জামায়াতকে অভিযুক্ত করে সরে গেল ইসলামী আন্দোলন

সজীব রহমান
শুক্রবার বিকেলে পুরানা পল্টনে সংবাদ সম্মেলন করে ১১ দলীয় জোট ছাড়ার ঘোষণা দেয় ইসলামী আন্দোলন। ছবি: ইসলামী আন্দোলনের ফেসবুক পেজ

জল্পনা-কল্পনা ছিল আগে থেকেই। শেষ পর্যন্ত সেগুলোই সত্য প্রমাণিত হলো। ইসলামপন্থি সব দলকে জোটবদ্ধ করার প্রক্রিয়ায় শুরু থেকে অংশীদার হয়েও শেষ মুহূর্তে নির্বাচনের আগে জোট ছাড়ল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। আর এর পেছনে এই জোটের বৃহত্তম দল জামায়াতে ইসলামীর নানা ভূমিকার কথা তুলে ধরেছে দলটি।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ বলছে, তারা ইসলামি শাসনব্যবস্থা কায়েমের লক্ষ্যে রাজনীতি করলেও তারা মনে করছে, জামায়াতে ইসলামী প্রচলিত আইন অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করবে, যা তাদের আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

তারা আরও বলছে, ইসলামী আন্দোলন ১১ দলের এই জোটে অংশ নিয়েছিল ইসলামপন্থি রাজনীতির আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য। কিন্তু জামায়াতের সার্বিক কার্যক্রমে তাদের মনে হয়েছে, তারা কেবল ক্ষমতার রাজনীতির জন্য এই জোটকে ব্যবহার করতে পারে।

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের পর জামায়াতের আমির যে জাতীয় সরকারের কথা বলেছিলেন, সেটিও সন্দেহের উদ্রেক করেছে ইসলামী আন্দোলনের মধ্যে। তারা ভাবছে, বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে গোপন কোনো সমঝোতা হয়েছি কি না, যার মধ্য দিয়ে পাতানো একটি নির্বাচন আয়োজন করা হতে পারে।

এ ছাড়া জামায়াতে ইসলামী শুরু থেকেই ইসলামী আন্দোলনকে ‘খাটো করে’ দেখেছে বলেও অভিযোগ করেছে দলটি। তারা বলছে, কারও অনুগ্রহে রাজনীতি না করে নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী রাজনীতি অব্যাহত রাখতেই ১১ দলীয় জোট থেকে তারা বেরিয়ে এসেছে।

শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর পুরানা পল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে দলের যুগ্ম মহাসচিব ও মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের এমন অবস্থানের কথা তুলে ধরেন।

সংবাদ সম্মেলনে গাজী আতাউর জানান, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ২৬৮ প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ হয়েছে। তারা সবাই নিজ নিজ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। কেউ প্রার্থিতা প্রত্যাহার করবেন না। প্রার্থিতা প্রত্যাহার শেষে চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা ঘোষণা হলে বাকি ৩২ আসনে নিজেদের নীতি-আদর্শের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ প্রার্থীকে সমর্থন দেবে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।

১১ দলীয় জোট যেভাবে

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইসলামপন্থি সব মানুষের ভোট এক বাক্সে নিয়ে আসার লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ আট দলের মধ্যে প্রথম জোটের আলোচনা শুরু হয়। নির্বাচন ঘনিয়ে আসতে আসতে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) ও আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) মতো দলগুলো যুক্ত হলে এটি ১১ দলীয় জোটে রূপ নেয়।

জোট নেতারা জানান, শুরুতে লক্ষ্য ছিল— জাতীয় নির্বাচনে ইসলামপন্থি দলগুলোকে জোটবদ্ধ করে ইসলামপন্থি সব ভোটকে এক বাক্সে নিয়ে আসা। একে বলা হচ্ছিল ‘ওয়ান বক্স’ পলিসি। জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনসহ সব দলই এ নীতিকে সামনে রেখেই কার্যক্রম পরিচালনা করছিল। সবশেষ আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে অবশ্য একে জোট নয়, ‘১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্য’ হিসেবে পরিচিত করিয়ে দিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।

জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিসহ এই জোটে রয়েছে— বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশ, খেলাফত মজলিশ, নেজামে ইসলাম পার্টি, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি), জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি, এবি পার্টি ও এলডিপি। শুরু থেকেই ইসলামী আন্দোলন সঙ্গী থাকলেও এখন তারা জোট থেকে সরে দাঁড়াল।

আসন সমঝোতা নিয়ে ‘জটিলতা’, জোটে ভাঙনের সুর

জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে যখন প্রার্থী তালিকা চূড়ান্তের পথে, তখনই ১১ দলীয় জোটে আসন সমঝোতা নিয়ে দেখা দেয় জটিলতা। জোটের একাধিক দলের বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে গণমাধ্যমে খবর এসেছে, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকে শুরুতে যে আসন সংখ্যা সমঝোতার জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে তা দলটির চাহিদার ধারেকাছেও ছিল না।

জানা গেছে, শতাধিক আসনের প্রত্যাশার বিপরীতে দলটিকে ত্রিশটির মতো আসন দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়। শেষ পর্যন্ত ইসলামী আন্দোলন তাদের চাহিদা ৫০টি নামিয়ে আনলেও জোটের পক্ষ থেকে তাদের ৪০টির বেশি আসন না দেওয়ার বিষয়ে অনড় অবস্থান জানানো হয়।

জোটের মধ্যে এমন অসন্তোষ ও তা থেকে ভাঙনের আশঙ্কা ক্রমেই প্রকাশ্য হয়ে পড়তে থাকে জোটের দলগুলোর নানা বক্তব্যে। এর মধ্যে বুধবার বিকেলে সংবাদ সম্মেলন করে আসন সমঝোতা তথা কোন দল থেকে কত আসনে প্রার্থীরা ভোট করছেন তা জানানোর কথা বলা হয়। ঘণ্টা দুয়েক পরেই গণমাধ্যমে পাঠানো আরেক বার্তায় সে সংবাদ সম্মেলন স্থগিতের ঘোষণা দেওয়া হয়।

জানা যায়, ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে আসন সমঝোতা না হওয়ার কারণেই জোটের আসন সমঝোতার হিসাব-নিকাশও চূড়ান্ত করা যায়নি। পরে বিকেলে সংবাদ সম্মেলন করে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশও জানায়, আসন সমঝোতা ছাড়াও জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নীতিগত নানা বিষয়ে মতপার্থক্যের কারণে তারা জোটে অংশগ্রহণ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। দুয়েক দিনের মধ্যে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হবে।

ইসলামী আন্দোলনকে ছাড়াই আসন সমঝোতার হিসাব

ইসলামী আন্দোলন শুক্রবার সংবাদ সম্মেলন করে জোট ও নির্বাচন নিয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়ার কথা জানিয়েছিল। এর মধ্যেই বৃহস্পতিবার রাতে সংবাদ সম্মেলন করে ‘১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্যে’র ২৫৩ আসনে আসন সমঝোতার তথ্য তুলে ধরা হয়। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ সে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিল না।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা ১৭৯টি আসনে, এনসিপি ৩০টি আসনে, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২০টি আসনে, খেলাফত মজলিস ১০টি আসনে, নেজামে ইসলাম পার্টি দুটি আসনে, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি) দুটি আসনে, এবি পার্টি তিনটি আসনে ও এলডিপি সাতটি আসনে ভোট করবে।

সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না জানানোর কারণে তাদের জন্য আসন সমঝোতাও চূড়ান্ত করা যায়নি। এ ছাড়া জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) ও বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন জোটে থাকলেও তাদের জন্যও আসন চূড়ান্ত হয়নি।

জোটই ছাড়ল ইসলামী আন্দোলন

নানা নাটকীয়তা-গুঞ্জনের পর শুক্রবার বিকেলে সংবাদ সম্মেলন করে ইসলামী আন্দোলন ১১ দলীয় জোট ছাড়ার ঘোষণা দেয়। আদর্শের বদলে ক্ষমতার রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়ার অভিযোগ তুলে দলটি জানায়, ২৬৮টি আসনে তাদের প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বৈধ হয়েছে, তারা কেউই প্রার্থিতা প্রত্যাহার করবেন না, ভোটের মাঠে লড়বেন।

সংবাদ সম্মেলনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব ও দলের মুখপাত্র মাওলানা গাজী আতাউর রহমান বলেন, ইসলামপন্থি সবার ভোট এক বাক্সে নিয়ে আসতে যে ‘ওয়ান বক্স পলিসি’ বাস্তবায়ন করতে তারা জোটে যুক্ত হয়েছিলেন, এই জোটের মাধ্যমে সেটি অর্জন করা সম্ভব হবে বলে তারা আর বিশ্বাস করেন না।

জুলাই অভ্যুত্থানের পর ইসলামপন্থিদের একতাবদ্ধ করলে সরকার গঠন সম্ভব— এমন বিশ্বাস ছিল ইসলামী আন্দোলনের। সে কারণেই তারা ‘ওয়ান বক্স’ পলিসিতে আস্থা রেখেছিলেন। ভেবেছিলেন, সরকার গঠন করতে পারলে তারা ইসলামি আইন বাস্তবায়ন করবেন। কিন্তু এখন তারা দেখছেন, এই জোটের শীর্ষ দল জামায়াতে ইসলামী ক্ষমতায় গেলে প্রচলিত আইনই বাস্তবায়ন করতে চায়। এসব কারণেই তারা আর জোটের অংশ না হওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

ইসলামি আদর্শ থেকে বিচ্যুত, গোপন সমঝোতা— জামায়াতের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ

সংবাদ সম্মেলনে আধা ঘণ্টারও বেশি সময়ের বক্তব্যে গাজী আতাউর রহমান ১১ দলীয় জোট নিয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের অবস্থান বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন। এর মধ্যে একটি বড় অংশেই উঠে এসেছে জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগের কথা। আদর্শ থেকে শুরু করে কৌশলের নানা ধাপেই জামায়াতের বিরুদ্ধে বহু অভিযোগ উত্থাপন করেছেন তিনি।

গাজী আতাউর রহমান বলেন, মানুষের মধ্যে প্রত্যাশা জেগে উঠেছিল ইসলামি শক্তির ‘ওয়ান বক্স’ পলিসি নিয়ে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক বাস্তবতা হলো— আমরা দেখলাম, একপর্যায়ে এসে সেই ইসলামপন্থি শক্তির ‘ওয়ান বক্স’কে কেউ কেউ (জামায়াতে ইসলামীর প্রতি ইঙ্গিত) রাজনৈতিক ক্ষমতায় যাওয়ার লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য ভিন্ন দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে।

তিনি বলেন, ৫ আগস্টের পর থেকে সারা দেশে ইসলামপন্থিদের এক সঙ্গে করার জন্য যে চেষ্টা করেছি, আমরা দেখেছি, শেষ পর্যায়ে সে লক্ষ্য অর্জিত না হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আমরা যেহেতু ইবাদতের রাজনীতি করি, তাই আমরা আমাদের নেতাকর্মীদের সঙ্গে প্রতারণা করতে পারি না। আমরা এ দেশের ইসলামপন্থি জনতার আবেগের সঙ্গে কিছুতেই প্রতারণা করতে পারি না।

শুক্রবার বিকেলে সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচনি জোট ও সংসদ নির্বাচন নিয়ে দলের অবস্থান তুলে ধরেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব ও মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান। ছবি: ইসলামী আন্দোলনের ফেসবুক পেজ
শুক্রবার বিকেলে সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচনি জোট ও সংসদ নির্বাচন নিয়ে দলের অবস্থান তুলে ধরেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব ও মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান। ছবি: ইসলামী আন্দোলনের ফেসবুক পেজ

জামায়াত ক্ষমতায় গেলে ইসলামি শাসন কায়েম করবে না অভিযোগ করে ইসলামী আন্দোলনের এই মুখপাত্র বলেন, জামায়াত ইসলামের আমির ডা. শফিকুর রহমান স্পষ্ট করে বলেছেন, তারা ক্ষমতায় গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন। তার সঙ্গে সাক্ষাতের পর খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের একজন নারী স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘আমরা আশ্বস্ত হয়েছি যে জামাতের আমির শরিয়া আইন প্রতিষ্ঠা করবেন না বলে ওয়াদা করেছেন।’

‘আজ যখন রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার মতো একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তখন যারা প্রধান শক্তি তারাই যদি ইসলামের সুমন আদর্শ থেকে ভিন্ন দিকে চলে যায়, তাদেরই যদি ইসলামি আইনের প্রতি আস্থা না থাকে, তাহলে আমরা যে কর্মী-সমর্থক নিয়ে সারা দেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে যাচ্ছি, সে স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে,’— বলেন গাজী আতাউর রহমান।

জামায়াতে ইসলামী শুরু থেকেই ‘আল্লাহর আইন চাই, সৎ লোকের শাসন চাই’ স্লোগান দিয়ে এলেও এখন তা থেকে বিচ্যুত হয়েছে বলে মনে করছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। দলটির মুখপাত্র বলেন, এখন যখন ক্ষমতায় যাওয়ার মতো অবস্থা তৈরি হয়েছে, তখন তারা আল্লাহর আইন থেকে সরে গেলেন। তারা প্রচলিত আইনে রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন— এমন ঘোষণা করলেন। আমাদের যেটা মনে হয়েছে, তারা ক্ষমতাটাকেই মুখ্য মনে করছে। আমরা তাদের ক্ষমতায় যাওয়ার পথে বাধা দিতে চাই না।

তিনি বলেন, বিগত ৫৪ বছর রাষ্ট্র প্রচলিত আইনে পরিচালিত হয়েছে। এই আইন শান্তি প্রতিষ্ঠায়, কল্যাণ প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয়েছে। এই আইন বৈষম্য তৈরি করেছে, অন্যায়-অবিচারের মূল এই প্রচলিতা আইন। তাই আমরা প্রচলিত আইন পরিবর্তন করে আল্লাহর দেওয়া আইন প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন করে আসছি।

তিনি আরও বলেন, এখন শেষ মুহূর্তে যদি দেখি প্রধান যে রাজনৈতিক শক্তি আমাদের সহযোগী ছিলেন, তারা যখন বলছেন তারা আল্লাহর আইনের পথে চলবেন না, তারা প্রচলিত আইনেই রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন তখন আমরা আর তাদের সহযোগী হওয়ার জন্য প্রস্তুত নই।

১১ দলীয় জোটে আরও যেসব ইসলামি সংগঠন আছে, তাদেরও জামায়াতের আমিরের প্রচলিত আইনে রাষ্ট্র পরিচালনার বক্তব্য নিয়ে বোঝাপড়া স্পষ্ট করে নেওয়ার আহ্বান জানান গাজী আতাউর।

তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের পর ডা. শফিকুর রহমানের জাতীয় সরকার বা খালেদা জিয়ার দেখানো ঐক্যের পাটাতনে পথচলার বক্তব্যে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের গোপন সমঝোতার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছে না ইসলামী আন্দোলন। বরং সে সমঝোতার অংশ হিসেবে আগামী নির্বাচন পাতানো হতে পারে বলেও আশঙ্কা করছে তারা।

গাজী আতাউর রহমান বলেন, জামায়াতে ইসলামের আমির ডা. শফিকুর রহমান বিএনপির প্রধান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে স্পষ্ট করে বলেছেন, তারা নির্বাচনের পরে বিএনপির সঙ্গে জাতীয় সরকার গঠন করবেন। খালেদা জিয়া যে ঐক্যের পাটাতন তৈরি করে গেছেন, সে ঐক্যের পাটাতনে দাঁড়িয়ে আগামী দিনে রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন।

গাজী আতাউর বলেন, এখন আমাদের প্রশ্নের জায়গাটি হলো— তিনি একটি জোটে (অ্যালায়েন্স) আছেন, একটি সমঝোতায় আছেন। আগামীতে একটি জাতীয় সরকার হবে নাকি কোন সরকার হবে, সেটি একটি মৌলিক প্রশ্ন। তিনি আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির সঙ্গে বৈঠক করে ঘোষণা দিয়ে আসলেন যে তিনি জাতীয় সরকার করবেন, তাদের ঐক্যের পাটাতনে দাঁড়িয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন। আমাদের সঙ্গে তো তিনি বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেননি।

শফিকুর রহমানের এই বক্তব্য থেকেই পাতানো নির্বাচন নিয়ে শঙ্কার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এখন আমাদের আশঙ্কা হলো— নির্বাচনের আগেই যেহেতু একটি সমঝোতা-সমন্বয় প্রতিদ্বন্দ্বী দলের সঙ্গে হয়ে যাচ্ছে, তাহলে নির্বাচনটা আসলে পাতানো নির্বাচন হবে কি না! এটা কি ইলেকশন, নাকি সিলেকশন— এই শঙ্কাটাও সামনে চলে এসেছে। এই শঙ্কা নিয়ে আমরা কারও সহযোগী হতে চাই না, আমরা একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন চাই।’

সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিয়ে সংশয় জানিয়ে গাজী আতাউর রহমান আরও বলেন, ‘আগামী দিনে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে, নাকি আমাদের সঙ্গে ঐক্য করে তলে তলে আবার ভিন্ন রকম কিছু হবে— সেই আশঙ্কাও আমাদের মধ্যে দেখা দিয়েছিল। এ জন্য আমরা মনে করেছি, এগুলো জনগণের সামনে প্রকাশ করা দরকার। সমঝোতা হতে হলে, ঐক্য হতে হলে পারস্পরিক শ্রদ্ধা-বিশ্বাস-আস্থা লাগে। আস্থা-বিশ্বাস-শ্রদ্ধার জায়গা ভেঙে যায় তখন সেখানে ঐক্য হয় না।’

ইসলামী আন্দোলনকে জামায়াতে ইসলামী ‘অপমান করেছে’ বলেও অভিযোগ তুলে ধরেন দলটির মুখপাত্র। তিনি জানান, ৯ ডিসেম্বর ইসলামী আন্দোলন ও জামায়াতে ইসলামীর আমিরের মধ্যে আসন সমঝোতা নিয়ে প্রথম বৈঠক হয়। সেদিন প্রথম আলোতে একটি নির্বাচনি জরিপ প্রকাশিত হয়েছিল, যেখানে বিএনপির প্রতি ৬৫ শতাংশ, জামায়াতের প্রতি ২৫ শতাংশ ভোটারের সমর্থন উঠে আসে। জরিপে ইসলামী আন্দোলনের প্রতি সমর্থন ছিল শূন্য দশমিক এক শতাংশ।

গাজী আতাউর রহমান বলেন, ‘ওই দিন আলোচনার শুরুতেই জামায়াতের আমির এই জরিপ তুলে ধরেন। এটার অর্থ অপমান (ইনসাল্ট) করা, বোঝানো যে আপনাদের এক পারসেন্ট সমর্থনও নাই। এই ইনসাল্ট করেই উনি (জামায়াতের আমির) যাত্রা শুরু করেছেন।’

জরিপে ইসলামী আন্দোলনের প্রতি জনসমর্থন কম হওয়া নিয়ে জামায়াত শেষ পর্যন্তও ‘অপমান’ করে গেছে বলে জানান গাজী আতাউর। সবশেষ জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের সঙ্গে তার নিজের বৈঠকের কথা তুলে ধরেন তিনি। বলেন, ‘আমরা দেখলাম, শেষ পর্যন্ত তারা জরিপের মধ্যেই ছিল। আমার সঙ্গে যখন শেষ মিটিং হয়, আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরও বললেন, আপনাদের অনেক আসন দেওয়া হয়ে গেছে, জরিপে তো আপনাদের এত নাই।’

সে দিন দৈনিক আমার দেশে প্রকাশিত জরিপের কথা তুলে ধরেন গাজী আতাউর রহমান। বলেন, ওই জরিপে বিএনপির পক্ষে ৩৪ শতাংশ, জামায়াতের পক্ষে ৩৩ শতাংশ, এনসিপির পক্ষে ৭ দশমিক ১ শতাংশ ও ইসলামী আন্দোলনের প্রতি ৩ শতাংশ মানুষের সমর্থন উঠে এসেছিল।

গাজী আতাউর মনে করেন, এই জরিপের তথ্য তুলে ধরে জামায়াতের নায়েবে আমির ইসলামী আন্দোলনকে ‘অপমান’ করার চেষ্টা করেছেন। তিনি বলেন, ‘জামায়াতকে ৩৩ শতাংশ মানুষ আর এনসিপিকে ৭ শতাংশ মানুষ চাইলে তাদের তো সমর্থন ৪০ শতাংশ, যা বিএনপির চেয়েও বেশি। আমাদের আর কোনো অবস্থান থাকে? তাহলে বোঝা গেল, আমাদের যেসব আসন দেওয়া হয়েছে, তারা আমাদের সেগুলো অনুগ্রহ করে দিয়েছে। কিন্তু আমরা তো কারও অনুগ্রহের পাত্র হয়ে রাজনীতি করতে চাই না।’

ad
ad

রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

তারেক রহমানের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের বাণিজ্য প্রতিনিধির বৈঠক অনুষ্ঠিত

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি (ইউএস ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভ) রাষ্ট্রদূত জেমিসন গ্রিয়ারের এক ভার্চুয়াল বৈঠকে অনুষ্ঠিত হয়েছে।

৭ ঘণ্টা আগে

কোরআনের আলো পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিন: সাইফুল হক

সাইফুল হক বলেন, কোরআনের হাফেজ যারা, তারা আমাদের সমাজের নৈতিক দিশা প্রদর্শক। তারা কোরআনের আলো সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিয়ে মানবসেবায় নিজেদের নিয়োজিত করবেন— এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

১২ ঘণ্টা আগে

বিমানের পরিচালনা পর্ষদে খলিলুর রহমান, ফয়েজ তৈয়্যব ও আখতার আহমদ

রাষ্ট্রায়ত্ত বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পরিচালনা পর্ষদে অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব এবং নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমদকে পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

১ দিন আগে

কোন কোন দলের জন্য ৪৭ আসন ফাঁকা রাখল ১১ দলীয় জোট?

অন্যদিকে জোটের তিন দলের জন্য এখন পর্যন্ত কোনো আসন চূড়ান্ত করা হয়নি, যার মধ্যে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের এখনো এ জোটে অংশগ্রহণ নিয়ে অনিশ্চয়তাই কাটেনি। দলটি সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিতও ছিল না।

১ দিন আগে