয়ের এক সীমান্ত এলাকায় গরু-ছাগল তাড়াতে গিয়ে ভুলবশত শূন্যরেখা পেরিয়ে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে ঢুকে পড়েন বিএসএফের এক কনস্টেবল। বিজিবি তাকে আটক করে, এবং পরে আনুষ্ঠানিক পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে তাকে ভারতের হাতে তুলে দেওয়া হয়। অর্থাৎ, একটি ছাগলকে ঠিকমতো সামলাতে না পারার মাশুল গুনতে হয়েছিল খোদ একজন সীমান্তরক্ষীকেই।
এর ঠিক এক বছরের মাথায়, ২০২৫ সালের ৬ ডিসেম্বর, সীমান্তের শূন্যরেখা থেকে একটি ছাগল বিএসএফ সদস্যরা নিয়ে যাচ্ছেন, এমন একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়। স্থানীয় কয়েকজন যুবক মোবাইলে দৃশ্যটি ধারণ করেন, আর মুহূর্তেই তা ছড়িয়ে পড়ে, একাধিক টেলিভিশন চ্যানেলও খবরটি প্রচার করে।
এর মাত্র পাঁচ দিন পর, ১১ ডিসেম্বর, কুড়িগ্রামের রৌমারী সীমান্তে আরেকটি ঘটনা ঘটে। কৃষকের সাতটি ছাগল শূন্যরেখা পেরিয়ে ভারতের দিকে চলে গেলে আসামের গুটালু ক্যাম্পের বিএসএফ সদস্যরা সেগুলো আটক করে নিজেদের ক্যাম্পে নিয়ে যান।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি বিষয়টি বিজিবিকে জানালে ১৮ ঘণ্টা পর আনুষ্ঠানিক পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে ছাগলগুলো ফেরত আনা হয়।
সীমান্তে কাঁটাতার, টহল, পুশ-ইন বিতর্কের মতো গুরুগম্ভীর প্রসঙ্গের মাঝে একটি ছাগলের এপার-ওপার হওয়াও যে সমান গুরুত্ব নিয়ে সংবাদ ও কূটনৈতিক আলোচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারে, তা বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত ছাড়া আর কোথাও কল্পনা করা কঠিন।
আর যদি প্রশ্ন হয়, ছাগল-কাণ্ডের শিকড় ঠিক কত পুরোনো, তাহলে তার উত্তর খুঁজতে যেতে হয় স্বাধীনতারও আগে, ১৯৪৬ সালে।
সেই বছরের নভেম্বরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-বিধ্বস্ত নোয়াখালীতে শান্তি স্থাপনের উদ্দেশ্যে চার মাসের সফরে আসেন মহাত্মা গান্ধী। জনশ্রুতি অনুযায়ী, ছাগলের দুধ পান করা গান্ধী তাঁর সফরসঙ্গী হিসেবে একটি ছাগল সঙ্গে এনেছিলেন, আর স্থানীয় কেউ কেউ সেই ছাগলটি চুরি করে খেয়ে ফেলেছিলেন। প্রায় ৮০ বছর ধরে এই গল্প নোয়াখালীর মুখে মুখে ফিরেছে, একাধিক সংবাদমাধ্যমেও এটি নানা সময়ে উল্লেখ পেয়েছে।
তবে এই দাবিটি ইতিহাসের নথিতে দাঁড়ায় না।
গান্ধী আশ্রম ট্রাস্টের সচিব ও একাধিক ইতিহাসবিদের বরাত দিয়ে সাম্প্রতিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলো জানাচ্ছে, গান্ধীর সেই সফরের সমসাময়িক নথিপত্র, সংবাদপত্র বা তার সফরসঙ্গীদের লেখায় ছাগল চুরির কোনো উল্লেখ নেই।
অর্থাৎ এটি ইতিহাস নয়, বরং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসা একটি জনশ্রুতি বা গুজব, যা হয়তো নোয়াখালীর সেই উত্তাল সময়ের স্মৃতির সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। এই ঘটনা তাই ‘সত্য’ হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশের সামাজিক স্মৃতিতে ছাগলের অদ্ভুত সাংস্কৃতিক অবস্থানের একটি প্রমাণ হিসেবেই গুরুত্বপূর্ণ । এমনকি সবচেয়ে সম্মানিত অতিথির ছাগলও লোককথায় নিরাপদ থাকেনি।
এই চারটি সময়ের চারটি ঘটনা পাশাপাশি রাখলে একটা প্যাটার্ন স্পষ্ট হয়। এদেশে ছাগল আর নিছক একটি গৃহপালিত বা কোরবানির পশু নয়; সে হয়ে উঠেছে ক্ষমতা, অর্থবিত্ত, রাজনৈতিক তিক্ততা, সীমান্ত-কূটনীতি আর সামাজিক স্মৃতির এক আশ্চর্য মিলনস্থল।
একটি ছাগলের দাম দিয়ে বোঝা যায় একজন সরকারি কর্মকর্তার সম্পদের উৎস কতটা প্রশ্নবিদ্ধ। একটি ছাগলের সীমান্ত পারাপার দিয়ে ফুটে ওঠে দুই দেশের সম্পর্কের খুঁটিনাটি উত্তেজনা ও তার সমাধানের কূটনৈতিক প্রক্রিয়া। একটি ছাগলের গলায় প্ল্যাকার্ড থেকে বোঝা যায়, রাজনৈতিক প্রতিবাদ কতটা প্রতীকী ও নাটকীয় রূপ নিতে পারে। আর প্রায় আশি বছর আগের একটি ছাগলের গল্প থেকে বোঝা যায়, সত্যি ঘটনা আর জনশ্রুতির সীমারেখা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কতটা ঝাপসা হয়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে বহু বড় বড় ইস্যু আসবে, যাবে, ভুলে যাওয়া হবে। কিন্তু ছাগল সম্ভবত থেকে যাবে- কখনো কোরবানির হাটে দরদামের গল্পে, কখনো দুর্নীতির অনুসন্ধানের সূত্র হিসেবে, কখনো সীমান্তের পতাকা বৈঠকের আলোচ্যসূচিতে, আবার কখনো দুই রাজনীতিকের মধ্যে সবচেয়ে তীক্ষ্ণ খোঁচার অস্ত্র হয়ে।

আসিফ ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, “‘আসিফ মাহমুদ’ ও ‘দুর্নীতি’ শব্দ দুটিকে বারবার পাশাপাশি বসিয়ে একটি ন্যারেটিভ প্রতিষ্ঠা, জনমনে নেতিবাচক পারসেপশন তৈরি এবং চরিত্র হননই আসল উদ্দেশ্য।”
১ দিন আগে
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যজোট আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় লংমার্চ করবে। ওইদিন সকাল ৭টায় রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে জমায়েত হবে। সকাল ৮টা পর্যন্ত এক ঘণ্টার উদ্বোধনী সভা শেষে লংমার্চ শুরু হবে। পথে পাঁচটি পথসভা হবে। মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ থেকে শুরু হয়ে লংমার্চটি গাজীপুর, টাঙ্গা
১ দিন আগে
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় ঠাকুরগাঁ-১ আসনটি শূন্য হয়েছে। এ আসনে উপনির্বাচন হবে আগামী ২৯ অক্টোবর।
১ দিন আগে