হরমুজ প্রণালি নিয়ে চুক্তি হতে পারে বুধবারের মধ্যেই

ডেস্ক, রাজনীতি ডটকম
আপডেট : ০৫ আগস্ট ২০২৬, ০০: ০১
ইরান যুদ্ধের শুরু থেকেই উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে হরমুজ প্রণালি। প্রতীকী ছবি

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের অবসান ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করার লক্ষ্যে কূটনৈতিক তৎপরতায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে বলে জানিয়েছে কাতার। মধ্যস্থতাকারীদের আশা, সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে বুধবারের মধ্যেই একটি সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব হতে পারে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি কোনো আলোচনা চলছে— এমন দাবি এখনো অস্বীকার করে আসছে ইরান। পরোক্ষ আলোচনার কোনো অগ্রগতিও তারা জানায়নি।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও এএফপির খবরে বলা হয়, হরমুজ প্রণালি নিয়ে চুক্তির বিষয়ে মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) কাতারের এমন মন্তব্যের পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ৪ শতাংশের বেশি কমে গেছে। এর আগের দিনও সম্ভাব্য সমঝোতার খবরে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম কমেছিল। বাজারের প্রত্যাশা, হরমুজ প্রণালি খুলে গেলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক হবে এবং দীর্ঘদিনের অস্থিরতা কমবে।

এর আগে সোমবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়েছে এবং তেহরানের জন্য এটি সমঝোতায় পৌঁছানোর ‘শেষ সুযোগ’। তবে ইরানের কর্মকর্তারা স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো আলোচনা চলছে না।

ইরানি কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বর্তমানে কেবল ওমানের সঙ্গে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও নৌ চলাচল নিয়ে আলোচনা হচ্ছে এবং এই সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো বড় বৈঠকের পরিকল্পনা নেই।

দুই দেশের বক্তব্যে স্পষ্ট পার্থক্য থাকলেও ওয়াশিংটনের শীর্ষ কর্মকর্তারা কূটনৈতিক অগ্রগতির বিষয়ে আশাবাদী। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, “হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার লক্ষ্যে চলমান আলোচনায় ‘উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি’ হয়েছে। তবে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। আমরা আশা করছি, খুব শিগগিরই তা হবে।”

মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টও একই ধরনের আশাবাদ জানিয়ে বলেন, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার বিষয়ে ইরানের সঙ্গে মঙ্গলবার অথবা বুধবারের মধ্যেই একটি সমঝোতা হতে পারে।

এদিকে কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি জানান, মধ্যস্থতাকারীদের প্রচেষ্টা এখন ‘খুবই অগ্রসর পর্যায়ে’ পৌঁছেছে। তার ভাষ্য, কাতার, পাকিস্তান ও ওমান সমন্বিতভাবে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে খসড়া প্রস্তাব আদান-প্রদান এবং যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে।

পাকিস্তানের এক জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, ‘পর্দার আড়ালে অনেক কিছুই ঘটছে। আমরা উভয় পক্ষের সঙ্গে কথা বলছি। এই মুহূর্তে আমাদের একমাত্র লক্ষ্য, অন্তত তাদের আবার আলোচনার টেবিলে বসানো।’

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে যুদ্ধের কারণে সবচেয়ে বড় কৌশলগত চাপ তৈরি হয়েছে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে। বিশ্বে সমুদ্রপথে পরিবাহিত অপরিশোধিত তেল এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় ২০ শতাংশ এই জলপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে প্রণালিতে নৌ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে।

মঙ্গলবারও ওমান উপকূলের কাছে হরমুজ প্রণালির প্রবেশমুখে একটি পণ্যবাহী জাহাজ অজ্ঞাত একটি বস্তুর আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও। পরে জানা যায়, সেটি একটি শুকনো পণ্যবাহী (ড্রাই বাল্ক) জাহাজ। হামলার পর নাবিকদের জাহাজ ছেড়ে সরে যেতে হয় এবং একজন নাবিক নিখোঁজ রয়েছেন।

হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে ইরানের অবস্থানও অপরিবর্তিত রয়েছে। তেহরান দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, ওমানের সঙ্গে যৌথভাবে এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে থাকা উচিত। তবে গত সপ্তাহে ওমানের দেওয়া একটি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান, যেখানে যৌথ তদারকি ও জাহাজ থেকে স্বেচ্ছা ফি আদায়ের কথা বলা হয়েছিল।

ইরানের একটি জ্যেষ্ঠ সূত্র জানিয়েছে, তেহরান হরমুজে প্রবেশকারী জাহাজগুলোর ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এবং বেরিয়ে যাওয়া জাহাজগুলোর গতিবিধি পর্যবেক্ষণের ক্ষমতা চায়। প্রয়োজনে সেসব জাহাজে হস্তক্ষেপ করার অধিকারও তারা রাখতে চায়।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এমন দাবি মেনে নেওয়া হলে মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আসবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটিও প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়বে যে ফেব্রুয়ারিতে ইসরায়েলের সঙ্গে শুরু করা সামরিক অভিযান ইরানকে দুর্বল করতে সক্ষম হয়েছে।

এদিকে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তার বরাতে জানা গেছে, দীর্ঘমেয়াদি হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ-নির্ভুলতাসম্পন্ন দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে, যা ভবিষ্যৎ সংঘাত মোকাবিলার সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

অন্যদিকে উপসাগরীয় অঞ্চলের কূটনীতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ইরান বুঝতে পেরেছে যে সরাসরি সামরিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রকে হারানো সম্ভব নয়। তাই দেশটি আঞ্চলিক বাণিজ্যপথ, জ্বালানি অবকাঠামো ও নৌ চলাচলকে চাপের কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছে, যাতে সংঘাতের অর্থনৈতিক মূল্য ক্রমাগত বাড়তে থাকে।

তবে এখন নজর বুধবারের দিকে। কূটনৈতিক তৎপরতা সফল হলে শুধু হরমুজ প্রণালিই নয়, কয়েক মাস ধরে চলা ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতও একটি নতুন মোড়ে পৌঁছাতে পারে। আর আলোচনা ভেস্তে গেলে মধ্যপ্রাচ্যে আবারও পূর্ণমাত্রার সামরিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশ্লেষকরা।

ad
ad

বিশ্ব রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন

ইরান ইস্যুতে এখনো যে বড় ভুলটি করেননি ট্রাম্প

কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হতে থাকলে ট্রাম্পের সামনে কয়েকটি কঠিন বিকল্প রয়েছে। তিনি কি এখনকার মতো ফলহীন বিমান হামলা, নড়বড়ে যুদ্ধবিরতি এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের সামুদ্রিক অবরোধের ধারাবাহিকতা বজায় রাখবেন, যা যুদ্ধের কোনো স্থায়ী সমাধান দিচ্ছে না?

১৪ ঘণ্টা আগে

সমঝোতায় আসাটাই শেষ সুযোগ, ইরানকে ট্রাম্পের আলটিমেটাম

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো ধরনের সরাসরি আলোচনা চলছে না—ইরানের পক্ষ থেকে এমন বক্তব্য আসার পরই ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর জবাবে গতকাল সোমবার (৩ আগস্ট) নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে তিনি এই হুঁশিয়ারি দেন।

১৫ ঘণ্টা আগে

ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে প্রাণহানি ৬ হাজার ছাড়াল, আহত অর্ধলক্ষাধিক

এদিকে ভূমিকম্পের এতদিন পরও নিখোঁজ স্বজনদের উদ্ধার করতে না পেরে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সাধারণ নাগরিকরা। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় সরকার ও সামরিক বাহিনী প্রয়োজনীয় ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে।

১৭ ঘণ্টা আগে

রাশিয়া ও ইউক্রেনে পাল্টাপাল্টি ড্রোন-মিসাইল হামলা, নিহত অন্তত ২২

রাশিয়ার দক্ষিণাঞ্চলীয় ক্রাসনোদার অঞ্চলের গভর্নর ভেনিয়ামিন কনদ্রাতিয়েভ জানান, সোমবার (৩ আগস্ট) গেলেনঝিকের নিকটবর্তী পর্যটনগ্রাম আরখিপো-ওসিপোভকায় একটি ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ পড়ে অন্তত সাতজন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে তিন শিশু রয়েছে। এ ঘটনায় আরও প্রায় ৪০ জন আহত হন।

১৭ ঘণ্টা আগে