ঈদের আমেজ: শূন্য জ্যাকসন হাইটস যখন পূর্ণ

জাকিয়া আহমেদ, নিউইয়র্ক থেকে
ছোট ছোট টেবিলে সাজানো বাহারি পণ্যের পসরা (বাঁয়ে) ও মেহেদিরাঙা হাত দেখাচ্ছেন এক তরুণী (ডানে)। ছবি: রাজনীতি ডটকম

১২ বছরের সোহা চৌধুরী। ছোটবেলা থেকেই আত্মীয়স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীদের হাতে মেহেদি পরিয়েছে। এমনকি বিয়েতেও পরিবারের মানুষরা ভরসা রেখেছে ছোট্ট সোহার ওপর।

কিন্তু ১৯ মার্চ সকাল ১১টায় যখন যুক্তরাষ্ট্রের বাঙালিপাড়া হিসেবে পরিচিত জ্যাকসন হাইটসে গেলাম, দেখা গেল সোহা টেবিলের পাশে বসে আছে, পাশে মা। টেবিলের ওপর মেহেদিসহ অন্যান্য কিছু জিনিস।

কত মানুষের হাতে মেহেদি পরাতে পারবে— জানতে চাইলে কিছুটা মুখ ভার করে সোহার জবাব, আমি ছোট মানুষ বলে মানুষ হয়তো ভরসা করবে না। কিন্তু তারা তো জানে না, আমি কত সুন্দর সুন্দর ডিজাইন জানি।

হাতে মেহেদি পরাচ্ছে ছোট্ট সোহা। ছবি: রাজনীতি ডটকম
হাতে মেহেদি পরাচ্ছে ছোট্ট সোহা। ছবি: রাজনীতি ডটকম

খুলনার মেয়ে সোহা দুই বছর আগে বাবা-মায়ের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছে।

গত কয়েকদিন ধরে এখানে বৃষ্টি হলেও ঈদের আগের দিন আকাশে সূর্য ছিল। তবে বাতাসও ছিল। আর সকাল বলে তখনও জ্যাকসন হাইটস জমে ওঠেনি। মানুষ নেই, শূন্য জ্যাকসন হাইটস। তবে ‘চাঁনরাত’-এর আয়োজন শুরু হয়েছে। কেউ টেবিল পাতছে, কেউ আবার বিভিন্ন পোশাকের তাক সাজাচ্ছে। কেউ ঠিক করছে রাতের জন্য লাইটের তার। কিন্তু সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাতাসের তীব্রতাও বাড়ছিল। শীতে জমে যাওয়ার মতো অবস্থা।

পুরো জ্যাকসন হাইটস ঘুরে দেখা গেল, বড় বড় কাচে ঘেরা নামিদামি দোকানগুলোর পাশাপাশি রাস্তার দুই ধারে ছোট ছোট টেবিলে পসরা সাজাচ্ছেন সবাই। জায়নামাজ, টুপি, তসবিহ, পোশাক, জুতো, গয়না, খেলনা, ঘর সাজানোর নানা পণ্য, খাবারের দোকান— সেখানে কী নেই আসলে!

কেউ আবার টেবিল-চেয়ার বসিয়েছেন, কিন্তু তিনি এখন বসতে পারছেন না, পরে বসবেন। তার জন্য টেবিলের ওপর নাম লিখে রেখেছেন, যেন জায়গা আবার দখল না হয়ে যায়।

দুপুর সাড়ে ১২টার পর থেকে জ্যাকসন হাইটসে মানুষ বাড়তে লাগল, সঙ্গে বাতাসের তীব্রতাও। আর দুপুর দুইটার পর সূর্যটা একটু দেখা গেল, কিন্তু তাতে শীত কমল না। এরপর থেকেই শূন্য রাস্তাগুলো পূর্ণ হতে শুরু করে। আর ইফতারের পর সেখানে পা ফেলার মতো জায়গা ছিল না।

কেউ হয়তো একা, কেউ বন্ধুদের সঙ্গে, কেউ আবার পুরো পরিবার নিয়ে এসেছেন শেষ মুহূর্তের কেনাকাটায়।

স্টুডেন্ট ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে এসেছে নাবীসা ইসলাম। তিনিও বাসা থেকে দুটি চেয়ার আর একটি ছোট টেবিল নিয়ে বসেছেন মেহেদি পরানোর জন্য। দুপুর দুইটা পর্যন্ত কয়েকজনের হাতে মেহেদি পরিয়ে ছুটে গেলেন বিশ্ববিদ্যালয়ে— সেখানে আজ পরীক্ষা। পরীক্ষা দিয়ে ফিরে এসে আবার বসেন।

নাবীসা বললেন, দেশে বন্ধুদের আবদার ছিল ঈদের আগে এটা করার। সেদিন ফোনে কথা বলতে বলতেই এক বন্ধু এই আইডিয়া দিল। ভাবলাম, মন্দ না তো! কিছু টাকা এলে নিজের জন্যও কিছু করা যাবে। রাত ১১টায় বাড়ি ফেরার আগে নাবীসা জানালেন, আমার ভীষণ ভালো লাগছে। অনেকখানি হাতখরচের টাকা হয়ে গেছে। সেই সঙ্গে যারা এখানে আসার চিন্তা করছেন, তাদের উদ্দেশে বলেন— মেহেদি পরানো বা কিছু বিউটিফিকেশনের কাজ শিখে এলে অনেক স্টুডেন্টই এখানে নিজের খরচের পাশাপাশি ভালো আয় করতে পারবেন।

তার কথার সত্যতা মেলে মেহেদি স্টলগুলোতে— উপচে পড়া ভিড়ে। কেবল বাংলাদেশিরাই নয়, অন্য দেশের নারীরাও যেন নিজের হাত রাঙাতে মুখর। অনেককেই দেখা গেল এমন।

তবে ঈদ উপলক্ষ্যে কেবল বাংলাদেশি মুসলিমই নয়, অন্য দেশের অন্য ধর্মের মানুষরাও পসরা সাজিয়ে বসেছিলেন, ক্রেতারাও তা-ই। পাকিস্তান, তুরস্ক, ভারত— এদেরই বেশি দেখা গেল, তবে এর বাইরেও অনেকে ছিলেন। কেউ মেহেদি দিতে এসেছেন, কেউ কেনাকাটায়, কেউ আবার বিক্রেতা।

তাদেরই একজন মুজতুবা রশীদ। কী নেই তার ভাণ্ডারে— চুড়ি, জুতো, গয়না, ব্যাগ, প্লাস্টিকের ফুল। পাশে মেয়েকে নিয়ে বিক্রির ফাঁকে ফাঁকে কথা হলো তার সঙ্গে। হরেক রকম পণ্য থাকার কারণে তার বিক্রিও বেশ ভালো।

তিনি বললেন, উৎসব তো উৎসবই— তাতে কোনো ভেদাভেদ থাকে না। ঈদের মতো পূজা বা বড়দিনও তাই। এ যেন ফের মনে করিয়ে দিল— ধর্ম যার যার, উৎসব সবার।

এমন ছোট উদ্যোগের পাশাপাশি বড় বড় দোকানগুলোতেও ছিল ভিড়।

তারেক আহমেদ যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন ৩৬ বছর আগে। জ্যাকসন হাইটসে তিনি স্ত্রীর নামে দিয়েছেন ‘শিমু ফ্যাশন’। এখানে প্রধানত ভারতীয় ও পাকিস্তানি পোশাকের পাশাপাশি রয়েছে গয়নাও।

তারেক আহমেদ বলেন, ২৪ বছরের প্রতিষ্ঠান তার। তবে এবারের মতো ব্যবসায় মন্দা তিনি আগে দেখেননি। বিকেলে তিনি বলেন, এত বছর এই সময়ে এখানে পা ফেলার মতো অবস্থা থাকত না, কথা বলার ফুরসত ছিল না। তবে এবার ব্যবসায় মন্দা।

চলতি মাসে বারবার তুষারপাত, বৃষ্টি, শীত— সব মিলিয়ে এ অবস্থা। পুরো রমজান জুড়ে কেনাকাটা ছিল কম। ক্ষতিটা এবার বেশ ভালোই হয়েছে, যোগ করেন তিনি।

শিমু ফ্যাশনের পাশের দোকান ‘রোকসানা ফ্যাশন’। সেখান থেকে দুই মেয়েকে নিয়ে বের হয়েছেন সালমা ইসলাম।

বৃষ্টি-শীতের কথা বললেন তিনিও।

সালমা ইসলাম বলেন, এই আবহাওয়ার মধ্যে বাচ্চাদের নিয়ে বের হইনি। আজকের জন্যই রেখে দিয়েছিলাম। আগে কখনো এমন করিনি।

তবে ইফতারের পর পুরোদমে জমে ওঠে জ্যাকসন হাইটস।

রাত ১১টায় দেখা গেল, তরুণরা গোল হয়ে গান ধরেছে। শেষ গান শোনা গেল— ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি… জন্ম দিয়েছ তুমি মাগো, তাই তোমায় ভালোবাসি… আমার প্রাণের বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি… প্রাণের প্রিয় মা তোকে বড় বেশি ভালোবাসি’।

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

গাজায় জাতিগত নিধন: আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে ইসরায়েলের পক্ষ নেবে না জার্মানি

ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনের গাজায় গণহত্যা চালানোর অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সেখানে জাতিগতভাবে নিধন করে ফিলিস্তিনিদের নির্মূল করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। সে অভিযোগ নিয়েই দক্ষিণ আফ্রিকা দ্বারস্থ হয় আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের।

৬ ঘণ্টা আগে

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইসরায়েলের তেল শোধনাগারে আগুন

ইসরায়েলের হাইফা শহরে একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল শোধনাগারে হামলা চালিয়েছে ইরান। এতে সেখানে আগুন লাগার খবর পাওয়া গেছে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে হামলার ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের বিষয়ে কিছু জানা যায়নি। এ ছাড়া আগুন নিয়ন্ত্রণে এসেছে কি না, তাও জানা সম্ভব হয়নি।

১৭ ঘণ্টা আগে

কাতারের এলএনজি সক্ষমতায় ১৭% ক্ষতি, মেরামতে লাগবে ৫ বছর

ইরানের সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কাতারের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানি সক্ষমতার প্রায় ১৭ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে এবং ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলো পুরোপুরি মেরামতে তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন দেশটির জ্বালানি খাতের শীর্ষ কর্মকর্তা।

১৮ ঘণ্টা আগে

অন্যদের জন্য নিষেধাজ্ঞা, হরমুজ দিয়ে ইরানের তেল রপ্তানি অব্যাহত

ট্যাংকার ট্র্যাকিং ডেটা ও স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে ইরানের হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে তেল রপ্তানি অব্যাহত রাখার তথ্য উঠে এসেছে। বাণিজ্য বিশ্লেষণী প্রতিষ্ঠান কেপলার আর ট্যাংকার ট্র্যাকারও জানিয়েছে একই তথ্য।

১৯ ঘণ্টা আগে