চতুর্থ বছরে সুদানের গৃহযুদ্ধ— ড্রোন হামলা ও ইরান যুদ্ধের প্রভাবে দুর্দশা চরমে

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
গৃহযুদ্ধে বাস্তুচ্যুত সুদানিদের অনেককে আশ্রয় নিতে হয়েছে চাঁদ প্রজাতন্ত্রে। ছবি: সংগৃহীত

চতুর্থ বছরে প্রবেশ করেছে সুদানের গৃহযুদ্ধ, যা দেশের দুই-তৃতীয়াংশ মানুষকেই নির্ভরশীল করে তুলেছে মানবিক সহায়তার ওপর, প্রায় দুই কোটি মানুষের জন্য বয়ে এনেছে তীব্র খাদ্য সংকট আর দুর্ভিক্ষের শঙ্কা। ২০২৩ সালের ১৫ এপ্রিল শুরু হওয়া এ গৃহযুদ্ধ চতুর্থ বছরে এসেও সমান প্রাণঘাতী; বরং নতুন নতুন বিশ্ব বাস্তবতায় এ যুদ্ধ আরও বেশি প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে।

জাতিসংঘের তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের শুরু থেকে ড্রোন হামলায় এই সংঘাতে প্রায় ৭০০ বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। ড্রোনের ব্যবহার যখন চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে তখন ইরান যুদ্ধ ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতা সুদানে মানবিক সহায়তা কার্যক্রমকে জটিল করে তুলছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বলছে, পরিস্থিতি ক্রমাবনতি ঘটছে।

সুদানে সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনী র‌্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের মধ্যে এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ শুরু হয় ২০২৩ সালের ১৫ এপ্রিল, যা এখন চতুর্থ বছরে প্রবেশ করেছে। সহসাই এ যুদ্ধের অবসানও দেখছেন না বিশ্লেষকরা। চলমান এ সংঘাতকে ‘বেদনাদায়ক’ অভিহিত করে জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা প্রধান টম ফ্লেচার বলেন, ‘সুদানের পরীক্ষায় বিশ্ব ব্যর্থ হয়েছে।’

ড্রোন হামলায় বিপর্যস্ত জনজীবন

টম ফ্লেচার মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে বলেন, সুদানের চলমান সংঘাতে ড্রোনের ব্যবহার উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। প্রায় প্রতিদিনই ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটছে, বিশেষ করে বর্তমানে সংঘাতের প্রধান যুদ্ধক্ষেত্র দক্ষিণ কর্দোফান অঞ্চল ও রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারসের (আরএসএফ) নিয়ন্ত্রণে থাকা পশ্চিমাঞ্চলের দারফুরে ড্রোন হামলার হার বেশি।

চিকিৎসা সহায়তা সংস্থা ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস (এমএসএফ) জানিয়েছে, দারফুরে সুদানি সেনাবাহিনীর চালানো ড্রোন হামলায় মঙ্গলবারও (১৪ এপ্রিল) দুজন নিহত হয়েছেন। একই হামলায় আহত অন্তত ৫৬ জনকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে ইউনিসেফ জানিয়েছে, চলমান গৃহযুদ্ধে চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে হতাহতের শিকার শিশুর সংখ্যা প্রায় আড়াই শ। এর মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশের জন্য দায়ী ড্রোন হামলা।

ইউনিসেফের এক মুখপাত্র বলেন, ‘ড্রোন শিশুদের ঘরে, বাজারে, সড়কে, এমনকি স্কুল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কাছেও হত্যা ও আহত করছে।’

ইরান যুদ্ধের প্রভাবে মানবিক সহায়তায় সংকট

তিন বছর ধরে চলমান সংঘাতে সুদানে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন লাখো মানুষ। কোটি মানুষ এখন নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন সহায়তার ওপর। এ পরিস্থিতিতে ইরান যুদ্ধ সুদানে মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে এসেছে। ইরান যুদ্ধ ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা যেমন হুমকির মুখে, তেমনি সরাসরি সুদানে সরবরাহ শৃঙ্খলকে সরাসরি প্রভাবিত করছে।

জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা প্রধান টম ফ্লেচার সতর্ক জানান, সুদানে প্রায় তিন কোটি ৪০ লাখ মানুষ এখন মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। এ সংখ্যা দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ। শুধু তাই নয়, লাখো শিশু শিক্ষা থেকে বঞ্চিত, শত শত হাজার শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে। আর নারী ও কিশোরীরা ভয়াবহ যৌন সহিংসতার শিকার হয়ে চলেছে।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) জানায়, সুদানে এখন এক কোটি ৯০ লাখের বেশি মানুষ তীব্র খাদ্য সংকটে ভুগছে। দারফুর ও কর্দোফানের বিস্তীর্ণ এলাকায় দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

ডব্লিউএফপির জরুরি প্রস্তুতি ও সাড়া বিভাগের প্রধান রস স্মিথ বলেন, সুদানের পরিস্থিতি আগে থেকেই নাজুক। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি একে ভয়াবহভাবে আরও জটিল করে তুলছে।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের মধ্যে চলমান সংঘাতের কারণে মানবিক সহায়তা সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ রুটগুলো ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এবং দুবাই, দোহা ও আবুধাবির মতো গুরুত্বপূর্ণ হাবগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সরবরাহ ব্যয় ও সময়— দুইই বেড়ে গেছে।

এর ফলে খাদ্য, জ্বালানি ও সারসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম হু হু করে বাড়ছে সুদানে, যা আরও বেশি মানুষকে ক্ষুধার ঝুঁকিতে ঠেলে দিচ্ছে বলে সতর্ক করেছেন স্মিথ।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা, বিবিসি, জাতিসংঘ, ইউনিসেফ

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

গাজায় দিনে ৪৭ নারী ও কন্যাশিশুকে হত্যা করেছে ইসরায়েল

জেনেভায় এক সংবাদ সম্মেলনে ইউএন উইমেনের মুখপাত্র সোফিয়া ক্যালটর্প বলেন, ইসরায়েলি বিমান হামলা ও স্থল সামরিক অভিযানে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত গাজায় ৩৮ হাজারের বেশি নারী ও কন্যাশিশু নিহত হয়েছে। এর মধ্যে নারী ২২ হাজারের বেশি, কন্যাশিশু প্রায় ১৬ হাজার।

৪ ঘণ্টা আগে

নেতানিয়াহুর জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধে জড়িয়েছেন ট্রাম্প: কমলা হ্যারিস

হ্যারিস বলেন, ট্রাম্প এমন একটি যুদ্ধ শুরু করেছেন, যা ‘আমেরিকার জনগণ চায় না’ এবং এতে মার্কিন সেনাদের অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকির মধ্যে ফেলা হয়েছে।

৬ ঘণ্টা আগে

ডলারের বদলে চীনা মুদ্রা দিয়ে ইরানের তেল কিনছে ভারত

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ইরান ও রাশিয়ার তেল সমুদ্রপথে কেনাবেচার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা ৩০ দিনের জন্য শিথিল করে। ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় তা নিয়ন্ত্রণে আনতেই এই সিদ্ধান্ত নেয় ওয়াশিংটন। সেই সুযোগেই ইরানি তেল আমদানিতে সক্রিয় হয় ভারত।

৭ ঘণ্টা আগে

যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণ রাখতে ‘দৃঢ়প্রতিজ্ঞ’ ইরান

দেশটির সর্বোচ্চ নিরাপত্তা সংস্থা সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক বার্তায় জানিয়েছে, তেহরান যুদ্ধের চূড়ান্ত অবসান এবং এই অঞ্চলে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি দিয়ে যাতায়াতের ওপর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ কার্যকর রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

১৯ ঘণ্টা আগে