যিশুর সঙ্গলাভে উপবাসের নির্দেশ, ১৯০ শিশুর মৃত্যুতে দোষী কেনিয়ার ধর্মগুরু

কেনিয়ায় পল ম্যাকেঞ্জি নামে এক ধর্মগুরুকে ১৯১ জনকে হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেছেন দেশটির আদালত। নিহতদের মধ্যে একজন ছাড়া বাকি সবাই শিশু। অনুসারীদের সন্তানদের খাবার না দিয়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন ম্যাকেঞ্জি। তার দাবি ছিল, এভাবে মারা গেলে শিশুরা ‘যিশুর সঙ্গে মিলিত হতে’ পারবে।
একই মামলায় ম্যাকেঞ্জির ধর্মীয় গোষ্ঠীর আরও ২৮ নেতাকে হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। তারা সবাই নিজেদের নির্দোষ দাবি করেছিলেন। বারবার বলেছেন, কাউকে জোর করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়নি। ম্যাকেঞ্জির ধর্মীয় মতবাদে শিক্ষা গ্রহণ নিষিদ্ধ ছিল। আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থাকেও ‘অশুভ’ বলে বিবেচনা করা হতো।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়, সোমবার (১৯ অক্টোবর) কেনিয়ার বন্দরনগরী মোম্বাসায় আট ঘণ্টা ধরে রায় পড়ে শোনান বিচারক ডায়ানা মোচাচে। তিনি বলেন, ম্যাকেঞ্জির অনুসারীরা বিশ্বাস করতেন, তিনি ‘যিশুর মুখপাত্র’। মামলায় ম্যাকেঞ্জির সঙ্গে অভিযুক্ত একজন আদালতকে জানান, অনুসারীদের বলা হয়েছিল, কেউ উপবাসের নির্দেশ অমান্য করলে ‘লাথি ও ঘুষি মেরে তাকে স্বর্গে পাঠাতে হবে।’
বিচারক বলেন, যে বনে ধর্মীয় গোষ্ঠীটির ঘাঁটি ছি্ল, সেখানে মৃতদের কবর দেওয়াকে ‘বিয়ে’ বলা হতো। কেউ মারা গেলে সেটিকে ‘যিশুর সঙ্গে বিয়ে হয়েছে’ বলে উদযাপন করা হতো। এক সাক্ষী জানান, এক গর্ভবতী নারীকে তার নবজাতক সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াতে নিষেধ করা হয়েছিল। শিশুটি ১২ দিন পর মারা যায়। সাক্ষীর ভাষ্য, ‘ওই নারীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, যেন তিনি উপবাস করতে করতে মারা যান এবং তার সন্তানদের অনুসরণ করেন।’
-39e44c.jpg)
ম্যাকেঞ্জির সাবেক নিরাপত্তাপ্রধান এনোস আমানিয়া এনগালাকেও প্রথমে এ মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছিল। পরে সমঝোতার মাধ্যমে দোষ স্বীকার করে মামলার পক্ষে সাক্ষী হতে রাজি হন তিনি। ম্যাকেঞ্জি ও তার ধর্মীয় গোষ্ঠীর অন্য নেতাদের বিরুদ্ধে আরও কয়েকটি মামলা চলছে। এসব মামলায় সন্ত্রাসবাদ, উগ্রপন্থায় জড়িয়ে পড়তে মানুষকে প্ররোচিত করা এবং শিশুদের শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগ রয়েছে।
তবে হত্যার অভিযোগে এই প্রথম ম্যাকেঞ্জির বিরুদ্ধে রায় হলো। আগামী ৬ নভেম্বর তার সাজা ঘোষণা করা হবে। ২০২৩ সালে কেনিয়ার উপকূলের কাছে শাকাহোলা বনে অগভীর কবর থেকে ৪০০টির বেশি মরদেহ উদ্ধারের পর ম্যাকেঞ্জিকে গ্রেপ্তার করা হয়। দেশটির বিভিন্ন এলাকা থেকে অনুসারীদের নিয়ে ওই বনে বসতি গড়েছিলেন তিনি।
৬ সন্তান হারিয়ে বিচারের অপেক্ষায় ছিলেন বাবা
ধর্মীয় গোষ্ঠীটির কারণে নিজের ছয় সন্তানকে হারিয়েছেন ৪৮ বছর বয়সী স্টিফেন মুয়িতি। হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের মধ্যে তার সাবেক স্ত্রীও রয়েছেন। আদালতের বাইরে মুয়িতি বলেন, ‘সব অভিযুক্ত দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় আমি খুশি।’
রায় ঘোষণার আগে পরিবারের একটি ছবি হাতে নিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। মুয়িতি বলেন, ‘আমার ছয় সন্তানই শাকাহোলা বনে মারা গেছে। আমি শুধু আমার ছেলে স্যামুয়েলের দেহাবশেষ খুঁজে পেয়েছিলাম এবং তাকে কবর দিতে পেরেছিলাম।’
অগভীর কবর খুঁড়ে মরদেহ উদ্ধারের ভয়াবহ কাজে কাছের একটি শহর থেকে ১৭ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তাদের কেউ কেউ দিনে মাত্র ৮ ডলার বা ৬ পাউন্ড পারিশ্রমিক পেতেন।
কবর খোঁড়ার কাজে যুক্ত জেমস বলেন, ‘আমরা যে কবরই পেয়েছি, তাতেই অন্তত তিনটি মরদেহ ছিল। কিছু দেহাবশেষ ছিল মাত্র কয়েক সপ্তাহ বয়সী শিশুর।’ তিনি আরও বলেন, ‘একবার আমরা একটি কবরের ভেতর সারি করে রাখা ১২টি শিশুর মরদেহ পেয়েছিলাম। দৃশ্যটি ছিল ভয়াবহ। মরদেহগুলো কাপড়ের মতো সাজিয়ে রাখা হয়েছিল। একটি মরদেহের ওপর আরেকটি।’
কবর খোঁড়ার কাজে যুক্ত ব্যক্তিদের ভাষ্য, কিছু শিশুর হাত-পা বাঁধা ছিল। তাদের দেহ বিছানার চাদরে মোড়ানো ছিল। ম্যাকেঞ্জির অনেক অনুসারী কেনিয়ার অন্য এলাকা থেকে এসেছিলেন। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের পরিচিত কিছু মানুষও ওই গোষ্ঠীতে ছিলেন। সদস্যরা প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে এবং গালানা নদী থেকে পানি আনতে প্রায়ই কাছের শাকাহোলা শহরে যেতেন। নদীটি শহরের মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে।
আরেক গোরখোদক সালিম কারিসা বলেন, ‘আমরা কখনো কখনো মোটরসাইকেলে করে লোকজনকে বনের ভেতরে নিয়ে যেতাম। কিন্তু সবকিছু এত পরিকল্পিত ও গোপনে করা হতো যে ভেতরে আসলে কী ঘটছে, তা কেউ বুঝতে পারত না।’
শিক্ষা-চিকিৎসার বিরোধিতা, অনুসারীদের নিয়ে বনে আশ্রয়
২০০৩ সালে ‘গুড নিউজ ইন্টারন্যাশনাল মিনিস্ট্রিজ’ নামে একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন ম্যাকেঞ্জি। পরবর্তী ১৬ বছরে প্রতিষ্ঠানটির জনপ্রিয়তা বাড়ে। কেনিয়ার বিভিন্ন এলাকায় এর শাখা গড়ে ওঠে, অনুসারী হন হাজারো মানুষ। প্রতিষ্ঠানটির ‘টাইমস টিভি’ নামে একটি টেলিভিশন চ্যানেলও ছিল। মালিন্দি শহরে অবস্থিত ম্যাকেঞ্জির গির্জা থেকে দেওয়া ধর্মীয় বক্তব্য প্রচার করা হতো সেখানে।
পৃথিবীর শেষ সময় নিয়ে দেওয়া বক্তব্যে নানা ষড়যন্ত্রতত্ত্ব প্রচার করতেন ম্যাকেঞ্জি। শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবাকে তিনি নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করতেন। শিক্ষাকে ‘অশুভ’ বলতেন, চিকিৎসাসেবাকে ‘ধর্মীয় মতবাদের বিরোধী’ বলে দাবি করতেন। ডিজিটাল পরিচয়পত্রকে বর্ণনা করতেন ‘শয়তানের চিহ্ন’ হিসেবে।
ম্যাকেঞ্জির ছেলে ড্যান পল ম্যাকেঞ্জি ওই গির্জায় ক্যামেরাম্যান হিসেবে কাজ করতেন। তিনি বলেন, ‘শিশুরা পেছনে বসত, বড়রা বসত মাঝখানে। আর সবাই সকালজুড়ে ধর্মীয় গান গাইত।’ নিজেকে ধর্মযাজক হিসেবে পরিচয় দেওয়া ম্যাকেঞ্জি দুপুরে জ্বালাময়ী ধর্মীয় বক্তব্য দেওয়া শুরু করতেন। এসব বক্তব্যের কিছু অংশে মানুষের শরীর থেকে ‘অশুভ আত্মা তাড়ানোর’ কথা বলতেন তিনি।
২০১৯ সালে গির্জার প্রধান কেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর পল ম্যাকেঞ্জি শাকাহোলা বনে চলে যান এবং অনুসারীদেরও সেখানে যাওয়ার জন্য উৎসাহিত করেন।
ওষুধ নিষিদ্ধ, অসুস্থ হয়েও বাঁচার আশা ছাড়েননি তরুণ
২৩ বছর বয়সী পিটার শুকরানির মা তাকে নিয়ে শাকাহোলা বনে চলে গিয়েছিলেন। আট বছর বয়সে ম্যাকেঞ্জির গির্জায় যাওয়া শুরু করেন শুকরানি। তিনি ম্যাকেঞ্জিকে নিজের ‘আধ্যাত্মিক পিতা’ বলে বর্ণনা করেন। তার ভাষ্য, তিনি কখনোই ম্যাকেঞ্জির সম্পর্কে খারাপ কিছু বলবেন না।
বনে থাকার সময় অসুস্থ হয়ে পড়েন শুকরানি। কিন্তু সেখানে ওষুধ ব্যবহার নিষিদ্ধ থাকায় তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। শুকরানি বলেন, ‘আমাকে যে ওষুধগুলো খেতে দেওয়া হতো, আমার মা সেগুলো ফেলে দিতেন। কারণ, তিনি বিশ্বাস করতেন, একমাত্র ঈশ্বরই আমাকে সুস্থ করতে পারবেন।’
বনের মধ্যে মাটির তৈরি ঘর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। সেখানে কয়েক দিন উপবাসের পর অল্প কিছু খাবার খেয়ে দিন কাটাতেন অনুসারীরা। শুকরানি বলেন, ‘আমরা শান্তিতে স্বাভাবিক জীবন যাপন করতাম। কয়েক দিন উপবাস করতাম, তারপর অল্প কিছু খাবার খেতাম।’
২০২৩ সালের মার্চে স্থানীয় পশুপালকরা প্রথম মরদেহের সন্ধান পাওয়ার আগেই শত শত মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। কবর খোঁড়ার কাজে যুক্ত সালিম কারিসা বলেন, ‘আমরা কাউকে বনের বাইরে নিয়ে আসতাম। কিন্তু তাদের শরীর এত দুর্বল হয়ে পড়েছিল যে আমাদের হাতের মধ্যেই মারা যেতেন।’
বন থেকে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে শুকরানিও ছিলেন। উদ্ধারের আগে কয়েক সপ্তাহ ধরে অসুস্থ অবস্থায় বিছানায় পড়ে ছিলেন তিনি। তার মা ওষুধ ফেলে দেওয়ায় শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হয়েছিল। শুকরানি বলেন, ‘আমার মা বিশ্বাস করতেন, পাদরি ম্যাকেঞ্জির মতবাদ অনুযায়ী ওষুধ অশুভ।’ তিনি আরও বলেন, ‘শাকাহোলা বন থেকে আমাকে উদ্ধার করা না হলে আমি মারা যেতাম।’
নিজের জীবন ঝুঁকিতে পড়লেও শুকরানি এখনো ম্যাকেঞ্জিকে ভালো মানুষ মনে করেন। তার এই অবস্থান ওই ধর্মীয় গোষ্ঠীর প্রতি অনুসারীদের বিশ্বাসের গভীরতাও তুলে ধরে।
শত শত মৃত্যু, তবু ধর্মগুরুর প্রতি অটুট বিশ্বাস
মরদেহ পচে যাওয়ায় এখনো অনেকের পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। আদালতের নথিতে কয়েকটি মরদেহকে ‘অজ্ঞাতপরিচয় বালক’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে কবরের অবস্থান ও মরদেহ উদ্ধারের তারিখের ভিত্তিতে পরিচয় শনাক্তের চেষ্টা করা হয়েছে।
ম্যাকেঞ্জির অনুসারীদের মধ্যে নারী, পুরুষ ও শিশু ছিলেন। তদন্তে উঠে এসেছে, তাদের কেউ উপবাসে, কেউ শ্বাসরোধে, আবার কেউ মারধরের কারণে মারা গেছেন। এত মানুষের মৃত্যু ও নিজের কষ্টের অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও শুকরানি মনে করেন, ম্যাকেঞ্জি এমন একজন ‘ভালো মানুষ, যিনি আমার যত্ন নেন’।
রায় ঘোষণার আগে শুকরানি বলেন, ‘ম্যাকেঞ্জি কাউকে জোর করে উপবাস করাননি। মানুষ নিজেদের বিশ্বাস থেকে নিজেরাই এসব সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি এখনো তাকে ভালোবাসি এবং তিনি এখনো আমার পাদরি।’
অন্যদিকে, ম্যাকেঞ্জির ছেলে ড্যান মনে করেন, তার বাবাকে হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা উচিত। রায় ঘোষণার আগে তিনি বলেন, ‘তিনি ছিলেন নেতা। মানুষ তার দিকে তাকিয়ে থাকত, তাকে অনুসরণ করত। তাই গণহত্যার জন্য তিনিই দায়ী, তিনিই একজন হত্যাকারী।’














