রাষ্ট্রের অনানুষ্ঠানিক ক্ষমতাকেন্দ্র: কী এই কিচেন কেবিনেট? হঠাৎ কেন আলোচনায়?

প্রতিবেদক, রাজনীতি ডটকম
অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস ২০২৫ সালের ১০ মে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। ফাইল ছবি: পিআইডি

বিগত কয়েক দিনে দেশের রাজনৈতিক ও ও প্রশাসনিক অঙ্গনে সবচেয়ে আলোচিত শব্দ ‘কিচেন কেবিনেট’। অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক একাধিক উপদেষ্টার বিস্ফোরক বক্তব্যে সামনে এসেছে এমন এক অনানুষ্ঠানিক ক্ষমতাকেন্দ্রের অভিযোগ, যারা উপদেষ্টা পরিষদের আনুষ্ঠানিক কাঠামোর বাইরে থেকে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তার করতেন।

সাবেক বেশ কয়েকজন উপদেষ্টা অভিযোগ করেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে শেষ দেড় বছর রাষ্ট্র পরিচালনার মূল সিদ্ধান্তগুলো কোনো আনুষ্ঠানিক উপদেষ্টা পরিষদের সভায় নেওয়া হয়নি; বরং নেওয়া হয়েছে পর্দার আড়ালে থাকা এক অদৃশ্য চক্রের ইশারায়। প্রশ্ন উঠেছে— কারা ছিলেন এই ‘কিচেন কেবিনেটে’র সদস্য, কীভাবে তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতেন, আর কেন এখন হঠাৎ করে এই বিতর্ক তীব্র হয়ে উঠেছে?

পররাষ্ট্র বিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনের একটি টেলিভিশন সাক্ষাৎকারের পর থেকে এই বিতর্ক এমন মোড় নিয়েছে যে, খোদ সরকারের ভেতরেই একে অপরকে দায়ী করার হিড়িক পড়েছে। রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা এই গোষ্ঠী আসলে কারা এবং কেন তারা সাংবিধানিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে দেশ চালাচ্ছিল, সেই প্রশ্নই এখন সাধারণ মানুষের মুখে মুখে।

রাজনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ইতিহাসে ‘কিচেন কেবিনেট’ শব্দটির জন্ম হয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম প্রেসিডেন্ট অ্যান্ড্রু জ্যাকসনের শাসনামলে। সে সময় আনুষ্ঠানিক মন্ত্রিসভাকে পাশ কাটিয়ে ঘনিষ্ঠ কিছু ব্যক্তি ও বন্ধুদের নিয়ে জ্যাকসন রাষ্ট্র পরিচালনার অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করতেন, যা ছিল চরম অস্বচ্ছ। আজকের দিনেও এই শব্দটির অর্থ প্রায় একই, এমন এক অনানুষ্ঠানিক উপদেষ্টা বলয় যারা সরাসরি জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য নয়, অথচ রাষ্ট্র পরিচালনার সবচেয়ে স্পর্শকাতর সিদ্ধান্তগুলো তারাই নির্ধারণ করে।

বাংলাদেশে এই বিতর্কের সূত্রপাত গত ২৫ মে, যখন সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা এম তৌহিদ হোসেন যমুনা টেলিভিশনে অকপটে স্বীকার করেন যে, অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তগুলো একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী নিয়ন্ত্রণ করত। তিনি বলেন, ‘কোনো এক উপলক্ষ্যে কিচেন কেবিনেটের একটা বৈঠকে আমাকে যেতে হয়েছিল যমুনাতে। পরে জেনেছি প্রতি মঙ্গলবার তারা বসেন। সিদ্ধান্ত নিতো কেউ কেউ, এ ধরনের কথাবার্তা শোনা যেত। আমার কানেও আসতো। এর বাইরে আসলে আমার জানা ছিল না যে এ রকম একেবারে একটা গ্রুপ আছে, যারা নিয়মিত বসে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য।’

তিনি আরও জানান, মন্ত্রণালয়ের কাজে এই গোষ্ঠীর হস্তক্ষেপ ও অযাচিত প্রভাব এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে, তিনি তিনবার পদত্যাগের কথা ভেবেছিলেন।

এই গোষ্ঠীর প্রভাবের বিষয়ে একই সুর শোনা গেছে সাবেক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেনের কণ্ঠেও। তিনি আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে বড় সিদ্ধান্তগুলো কেবিনেটে হতো না, বরং কেবিনেটের বাইরে আলোচনা হতো। এসব আলোচনার মধ্যেও আমি থাকিনি। আমাকে রাখাও হয়নি। দেশটা তখন এক অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির মধ্যে ছিল। উপদেষ্টাদের কেউ আমাকে ডাকেওনি।’

এই পরিস্থিতির বিপরীতে এসে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করার চেষ্টা করেছেন সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টা ও জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। ২৬ মে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘আমিও বলেছি কিচেন কেবিনেট ছিল, কিন্তু আমি সেটার সদস্য ছিলাম না।’

তার এই বক্তব্য কিচেন কেবিনেটের অস্তিত্বকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে নিলেও, তিনি এর দায় থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখেছেন। উল্টো তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া বিতর্কিত বাণিজ্য চুক্তির দায় তৎকালীন নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং বিএনপির ওপর চাপিয়েছেন। আসিফ মাহমুদের অভিযোগ, ‘এই চুক্তি সম্পূর্ণ তারেক রহমান ও বিএনপির ইচ্ছেতে হয়েছে।’

সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মাহফুজ আলম বিষয়টিকে দেখেছেন আরও ভিন্ন আঙ্গিকে। ১৯ মে দেওয়া এক ফেসবুক পোস্টে তিনি একে ‘আমলাতান্ত্রিক কিচেন কেবিনেট’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। মাহফুজ আলমের দাবি, জুলাই অভ্যুত্থানের লক্ষ্য ও সংস্কার কাজকে বাধাগ্রস্ত করতে বিএনপি, জামায়াত ও আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের নিয়ে এই আমলাতান্ত্রিক চক্রটি সক্রিয় ছিল। তার মতে, নতুন মিডিয়া অনুমোদনে বাধা দেওয়া বা জুলাইয়ের সংস্কার সনদ ভেস্তে দেওয়ার পেছনেও ছিল এই গোষ্ঠীটির কারসাজি।

এই পুরো ঘটনাপ্রবাহের ওপর ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষণের আলো ফেলেছেন অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের। তৌহিদ হোসেনের বক্তব্যের সূত্র ধরে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, পর্দার আড়ালের এই ব্যক্তিদের অনেকের পরিচয়ই রাজনৈতিক মহলের কাছে পরিচিত। তিনি সাবেক উপদেষ্টা আদিলুর রহমানকে ব্যঙ্গাত্মকভাবে ‘শেফ অফ দ্য পার্টি’ আখ্যা দিয়ে সতর্ক করেছেন যে, রাষ্ট্র পরিচালনার এই কৌশল কেবল অভ্যন্তরীণ নয়, বরং বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অংশ।

প্রকৃতপক্ষে, কিচেন কেবিনেট কোনো সাংবিধানিক ফোরাম নয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যেখানে মন্ত্রিসভা বা উপদেষ্টা পরিষদ আলোচনা-সমালোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেবে, সেখানে একটি ক্ষুদ্র চক্রের গোপন বৈঠক রাষ্ট্রীয় কাঠামোকেই ভেতর থেকে দুর্বল করে ফেলে। বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের অনানুষ্ঠানিক বলয় যখন জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে উঠে যায়, তখন তা কেবল ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করে না, বরং পুরো রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎকে ঝুঁকিতে ফেলে। এই বিতর্ক শুধু অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যর্থতার গল্প নয়, বরং এটি একটি সাবধানবাণী।

গত বছর বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী সতর্ক করেছিলেন যে, সরকারের কিছু উপদেষ্টা প্রধান উপদেষ্টার কান ভারী করছেন। আজ সেই সতর্কতাই যেন বাস্তব হয়ে সামনে এসেছে। বর্তমানে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী একইভাবে বর্তমান বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধেও হাওয়া ভবনের কিচেন কেবিনেট দিয়ে দেশ চালানোর অভিযোগ তুলেছেন। সব মিলিয়ে, এই সত্যের উদ্ঘটন কেবল মুখোশ উন্মোচনের জন্য নয়, বরং রাষ্ট্রকে পুনরায় নৈতিকতা ও জবাবদিহিতার জায়গায় ফিরিয়ে আনার জন্য জরুরি।

রাজনীতি/এনআইআর

ad
ad

রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

সংবিধান সংশোধন কমিটির বৈঠক ৪ আগস্ট, বিরোধী দলের ৫ পদ এখনো শূন্য

জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে গঠিত জাতীয় সংসদের সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটি প্রথমবারের মতো আগামী ৪ আগস্ট বৈঠকে বসছে। তবে সংবিধান সংস্কার নাকি সংশোধন— এ মৌলিক মতপার্থক্যের কারণে বিরোধী দল এখনো কমিটিতে যোগ না দেওয়ায় তাদের জন্য নির্ধারিত পাঁচটি পদ শূন্যই থাকছে।

১০ ঘণ্টা আগে

‘কিছুই বদলায়নি’, রাষ্ট্র-প্রশাসনে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন না হওয়ায় আক্ষেপ মির্জা ফখরুলের

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মানুষের আত্মত্যাগ এবং পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার গঠনের পরও রাষ্ট্র ও প্রশাসনে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন না হওয়ায় আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, ‘আমি দেখছি যে, কিছুই বদলায়নি।’

১১ ঘণ্টা আগে

সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে সম্মত ঢাকা-দিল্লি: পররাষ্ট্রমন্ত্রী

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা উভয়েই একমত, পারস্পরিক স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এবং আমি যেমন সবসময় বলি, সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে আমাদের দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়া উচিত।’

১৫ ঘণ্টা আগে

হবিগঞ্জ শহরে পৌঁছাতেই পারেননি এনসিপি নেতারা, লিখিত অভিযোগ দিলেন পুলিশ ফাঁড়িতে

অভিযোগ অনুযায়ী, হবিগঞ্জে এনসিপির নেতাকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত জেলা ছাত্রদলের সভাপতি শাহ রাজিব আহমেদ রিংগন। এ ছাড়া আরও ১০ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত ১০০ জনের বিরুদ্ধে এনসিপি নেতাদের গাড়িবহরে হামলা ও নেতাকর্মীদের মারধরের অভিযোগ করেছে দলটি।

১ দিন আগে