বিএনপিতে রদবদল ঘিরে নানা প্রশ্ন

প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর সাংগঠনিক রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন এনেছে বিএনপি। দলের শীর্ষস্থানীয় পদ ছাড়াও মধ্যম সারির নেতাদের কারো পদোন্নতি দেওয়া, কাউকে পদাবনত করা হয়েছে, বাদ পড়েছেন কেউ কেউ।

এই প্রক্রিয়ায় নতুন করে ৪৫ জনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে দলটির কেন্দ্রীয় কমিটিতে। আবার ভাঙা হয়েছে বেশি কিছু শাখা ও সহযোগী সংগঠনের কমিটি। এবার দলের মহাসচিব পদে পরিবর্তন আসতে পারে-এমন আলোচনা চলছে দলের ভেতর-বাইরে।

বিএনপি নেতারা বলছেন, এটি ধারাবাহিক সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার অংশ। আবার কেউ কেউ প্রকাশ্যে কিছু না বললেও ভেতরে ভেতরে ক্ষোভে ফুঁসছেন।

প্রচার সম্পাদক থেকে যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী। তিনি বলেন, ‘এটি হঠাৎ রদবদল নয়, এটি পার্টির ধারাবাহিক সাংগঠনিক কাজের অংশ। সামনে হয়তো আরও হবে।’

গত কয়েকদিনে বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনগুলোর অন্তত নয়টি কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। আগামীতে আরও বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে বলে জানিয়েছেন দলটির নেতারা।

এরই মধ্যে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটিতে রদবদল ও নতুন করে ৪৫ জনকে অন্তর্ভূক্ত করা হয়। তাদের অনেককে কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে বাদ দিয়ে দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলে যুক্ত করা হয়েছে। আবার কাউকে-কাউকে পদাবনতি করে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়া হয়েছে।

বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটিতে রদবদলের পাশাপাশি দলের বর্তমান বিদেশ বিষয়ক কমিটি ভেঙে দিয়ে দুটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে—চেয়ারপারসনস ফরেন অ্যাফেয়ার্স অ্যাডভাইজরি কমিটি এবং স্পেশাল অ্যাসিসট্যান্ট টু দ্য চেয়ারপারসনস ফরেন অ্যাফেয়ার্স অ্যাডভাইজরি কমিটি। চেয়ারপারসনস ফরেন অ্যাফেয়ার্স অ্যাডভাইজরি কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নিজেই আছেন।

গত ১৪ মে বিগত সরকার বিরোধী আন্দোলনের ব্যর্থতার কারণে ঢাকা মহানগর বিএনপির উত্তর-দক্ষিণ উভয় কমিটির পাশাপাশি বরিশাল মহানগর ও চট্রগ্রাম মহানগর বিএনপির কমিটিও বিলুপ্ত করা হয়। একই কারণে কেন্দ্রীয় যুবদলের কমিটির মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার আগেই কমিটি বিলুপ্ত করা হয়।

অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চর্চায় বিএনপি কতটা উদাসীন রদবদল তারই প্রমাণ বলে মনে করছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেছেন, বিএনপির আন্দোলনের ব্যর্থতার মূল দায় দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের, তিনিই লন্ডনে বসে কাউকে পদায়ন ও কাউকে বাদ দিচ্ছেন।

বিএনপির নেতারা বলছেন, ৭ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে সরকারবিরোধী আন্দোলনে ব্যর্থতার কারণে দলের ও অঙ্গ-সংগঠনের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। আর দলের কেন্দ্রীয় কমিটির যেসব নেতার পদাবনতি করা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সক্রিয় না থাকার অভিযোগ রয়েছে। আবার যাদের পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে এবং নতুন করে যুক্ত করা হয়েছে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের চোখে হয়তো তারা সফল।

তারা বলছেন, আন্দোলনের ব্যর্থতার জন্য দলের মধ্যম সারির নেতাদের পদাবনতির বিষয়টি আক্ষরিক অর্থে শাস্তি। তাহলে ২৮ অক্টোবরের নয়াপল্টনের মহাসমাবেশের দিন দলের দলের নীতিনির্ধারণী যেসব নেতারা মঞ্চ ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছেন তাদের বিচার হবে না কেন?

এরপর ৭ জানুয়ারি নির্বাচনের আগে দলের নীতিনির্ধারণে পর্যায়ে যেসব নেতা জেলের বাইরে ছিলেন, কিন্তু মাঠের নেতারা তাদের খুঁজে পায়নি এবং যাদের কৌশল প্রণয়নে ভুলের কারণে আন্দোলন সফল হয়নি তাদের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া হবে কেন- এই প্রশ্ন তুলছেন কেউ কেউ।

ঈদের আগেভাগে বিএনপিতে হঠাৎ ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে অনেকের মধ্যে অসন্তোষ থাকলেও এ নিয়ে কোনও নেতা বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রকাশ্যে কথা বলতে চান না। কথা বলে কেউ তো নিজের পদ হারাতে চান না। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা বলছেন, নানা বিবেচনায় বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোতে এই পরিবর্তন ও সংযোজন করা হয়েছে। এইগুলো দলের ধারাবাহিক সাংগঠনিক কাজের অংশ। আবার কেউ কেউ বলছেন, দীর্ঘদিন দলের কাউন্সিল হয় না। তাই দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান কাউন্সিল না করার চাপ এড়িয়ে বেশ কিছু পদে রদবদল করে নতুনত্ব আনার চেষ্টা করছেন। সেটা দলের আন্দোলন-সংগ্রামে কত ইতিবাচক হবে তা সময়ে বলে দেবে।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, ‘নানা বিবেচনায় এসব করা হয়েছে। যেসব কমিটির মেয়াদ নেই, সেগুলো ভেঙে দেওয়া হয়েছে। আবার যেসব কমিটির মেয়াদ আছে, সেগুলোতে নতুন নেতৃত্ব প্রয়োজন আছে বলে তা ভেঙে দেওয়া হয়েছে। আবার কারও কারও পদ থাকলেও পদোন্নতি দরকার বিবেচনায় তাদের নতুন পদ দেওয়া হয়েছে।’

এতো রদবদল করে বিএনপি তার আন্দোলন-সংগ্রামে কতটুকু সফল হতে পারবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি তো মনে করি, অনেকাংশে তো সফল হয়েও গেছি। এই সরকারকে মানুষ ভোট দেয় নাই। তাদের নৈতিক কোনও ভিত্তিও নেই। জোর করে প্রশাসনকে ব্যবহার করে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে। তাদের লুটপাটের খবর বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে।’

বিএনপির একজন কেন্দ্রীয় নেতা বলেন,‘যারা পদোন্নতি পেয়েছেন তারা সবাই খুশি নয়। কারণ দেখা যাচ্ছে তার চেয়ে জুনিয়রকে ওপরের পদে পদোন্নতি দিয়ে রাখা হয়েছে। ফলে, সবকিছু মিলিয়ে বিএনপিতে কিছুটা বিশৃঙ্খল অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে।’

এ দিকে পদাবনতি হওয়া এবং কেন্দ্রীয় কমিটিতে বাদ পড়া বিএনপির নেতাদের মধ্যে অসন্তোষ থাকলেও তারা প্রকাশ্যে কিছু বলতে চাচ্ছেন না। এ রকম তিন নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বলেন, মাঠের সরকার বিরোধী কার্যকর আন্দোলন গড়ে তোলার ব্যর্থতার জন্য যদি আমাদের পদ যায়, একই কারণে যাদের নীতি প্রণয়নে অদূরদর্শিতা ছিলো, তাদেরও বিচার হওয়া উচিত।

পদাবনতি হওয়া বিএনপির এক নেতা বলেন, ‘৭ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে মহাসচিবসহ স্থায়ী কমিটির মাত্র ২ জন সদস্যদের কারাগারে ছিলেন। বাকিদের তো আন্দোলনের মাঠে দেখা যায়নি। কিন্তু এখন সব ব্যর্থতা শুধু আমাদের ওপর আসবে কেনো?’

পদাবনতি হওয়া আরেক নেতা বলেন, ‘২০১৬ সালের পরে বিএনপির কোনও কাউন্সিল হয়নি। এই নিয়ে দলের ভেতরে মাঝে-মধ্যে আলোচনা ওঠে। এখন দেশের বর্তমান যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাতে আবার কখন কাউন্সিল করা যাবে সেটাও বলা সম্ভব নয়। ফলে, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান চিন্তা করছে কিছু লোকের পদ-পরিবর্তন, কাউকে নতুন করে যুক্ত করে কেন্দ্রীয় কমিটিতে কিছুটা নতুনত্ব আনতে।’

তবে দলের একাধিক সূত্র বলছে, আন্দোলনে ব্যর্থতা ও কিছু ক্ষেত্রে নেতাদের নিষ্ক্রিয়তার কারণে কমিটিগুলো বিলুপ্ত ঘোষণা করা হলেও সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন কমিটি হওয়ার কথা। সেটি না করে সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে কমিটি বিলুপ্ত করা অন্য ধরনের বার্তা দেয়।

একাধিক নেতার মন্তব্য হচ্ছে, শীর্ষ নেতাদের কেউ কেউ ভেবেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র এসে নির্দলীয় সরকারের অধীন নির্বাচন করে দিয়ে যাবে। মার্কিন কর্মকর্তা ও কূটনীতিকদের কথাবার্তা হয়তো তাঁদের অতিমাত্রায় আশাবাদী করেছিল। এই আশাবাদী হয়ে ওঠার ঘটনায় আন্দোলন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই দায় প্রথমত শীর্ষ নেতৃত্বের।

তবে এই রদবদলে দল সক্রিয় হবে কিনা, আন্দোলনে এর কোনও প্রভাব পড়বে কিনা, তা ঈদের কিছুদিন পরই বোঝা যাবে বলে দলের নেতাদের কেউ কেউ মত দিচ্ছেন।

ad
ad

রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

ইসির আচরণে নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে: রিজভী

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) দায়িত্ব পালনে নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে বলে মন্তব্য করে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, ইসির এমনভাবে কাজ করা উচিত, যাতে নির্বাচন নিয়ে কোনো ধরনের সন্দেহ বা প্রশ্নের অবকাশ না থাকে। কিন্তু কমিশনের বিভিন্ন আচরণে সেই নিরপেক্ষতা নিয়েই উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

৭ ঘণ্টা আগে

নির্বাচনে ঠিক হবে দেশ উদারপন্থি নাকি উগ্রপন্থিদের হাতে যাবে: মির্জা ফখরুল

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, এই নির্বাচনে নির্ধারিত হবে দেশ লিবারেল ডেমোক্রেসির (উদার গণতন্ত্র) হাতে থাকবে, নাকি উগ্রপন্থি-রাষ্ট্রবিরোধীদের দখলে যাবে।

৯ ঘণ্টা আগে

জামায়াতের পলিসি সামিটে ভারতসহ ৩০ দেশের প্রতিনিধি

কূটনৈতিক প্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতা, শিক্ষাবিদ, শিল্পোদ্যোক্তা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে চলছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পলিসি সামিট-২০২৬।

১০ ঘণ্টা আগে

শুধু দল নয়, বাংলাদেশের মানুষ থেকে মন্ত্রী বানানো হবে: তাহের

জনগণের ম্যান্ডেট পেয়ে সরকার গঠন করলে শুধু দল থেকে নয়, বাংলাদেশের মানুষ থেকে মন্ত্রী বানানো হবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের।

১০ ঘণ্টা আগে