সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন লড়াই, আলোচনায় যারা

প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ১২: ৩৫
(ওপরের সারিতে বাঁ থেকে) আফরোজা আব্বাস, নিলোফার চৌধুরী মনি, সৈয়দা আসিফা আশরাফী পাপিয়া ও নিপুন রায়; (মাঝের সারিতে বাঁ থেকে) তানিয়া রব, ব্যারিস্টার রাসনা ইমাম, কনকচাঁপা ও সানজিদা তুলি; (নিচের সারিতে বাঁ থেকে) সামিরা তানজিনা চৌধুরী, ফারজানা সিঁথি, নুরুন্নেসা সিদ্দিকা ও মারদিয়া মমতাজ। কোলাজ: রাজনীতি ডটকম

সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোতে মনোনয়ন দৌড় শুরু হয়েছে। রাজধানীর দলীয় কার্যালয়গুলোতে ভিড় বাড়ছে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের। আগামী ১২ মে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এ নির্বাচনের মনোনয়ন প্রতিযোগিতা যেমন জমে উঠেছে, তেমনি দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেত্রীদের মূল্যায়ন নিয়ে ভেতরে ভেতরে তৈরি হয়েছে আলোচনা-উদ্বেগ।

এবারের সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনে আনুপাতিক হারে বিএনপি জোট ৩৬টি, জামায়াত-এনসিপি জোট ১৩টি এবং স্বতন্ত্ররা ১টি আসন পাচ্ছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সংসদে কার্যকর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে দলগুলো এবার ত্যাগ, মেধা ও যোগ্যতাকে প্রধান বিবেচ্য হিসেবে ধরছে।

দলীয় সূত্রগুলো বলছে, গতকাল রোববার (১২ এপ্রিল) মনোনয়ন ফরম সংগ্রহের শেষ দিন পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ৫০০ ফরম বিক্রি হয়েছে এবং ৯০০-এর বেশি প্রার্থী তা জমা দিয়েছেন। বিপুল এই প্রার্থীর ভিড়ে নতুন মুখ ও তারকা প্রার্থীদের আগমনে দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেত্রীদের মধ্যে কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

বিএনপি জোট থেকে আলোচনায় যারা

বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১২ দলীয় জোটের মনোনয়ন দৌড়ে স্বভাবতই বেশি আলোচনায় রয়েছেন জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের শীর্ষ নেত্রীরা। এদের মধ্যে রয়েছেন সভাপতি আফরোজা আব্বাস, সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমেদ, সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক হেলেন জেরিন খান, শিরিন সুলতানা, নিলোফার চৌধুরী মনি ও রেহানা আক্তার রানু।

এ ছাড়া ঢাকা ও তৃণমূল পর্যায়ের সক্রিয় নেত্রীদের মধ্যে আলোচনায় আছেন অ্যাডভোকেট নিপুন রায় চৌধুরী, সেলিমা সুলতানা নিশিতা, অ্যাডভোকেট আরিফা সুলতানা রুমা, ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি, খায়রুন্নাহার, সৈয়দা আসিফা আশরাফী পাপিয়া ও বিলকিস জাহান শিরিন।

মনোনয়ন দৌড়ে রয়েছেন ইডেন কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ও বর্তমান নেত্রীরাও। আলোচনা আছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কুয়েত মৈত্রী হল শাখা ছাত্রদলের সাবেক সভানেত্রী মির্জা কামরুন নাহার নার্গিস। তিনি ১৯৮৭ সালে টাঙ্গাইলে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সময় পুলিশের গুলিতে নিহত শহিদ মির্জা আবু রায়হান জগলুর বোন।

একই সঙ্গে বিনোদন অঙ্গন থেকেও এবার রেকর্ড সংখ্যক তারকা মনোনয়ন চেয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন বেবি নাজনিন, কনকচাঁপা, রিজিয়া পারভিন ও দিঠি আনোয়ার।

সাংস্কৃতিক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে হাসনা জসিমউদ্দিন মৌদুদ এবং ব্যারিস্টার সালিমা বেগম অরুণীর নামও আলোচনায় রয়েছে। পেশাজীবীদের মধ্যে রয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, চিকিৎসক ও সাহিত্যিকসহ একাধিক বিশিষ্ট নারী।

পেশাজীবীদের মধ্য থেকে মনোনয়ন দৌড়ে আছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার রাসনা ইমাম; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক নাজমা সুলতানা ঝংকার, অধ্যাপক আজমরি ইসলাম; তাহমিনা বেগম রিপা, ডাক্তার সানসিলা জেবরিন প্রিয়াঙ্কা, ডাক্তার নাহরিন খান এবং সাবিরা সুলতানা।

পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য থেকেও অনেকেই মনোনয়নপ্রত্যাশী। এ তালিকায় প্রয়াত বিএনপি নেতা হারিস চৌধুরীর মেয়ে সামিরা তানজিনা চৌধুরী, খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের পরিবারের কয়েকজন সদস্য, ব্যারিস্টার শাকিলা ফারজানা, ফানা চৌধুরী বেবি, সাবলিনা খান, আদিবা হোসেন, অ্যাডভোকেট হাসিনা আহমদ ও রুমানা মাহমুদ অন্যতম।

এ ছাড়া গত বছরের আগস্টে শাহবাগে সেনাবাহিনীর এক কর্মকর্তার সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে ভাইরাল হওয়া ফারজানা সিঁথিও নড়াইল-২ আসন থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। তিনি বর্তমানে আন্তর্জাতিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা দ্য হাঙ্গার প্রজেক্টের বরগুনা সদর শাখার সাধারণ সম্পাদক এবং গভর্নমেন্ট কলেজ অব অ্যাপ্লাইড হিউম্যান সায়েন্সের শিক্ষার্থী।

বিএনপি জোটে থাকা অন্যান্য দলও নিজেদের প্রার্থিতা নিয়ে তৎপর। গণতন্ত্র মঞ্চের নেতা আ স ম আব্দুর রবের স্ত্রী তানিয়া রব, গণসংহতি আন্দোলনের সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকির স্ত্রী তসলিমা আক্তার, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হকের মেয়ে ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ডক্টর মোশরেকা অদিতি হকও আলোচনায় আছেন।

গণ অধিকার পরিষদ থেকেও অন্তত দুই-তিনজন নেত্রীর নাম প্রস্তাব করার কথা শোনা যাচ্ছে। এ ছাড়া বিনপির মনোনয়ন নিয়েছেন গুমের শিকার পরিবারের স্বজনদের সংগঠন ‘মায়ের ডাকে’র সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম তুলি। তার নামও রয়েছে আলোচনায়।

জাতীয় পার্টির (কাজী জাফর) প্রয়াত নেতা কাজী জাফরের মেয়ে জয়া কাজী, সৈয়দ এহসানুল হুদার স্ত্রী রোকসানা শারমিন এবং ন্যাশনাল পিপলস পার্টির (এনপিপি) চেয়ারম্যান ডক্টর ফরিদুজ্জামান ফরহাদের স্ত্রীও বিএনপির মনোনয়ন নিয়েছেন।

উল্লেখ্য, সৈয়দ এহসানুল হুদা বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান ছিলেন। গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর নিজের দল বিলুপ্ত করে নেতাকর্মীদের নিয়ে তিনি বিএনপিতে যোগ দিয়েছেন। তার স্ত্রী রোকসানা শারমিন বলেন, আমার স্বামী বিগত দিনে অনেক মামলা-হামলার শিকার হয়েছেন এবং আমি নিজেও নারী সমাজকে সংগঠিত করতে কাজ করছি, সুযোগ পেলে আমি আদর্শিক ভূমিকা পালন করব।

বিএনপির তৃণমূলে উদ্বেগ-শঙ্কা

নতুন ও তারকা প্রার্থীদের এই ব্যাপক উপস্থিতিতে দীর্ঘদিনের তৃণমূল নেত্রীদের মধ্যে উদ্বেগও দেখা দিয়েছে। দীর্ঘ সতেরো বছর আন্দোলন-সংগ্রামে যুক্ত ছিলেন উল্লেখ করে এক তৃণমূল নেত্রী বলেন, ‘দুই মাসের বাচ্চাকে রেখেও আমি দলের জন্য কাজ করেছি, তাই দল যেন আমার ত্যাগ ভুলে না যায়।’

তবে দলীয় মনোনয়ন প্রসঙ্গে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ বলেন, “যারা গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন, তাদেরই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে।” এ ছাড়া সেলিব্রিটিদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলের জন্য সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে কাজ করে।

জামায়াত-এনসিপি জোট থেকে আলোচনায় যারা

জামায়াতে ইসলামী-এনসিপি জোট তাদের ১৩টি আসনের জন্য ১২ জনের একটি প্রাথমিক তালিকা চূড়ান্ত করেছে। এদের মধ্যে আলোচনায় রয়েছেন জামায়াতের মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি অধ্যক্ষ নুরুন্নেসা সিদ্দিকা, কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট সাবিকুন্নাহার মুন্নি, সাবেক সংসদ সদস্য ডাক্তার আমিনা বেগম, ডাক্তার হাবিবা চৌধুরী সুইট এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা মারদিয়া মমতাজ।

জামায়াতের দলীয় সূত্র বলছে, সরাসরি নির্বাচিত এমপিদের পরিবারের কাউকে মনোনয়ন দেওয়া হবে না, সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় ও যোগ্য নারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। যেসব এলাকায় তাদের পুরুষ প্রার্থীরা জয়ী হতে পারেননি, রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষায় সেসব এলাকার যোগ্য নারীদের তারা অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।

সব মিলিয়ে, সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনে বিপুল সংখ্যক প্রার্থীর উপস্থিতিতে মনোনয়ন বাছাই যেমন জটিল হয়ে উঠেছে, তেমনি দীর্ঘদিনের ত্যাগ ও সাংগঠনিক ভূমিকার স্বীকৃতি নিয়ে ভেতরে ভেতরে আলোচনা ও প্রত্যাশাও বাড়ছে। ফলে আসন্ন নির্বাচন শুধু আসন বণ্টনের বিষয় নয়, বরং দলগুলোর অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য ও রাজনৈতিক মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।

ad
ad

রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

একাত্তরে তো বিএনপির জন্মই হয়নি: জামায়াত আমির

শফিকুর রহমান বলেন, ‘বিএনপি এখন গর্ব করে বলে— একাত্তরও তাদের, নব্বইও তাদের, চব্বিশও তাদের। সবকিছু তাদের, আর কারও কিছু নাই। একাত্তরে তো বিএনপির জন্মই হয়নি, একাত্তর তাদের হয় কীভাবে!’

৩ দিন আগে

ফ্যাসিবাদ কায়েমের ইঙ্গিত দিচ্ছে সরকার : জামায়াত আমির

জামায়াতের আমির দাবি করেন, জুলাই জাদুঘর জনগণের সম্পদ হলেও সেটিকে দলীয়করণের পথে নেওয়া হচ্ছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, বিএনপি সংস্কার পরিষদের শপথ না নিয়ে জাতির সঙ্গে প্রতারণা করেছে এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যেমন ক্রিকেট বোর্ড, বিশ্ববিদ্যালয় ও জেলা পরিষদে প্রভাব বিস্তার করছে।

৩ দিন আগে

বিএনপি কার্যালয়ে হট্টগোলের মুখে কনকচাঁপা, রিজভীর নিন্দা

দলের জন্য নিজের ত্যাগের বর্ণনা দিয়ে শিল্পী বলেন, ‘মানসিক ও অর্থনৈতিকভাবে নিঃস্ব হয়ে গেছি। একজন শিল্পী গাইতে না পারলে তার কী বাকি থাকে বলুন? বাংলাদেশের মাটিতে কোথাও কোনো গান গাইতে পারিনি। আমার ক্যারিয়ার হারানো বা নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার কি কোনো স্বীকৃতি আমি পেতে পারি না?’

৩ দিন আগে

আমরা আবারও আন্দোলনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি : নাহিদ ইসলাম

নাহিদ বলেন, আপনাদের প্রতি আহ্বান ও অনুরোধ থাকবে, আমরা আবারও আন্দোলনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। আমরা দল-মত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ আছি। এটি কোনো দলের বা জোটের বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশকে রক্ষা করার এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানকে রক্ষার বিষয়। জুলাইয়ের শহীদদের রক্ত যেন বৃথা না যায়, সেই লক্ষ্যে আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকব।

৩ দিন আগে