ন্যাটো মিত্রদের ‘শাস্তি’র চিন্তা পেন্টাগনে— স্পেনকে স্থগিত, ফকল্যান্ড নিয়ে নতুন ভাবনা

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০২৬, ২২: ৪৭
ন্যাটোর মহড়ায় স্পেনের সামরিক বাহিনীর সদস্যরা। ছবি: সংগৃহীত

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রকে পূর্ণ সমর্থন না দেওয়ায় ন্যাটোর কিছু মিত্রদেশকে শাস্তি দেওয়ার বিকল্প নিয়ে আলোচনা চলছে— এমনটাই উঠে এসেছে পেন্টাগনের একটি অভ্যন্তরীণ ইমেইলে। এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ওই ইমেইলে ন্যাটোতে স্পেনের সদস্যপদ স্থগিত করা এবং ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে ব্রিটেনের দাবির প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পুনর্বিবেচনার মতো পদক্ষেপের প্রস্তাব রয়েছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই নীতিগত বিকল্পগুলো তৈরি করেছেন পেন্টাগনের শীর্ষ নীতিনির্ধারণী উপদেষ্টা এলব্রিজ কলবি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, ইরান যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রকে ঘাঁটি, আকাশসীমা ও ওভারফ্লাইট ব্যবহারের অনুমতি (এবিও) দিতে কিছু মিত্র দেশের অনীহা বা অস্বীকৃতিতে হতাশা থেকেই এ প্রস্তাবগুলো এসেছে।

কলবি ইমেইলে লিখেছেন, এবিও ন্যাটোর জন্য একেবারে ন্যূনতম ভিত্তি। একইসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, এ বিকল্পগুলো পেন্টাগনের উচ্চপর্যায়ে ঘুরছে। ইমেইলের একটি প্রস্তাবে ‘কঠিন’ দেশগুলোকে ন্যাটোর গুরুত্বপূর্ণ বা মর্যাদাপূর্ণ পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।

ট্রাম্পের চাপ ও ন্যাটো নিয়ে প্রশ্ন

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এরই মধ্যে ন্যাটো মিত্রদের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তার অভিযোগ, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অভিযানে মিত্ররা নিজেদের নৌ বাহিনী পাঠাতে রাজি হয়নি।

এর প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প এমনকি ন্যাটো থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে যাওয়ার সম্ভাবনার হুমকিও দিয়েছেন। গত ১ এপ্রিল রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘আপনি আমার জায়গায় থাকলে কি তা ভাবতেন না?’

তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইমেইলে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাটো ছাড়ার প্রস্তাব নেই। ইউরোপে ঘাঁটি বন্ধের কথাও বলা হয়নি, যদিও ইউরোপে মার্কিন সেনা কমানোর সম্ভাবনা আছে কি না— সে বিষয়ে তিনি মন্তব্য করেননি।

পেন্টাগনের মুখপাত্র কিংসলি উইলসন বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ন্যাটো মিত্রদের জন্য যা করেছে, তারপরও তারা আমাদের পাশে ছিল না। প্রেসিডেন্টকে এমন বাস্তবসম্মত বিকল্প দেওয়া হবে, যেন মিত্ররা ‘কাগুজে বাঘ’ হয়ে না থেকে নিজেদের দায়িত্ব পালন করে।

ইউরোপের ‘অধিকারবোধ’ কমাতে চাপ

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম ইরান যুদ্ধ ন্যাটোর ৭৬ বছরের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে। বিশ্লেষক ও কূটনীতিকরা বলছেন, এতে ইউরোপীয় দেশগুলো উদ্বিগ্ন। আক্রমণের শিকার হলে যুক্তরাষ্ট্র আদৌ পাশে দাঁড়াবে কি না, তা নিয়েই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

ব্রিটেন ও ফ্রান্সসহ কয়েকটি দেশ বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধে সরাসরি যোগ দেওয়া মানে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া। তবে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি হলে বা সংঘাত শেষ হলে তারা প্রণালি খোলা রাখতে সহায়তা করতে প্রস্তুত।

অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, ন্যাটো ‘একতরফা সম্পর্ক’ হতে পারে না। বিশেষ করে স্পেনের প্রতি তাদের ক্ষোভ বেশি। দেশটির সমাজতান্ত্রিক সরকার জানিয়েছে, ইরানে হামলার জন্য তাদের ঘাঁটি বা আকাশসীমা ব্যবহার করতে দেবে না। অথচ স্পেনে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দুটি সামরিক ঘাঁটি রয়েছে।

ইমেইলে প্রস্তাবিত পদক্ষেপগুলোর লক্ষ্য হিসেবে বলা হয়েছে, ইউরোপীয়দের মধ্যে থাকা ‘অধিকারবোধ’ কমিয়ে আনা এবং শক্ত বার্তা দেওয়া। স্পেনকে ন্যাটো থেকে স্থগিত করার প্রস্তাব সামরিকভাবে সীমিত প্রভাব ফেললেও প্রতীকীভাবে বড় বার্তা দেবে বলে এতে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে কীভাবে ন্যাটোতে স্পেনের সদস্যপদ স্থগিত করা হবে— সে বিষয়ে বিস্তারিত বলা হয়নি। এ নিয়ে ন্যাটোর ভেতরে এমন কোনো বিদ্যমান প্রক্রিয়া আছে কি না সেটিও স্পষ্ট নয়। স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এ বিষয়ে বলেন, ‘আমরা ইমেইলের ভিত্তিতে কাজ করি না; আমরা সরকারি অবস্থান ও নথির ভিত্তিতে কাজ করি।’

ফকল্যান্ড ইস্যুতে নতুন হিসাব

ইমেইলে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব হলো— ইউরোপীয় ‘ঔপনিবেশিক সম্পদ’ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সমর্থন পুনর্বিবেচনা করা। এর মধ্যে রয়েছে ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ, যা ব্রিটেন পরিচালনা করে, তবে আর্জেন্টিনা এখনো এ দ্বীপের মালিকানা দাবি করে।

আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হ্যাভিয়ের মিলেই ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত। তিনি ফকল্যান্ড দ্বীপ নিয়ে আশাবাদী সুরে বলেন, ‘আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি, যেন মালভিনাস (ফকল্যান্ড) আবার আর্জেন্টিনার হাতে ফিরে আসে। আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এ বিষয়ে বেশি অগ্রগতি হচ্ছে।’

১৯৮২ সালে এই দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে ব্রিটেন ও আর্জেন্টিনার মধ্যে যুদ্ধ হয়, যেখানে প্রায় ৬৫০ আর্জেন্টাইন ও ২৫৫ ব্রিটিশ সেনা নিহত হয়। শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনা আত্মসমর্পণ করে।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমারের মুখপাত্র বলেছেন, ‘সার্বভৌমত্ব যুক্তরাজ্যের হাতে এবং দ্বীপবাসীর আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারই এখানে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ— এটাই আমাদের অবস্থান।’

সম্পর্কের টানাপড়েন আরও স্পষ্ট

রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধ ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইউরোপ সম্পর্কের টানাপড়েন আরও স্পষ্ট হয়েছে। ট্রাম্প প্রকাশ্যে স্টারমারকে ‘দুর্বল’ বলে সমালোচনা করেছেন এবং তাকে ‘উইনস্টন চার্চিল নন’ বলেও কটাক্ষ করেছেন। ব্রিটেনের বিমানবাহী রণতরীকে তিনি ‘খেলনা’ হিসেবে উল্লেখ করেন।

শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রকে ব্রিটিশ ঘাঁটি ব্যবহার করে ইরানে হামলার অনুমতি দেয়নি লন্ডন। পরে অবশ্য ইরানের পালটা হামলার প্রেক্ষাপটে নিজেদের নাগরিকদের সুরক্ষায় প্রতিরক্ষামূলক মিশনে সীমিত অনুমতি দেয়।

মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, ‘এ যুদ্ধে অনেক কিছুই পরিষ্কার হয়ে গেছে। ইরানের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানতে না পারলেও ইউরোপে পৌঁছাতে পারে। আপনি যদি প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়াতে না চান, তাহলে সেটাকে প্রকৃত জোট বলা কঠিন।

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

ইরান যুদ্ধে বিশ্বব্যাপী মজুত অস্ত্রভাণ্ডারের বড় অংশ শেষ যুক্তরাষ্ট্রের

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের যেসব গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের মজুত উদ্বেগজনকভাবে কমে এসেছে, তার মধ্যে রয়েছে প্রিসিশন-স্ট্রাইক ক্ষেপণাস্ত্র, এটিএসিএমএস ক্ষেপণাস্ত্র এবং প্যাট্রিয়ট ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র।

১১ ঘণ্টা আগে

ইরাকি বিদ্রোহী নেতার মাথার দাম ১ কোটি ডলার ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের

ইরাকে ইরান-সমর্থিত একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠীর প্রধান হাশিম ফিনিয়ান রহিম আল-সরাজিকে ধরিয়ে দিতে ১ কোটি ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। শুক্রবার (২৪ এপ্রিল) গালফ নিউজের খবরে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

১১ ঘণ্টা আগে

ইরান অবরোধে দুই রণতরিসহ ২৬ যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন যুক্তরাষ্ট্রের

মধ্যপ্রাচ্য ও ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক উপস্থিতি আরও জোরদার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বর্তমানে ওই অঞ্চলে দুটি বিমানবাহী রণতরিসহ অন্তত ২৬টি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন রয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) মার্কিন প্রশাসনের এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে সিএনএনের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

১২ ঘণ্টা আগে

আরও ৩ সপ্তাহ বাড়ল লেবানন-ইসরায়েল যুদ্ধবিরতির মেয়াদ, ঘোষণা ট্রাম্পের

লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আরও তিন সপ্তাহ বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) হোয়াইট হাউসে দুই দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক শেষে এ ঘোষণা দেন তিনি।

১৫ ঘণ্টা আগে