ট্রাম্পকে রুখবে কে— প্রশ্ন মার্কিন গণমাধ্যমের

নাজমুল ইসলাম হৃদয়
আপডেট : ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ২০: ০৪
মার্কিন ম্যাগাজিন নিউজউইক, দ্য নিউ ইয়র্কার ও টাইম-এর কভারে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: সংগৃহীত

সভ্যতার মোড়কে মোড়ানো পশ্চিমা বিশ্বের আসল চেহারাটা আবারও নগ্ন হয়ে পড়েছে। উনিশ শতকে আমেরিকা একটি ভয়ানক দর্শন বিশ্বাস করত, যার নাম ছিল ‘ম্যানিফেস্ট ডেস্টিনি’ (Manifest Destiny)। তখন দেশটি মনে করত, সৃষ্টিকর্তা তাদের অধিকার দিয়েছেন আটলান্টিক থেকে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত পুরো মহাদেশ দখল করার। এই ‘অধিকারের’ দোহাই দিয়ে তারা নির্বিচারে হত্যা করেছে আদিবাসীদের, কেড়ে নিয়েছে তাদের ভিটেমাটি। আজ ২০২৬ সালে এসেও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাত ধরে সেই পুরনো, হিংস্র এবং বর্ণবাদী দর্শনই ফিরে এসেছে এক নতুন ও দানবীয় রূপে। বিশ্লেষকরা এর নাম দিয়েছেন ‘মেগা ম্যানিফেস্ট ডেস্টিনি’ (Mega Manifest Destiny)।

আগে আমেরিকার লক্ষ্য ছিল একটি মহাদেশ, আর এখন ট্রাম্পের এই ‘মেগা’ সংস্করণের ক্ষুধা পুরো পৃথিবী গিলে খাওয়ার। এটি এমন এক সর্বগ্রাসী মানসিকতা, যেখানে ওয়াশিংটন মনে করে বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করা, যেকোনো দেশের সম্পদ লুণ্ঠন করা এবং যেকোনো জাতির সার্বভৌমত্ব গুঁড়িয়ে দেওয়া তাদের জন্মগত ও বৈধ অধিকার। তাদের কাছে পৃথিবীটা যেন এখন আর কোনো স্বাধীন রাষ্ট্রের সমষ্টি নয়, বরং আমেরিকার ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হয়েছে।

এই ‘মেগা ম্যানিফেস্ট ডেস্টিনি’র স্বরূপ বুঝতে হলে তাকাতে হবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারের দিকে। নিউ ইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া সেই সাক্ষাৎকারে তিনি যা বলেছেন, তা শুনে বিশ্ববিবেক স্তম্ভিত। যখন তাকে প্রশ্ন করা হয় যে তার ক্ষমতার কোনো সীমা আছে কি না, কিংবা তিনি আন্তর্জাতিক আইন মানতে বাধ্য কি না, তখন ট্রাম্প অবলীলায় উত্তর দেন, ‘আমার আন্তর্জাতিক আইনের কোনো প্রয়োজন নেই। আমাকে থামানোর ক্ষমতা কোনো আইনের নেই, একমাত্র আমার নিজের মোরালিটি বা বিবেকই আমাকে থামাতে পারে।’

এই একটি বাক্যেই আমেরিকার বর্তমান পররাষ্ট্রনীতির পুরো কঙ্কালটি বেরিয়ে এসেছে। যে দেশের প্রেসিডেন্ট মনে করেন জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক আদালত বা জেনেভা কনভেনশন তার কাছে অর্থহীন, এবং তার নিজের খেয়াল-খুশিই হলো সর্বোচ্চ আইন, সেই দেশটি বিশ্বের নিরাপত্তার জন্য এক ভয়াবহ হুমকি।

ট্রাম্পের এই উক্তি প্রমাণ করে যে, ‘মেগা ম্যানিফেস্ট ডেস্টিনি’র মূল কথাই হলো— ‘আমেরিকা সব আইনের ঊর্ধ্বে। তারা নিজেদের বিচারক, জুরি এবং জল্লাদ মনে করে’। ট্রাম্প যখন বলেন, ‘আমি কাউকে আঘাত করতে চাই না’, তখন তা শতাব্দীর সেরা কৌতুক হিসেবে শোনায়। কারণ, আমেরিকার কাছে অন্য দেশের সার্বভৌমত্ব হরণ করা কোনো ‘আঘাত’ নয়, দেশটি বরং তা নিজের অধিকার হিসেবে মনে করে।

আমেরিকার এই আগ্রাসী রূপটি নিখুঁতভাবে ফুটে উঠেছে ‘দ্য নিউ ইয়র্কার’ ম্যাগাজিনের চলতি সংখ্যার প্রচ্ছদে (কভার)। সেখানে দেখা যাচ্ছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি বিশাল তেলের ব্যারেলে মুখ লাগিয়ে সরাসরি তেল পান করছেন। এই ছবিটি কেবল একটি কার্টুন নয়, এটি আমেরিকার ভোগবাদী এবং লুণ্ঠনকারী চরিত্রের এক ভয়াবহ প্রতিচ্ছবি।

‘মেগা ম্যানিফেস্ট ডেস্টিনি’র অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো পৃথিবীর প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। কভারে ট্রাম্পের তেল পানের দৃশ্যটি আসলে তৃতীয় বিশ্বের রক্ত পানেরই রূপক। ইরাক বা লিবিয়া ধ্বংস করে তারা যেমন তেল লুট করেছে, ট্রাম্পের ‘মেগা’ নীতিতে এখন পরিবেশ বা জলবায়ুর তোয়াক্কা না করে সেই একই কায়দাতে পৃথিবীর সম্পদ শুষে নেওয়ার এজেন্ডা বাস্তবায়িত হচ্ছে। ট্রাম্প পরিবেশগত বিধিনিষেধ তুলে দিয়ে তেল ও গ্যাস উৎপাদন বাড়াচ্ছেন। এটি কেবল জ্বালানির তৃষ্ণা নয়, এটি অন্যের সম্পদ কুক্ষিগত করার এক দানবীয় নেশা। নিজেরা মোটাতাজা হওয়ার জন্য বাকি বিশ্বকে পরিবেশগত বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেওয়া, এটাই হলো যুক্তরাষ্ট্রের উন্নয়নের মডেল।

অন্যদিকে, ‘টাইম’ এবং ‘নিউজউইক’ ম্যাগাজিনের চলতি সংখ্যার কভারে ট্রাম্পের কৌশলগত আগ্রাসনের চিত্র ফুটে উঠেছে। টাইম ম্যাগাজিনের কভারে ট্রাম্পকে দেখা যাচ্ছে দাবার বোর্ডের সামনে বসে চাল দিতে। শিরোনাম “TRUMP’S NEXT MOVE”। এখানে বিশ্ব রাজনীতিকে দেখানো হয়েছে একটি নিছক খেলা হিসেবে, যেখানে ট্রাম্প হলেন একচ্ছত্র খেলোয়াড় আর বাকি দেশগুলো একেকটি দাবার গুটি।

এই ছবিটিতে ‘মেগা ম্যানিফেস্ট ডেস্টিনি’র সবচেয়ে কুটিল দিকটি উন্মোচন করে। ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতিতে বন্ধুত্বের কোনো স্থান নেই, আছে কেবল প্রভু আর দাসের সম্পর্ক। দাবার বোর্ডে যেমন প্রয়োজনে সৈন্য বিসর্জন দেওয়া হয়, তেমনি আমেরিকা তাদের স্বার্থের জন্য আজ যাকে বন্ধু বলছে, কাল তাকেই ছুড়ে ফেলে দিতে দ্বিধা করবে না। ভেনেজুয়েলা, ইরান, এমনকি গ্রিনল্যান্ডকে নিয়ে ট্রাম্পের আগ্রহ প্রমাণ করে যে, তাদের কাছে দেশ বা জাতিসত্তা বলে কিছু নেই। সব কিছুই তাদের কাছে রিয়েল এস্টেট বা ব্যবসার পণ্য। ডলারের দাপট দেখিয়ে তারা ইতিহাস, ভূগোল এবং মানুষের আত্মসম্মান, সব কিছুই কিনতে চায়।

নিউজউইক তাদের শিরোনামে প্রশ্ন রেখেছে— ‘CAN ANYONE STOP HIM?’ (কেউ কি তাকে থামাতে পারবে?)। এই প্রশ্নের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক গভীর শঙ্কা। কারণ, ট্রাম্পের এই আগ্রাসী নীতি কেবল আমেরিকার সীমানায় আটকে নেই; এটি ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বব্যাপী। ছোট ও দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর ওপর নিজেদের ইচ্ছা চাপিয়ে দেওয়া, অর্থনৈতিক অবরোধ আর সামরিক হুমকির মাধ্যমে বিশ্বকে জিম্মি করে রাখাই এখন ওয়াশিংটনের একমাত্র লক্ষ্য। যার সাম্প্রতিক উদাহরণ দেখা যায়, আন্তর্জাতিক নিয়ম নীতির তোয়াক্কা না করে সোজা একটা দেশে ঢুকে সে দেশের প্রেসিডেন্টকে তুলে আনা, অথবা কোন রাখঢাকের বালাই না করে গ্রিনল্যান্ডকে চেয়ে বসার মতো লাগামহীন কর্মকান্ডে!

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, আমেরিকা বরাবরই নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য ‘গণতন্ত্র’ বা ‘সভ্যতা’ বিস্তারের নাটক সাজিয়েছে। উনিশ শতকে তারা বলত ‘বর্বরদের সভ্য করা’ তাদের দায়িত্ব, আর আজ ট্রাম্প বলছেন ‘আমেরিকা ফার্স্ট’। কিন্তু দুটোর সারমর্ম একই, লুণ্ঠন ও আধিপত্য। তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এই ‘মেগা ম্যানিফেস্ট ডেস্টিনি’ এক অশনি সংকেত।

ট্রাম্প যখন বলেন, ‘আমার বিবেকই আমাকে থামাবে’, তখন বুঝতে হবে তৃতীয় বিশ্ব এক ভয়াবহ সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আমেরিকার এই ‘মেগা ম্যানিফেস্ট ডেস্টিনি’ যদি থামানো না যায়, তবে বিশ্ব অচিরেই এমন এক অরাজকতার সাক্ষী হবে, যেখানে ‘জোর যার মুলুক তার’ নীতিই হবে একমাত্র বাস্তবতা। বিশ্ববাসীকে তাই আজ এই নতুন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সজাগ হতে হবে। কারণ স্বাধীনতা কোনো দেশের দান নয়, আর দাদাগিরি কোনো দেশের ‘সৃষ্টিকর্তাপ্রদত্ত অধিকার’ হতে পারে না।

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

সৌদি আরবের ৪ খনিতে মিলল ২ লাখ ২১ হাজার কেজি সোনা

মা’আদেনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বব উইল্ট বলেন, ‘এই ফলাফল দেখাচ্ছে কোম্পানির দীর্ঘমেয়াদি কৌশল মাঠপর্যায়ে কার্যকর। চারটি এলাকায় খননকাজের মাধ্যমে ৭০ লাখ আউন্সের বেশি সোনা উত্তোলন আমাদের সম্ভাবনাকে প্রতিফলিত করছে। এটি ভবিষ্যতে নগদ অর্থ প্রবাহ বৃদ্ধিতেও সহায়ক হবে।’

৮ ঘণ্টা আগে

আইসিজে-তে রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার মিয়ানমারের

শুনানির প্রথম দিনে গতকাল শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) মিয়ানমার সরকারের প্রতিনিধি কো কো হ্লাইং দাবি করেন, গাম্বিয়া এই অভিযোগের সপক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেনি এবং তাদের আনা দাবিগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।

৮ ঘণ্টা আগে

পারস্পরিক শুল্ক কমানোর ঘোষণা শি ও কার্নির

অন্যদিকে অটোয়া চীনা বৈদ্যুতিক যানের (ইভি) ওপর সর্বাধিক সুবিধাপ্রাপ্ত দেশের হারে ছয় দশমিক এক শতাংশ কর আরোপে সম্মত হয়েছে।

৯ ঘণ্টা আগে

গাজার জন্য 'বোর্ড অব পিস' গঠন করলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প

হোয়াইট হাউজ জানিয়েছে, বোর্ডের প্রতিটি সদস্যের জন্য গাজাকে স্থিতিশীল করা ও দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থাকবে।

১২ ঘণ্টা আগে