কর্নেল অলি ও স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে জামায়াত আমিরের বক্তব্যে নতুন বিতর্ক

প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম
এলডিপির চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল অলি আহমদ (বাঁয়ে) ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান (ডানে)। মাঝে জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণার মুহূর্ত। কোলাজ: রাজনীতি ডটকম

বাংলাদেশের ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ নিয়ে নতুন বিতর্ক উসকে দিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। এ প্রসঙ্গে তিনি টেনে এনেছেন অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল অলি আহমদের নাম, যিনি প্রয়াত রাষ্ট্রপতি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের অধীনে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে অনন্য অবদানের জন্য বীর বিক্রম খেতাবে ভূষিত হয়েছেন।

কর্নেল অলিকে জামায়াতের আমির সরাসরি ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ না বললেও বিদ্রোহের সূচনাকারী হিসেবে তার নাম উল্লেখ করেছেন। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করলেও জামায়াতের আমির বলেছেন, কর্নেল অলিই প্রথম বিদ্রোহ করেছিলেন এবং জিয়াউর রহমানকে হাতে ধরে সামনে নিয়ে গিয়েছিলেন।

সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) চট্টগ্রামে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের এক নির্বাচনি সমাবেশে শফিকুর রহমান এমন কথা বলেন। তার বক্তব্য এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার সেই ঊষা লগ্নে কর্নেল অলি প্রকৃতপক্ষেই কী করেছিলেন বা কী বলেছিলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

জামায়াতের আমির সোমবারের জনসভায় বলেন, “বাংলাদেশে একাত্তর সালে স্বাধীনতার ঘোষণা এখান থেকেই হয়েছিল। আপনাদেরই এক গর্বিত সন্তান সবার আগে চিৎকার দিয়ে বলেছিলেন, ‘উই রিভল্ট’। তিনি হচ্ছেন এলডিপির সম্মানিত সভাপতি ড. কর্নেল অলি আহমদ বীর বিক্রম। জিয়াউর রহমান সাহেবকে হাতে ধরে সামনে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। চট্টলাবাসী, আপনাদের স্যালুট।”

সেনাবাহিনী থেকে রাজনীতিতে কর্নেল অলি

বীর মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক আলোচিত নাম। ১৯৭৫ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠন করলে নির্ধারিত সময়ের ৯ বছর আগেই সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়ে বিএনপিতে যোগ দিয়েছিলেন কর্নেল অলি। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখা এই রাজনীতিবিদ ১৯৯১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলে যোগাযোগমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।

২০০৬ সালে বিএনপির আরেক প্রবীণ নেতা সাবেক রাষ্ট্রপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর সঙ্গে বিএনপি থেকে বেরিয়ে এসেছে লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি (এলডিপি) গঠন করেন কর্নেল অলি। পরে বদরুদ্দোজা চৌধুরী নিজে বিকল্প ধারা নামে রাজনৈতিক দল গঠন করেন।

বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক জোট গঠনে নানা ভূমিকা রাখা কর্নেল অলি তার দল নিয়ে গত ২৮ ডিসেম্বর জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় নির্বাচনি জোটে যোগ দেন। এই জোটের হয়ে সাতটি আসনে নির্বাচন করছে এলডিপি।

বিএনপিতে থাকাকালীন তো বটেই, এলডিপি গঠনের পরও একাত্তরে স্বাধীনতাবিরোধী অবস্থানের কারণে বিভিন্ন সময়ে জামায়াতে ইসলামীর কঠোর সমালোচনা করেছেন কর্নেল অলি। ২০০১ সালে জামায়াতকে জোটসঙ্গী হিসেবে নিয়ে বিএনপি সরকার গঠন করলে প্রথম বিএনপির সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয় তার।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেই জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটে তার যোগ দেওয়া নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। কর্নেল অলি সে সময় বলেন, জামায়াত এখন ‘পরিশুদ্ধ’ হয়েছে বলেই তাদের নেতৃত্বাধীন জোটে তিনি যোগ দিয়েছেন।

‘স্বাধীনতার ঘোষণা’ ইস্যুতে কী বলেছেন কর্নেল অলি

চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে জিয়াউর রহমানের পাঠ করা স্বাধীনতার ঘোষণাই মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি ক্ষণ বলে বিবেচিত। ওই সময় চট্টগ্রামে অষ্টম বেঙ্গল রেজিমেন্টে জিয়াউর রহমানের অধীনে ক্যাপ্টেন পদে কর্মরত ছিলেন অলি আহমদ। ওই সময় চট্টগ্রামে এই রেজিমেন্টের বিদ্রোহের সম্মুখভাগে তিনি ছিলেন বলে বিভিন্ন সময় স্মৃতিচারণ ও সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছেন। নিজে বহুবার বলেছেন, জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে তারা বিদ্রোহ করেছেন।

জিয়াউর রহমান নিজেও কর্নেল অলিকে ওই সময় বিদ্রোহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার জন্য কৃতিত্ব দিয়ে এসেছেন। তবে কর্নেল অলি এ-ও বলেছেন, চট্টগ্রামের সন্তান হিসেবে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ করার সুযোগ তার সামনে ছিল। কিন্তু সিনিয়র অফিসার জিয়াউর রহমান থাকায় তিনি সে ঘোষণা পাঠ করতে সম্মত হননি।

সেই সময়ের কথা জানতে কর্নেল অলির মোবাইল নাম্বারে একাধিকবার কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি। কোনো বার্তাতেও তার পক্ষ থেকে সাড়া না পাওয়ায় রাজনীতি ডটকম তার বক্তব্য জানতে পারেনি।

তবে জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর রাষ্ট্রায়ত্ত বার্তা সংস্থা বাসসকে এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকার দেন অলি আহমেদ। সে সাক্ষাৎকারেও তিনি নিজেকে ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ বা চট্টগ্রামে অষ্টম বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিদ্রোহের নেতা হিসেবে দাবি করেননি। বরং সে সাক্ষাৎকারেও তিনি জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বেই বিদ্রোহ করার কথা উল্লেখ করেন।

পরিস্থিতি ও প্রসঙ্গ বিবেচনায় অলি আহমদের ওই সাক্ষাৎকার থেকে চট্টগ্রামে অষ্টম বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিদ্রোহ ও স্বাধীনতার ঘোষণা অংশের বক্তব্য পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো—

‘১৯৭১ সালে আমি ছিলাম চট্টগ্রামে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট কর্মরত তরুণ এক অফিসার। সেনাবাহিনীর সদস্য হয়েও জনগণের পক্ষে ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করার অভিজ্ঞতা আমার হয়েছিল। স্বাধীনতাযুদ্ধের পক্ষে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে ঐক্যবদ্ধ করা এবং সঠিক সময়ে বিদ্রোহ করে অস্ত্রশস্ত্রসহ সদলবলে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার অভিজ্ঞতা ছিল খুবই রোমহর্ষক।’

‘২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্র্যাকডাউনের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মেজর জিয়ার নেতৃত্বে আমি সর্বপ্রথম অষ্টম বেঙ্গল রেজিমেন্টকে নিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করি। সে সময় বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক ছিলেন কর্নেল আব্দুর রশিদ জানজুয়া এবং সহঅধিনায়ক ছিলেন মেজর জিয়াউর রহমান।’

‘২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। পটিয়া থানায় বসে আমরা স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। আমি জিয়াউর রহমানকে বললাম, আপনি রেডিও স্টেশনে চলে যান। তাকে আমি গার্ড দিয়ে পাঠিয়ে দিলাম কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রে। এটি ছিল ট্রান্সমিটিং স্টেশন। এটাকে কিছুটা পরিবর্তন করে ব্রডকাস্টিং স্টেশন করা হয়।’

“সেখানে জিয়াউর রহমান লিখেছেন, আই মেজর জিয়া ডিক্লেয়ার মাইসেল্ফ অ্যাজ প্রভিশনাল হেড অব দ্য স্টেট অ্যান্ড আর্জ অল দ্য কান্ট্রিজ অব দ্য ওয়ার্ল্ড টু সাপোর্ট আস। অর্থাৎ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে নিজেকে ঘোষণা করলাম এবং বিশ্বের সব দেশকে আমাদের স্বীকৃতি, অস্ত্র, খাদ্য, ওষুধ দেওয়ার অনুরোধ জানালাম। ৩০ মে সন্ধ্যায় তিনি আরেকটি ঘোষণা দেন। সেখানে তিনি বলেন, ‘আমি শেখ মুজিবুর রহমানকে ক্ষমতা হস্তান্তর করলাম এবং নিজেকে সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে ঘোষণা করলাম।”

‘জিয়াউর রহমান যখন স্বাধীনতার ঘোষণা করেন, তখন আমি পাশে বসে ছিলাম। ১৯৭৩ সালে জিয়াউর রহমানের নিজ হাতে লেখা একটি ডক্যুমেন্ট আছে আমার কাছে। তিনি লিখেছেন, ক্যাপ্টেন অলি আহমদ বিদ্রোহের জন্য মুখ্য ভূমিকা পালন করেন।’

‘২৭ মার্চ সকালে জিয়াউর রহমান ও আমি পটিয়া থানায় উপস্থিত হই। ওই জায়গায় আসেন মাহমুদ নামে এক ব্যক্তি। প্রায় ৬ ফুট ২ ইঞ্চি লম্বা। তিনি থানার অভ্যন্তরে প্রবেশ করে বললেন, এখানে ক্যাপ্টেন অলি আহমদ কে? আমাদের কাঁধে কোনো ব্যাজ ছিলো না। শুধু খাকি ইউনিফর্ম পরা ছিল। আমি তাকে থানার বারান্দায় ডেকে নিয়ে গেলাম।’

‘আপনি ক্যাপ্টেন অলিকে কেন তালাশ করছেন? তিনি উত্তরে বললেন, ক্যাপ্টেন অলিকে স্বাধীনতা ঘোষণা করতে হবে। কারণ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, অলি আহমদ চট্টগ্রামের সন্তান। তিনি যদি স্বাধীনতা ঘোষণা করেন তাহলে সকলে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসবেন। জবাবে আমি বললাম, কক্ষের ভেতরে যিনি বসে আছেন উনি হলেন মেজর জিয়াউর রহমান। তিনি স্বাধীনতা ঘোষণা করবেন।’

‘এরপর মেজর জিয়ার সঙ্গে আমার এ বিষয়ে আলাপ-আলোচনা হয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই মেজর জিয়াউর রহমান জনাব মাহমুদকে সঙ্গে নিয়ে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। আমি মেজর জিয়াকে বললাম, বোয়ালখালী থানার ফুলতলা প্রাইমারি স্কুলে আমি আর্মি হেড কোয়ার্টার স্থাপন করে কিছুক্ষণের মধ্যেই কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রে উপস্থিত হব। আমি উপস্থিত হওয়ার পূর্বেই তৎকালীন মেজর জিয়া বেতার ভাষণের জন্য বিষয়বস্তু লিপিবদ্ধ করেন। আমি উপস্থিত হয়ে দুটি সংশোধনী করলাম। জিয়াউর রহমান সংশোধনীগুলো গ্রহণ করলেন।’

‘মূলত জিয়াউর রহমানের এই ভাষণ ছিল সমগ্র জাতির ও আন্তর্জাতিক বিশ্বের জন্য এক দিকনির্দেশনা। জাতি কখনো তার এ সাহসী ভূমিকার কথা ভুলবে না। এরপর সমগ্র চট্টগ্রাম ও বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ শুরু হয়।’

ad
ad

রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

বেকার ভাতা নয়, তরুণরা ‘জাস্টিস’ চায়: জামায়াত আমির

জনসভায় তিনি বলেন, অতীতে যারা গালগল্প শুনিয়ে জনগণের সম্পদ লুণ্ঠন করেছে, তাদের দিন শেষ। ১৩ তারিখের নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে পরিবর্তনের যে সূচনা হবে, সেখানে মেধার মূল্যায়ন ও যুবকদের কর্মসংস্থানই হবে প্রধান লক্ষ্য।

৩ ঘণ্টা আগে

ড. কাইয়ুমের প্রার্থিতা বহাল, নাহিদের রিট খারিজ

মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি মো. আসিফ হাসানের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এ আদেশ দেন। এর আগে সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) নাহিদ ইসলাম এ রিট দায়ের করেন। রিটে ড. এম এ কাইয়ুমের প্রার্থিতা স্থগিত চাওয়া হয়।

৩ ঘণ্টা আগে

ভোটারদের কাছে মির্জা ফখরুলের আবেগঘন আকুতি

পোস্টে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর লিখেছেন, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছি। এটাই আমার শেষ নির্বাচন। একজন চেনা লোক হিসেবে, আপনাদের সেবক হিসেবে শেষবারের মতো আমাকে সুযোগ দিন যাতে আপনাদের অসমাপ্ত স্বপ্নগুলো আমি সত্যি করে যেতে পারি।

৫ ঘণ্টা আগে

বিএনপির প্রার্থী আসলাম চৌধুরীর নির্বাচনে বাধা নেই

৫ ঘণ্টা আগে