ইরান যুদ্ধের ১০০ দিন— আলোচনায় অচলাবস্থা, ক্রমশই ফিকে হচ্ছে সমঝোতার সম্ভাবনা

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ০৭ জুন ২০২৬, ২২: ৩৪
ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পতাকা। ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ ১০০ দিনে গড়ালেও স্থায়ী ও কার্যকর যুদ্ধবিরতি কিংবা সমঝোতার কোনো সুস্পষ্ট পথ এখনো দৃশ্যমান হচ্ছে না। কয়েক দফা পরোক্ষ আলোচনা, এপ্রিলের নাজুক যুদ্ধবিরতি আর পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় প্রস্তাবিত সমঝোতা কাঠামো সত্ত্বেও দুপক্ষের অবস্থান এখনো বলতে গেলে দুই মেরুতে। একই সময়ে পারস্য উপসাগরে নতুন করে হামলা-পালটা হামলা, হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা ও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বাধা বিশ্ববাজারে অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে তুলেছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় শুরু হয় ইরান যুদ্ধ। দেখতে দেখতে রোববার (৭ জুন) সে যুদ্ধ গড়িয়েছে ১০০ দিনে। এখনো এ যুদ্ধে সবচেয়ে বড় অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনের পথটি এখনো স্বাভাবিকভাবে খুলে দেওয়া হয়নি।

ইরান বলছে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের ‘হুমকি’ পুরোপুরি দূর না হওয়া পর্যন্ত এবং কোনো ধরনের অবরোধের মুখে প্রণালির ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হবে না। অন্যদিকে ওয়াশিংটন জোর দিয়ে বলছে, যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে হরমুজ অবশ্যই কোনো শর্ত বা টোল ছাড়াই আন্তর্জাতিক নৌ পরিবহনের জন্য পুরোপুরি উন্মুক্ত থাকতে হবে।

আলোচনায় অচলাবস্থা

যুদ্ধ শুরুর ৪০ দিনের মাথায় পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণার পর শুরু হয় যুদ্ধবিরতি। তিন দিন পর ১১ এপ্রিল পাকিস্তানের উদ্যোগে দেশটির রাজধানী ইসলামাবাদে দুপক্ষের মধ্যে বহুল প্রতীক্ষিত বৈঠক হয়। প্রায় ২১ ঘণ্টা ধরে সেখানে দুপক্ষের মধ্যে আলোচনা হলেও দিনশেষে কোনো সমাধান আসেনি ‘ইসলামাবাদ টকস’ নামে সে সংলাপ থেকে। পরে পাকিস্তান বারবার উদ্যোগ নিলেও দ্বিতীয় দফায় আলোচনায় বসাতে পারেনি ইরান-যুক্তরাষ্ট্রকে।

এর মধ্যে গত কয়েক সপ্তাহে উভয় পক্ষই একাধিকবার আশাবাদী বক্তব্য দিলেও বাস্তবে আলোচনায় খুব কম অগ্রগতি হয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সম্প্রতি বলেছেন, আলোচনায় ‘কোনো বাস্তব অগ্রগতি’ হয়নি। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে এবং তিনি এখনো সমঝোতার সম্ভাবনা দেখছেন।

তবে গত সপ্তাহে ইরান কার্যত আলোচনার প্রক্রিয়া স্থগিত করার ঘোষণা দেয়। তেহরানের অভিযোগ, লেবাননে ইসরাইলি সামরিক অভিযান ও সাম্প্রতিক মার্কিন হামলা যুদ্ধবিরতির চেতনার পরিপন্থি। এরপর থেকেই আলোচনা আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

নতুন করে হামলা-পালটা হামলা

ইরান যুদ্ধে যেমন একদিকে শান্তি আলোচনা থমকে রয়েছে, অন্যদিকে তেমনি যুদ্ধবিরতির মধ্যেও সংঘাত পুরোপুরি থামছে না। গত সপ্তাহে কুয়েত, বাহরাইনসহ উপসাগরীয় অঞ্চলে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটে। মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, বেশির ভাগ হামলা প্রতিহত করা হয়েছে অথবা লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছানোর আগেই ব্যর্থ হয়েছে। জবাবে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি ইরানি রাডার স্থাপনায় হামলা চালায়।

সেনা প্রত্যাহারের কোনো পরিকল্পনা নেই

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্য, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে অন্তত ১৩ জন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন এবং কয়েকশ সেনা আহত হয়েছেন। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়েছেন, যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনা দ্রুত ফিরিয়ে আনার কোনো পরিকল্পনা তার নেই।

এনবিসির ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘কাজ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত’ সেনাদের সরানোর কথা ভাবছেন না তিনি। ট্রাম্পের ভাষায়, ‘তাদের ঝুঁকিতে আছে বলে আমি মনে করি না। আমাদের বিশ্বের সেরা প্রতিরক্ষা ও আক্রমণক্ষমতা রয়েছে। এখন সেনা প্রত্যাহার করা বোকামি হবে, কারণ প্রয়োজনে তাদের ব্যবহার করতে হতে পারে।’

হরমুজ নিয়ে ইরানের নতুন প্রস্তাব

এদিকে ইরানের আলোচক দলের সদস্য মাজিদ শাকেরি বলেছেন, তেহরান একটি ৩০ দিনের সময়সীমা ঘোষণা করার কথা বিবেচনা করছে। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সব ধরনের হুমকি দূর হওয়ার ৩০ দিন পর ইরানি প্রশাসনের অধীনে হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা যেতে পারে।

একই সঙ্গে প্রণালি ব্যবহারকারী জাহাজগুলোর কাছ থেকে নিরাপত্তা, নৌ নির্দেশনা, অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রম এবং পরিবেশ সুরক্ষা বাবদ ফি নেওয়ার পরিকল্পনাও পর্যালোচনা করছে ইরান। তেহরানের দাবি, এটি কেবল টোল নয়, বরং বিভিন্ন সেবা প্রদানের বিনিময়ে আদায় করা হবে।

বর্তমানে ইরানের অনুমতি নিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর কাছ থেকে গড়ে ১৫ থেকে ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত ফি নেওয়া হচ্ছে বলে দেশটির পার্লামেন্টের এক সদস্য জানিয়েছেন।

বৈশ্বিক প্রভাব বাড়ছে

যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও চাপ বাড়ছে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক না হওয়ায় জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে এবং তেলের দাম উচ্চ অবস্থানে রয়েছে। জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) সতর্ক করে বলেছে, যুদ্ধ ও জ্বালানি মূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে বিশ্বজুড়ে আরও কয়েক কোটি মানুষ খাদ্য সংকটে পড়তে পারে।

যুদ্ধ থামবে?

১০০ দিন আগে শুরু হওয়া এই সংঘাত এখন এমন একপর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধও চলছে না, আবার স্থায়ী শান্তির পথও তৈরি হয়নি। এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি টিকে থাকলেও হরমুজ প্রণালি, ইরানের স্থগিত আলোচনার সিদ্ধান্ত, আঞ্চলিক হামলা এবং ক্ষতিপূরণ ও নিষেধাজ্ঞা নিয়ে মতবিরোধের কারণে চূড়ান্ত সমঝোতা এখনো অধরাই রয়ে গেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, আগামী কয়েক সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং উভয় পক্ষের সরাসরি বা পরোক্ষ আলোচনায় ফেরা— এই দুই বিষয়ই নির্ধারণ করবে যুদ্ধটি শান্তির দিকে এগোবে, নাকি নতুন করে বড় ধরনের সংঘাতে রূপ নেবে।

সূত্র: রয়টার্স, আলজাজিরা, বিবিসি, গার্ডিয়ান, আইটিভি, গালফ নিউজ

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

সব তেলাপোকা এক হও— দিল্লিতে ‘জেন জি’দের নজিরবিহীন বিক্ষোভ

শনিবার দিল্লির যন্তর মন্তরে মোদি সরকারের শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে দিপক এবং তার সঙ্গে জড়ো হওয়া শত শত তরুণ যে বিক্ষোভ প্রদর্শন করলেন, তা আর কোনো তামাশা বা রসিকতার পর্যায়ে নেই। বিক্ষোভে অংশ নেওয়া এক বিশাল জনসমুদ্রের উদ্দেশে দিপক বলেন, ‘মোদি সরকারের প্রতি আমাদের বার্তা একদম পরিষ্কার ও সহজ: শিক্ষা

১ দিন আগে

রুশ ভূখণ্ডে ইউক্রেনের নজিরবিহীন ড্রোন হামলা, সেন্ট পিটার্সবার্গে জরুরি সতর্কতা

রাশিয়ার বার্ষিক অর্থনৈতিক ফোরামের সমাপনী দিনে এই হামলা চালানো হয় বলে জানিয়েছে রুশ কর্তৃপক্ষ। আঞ্চলিক গভর্নর আলেকজান্ডার দ্রোজদেন্দো জানিয়েছেন, সেন্ট পিটার্সবার্গের চারপাশের লেনিনগ্রাদ অঞ্চলে আকাশেই ১৪০টিরও বেশি ইউক্রেনীয় ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে।

১ দিন আগে

বিদ্যুৎ বিপর্যয়, মূল্যস্ফীতি, জনরোষ— যুদ্ধ শেষে ইরানের সামনে কঠিন বাস্তবতা

যুদ্ধকালীন জাতীয় ঐক্য পার হয়ে এক ঝুঁকিপূর্ণ ও চরম বাস্তবতার পথে পা বাড়াতে যাচ্ছে ইরান। এই বাস্তবতা হলো— দেশটির আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতি, অর্থনীতির ১০ শতাংশ সংকোচন, তীব্র বিদ্যুৎ বিপর্যয় এবং সরকারের নজিরবিহীন ভিন্নমত দমনের বিরুদ্ধে ওঠা তীব্র জনরোষের এক অগ্নিপরীক্ষা।

২ দিন আগে

দিল্লির যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির সমাবেশ

সকাল সাড়ে ১০টার দিকে অভিজিৎ দীপকে সরাসরি যন্তর মন্তরে পৌঁছান। সাদা টি-শার্ট, কালো জ্যাকেট ও টুপি পরিহিত অভিজিতের হাতে ছিল ভারতীয় সংবিধানের অন্যতম রূপকার ভীমরাও আম্বেদকরের আত্মজীবনী।

২ দিন আগে