মানসিক চাপে ৫ হাজার মার্কিন সেনা, ফিরে যাচ্ছে আব্রাহাম লিংকন

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন। ১০ মার্চ ২০২৬। ছবি: সংগৃহীত

দীর্ঘ ২৬৬ দিন অভিযানে থাকার পর দেশে ফিরতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন। এর মধ্যে ২০০ দিনের বেশি সময় এটি সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে মোতায়েন ছিল। দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর এই অভিযানে রণতরিটিতে থাকা প্রায় পাঁচ হাজার নাবিক ও সেনাসদস্যের মানসিক স্বাস্থ্য ও মনোবল নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এমনকি আত্মহত্যার ঝুঁকি নিয়েও সতর্ক করেছেন তাদের পরিবারের সদস্যরা।

রোববার (১৬ আগস্ট) গালফ নিউজের খবরে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি হাং কাও জানিয়েছেন, রণতরিটি শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্রে ফিরবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, জাহাজের নাবিকদের কল্যাণ ও নিরাপত্তাই অগ্রাধিকার।

দীর্ঘ সময় ধরে রণতরিটির মোতায়েন থাকা নিয়ে এরই মধ্যে মার্কিন কংগ্রেসের সদস্য এবং জাহাজে কর্মরত নাবিকদের পরিবারের সদস্যরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। নাবিকদের মধ্যে মনোবল কমে যাওয়া ও মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যার খবর প্রকাশের পর এ নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে।

হাং কাও বলেন, পরিকল্পিত পালাবদলের অংশ হিসেবেই ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনকে দেশে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। মিশনের প্রয়োজনেই লিংকনের মোতায়েনের সময় বাড়ানো হয়েছিল। তবে দীর্ঘ সময় ধরে মোতায়েন থাকা কঠিন, আর যুদ্ধ অভিযান সেটিকে আরও কঠিন করে তোলে।

সিএনএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের মধ্যে মার্কিন অভিযানকে সহায়তা করতে আব্রাহাম লিংকনকে পশ্চিম এশিয়ায় (মধ্যপ্রাচ্য) পাঠানো হয়। যুদ্ধটি এখন ষষ্ঠ মাসে পড়েছে। রণতরিটি ২৫০ দিনের বেশি সময় ধরে মোতায়েন রয়েছে। গত ২০০ দিনের বেশি সময়ে রণতরিটি কোনো বন্দরে নোঙর করেনি।

এ বিষয়ে হাং কাও বলেন, মোতায়েনের সময় জাহাজের নাবিকদের কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। তাজা খাবারের সরবরাহ না থাকায় খাবারের তালিকায় পরিবর্তন আনতে হয়েছে। আবার অভিযান নিয়ে হুমকি বেড়ে গেলে বাড়িতে ফোন করার ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

নৌবাহিনীর এই ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি আরও বলেন, মোতায়েনের সময় অল্পসংখ্যক নাবিক মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যার জন্য চিকিৎসা নিয়েছেন। তবে কোনো প্রাণহানি ঘটেনি।

সিএনএন জানিয়েছে, গত মাসে রণতরিটি থেকে এক নাবিক পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। পরে দ্রুত তাকে উদ্ধার করা হয় এবং চিকিৎসকেরা তার শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করেন। ওই নাবিক পরে দায়িত্বে ফিরেছেন, নাকি তাকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত জানা যায়নি।

আব্রাহাম লিংকন গত বছরের নভেম্বরে সান ডিয়েগোতে অবস্থিত নিজ ঘাঁটি থেকে যাত্রা শুরু করে। পরে এটিকে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধক্ষেত্রে মোতায়েন করা হয়।

হাং কাও বলেন, মোতায়েনের সময় রণতরিটি ১০ হাজারের বেশি উড্ডয়ন অভিযান পরিচালনা করেছে এবং ১৫ লাখ পাউন্ডের গোলাবারুদ নিক্ষেপ করেছে। মার্কিন বিমানবাহী রণতরিগুলোর মধ্যে এই জাহাজের নাবিকদের মোতায়েন রাখার হারও অন্যতম সর্বোচ্চ বলে জানান তিনি।

তিনি বলেন, ‘এতে কোনো সন্দেহ নেই যে আমাদের তরুণ নারী-পুরুষদের সক্ষমতার শেষ সীমা পর্যন্ত ঠেলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তারা কখনো ভেঙে পড়েননি।’ তবে এই শীর্ষ কর্মকর্তা স্বীকার করেন, দীর্ঘ সময়ের যুদ্ধ অভিযান অনিশ্চয়তা ও নানা ধরনের বিঘ্ন তৈরি করে। সামরিক নেতৃত্বকে তাই অভিযানের প্রয়োজন এবং সেনাসদস্যদের কল্যাণের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হয়।

তবে যুদ্ধজাহাজটির নাবিক ও মেরিন সেনাদের ‘ভুক্তভোগী’ হিসেবে বর্ণনা করতেও আপত্তি জানান হাং কাও। তিনি বলেন, পুরো অভিযান জুড়ে তারা এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছেন। হাং কাও বলেন, “তাদের (মার্কিন সামরিক বাহিনীর সদস্য) নিরাপত্তা ও সুরক্ষাই সব সময় প্রথম অগ্রাধিকার। রণতরিটি দেশে ফেরার পর এর নাবিকদের জন্য ‘বীরোচিত অভ্যর্থনা’র আয়োজন করা উচিত।”

প্রসঙ্গত, সম্প্রতি নিউইয়র্ক টাইমস, এনবিসি নিউজসহ বিভিন্ন মার্কিন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা যায়, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর দায়িত্ব পালনের পর কবে নাগাদ দেশে ফেরা যাবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকা যুদ্ধজাহাজটির নাবিক ও সেনাদের মানসিক স্বাস্থ্যের চরম অবনতি ঘটেছে। একই সঙ্গে তাদের মধ্যে আত্মহত্যার ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নাবিকদের পরিবার ও সহকর্মীরা।

এই উদ্বেগের কথা সরাসরি মার্কিন নৌবাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে তুলে ধরেছে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। সান ডিয়েগোতে গত সপ্তাহে অনুষ্ঠিত এক উত্তপ্ত টাউন হল সভায় হাং কাও ও অন্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সামনে পরিবারের সদস্যরা এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তবে কর্মকর্তারা তাদের বক্তব্যের কোনো সরাসরি জবাব দেননি।

সভায় নাবিকদের মানসিক স্বাস্থ্য ও আত্মহত্যার ঝুঁকি নিয়ে পরিবারের সদস্যরা যে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, সে বিষয়ে নৌবাহিনী ঠিক কী ব্যবস্থা নিচ্ছে, তাও সুনির্দিষ্টভাবে জানানো হয়নি। তবে নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়, রণতরিটিতে পরামর্শক, চ্যাপলিন (ধর্মীয় শিক্ষক), বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং অন্যান্য জরুরি সহায়তাসহ মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার একটি সুসংগঠিত ব্যবস্থা চালু রয়েছে।

পরিবারের সদস্য ও নাবিকদের অভিযোগ, ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনে থাকা প্রায় পাঁচ হাজার সেনাসদস্য চরম খাদ্য ও পানিসংকটের মুখোমুখি হয়েছেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চিঠি বা ডাক যোগাযোগে বিঘ্ন এবং একটানা দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, যেখানে বিশ্রামের সুযোগও খুব কম।

বর্তমানে নাবিক ও ক্রুদের মনোবল এতটাই ভেঙে পড়েছে যে তারা সামনে কোনো বন্দরে বিশ্রামের সুযোগও চান না; বরং যত দ্রুত সম্ভব দেশে ফিরতে চান। এক নাবিকের আকুতি, ‘এ মুহূর্তে আসলে আমাদের আর কোনো প্রত্যাশা নেই। আমরা শুধু বাড়ি ফেরার একটি সুনির্দিষ্ট তারিখ চাই।’

Ad
Ad
ad
ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

গাজার ধ্বংসস্তূপ ফুঁড়ে বের হচ্ছে মরদেহ: ২ ভবনে মিলল ২১ জনের দেহাবশেষ

এই দুই স্থানে অনুসন্ধান কার্যক্রম সমাপ্ত করার পর উদ্ধারকারীরা জানতে পারেন, জেইতুন এলাকার ‘আল-মাঘরিবি’ পরিবারের ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ির নিচে দীর্ঘদিন ধরে অন্তত ৪০ জনের মরদেহ চাপা পড়ে আছে। খবর পেয়েই সেখানে তল্লাশি ও উদ্ধার অভিযান শুরু করেছে সিভিল ডিফেন্সের দল।

১০ ঘণ্টা আগে

হরমুজ নিয়ে ট্রাম্পের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান ইরানের, জ্বালানি বাজারে নতুন অনিশ্চয়তা

তেহরান বলছে, হরমুজ ‘ইরানের ছিল, ইরানের আছে এবং ইরানেরই থাকবে।’ এমন তীব্র প্রতিক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ এই নৌ পথকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনাকে উসকে দিয়েছে। পাশাপাশি নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে কূটনৈতিক ও জ্বালানি বাজারেও।

২০ ঘণ্টা আগে

ইন্দোনেশিয়ায় ভূমিকম্পে নিহত ২০, ধ্বংসস্তূপে আটকা অনেকে

উদ্ধারকারী সংস্থার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভূমিকম্পের পর ফ্লোরেস দ্বীপের সিকা জেলার প্রধান শহর মাউমেরেতেই এখন পর্যন্ত ২০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। আরও ছয়জন আহত হয়েছেন এবং ধ্বংসস্তূপের নিচে দুজন আটকা পড়েছেন।

১ দিন আগে

ইসরায়েলি হামলায় লেবাননে ৭ জন নিহত

সিভিল ডিফেন্সের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ধ্বংসস্তূপের নিচে উদ্ধার অভিযান এখনো চলমান রয়েছে। ফলে এটি প্রাথমিক তথ্য এবং হতাহতের সংখ্যা পরবর্তীতে আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

১ দিন আগে