
টিম রাজনীতি ডটকম

বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপিকে সামনে এগিয়ে নেওয়াই এখন সময়ের দাবি— এমনটাই মনে করেন সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী ও সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য অধ্যাপক আবু সাইয়িদ। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নানা দল ও জোটের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি মনে করেন, বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতিতে জাতীয় রাজনীতিতে কার্যকর নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা একমাত্র বিএনপিরই রয়েছে।
বুধবার (২১ জানুয়ারি) বিকেলে গুলশানে বিএনপি চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের হাতে ফুল দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দেন তিনি।
পাবনা-১ (বেড়া-সাঁথিয়া) আসন থেকে একাধিকবার নির্বাচনে অংশ নেওয়া এই রাজনীতিক নব্বইয়ের দশকে আওয়ামী লীগ সরকারের তথ্য প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। সংস্কারপন্থি অবস্থানের কারণে প্রায় আড়াই দশক আগে আওয়ামী লীগের কয়েকজন শীর্ষ নেতার সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয় তার।
পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ, গণফোরাম ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেছেন আবু সাইয়িদ। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তিনি বিএনপির সঙ্গেই পথ চলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। রাজনীতি ডটকমকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন— কেন এখন বিএনপিই তার রাজনৈতিক ভরসা, ওয়ান-ইলেভেনের সময় প্রকৃতপক্ষে কী ঘটেছিল এবং পাবনায় জামায়াতের সঙ্গে তার বিরোধের নেপথ্য কারণ কী।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রাজনীতি ডটকমের সম্পাদক শরিফুজ্জামান পিন্টু ও নিজস্ব প্রতিবেদক নাজমুল ইসলাম হৃদয়। মাল্টিমিডিয়া সংস্করণের জন্য ভিডিও ইন্টারভিউ সম্পাদনা করেছেন মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার রায়হান হক।
রাজনীতি ডটকম: আপনি বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলেন, নব্বইয়ের দশকে আওয়ামী লীগ সরকারের তথ্য প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এসেছেন। প্রায় আড়াই দশক ক্ষমতার মূল বলয়ের বাইরে থাকার পর ৮২ বছর বয়সে এসে বিএনপিতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন কেন?
অধ্যাপক আবু সাইয়িদ: রাজনীতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টি সবসময় সরলরেখায় চলে না। বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশ একটি গভীর ক্রান্তিলগ্নে এসে দাঁড়িয়েছে। একজন রাজনীতিবিদ, যিনি সারাজীবন রাজনীতিকে ধারণ করেছেন, লালন করেছেন, তার জন্য এই সময়টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমি গভীরভাবে ভেবেছি, নিজস্ব মেধা ও মনন দিয়ে বিশ্লেষণ করেছি। আমার মনে হয়েছে, বাংলাদেশের এই সংকটময় বাস্তবতায় বিএনপি বর্তমানে যে ধারার রাজনীতি করছে, তা অত্যন্ত সময়োপযোগী।
দেশের এই বিশেষ পরিস্থিতিতে এই ধারার সঙ্গে আমি নিজেকে কতটুকু যুক্ত করতে পারব বা খাপ খাওয়াতে পারব— সেটিই ছিল মূল বিবেচ্য। আপনারা জানেন, আমি সংস্কারপন্থি। সে কারণেই কিন্তু আওয়ামী লীগ থেকে আমাকে প্রায় ২৫ বছর ধরে ‘সাইডলাইন’ বা দলের মূল কর্মকাণ্ডের বাইরে রাখা হয়েছে।
কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, দেশ ও জাতির প্রয়োজনে রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন বা সংস্কার অনিবার্য। সেই সংস্কারের স্পিরিট বা চেতনা আমি এখন বিএনপির রাজনীতির মধ্যে দেখতে পাচ্ছি। তাই দেশের এ বাস্তবতায় জাতীয় ঐক্য ও গণতন্ত্র পুনর্প্রতিষ্ঠার স্বার্থে বিএনপির সঙ্গেই পথ চলাকে আমি শ্রেয় মনে করেছি এবং যোগদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বিএনপির রাজনীতিকেই এখন সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সময়ের দাবি।

রাজনীতি ডটকম: বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে আপনার আলাপ হয়েছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি বর্তমানে কতটা শক্তিশালী বলে আপনি মনে করেন?
অধ্যাপক আবু সাইয়িদ: একটি ইঞ্জিন যতই শক্তিশালী হোক, বগিগুলো টেনে নেওয়ার ক্ষমতা তার থাকতে হবে। সেই ইঞ্জিনটা ঠিক থাকা দরকার। আমি মনে করি, তারেক রহমান সেই ইঞ্জিন। একজন পরিশীলিত মানুষ। আমি তারেক রহমানের সঙ্গে কথা বলে যা বুঝেছি, তিনি এখন পুরোদস্তুর একজন রাষ্ট্রনায়ক হওয়ার যোগ্য।
আমার ধারণা, তার ১৭ বছরে দীর্ঘ প্রবাস জীবন, দেশের বাইরে থেকে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিমণ্ডল পর্যবেক্ষণ এবং দেশের বিদ্যমান পরিস্থিতি, পরিবেশ, সমস্যা ও সম্ভাবনা— সবকিছু সম্পর্কে তিনি ওয়াকিবহাল। তার চিন্তার যে অগ্রসরমানতা, দূরদৃষ্টি ও নীতির প্রতি অবিচল আস্থা— তা নিয়ে তিনি যদি অগ্রসর হতে পারেন, তবে তিনি অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারবেন।
আমি জর্জ অরওয়েলের একটি উক্তি এখানে স্মরণ করতে চাই— ‘All men are equal, but some are more equal than others’। তারেক রহমানের মধ্যে আমি সেই ‘More equal’ হওয়ার গুণাবলি দেখেছি। তিনি যদি সিন্ডিকেটের খপ্পরে না পড়েন, যদি চাটুকার পরিবেষ্টিত না হয়ে পড়েন, তবে বাংলাদেশ তার নেতৃত্বে নতুন উচ্চতায় যাবে। আমার সাথে তার স্বল্পক্ষণ কথা হয়েছে, কিন্তু তার চলন-বলন ও আচরণে আমি দেখেছি, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের যে গুণাবলি প্রয়োজন, তার অনেকখানিই তার মধ্যে বিকশিত হয়েছে।

রাজনীতি ডটকম: ওয়ান-ইলেভেনের সময় আপনারা সংস্কারের কথা বলেছিলেন। তখন ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধান আলাদা রাখার প্রস্তাব ওঠে। প্রস্তাবটি কে করেছিলেন?
অধ্যাপক আবু সাইয়িদ: হ্যাঁ, ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক ছিল। সেখানে প্রস্তাবটি এসেছিল। খুব স্পষ্ট করে বলতে চাই, এই প্রস্তাবটি আমি দিইনি। এই প্রস্তাবটি ‘রেইজ’ করেছিলেন মোহাম্মদ হানিফ। খুব সুনির্দিষ্টভাবে বলেছিলেন, সিটিজেন সরকার করার জন্য এবং পাওয়ার ডিকনসোলিডেশন (ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ) করার জন্য প্রধানমন্ত্রী ও দলের সভানেত্রী একই ব্যক্তি হতে পারবেন না। বৈঠকে সাবের হোসেন চৌধুরী ছিলেন, আমি ছিলাম, ওয়ার্কিং কমিটির অধিকাংশ সদস্যই সেখানে উপস্থিত ছিলেন। আমরা সবাই সেই প্রস্তাবের পক্ষে মত দিয়েছিলাম।
রাজনীতি ডটকম: তারপরে তো আর এ নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি?
অধ্যাপক আবু সাইয়িদ: না, তারপর তো আমরা ‘সংস্কারপনন্থি’ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে গেলাম! আমাদের ‘পেটানো’ হলো, আমাদের নামে কেস হলো, গাড়ি ভাঙচুর হলো। আমাদের অবস্থানকে ইতিবাচক হিসেবে না দেখে কর্মীদের সামনে ‘নেতিবাচক’ হিসেবে উপস্থাপন করা হলো। বলা হলো— আমরা দলকে ভাঙতে চেয়েছি, নেত্রীকে মাইনাস করতে চেয়েছি। এসব বলে আমাদের পার্টি থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হলো।
কিন্তু সত্য তো চাপা থাকে না। তারপরও তো আমরা সংস্কারবাদী হয়েই আছি। মজার ব্যাপার হলো— এবারে যে অভ্যুত্থান হলো, এর মূল লক্ষ্যও কিন্তু সংস্কার। রাষ্ট্র সংস্কার, রাষ্ট্রীয় কাঠামোগত সংস্কার এবং আদর্শিক সংস্কার। আমরা সেদিন দলের ভেতরে যে গণতন্ত্রায়নের কথা বলেছিলাম, আজ সারা দেশ সেই সংস্কারের কথাই বলছে। সুতরাং ইতিহাস প্রমাণ করেছে, আমাদের সেদিনের অবস্থান ভুল ছিল না।
রাজনীতি ডটকম: কিন্তু অতীতের একটি বিষয়ের তো কোনো মীমাংসা হচ্ছে না। সেটা হলো স্বাধীনতার ঘোষণা। কে দিয়েছিলেন, কবে দিয়েছিলেন, কীভাবে দিয়েছিলেন— এই বিতর্ক থেকে তো আমরা এখনো মুক্ত হতে পারলাম না। সামনে কি মুক্ত হওয়ার কোনো সুযোগ আছে?
অধ্যাপক আবু সাইয়িদ: অবশ্যই আছে। আমি একটা কথা বলি— এগুলো সবই ইতিহাসের অন্তর্গত বিষয়। যার যার অবস্থান ইতিহাস নির্ধারিত করে দিয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও পরিষ্কারভাবে নির্ধারিত হবে। সে জন্য এগুলো নিয়ে আমাদের অযথা বিতর্ক করার কোনো অবকাশ নেই।
অতীত ঘেঁটে বিতর্ক তৈরি করে আমাদের সামনের চলার পথে যেন কোনো কাঁটা বা বিভ্রান্তি না আসে। আমরা এগুলোকে ‘বাইপাস’ করে এগোতে চাই। আমরা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র, একটি উন্নত ধরনের মানবিক রাষ্ট্র, মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই। যেখানে ক্ষুধা, দারিদ্র্য, বৈষম্য থাকবে না— সে ধরনের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলাম এবং এখনো চাই।
আমাদের ইতিহাসের সনদের ভেতরে কতগুলো সাংবিধানিক কাঠামোগত পরিবর্তন আসছে। ৪৮টির মতো পরিবর্তন বা সংযোজনের কথা বলা হচ্ছে। সেগুলোকে আমি সমর্থন করি। যেমন— ৭০ অনুচ্ছেদ, যা দিয়ে এমপিদের ‘ভেড়া’ বানানো হয়েছিল। আবার ৭০ অনুচ্ছেদ কেন দিয়েছিলাম? যেহেতু আমি খসড়া সংবিধান রচনা কমিটির একজন সদস্য ছিলাম, তাই এর প্রেক্ষাপটটা আমি জানি। এটি দেওয়া হয়েছিল ১৯৫৪ সালের অভিজ্ঞতায়।
১৯৫৪ সালে আবু হোসেন সরকারের সময় দেখা গিয়েছিল, চার দিনে তিনবার মন্ত্রিসভা পরিবর্তন করতে হয়েছে। কারণ এমপিরা ‘হর্স ট্রেডিং’ বা কেনাবেচার শিকার হতেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকে আমরা ৭০ অনুচ্ছেদ রেখেছিলাম। কিন্তু এখন মানুষ অনেক বাছ-বিচার করতে শিখেছে। আমি মনে করি, এখন ৭০ অনুচ্ছেদের সেই বাধার দেওয়াল অপসারণ করে এমপিদের মুক্তভাবে পার্লামেন্টে আলাপ-আলোচনা করার সুযোগ দেওয়া উচিত। এটি ‘গুড সাইন’। আমি আমার দলের সম্পর্কেও আলোচনা করতে পারব, সমালোচনা করতে পারব— এই স্বাধীনতাটুকু থাকা জরুরি।

রাজনীতি ডটকম: জুলাই সনদ নিয়ে কথা বলছিলেন। আপনি কি মনে করেন এটি সংবিধান বা স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক?
অধ্যাপক আবু সাইয়িদ: জুলাই সনদে যে প্রস্তাবগুলো এসেছে, সেগুলোকে আমি সমর্থন করি, বিশেষ করে জিয়াউর রহমানের অবদানকে যেখানে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে। যারা বিতর্ক তুলতে চায়, তাদের আমি শহিদ জিয়ার ‘একটি জাতির জন্ম’ লেখাটি পড়ার জন্য অনুরোধ করি। তাহলে সমস্ত দ্বন্দ্ব নিরসন হয়ে যাবে।
আরেকটি বিষয়— ৭ মার্চ। এটি তুলে দেওয়া বা বাতিল করা আমি সমর্থন করি না। কারণ এই অবিনশ্বর ভাষণের ভেতরে জাতি আরও বেশি ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল এবং মুক্তিযুদ্ধের দিকে ধাবিত হয়েছিল। এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম— এটি স্পষ্টভাবে ‘ডি-ফ্যাক্টো’ (কার্যত) একটি স্বাধীনতার ঘোষণা। এগুলোকে অস্বীকার করে ইতিহাস এগোতে পারে না।
রাজনীতি ডটকম: কিন্তু ১০ এপ্রিল না ১৭ এপ্রিল— কোনটি আমাদের স্বাধীনতার মূল ভিত্তি? মুজিবনগর সরকার গঠন, নাকি শপথ গ্রহণ?
অধ্যাপক আবু সাইয়িদ: সনদ বা ‘চার্টার’ বাংলাদেশে একটাই— ১০ এপ্রিল ১৯৭১। সেটাই মূল সনদ। সেখানে সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে। সেখানেই মুজিবনগর সরকার গঠন, মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা, বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপতি, তার অবর্তমানে সৈয়দ নজরুল ইসলাম ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি, তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রী, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, কামরুজ্জামান সাহেবরা মন্ত্রী— এই কাঠামো তো ১০ এপ্রিলই ঠিক করা হয়েছিল।
সমন্বয়ক হিসেবে তখন প্রথমেই করা হলো ‘জেড ফোর্স’ মানে জিয়াউর রহমান। অর্থাৎ জিয়াউর রহমানের অবদানের স্বীকৃতি কিন্তু তখনই মুজিবনগর সরকার দিয়েছে। তাজউদ্দীন সাহেব তার ভাষণে বলেছিলেন, জিয়াউর রহমান ‘লেনিনগ্রাদের যুদ্ধের’ মতো যুদ্ধ করছেন।

রাজনীতি ডটকম: আপনি পাবনা-১ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন, এখনো আছেন। বিএনপিতে যোগ দেওয়ার পর এখন নির্বাচন করছেন কি না?
অধ্যাপক আবু সাইয়িদ: পাবনা-১ আসনটি খুব কঠিন ও কমপ্লেক্স (জটিল)। এ আসন থেকে এ পর্যন্ত নির্বাচিত এমপিরা প্রায় সবসময় মন্ত্রী হয়েছে। কারণ এখানে যারা দাঁড়ান, প্রত্যেকের পলিটিক্যাল ব্যাকগ্রাউন্ড অন্যরকম। সত্তরের নির্বাচন বাদ দিলাম, তখন আমি এমএনএ ছিলাম। তিয়াত্তরের নির্বাচনও বাদ দিলাম। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জামায়াত ও বিএনপি এক হলো। আমার বিরুদ্ধে মতিউর রহমান নিজামী কনটেস্ট করলেন এবং বিজয়ী হলেন।
১৯৯৬ সালে যখন ওই ঐক্যটা থাকল না, তখন আমি বিজয়ী হলাম। ২০০১ সালে জামায়াত আবার ওই সিটটা দখল করল। ফলে ওখানে খুব হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়। জামায়াতের যে সাংগঠনিক শক্তি, সেটাকে কেউ অস্বীকার করবে না।
আমি ২০১৩ সালে বলেছিলাম, জামায়াতের রাজনীতি শেষ করতে হলে আদর্শ দিয়েই তাকে শেষ করতে হবে, জামায়াতকে নিষিদ্ধ করে নয়। একই কথা আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। অপরাধী যারা, তাদের সবাইকে জেলের ভেতরে নিয়ে যাওয়া হোক— নিম্ন পর্যায় থেকে উচ্চ পর্যায় পর্যন্ত। এটা আমার ব্যক্তিগত মত, বাকি সাধারণ কর্মী-সমর্থকদের রাজনীতি করতে দেওয়া উচিত। দিলেই দেখা যাবে আওয়ামী লীগের কয়েক লাখ লোক আছে (যারা ভোট দেবে)। সব বাদ দিলাম, এই লোকগুলোকে বাদ দিয়ে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ নির্বাচন বলবেন, আর জনগণ এসে ভোট দেবে— এটা সম্ভব না।
হ্যাঁ, আমার ওখান থেকে যেই প্রার্থী হোক, কিংবা যিনি প্রার্থী আছেন এখন বিএনপির, সেখানে যদি স্বাধীনতার পক্ষের চিন্তা করে, স্বাধীনতাবিরোধীদের ঠেকাব— এই মনোভাব নিয়ে অগ্রসর হয়, তাহলে মতিউর রহমান নিজামীর ছেলে, সুযোগ্য ছেলে ব্যারিস্টার নাজিব মোমেন, উনি পরাজিত হবেন।

রাজনীতি ডটকম: তাহলে পাবনা-১ মানে সাঁথিয়া, সেখানে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীর পাশাপাশি আপনি রয়েছেন। এখন আবার আপনি বিএনপিতে জয়েন করলেন। আপনি কি বিএনপির প্রার্থী হবেন? নাকি যিনি আছেন তাকে সাপোর্ট দেবেন?
অধ্যাপক আবু সাইয়িদ: এই বয়সে এসে মাত্র ১২ দিন বা ১৫ দিনের ভেতরে ২৮৮টা বা ৩০০টা গ্রাম ঘুরে ঘুরে মানুষের দ্বারে দ্বারে যাওয়া আমার পক্ষে একটু ডিফিকাল্ট। তারপরও আমি মনে করি, মানুষ আমাকে ভালোবাসে। এখান থেকে, এই জায়গা থেকে আমার জয়লাভ করা সম্ভব ছিল। কিন্তু হচ্ছে না কেন? আমার প্রস্তাবককে গ্রেপ্তার করে নেওয়া হয়েছে! আমার সমর্থক যে ছিল তাকে গ্রেপ্তার করে নেওয়া হয়েছে! প্রায় ১৬০০ লোক—ছেলেমেয়ে ঘরছাড়া, বাড়ি ছাড়া, গ্রাম ছাড়া, দেশ ছাড়া।
আমার প্রস্তাবককে ডিসি অফিসের প্রাঙ্গণ থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আমি শুনলাম, ওখানে জামায়াতের নেতাজি দাঁড়িয়ে আছেন। আমি স্পষ্ট, মানে একেবারে পুরো গ্যারান্টি দিয়ে বলব না, তবে লোকে বলে যে জামায়াতের ক্যান্ডিডেট এই কাজটা করিয়েছে।
তখন ছাত্রলীগ কেবল নিষিদ্ধ হয়েছে। সেই সময় ঈদের পরদিন ‘গেট টুগেদারে’ আমার বাড়িতে ৫০ জন লোক ডাকলাম। মাত্র ৫০ জন, যারা আমার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ করেছে, যারা প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক ছিল, যারা রিটায়ার্ড করেছে। জামায়াতের যিনি ক্যান্ডিডেট, তিনি তার ওপরের লেভেল থেকে আমাকে ‘সন্ত্রাস দমন আইনে’ কেস দিলেন! আমি নাকি ওখানে কাজ করছি ৮২ বছর বয়সে, অস্ত্র তৈরি করছি! এবং অস্ত্র দিয়ে যুদ্ধ করে এই সরকারকে উৎখাত করব! সেই অভিযোগে সন্ত্রাস দমন আইনে মামলা। ১৬৪ জনের নাম এজাহারে, সব মিলিয়ে ৪৫০ জন আসামি!
ওইদিন এসপিকে আমি ডেকেছিলাম, আপনারা আসেন। পুলিশকে ডেকেছিলাম। তারা কিন্তু উপস্থিত। তারা তো দেখছে এ ধরনের কিছুই নাই। কিন্তু পুলিশের ওপর চাপ দিয়ে এই কাজটা করানো হয়েছে। পুলিশের ওপর যে চাপ দেওয়া হয়েছে, জামায়াতের বা মতিউর রহমান নিজামীর ছেলে দিয়েছে— তার প্রমাণ আমার কাছে কিন্তু আছে।

রাজনীতি ডটকম: আপনারা তো এখন একই জোটে বা একই ধারার রাজনীতি করছেন। কিন্তু আপনার ওপর আপনার এলাকায় এ পরিস্থিতি হলে সারা দেশের অবস্থাটা কী? জামায়াতের প্রার্থী যদি এটা করে থাকেন, তবে কেন?
অধ্যাপক আবু সাইয়িদ: জামায়াতের প্রার্থী করে থাকেন মানে আমি বলছি, যিনি এই অভিযোগটা করেছেন, তিনি জামায়াতের সাথে সম্পর্কিত। এবং জামায়াত এমন একটা পার্টি, তার ঊর্ধ্বতন চেইন অব কমান্ড ছাড়া এটা হতে পারে না। সেজন্য বলছি।
সারা দেশেই আমি বলতে পারব না। তবে পাবনা ৪-এ দেখি, ৫-এ দেখি— শিমুল বিশ্বাস যেখানে দাঁড়িয়ে আছে— সেখানে প্রবলেম খুব কম। মানে পুরো বেড়া আছে, সেজন্য প্রবলেমটা কম। এখানে বিএনপির ক্যান্ডিডেট উইন করবে, এটা আমি আশাবাদ ব্যক্ত করতে পারি।
আর জামায়াত কিন্তু এখনো ‘বেহেশতের টিকিট’ বিক্রি করছে! এবং জামায়াত থেকে দাবি করা হয়, কেন্দ্র থেকে দাবি করা হয় যে বেহেশতের টিকিট মানে হলো জামায়াতের সদস্য হওয়া। তোমরাই বেহেশতে থাকবা যদি তোমরা বেহেশতে যেতে চাও!
রাজনীতি ডটকম: আজকের যুগে এমন অসচেতন এবং ধর্মান্ধ মানুষ কি আছে যে যারা এটা বিশ্বাস করে? যদি কেউ করেও থাকে, কেন? এটার কারণটা কী?
অধ্যাপক আবু সাইয়িদ: কারণ প্রকৃত শিক্ষা, যা মানুষের বিবেককে জাগ্রত করে এবং সত্য সন্ধানে একটা পথচলার আলোকবর্তিকা দেখায়, এগুলো নেই। গ্রামের নারীদের ক্ষেত্রে এটা বেশি হচ্ছে। তারা সহজ-সরল, ধর্মপ্রাণ। তাদের ইমোশনকে ব্যবহার করা হচ্ছে।

রাজনীতি ডটকম: আপনি এবার বিএনপিতে যোগ দিলেন। বিএনপি যদি সরকার গঠন করে, সেক্ষেত্রে আপনার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নীতি নির্ধারণের জায়গায় আপনি কী কী কাজ করতে চান?
অধ্যাপক আবু সাইয়িদ: নীতিগুলো তো দেওয়াই আছে। ৩১ দফার ভেতরে আছে, ১৯ দফার ভেতরে আছে এবং সংস্কার প্রস্তাবগুলো আছে। এগুলো বাস্তবায়ন করলেই আমি খুশি। আই হ্যাভ নাথিং টু গেইন, নাথিং টু লুজ।
রাজনীতি ডটকম: আপনি তো অনেক আগে থেকেই সংস্কারপন্থি হিসেবে পরিচিত। তখন যে চাওয়াগুলো পূরণ হয়নি, তার মধ্যে কোন কাজগুলো এখন করতে চাইবেন?
অধ্যাপক আবু সাইয়িদ: আমার কাছে এখানে প্রস্তাবগুলো সব আছে। আমি এত বিস্তারিত যাব না। তবে মৌলিক কিছু বিষয় বলি। যেমন— প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি পদের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য থাকতে হবে। যেটা আমাদের সংবিধানে বর্তমানে নাই, সেখানে কিছুটা গ্যাপ আছে। এটা ঠিক করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ৭০ অনুচ্ছেদের কথা বলেছি, যেখানে মুক্তকণ্ঠে দলের সমালোচনা করা যাবে। দুটি বিষয়— বাজেট ও অনাস্থা প্রস্তাব ছাড়া বাকি সব ক্ষেত্রে এমপিরা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন।
তৃতীয়ত, স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করা। এবং স্থানীয় সরকার দলীয় ভিত্তিতে হবে না, দলীয় প্রতীকেও হবে না। এটি খুব জরুরি। কারণ স্থানীয় সরকার যদি শক্তিশালী হয়, তবে কেন্দ্রের ওপর চাপ কমে এবং উন্নয়ন তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছায়।
গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার জন্য গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহ যেগুলো আছে—সেগুলোকে নিরপেক্ষভাবে গড়ে তুলতে হবে। নির্বাচন কমিশন, পাবলিক সার্ভিস কমিশন— এগুলোর সদস্য ও চেয়ারম্যান নির্বাচন করার সুনির্দিষ্ট বিধি-বিধান থাকতে হবে। জুলাই সংস্কারে কিন্তু এগুলো আছে। আমি এগুলো সব সমর্থন করি।
আরেকটা বিষয় হলো— রাজনীতির ক্ষেত্রে আমাদের ভেতরে যে সরকারি দল আর বিরোধী দল— এটা বলা হয়। আমরা সরকারি দলে গেলাম, বিরোধী দল মানেই শত্রু! এটা ভাবা যাবে না। বিরোধী দলের সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে, তাদেরকে রাষ্ট্রের বিভিন্ন জায়গায়, বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরামর্শ করে, তাদের সঙ্গে রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনায় যদি তাদের অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হয়— তাহলে অনেক ভালো হবে।
প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রতিযোগিতা মেধার ভিত্তিতে চলবে। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে শত্রুতা— এটা আমাদের দেশে নতুন না। এটা আমাদের এই উপমহাদেশের কালচার। কিন্তু সেখান থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। প্রশাসনিক ভূমিকা তো থাকেই, কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষ করে বিএনপিকে এখন এই বড় ভূমিকাটা পালন করতে হবে।
রাজনীতি ডটকম: আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ আমাদের সময় দেওয়ার জন্য।
অধ্যাপক আবু সাইয়িদ: রাজনীতি ডটকমকেও ধন্যবাদ। আপনাদের পাঠকদের প্রতি আমার শুভেচ্ছা রইল।

বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিএনপিকে সামনে এগিয়ে নেওয়াই এখন সময়ের দাবি— এমনটাই মনে করেন সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী ও সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য অধ্যাপক আবু সাইয়িদ। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নানা দল ও জোটের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি মনে করেন, বর্তমান সংকটময় পরিস্থিতিতে জাতীয় রাজনীতিতে কার্যকর নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা একমাত্র বিএনপিরই রয়েছে।
বুধবার (২১ জানুয়ারি) বিকেলে গুলশানে বিএনপি চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের হাতে ফুল দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দেন তিনি।
পাবনা-১ (বেড়া-সাঁথিয়া) আসন থেকে একাধিকবার নির্বাচনে অংশ নেওয়া এই রাজনীতিক নব্বইয়ের দশকে আওয়ামী লীগ সরকারের তথ্য প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। সংস্কারপন্থি অবস্থানের কারণে প্রায় আড়াই দশক আগে আওয়ামী লীগের কয়েকজন শীর্ষ নেতার সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হয় তার।
পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ, গণফোরাম ও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেছেন আবু সাইয়িদ। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তিনি বিএনপির সঙ্গেই পথ চলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। রাজনীতি ডটকমকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন— কেন এখন বিএনপিই তার রাজনৈতিক ভরসা, ওয়ান-ইলেভেনের সময় প্রকৃতপক্ষে কী ঘটেছিল এবং পাবনায় জামায়াতের সঙ্গে তার বিরোধের নেপথ্য কারণ কী।
সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রাজনীতি ডটকমের সম্পাদক শরিফুজ্জামান পিন্টু ও নিজস্ব প্রতিবেদক নাজমুল ইসলাম হৃদয়। মাল্টিমিডিয়া সংস্করণের জন্য ভিডিও ইন্টারভিউ সম্পাদনা করেছেন মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার রায়হান হক।
রাজনীতি ডটকম: আপনি বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলেন, নব্বইয়ের দশকে আওয়ামী লীগ সরকারের তথ্য প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এসেছেন। প্রায় আড়াই দশক ক্ষমতার মূল বলয়ের বাইরে থাকার পর ৮২ বছর বয়সে এসে বিএনপিতে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন কেন?
অধ্যাপক আবু সাইয়িদ: রাজনীতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টি সবসময় সরলরেখায় চলে না। বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশ একটি গভীর ক্রান্তিলগ্নে এসে দাঁড়িয়েছে। একজন রাজনীতিবিদ, যিনি সারাজীবন রাজনীতিকে ধারণ করেছেন, লালন করেছেন, তার জন্য এই সময়টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমি গভীরভাবে ভেবেছি, নিজস্ব মেধা ও মনন দিয়ে বিশ্লেষণ করেছি। আমার মনে হয়েছে, বাংলাদেশের এই সংকটময় বাস্তবতায় বিএনপি বর্তমানে যে ধারার রাজনীতি করছে, তা অত্যন্ত সময়োপযোগী।
দেশের এই বিশেষ পরিস্থিতিতে এই ধারার সঙ্গে আমি নিজেকে কতটুকু যুক্ত করতে পারব বা খাপ খাওয়াতে পারব— সেটিই ছিল মূল বিবেচ্য। আপনারা জানেন, আমি সংস্কারপন্থি। সে কারণেই কিন্তু আওয়ামী লীগ থেকে আমাকে প্রায় ২৫ বছর ধরে ‘সাইডলাইন’ বা দলের মূল কর্মকাণ্ডের বাইরে রাখা হয়েছে।
কিন্তু আমি বিশ্বাস করি, দেশ ও জাতির প্রয়োজনে রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন বা সংস্কার অনিবার্য। সেই সংস্কারের স্পিরিট বা চেতনা আমি এখন বিএনপির রাজনীতির মধ্যে দেখতে পাচ্ছি। তাই দেশের এ বাস্তবতায় জাতীয় ঐক্য ও গণতন্ত্র পুনর্প্রতিষ্ঠার স্বার্থে বিএনপির সঙ্গেই পথ চলাকে আমি শ্রেয় মনে করেছি এবং যোগদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বিএনপির রাজনীতিকেই এখন সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সময়ের দাবি।

রাজনীতি ডটকম: বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে আপনার আলাপ হয়েছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি বর্তমানে কতটা শক্তিশালী বলে আপনি মনে করেন?
অধ্যাপক আবু সাইয়িদ: একটি ইঞ্জিন যতই শক্তিশালী হোক, বগিগুলো টেনে নেওয়ার ক্ষমতা তার থাকতে হবে। সেই ইঞ্জিনটা ঠিক থাকা দরকার। আমি মনে করি, তারেক রহমান সেই ইঞ্জিন। একজন পরিশীলিত মানুষ। আমি তারেক রহমানের সঙ্গে কথা বলে যা বুঝেছি, তিনি এখন পুরোদস্তুর একজন রাষ্ট্রনায়ক হওয়ার যোগ্য।
আমার ধারণা, তার ১৭ বছরে দীর্ঘ প্রবাস জীবন, দেশের বাইরে থেকে আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিমণ্ডল পর্যবেক্ষণ এবং দেশের বিদ্যমান পরিস্থিতি, পরিবেশ, সমস্যা ও সম্ভাবনা— সবকিছু সম্পর্কে তিনি ওয়াকিবহাল। তার চিন্তার যে অগ্রসরমানতা, দূরদৃষ্টি ও নীতির প্রতি অবিচল আস্থা— তা নিয়ে তিনি যদি অগ্রসর হতে পারেন, তবে তিনি অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারবেন।
আমি জর্জ অরওয়েলের একটি উক্তি এখানে স্মরণ করতে চাই— ‘All men are equal, but some are more equal than others’। তারেক রহমানের মধ্যে আমি সেই ‘More equal’ হওয়ার গুণাবলি দেখেছি। তিনি যদি সিন্ডিকেটের খপ্পরে না পড়েন, যদি চাটুকার পরিবেষ্টিত না হয়ে পড়েন, তবে বাংলাদেশ তার নেতৃত্বে নতুন উচ্চতায় যাবে। আমার সাথে তার স্বল্পক্ষণ কথা হয়েছে, কিন্তু তার চলন-বলন ও আচরণে আমি দেখেছি, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের যে গুণাবলি প্রয়োজন, তার অনেকখানিই তার মধ্যে বিকশিত হয়েছে।

রাজনীতি ডটকম: ওয়ান-ইলেভেনের সময় আপনারা সংস্কারের কথা বলেছিলেন। তখন ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধান আলাদা রাখার প্রস্তাব ওঠে। প্রস্তাবটি কে করেছিলেন?
অধ্যাপক আবু সাইয়িদ: হ্যাঁ, ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক ছিল। সেখানে প্রস্তাবটি এসেছিল। খুব স্পষ্ট করে বলতে চাই, এই প্রস্তাবটি আমি দিইনি। এই প্রস্তাবটি ‘রেইজ’ করেছিলেন মোহাম্মদ হানিফ। খুব সুনির্দিষ্টভাবে বলেছিলেন, সিটিজেন সরকার করার জন্য এবং পাওয়ার ডিকনসোলিডেশন (ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ) করার জন্য প্রধানমন্ত্রী ও দলের সভানেত্রী একই ব্যক্তি হতে পারবেন না। বৈঠকে সাবের হোসেন চৌধুরী ছিলেন, আমি ছিলাম, ওয়ার্কিং কমিটির অধিকাংশ সদস্যই সেখানে উপস্থিত ছিলেন। আমরা সবাই সেই প্রস্তাবের পক্ষে মত দিয়েছিলাম।
রাজনীতি ডটকম: তারপরে তো আর এ নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি?
অধ্যাপক আবু সাইয়িদ: না, তারপর তো আমরা ‘সংস্কারপনন্থি’ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে গেলাম! আমাদের ‘পেটানো’ হলো, আমাদের নামে কেস হলো, গাড়ি ভাঙচুর হলো। আমাদের অবস্থানকে ইতিবাচক হিসেবে না দেখে কর্মীদের সামনে ‘নেতিবাচক’ হিসেবে উপস্থাপন করা হলো। বলা হলো— আমরা দলকে ভাঙতে চেয়েছি, নেত্রীকে মাইনাস করতে চেয়েছি। এসব বলে আমাদের পার্টি থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হলো।
কিন্তু সত্য তো চাপা থাকে না। তারপরও তো আমরা সংস্কারবাদী হয়েই আছি। মজার ব্যাপার হলো— এবারে যে অভ্যুত্থান হলো, এর মূল লক্ষ্যও কিন্তু সংস্কার। রাষ্ট্র সংস্কার, রাষ্ট্রীয় কাঠামোগত সংস্কার এবং আদর্শিক সংস্কার। আমরা সেদিন দলের ভেতরে যে গণতন্ত্রায়নের কথা বলেছিলাম, আজ সারা দেশ সেই সংস্কারের কথাই বলছে। সুতরাং ইতিহাস প্রমাণ করেছে, আমাদের সেদিনের অবস্থান ভুল ছিল না।
রাজনীতি ডটকম: কিন্তু অতীতের একটি বিষয়ের তো কোনো মীমাংসা হচ্ছে না। সেটা হলো স্বাধীনতার ঘোষণা। কে দিয়েছিলেন, কবে দিয়েছিলেন, কীভাবে দিয়েছিলেন— এই বিতর্ক থেকে তো আমরা এখনো মুক্ত হতে পারলাম না। সামনে কি মুক্ত হওয়ার কোনো সুযোগ আছে?
অধ্যাপক আবু সাইয়িদ: অবশ্যই আছে। আমি একটা কথা বলি— এগুলো সবই ইতিহাসের অন্তর্গত বিষয়। যার যার অবস্থান ইতিহাস নির্ধারিত করে দিয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও পরিষ্কারভাবে নির্ধারিত হবে। সে জন্য এগুলো নিয়ে আমাদের অযথা বিতর্ক করার কোনো অবকাশ নেই।
অতীত ঘেঁটে বিতর্ক তৈরি করে আমাদের সামনের চলার পথে যেন কোনো কাঁটা বা বিভ্রান্তি না আসে। আমরা এগুলোকে ‘বাইপাস’ করে এগোতে চাই। আমরা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র, একটি উন্নত ধরনের মানবিক রাষ্ট্র, মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই। যেখানে ক্ষুধা, দারিদ্র্য, বৈষম্য থাকবে না— সে ধরনের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলাম এবং এখনো চাই।
আমাদের ইতিহাসের সনদের ভেতরে কতগুলো সাংবিধানিক কাঠামোগত পরিবর্তন আসছে। ৪৮টির মতো পরিবর্তন বা সংযোজনের কথা বলা হচ্ছে। সেগুলোকে আমি সমর্থন করি। যেমন— ৭০ অনুচ্ছেদ, যা দিয়ে এমপিদের ‘ভেড়া’ বানানো হয়েছিল। আবার ৭০ অনুচ্ছেদ কেন দিয়েছিলাম? যেহেতু আমি খসড়া সংবিধান রচনা কমিটির একজন সদস্য ছিলাম, তাই এর প্রেক্ষাপটটা আমি জানি। এটি দেওয়া হয়েছিল ১৯৫৪ সালের অভিজ্ঞতায়।
১৯৫৪ সালে আবু হোসেন সরকারের সময় দেখা গিয়েছিল, চার দিনে তিনবার মন্ত্রিসভা পরিবর্তন করতে হয়েছে। কারণ এমপিরা ‘হর্স ট্রেডিং’ বা কেনাবেচার শিকার হতেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকে আমরা ৭০ অনুচ্ছেদ রেখেছিলাম। কিন্তু এখন মানুষ অনেক বাছ-বিচার করতে শিখেছে। আমি মনে করি, এখন ৭০ অনুচ্ছেদের সেই বাধার দেওয়াল অপসারণ করে এমপিদের মুক্তভাবে পার্লামেন্টে আলাপ-আলোচনা করার সুযোগ দেওয়া উচিত। এটি ‘গুড সাইন’। আমি আমার দলের সম্পর্কেও আলোচনা করতে পারব, সমালোচনা করতে পারব— এই স্বাধীনতাটুকু থাকা জরুরি।

রাজনীতি ডটকম: জুলাই সনদ নিয়ে কথা বলছিলেন। আপনি কি মনে করেন এটি সংবিধান বা স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক?
অধ্যাপক আবু সাইয়িদ: জুলাই সনদে যে প্রস্তাবগুলো এসেছে, সেগুলোকে আমি সমর্থন করি, বিশেষ করে জিয়াউর রহমানের অবদানকে যেখানে স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে। যারা বিতর্ক তুলতে চায়, তাদের আমি শহিদ জিয়ার ‘একটি জাতির জন্ম’ লেখাটি পড়ার জন্য অনুরোধ করি। তাহলে সমস্ত দ্বন্দ্ব নিরসন হয়ে যাবে।
আরেকটি বিষয়— ৭ মার্চ। এটি তুলে দেওয়া বা বাতিল করা আমি সমর্থন করি না। কারণ এই অবিনশ্বর ভাষণের ভেতরে জাতি আরও বেশি ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল এবং মুক্তিযুদ্ধের দিকে ধাবিত হয়েছিল। এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম— এটি স্পষ্টভাবে ‘ডি-ফ্যাক্টো’ (কার্যত) একটি স্বাধীনতার ঘোষণা। এগুলোকে অস্বীকার করে ইতিহাস এগোতে পারে না।
রাজনীতি ডটকম: কিন্তু ১০ এপ্রিল না ১৭ এপ্রিল— কোনটি আমাদের স্বাধীনতার মূল ভিত্তি? মুজিবনগর সরকার গঠন, নাকি শপথ গ্রহণ?
অধ্যাপক আবু সাইয়িদ: সনদ বা ‘চার্টার’ বাংলাদেশে একটাই— ১০ এপ্রিল ১৯৭১। সেটাই মূল সনদ। সেখানে সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে। সেখানেই মুজিবনগর সরকার গঠন, মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা, বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপতি, তার অবর্তমানে সৈয়দ নজরুল ইসলাম ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি, তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রী, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, কামরুজ্জামান সাহেবরা মন্ত্রী— এই কাঠামো তো ১০ এপ্রিলই ঠিক করা হয়েছিল।
সমন্বয়ক হিসেবে তখন প্রথমেই করা হলো ‘জেড ফোর্স’ মানে জিয়াউর রহমান। অর্থাৎ জিয়াউর রহমানের অবদানের স্বীকৃতি কিন্তু তখনই মুজিবনগর সরকার দিয়েছে। তাজউদ্দীন সাহেব তার ভাষণে বলেছিলেন, জিয়াউর রহমান ‘লেনিনগ্রাদের যুদ্ধের’ মতো যুদ্ধ করছেন।

রাজনীতি ডটকম: আপনি পাবনা-১ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন, এখনো আছেন। বিএনপিতে যোগ দেওয়ার পর এখন নির্বাচন করছেন কি না?
অধ্যাপক আবু সাইয়িদ: পাবনা-১ আসনটি খুব কঠিন ও কমপ্লেক্স (জটিল)। এ আসন থেকে এ পর্যন্ত নির্বাচিত এমপিরা প্রায় সবসময় মন্ত্রী হয়েছে। কারণ এখানে যারা দাঁড়ান, প্রত্যেকের পলিটিক্যাল ব্যাকগ্রাউন্ড অন্যরকম। সত্তরের নির্বাচন বাদ দিলাম, তখন আমি এমএনএ ছিলাম। তিয়াত্তরের নির্বাচনও বাদ দিলাম। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জামায়াত ও বিএনপি এক হলো। আমার বিরুদ্ধে মতিউর রহমান নিজামী কনটেস্ট করলেন এবং বিজয়ী হলেন।
১৯৯৬ সালে যখন ওই ঐক্যটা থাকল না, তখন আমি বিজয়ী হলাম। ২০০১ সালে জামায়াত আবার ওই সিটটা দখল করল। ফলে ওখানে খুব হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়। জামায়াতের যে সাংগঠনিক শক্তি, সেটাকে কেউ অস্বীকার করবে না।
আমি ২০১৩ সালে বলেছিলাম, জামায়াতের রাজনীতি শেষ করতে হলে আদর্শ দিয়েই তাকে শেষ করতে হবে, জামায়াতকে নিষিদ্ধ করে নয়। একই কথা আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। অপরাধী যারা, তাদের সবাইকে জেলের ভেতরে নিয়ে যাওয়া হোক— নিম্ন পর্যায় থেকে উচ্চ পর্যায় পর্যন্ত। এটা আমার ব্যক্তিগত মত, বাকি সাধারণ কর্মী-সমর্থকদের রাজনীতি করতে দেওয়া উচিত। দিলেই দেখা যাবে আওয়ামী লীগের কয়েক লাখ লোক আছে (যারা ভোট দেবে)। সব বাদ দিলাম, এই লোকগুলোকে বাদ দিয়ে ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ নির্বাচন বলবেন, আর জনগণ এসে ভোট দেবে— এটা সম্ভব না।
হ্যাঁ, আমার ওখান থেকে যেই প্রার্থী হোক, কিংবা যিনি প্রার্থী আছেন এখন বিএনপির, সেখানে যদি স্বাধীনতার পক্ষের চিন্তা করে, স্বাধীনতাবিরোধীদের ঠেকাব— এই মনোভাব নিয়ে অগ্রসর হয়, তাহলে মতিউর রহমান নিজামীর ছেলে, সুযোগ্য ছেলে ব্যারিস্টার নাজিব মোমেন, উনি পরাজিত হবেন।

রাজনীতি ডটকম: তাহলে পাবনা-১ মানে সাঁথিয়া, সেখানে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীর পাশাপাশি আপনি রয়েছেন। এখন আবার আপনি বিএনপিতে জয়েন করলেন। আপনি কি বিএনপির প্রার্থী হবেন? নাকি যিনি আছেন তাকে সাপোর্ট দেবেন?
অধ্যাপক আবু সাইয়িদ: এই বয়সে এসে মাত্র ১২ দিন বা ১৫ দিনের ভেতরে ২৮৮টা বা ৩০০টা গ্রাম ঘুরে ঘুরে মানুষের দ্বারে দ্বারে যাওয়া আমার পক্ষে একটু ডিফিকাল্ট। তারপরও আমি মনে করি, মানুষ আমাকে ভালোবাসে। এখান থেকে, এই জায়গা থেকে আমার জয়লাভ করা সম্ভব ছিল। কিন্তু হচ্ছে না কেন? আমার প্রস্তাবককে গ্রেপ্তার করে নেওয়া হয়েছে! আমার সমর্থক যে ছিল তাকে গ্রেপ্তার করে নেওয়া হয়েছে! প্রায় ১৬০০ লোক—ছেলেমেয়ে ঘরছাড়া, বাড়ি ছাড়া, গ্রাম ছাড়া, দেশ ছাড়া।
আমার প্রস্তাবককে ডিসি অফিসের প্রাঙ্গণ থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। আমি শুনলাম, ওখানে জামায়াতের নেতাজি দাঁড়িয়ে আছেন। আমি স্পষ্ট, মানে একেবারে পুরো গ্যারান্টি দিয়ে বলব না, তবে লোকে বলে যে জামায়াতের ক্যান্ডিডেট এই কাজটা করিয়েছে।
তখন ছাত্রলীগ কেবল নিষিদ্ধ হয়েছে। সেই সময় ঈদের পরদিন ‘গেট টুগেদারে’ আমার বাড়িতে ৫০ জন লোক ডাকলাম। মাত্র ৫০ জন, যারা আমার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ করেছে, যারা প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক ছিল, যারা রিটায়ার্ড করেছে। জামায়াতের যিনি ক্যান্ডিডেট, তিনি তার ওপরের লেভেল থেকে আমাকে ‘সন্ত্রাস দমন আইনে’ কেস দিলেন! আমি নাকি ওখানে কাজ করছি ৮২ বছর বয়সে, অস্ত্র তৈরি করছি! এবং অস্ত্র দিয়ে যুদ্ধ করে এই সরকারকে উৎখাত করব! সেই অভিযোগে সন্ত্রাস দমন আইনে মামলা। ১৬৪ জনের নাম এজাহারে, সব মিলিয়ে ৪৫০ জন আসামি!
ওইদিন এসপিকে আমি ডেকেছিলাম, আপনারা আসেন। পুলিশকে ডেকেছিলাম। তারা কিন্তু উপস্থিত। তারা তো দেখছে এ ধরনের কিছুই নাই। কিন্তু পুলিশের ওপর চাপ দিয়ে এই কাজটা করানো হয়েছে। পুলিশের ওপর যে চাপ দেওয়া হয়েছে, জামায়াতের বা মতিউর রহমান নিজামীর ছেলে দিয়েছে— তার প্রমাণ আমার কাছে কিন্তু আছে।

রাজনীতি ডটকম: আপনারা তো এখন একই জোটে বা একই ধারার রাজনীতি করছেন। কিন্তু আপনার ওপর আপনার এলাকায় এ পরিস্থিতি হলে সারা দেশের অবস্থাটা কী? জামায়াতের প্রার্থী যদি এটা করে থাকেন, তবে কেন?
অধ্যাপক আবু সাইয়িদ: জামায়াতের প্রার্থী করে থাকেন মানে আমি বলছি, যিনি এই অভিযোগটা করেছেন, তিনি জামায়াতের সাথে সম্পর্কিত। এবং জামায়াত এমন একটা পার্টি, তার ঊর্ধ্বতন চেইন অব কমান্ড ছাড়া এটা হতে পারে না। সেজন্য বলছি।
সারা দেশেই আমি বলতে পারব না। তবে পাবনা ৪-এ দেখি, ৫-এ দেখি— শিমুল বিশ্বাস যেখানে দাঁড়িয়ে আছে— সেখানে প্রবলেম খুব কম। মানে পুরো বেড়া আছে, সেজন্য প্রবলেমটা কম। এখানে বিএনপির ক্যান্ডিডেট উইন করবে, এটা আমি আশাবাদ ব্যক্ত করতে পারি।
আর জামায়াত কিন্তু এখনো ‘বেহেশতের টিকিট’ বিক্রি করছে! এবং জামায়াত থেকে দাবি করা হয়, কেন্দ্র থেকে দাবি করা হয় যে বেহেশতের টিকিট মানে হলো জামায়াতের সদস্য হওয়া। তোমরাই বেহেশতে থাকবা যদি তোমরা বেহেশতে যেতে চাও!
রাজনীতি ডটকম: আজকের যুগে এমন অসচেতন এবং ধর্মান্ধ মানুষ কি আছে যে যারা এটা বিশ্বাস করে? যদি কেউ করেও থাকে, কেন? এটার কারণটা কী?
অধ্যাপক আবু সাইয়িদ: কারণ প্রকৃত শিক্ষা, যা মানুষের বিবেককে জাগ্রত করে এবং সত্য সন্ধানে একটা পথচলার আলোকবর্তিকা দেখায়, এগুলো নেই। গ্রামের নারীদের ক্ষেত্রে এটা বেশি হচ্ছে। তারা সহজ-সরল, ধর্মপ্রাণ। তাদের ইমোশনকে ব্যবহার করা হচ্ছে।

রাজনীতি ডটকম: আপনি এবার বিএনপিতে যোগ দিলেন। বিএনপি যদি সরকার গঠন করে, সেক্ষেত্রে আপনার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নীতি নির্ধারণের জায়গায় আপনি কী কী কাজ করতে চান?
অধ্যাপক আবু সাইয়িদ: নীতিগুলো তো দেওয়াই আছে। ৩১ দফার ভেতরে আছে, ১৯ দফার ভেতরে আছে এবং সংস্কার প্রস্তাবগুলো আছে। এগুলো বাস্তবায়ন করলেই আমি খুশি। আই হ্যাভ নাথিং টু গেইন, নাথিং টু লুজ।
রাজনীতি ডটকম: আপনি তো অনেক আগে থেকেই সংস্কারপন্থি হিসেবে পরিচিত। তখন যে চাওয়াগুলো পূরণ হয়নি, তার মধ্যে কোন কাজগুলো এখন করতে চাইবেন?
অধ্যাপক আবু সাইয়িদ: আমার কাছে এখানে প্রস্তাবগুলো সব আছে। আমি এত বিস্তারিত যাব না। তবে মৌলিক কিছু বিষয় বলি। যেমন— প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি পদের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য থাকতে হবে। যেটা আমাদের সংবিধানে বর্তমানে নাই, সেখানে কিছুটা গ্যাপ আছে। এটা ঠিক করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ৭০ অনুচ্ছেদের কথা বলেছি, যেখানে মুক্তকণ্ঠে দলের সমালোচনা করা যাবে। দুটি বিষয়— বাজেট ও অনাস্থা প্রস্তাব ছাড়া বাকি সব ক্ষেত্রে এমপিরা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন।
তৃতীয়ত, স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করা। এবং স্থানীয় সরকার দলীয় ভিত্তিতে হবে না, দলীয় প্রতীকেও হবে না। এটি খুব জরুরি। কারণ স্থানীয় সরকার যদি শক্তিশালী হয়, তবে কেন্দ্রের ওপর চাপ কমে এবং উন্নয়ন তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছায়।
গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার জন্য গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহ যেগুলো আছে—সেগুলোকে নিরপেক্ষভাবে গড়ে তুলতে হবে। নির্বাচন কমিশন, পাবলিক সার্ভিস কমিশন— এগুলোর সদস্য ও চেয়ারম্যান নির্বাচন করার সুনির্দিষ্ট বিধি-বিধান থাকতে হবে। জুলাই সংস্কারে কিন্তু এগুলো আছে। আমি এগুলো সব সমর্থন করি।
আরেকটা বিষয় হলো— রাজনীতির ক্ষেত্রে আমাদের ভেতরে যে সরকারি দল আর বিরোধী দল— এটা বলা হয়। আমরা সরকারি দলে গেলাম, বিরোধী দল মানেই শত্রু! এটা ভাবা যাবে না। বিরোধী দলের সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে, তাদেরকে রাষ্ট্রের বিভিন্ন জায়গায়, বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরামর্শ করে, তাদের সঙ্গে রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনায় যদি তাদের অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হয়— তাহলে অনেক ভালো হবে।
প্রতিদ্বন্দ্বিতা, প্রতিযোগিতা মেধার ভিত্তিতে চলবে। কিন্তু রাজনৈতিকভাবে শত্রুতা— এটা আমাদের দেশে নতুন না। এটা আমাদের এই উপমহাদেশের কালচার। কিন্তু সেখান থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। প্রশাসনিক ভূমিকা তো থাকেই, কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষ করে বিএনপিকে এখন এই বড় ভূমিকাটা পালন করতে হবে।
রাজনীতি ডটকম: আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ আমাদের সময় দেওয়ার জন্য।
অধ্যাপক আবু সাইয়িদ: রাজনীতি ডটকমকেও ধন্যবাদ। আপনাদের পাঠকদের প্রতি আমার শুভেচ্ছা রইল।

‘২০০০ টাকার কার্ড নিতে ১০০০ টাকা ঘুষ দেওয়া লাগবে না তো? তাহলে ঘুষ-চাঁদাবাজি, সেটা যদি আমরা নির্মূল না করতে পারি— এই সকল সুযোগ সুবিধা কি জনগণের কাছে পর্যন্ত পৌঁছাবে?’— বলেন এনসিপির এই নেতা।
১৬ ঘণ্টা আগে
সাইফুল হক বলেন, যারা কালো টাকা ও পেশী শক্তি দিয়ে ভোটের বাক্স ভরতে চান, তারা সেসব দিনের কথা ভুলে যান। যারা মাস্তানি ও চাঁদাবাজি করে, তাদের ঢাকা-১২ আসনের জনগণ প্রত্যাখ্যান করবেন। ইনশাল্লাহ তারেক রহমানের ভালোবাসা ও কোদাল মার্কা নিয়ে বিপুল ভোটে জয়যুক্ত হব।
২০ ঘণ্টা আগে
তিনি বলেন, সবকিছুর মালিক আল্লাহ, কিন্তু কেউ কেউ ‘বেহেস্তের টিকিট’ বিক্রির মাধ্যমে ভোট চাচ্ছে। নির্বাচনের আগেই তারা ঠকাচ্ছে, নির্বাচনের পরে তারা কি করবে সবাই বুঝে গেছে। অমুককে দেখেছেন, তমুককে দেখেছেন যারা বলছেন, তাদের ‘৭১ সালে দেশের মানুষ দেখেছে।
১ দিন আগে
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ১০ দলীয় নির্বাচনি ঐক্য ইনশাল্লাহ বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করবে। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ আমাদের সঙ্গে আছেন। জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে প্রয়োজনীয় রাষ্ট্রীয় সংস্কার এগিয়ে নিতে এই ঐক্যের বিজয়ের কোনো বিকল্প নেই।
১ দিন আগে