পোল্ট্রি খামার: লোকসানে প্রান্তিক খামারিরা

ড. মিহির কুমার রায়

বিশ্ব জুড়ে মানুষের খাদ্যতালিকায় প্রোটিনের অন্যতম প্রধান উৎস এখন পোল্ট্রি বা ফার্মের মুরগির মাংস। জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং মানুষের অর্থনৈতিক উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে এই মাংসের চাহিদাও দিন দিন বাড়ছে। তবে এই প্রতিযোগিতায় বিশ্ববাজারে এখনো বেশ পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) তথ্যমতে, বিশ্বে মুরগির মাংস উৎপাদনে শীর্ষ ৫০টি দেশের মধ্যেও নেই বাংলাদেশ। প্রতিবেশী ভারত, পাকিস্তান, এমনকি শ্রীলঙ্কাও এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের তুলনায় এগিয়ে রয়েছে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার বৈশ্বিক উৎপাদন ডাটাবেজের (FAOSTAT) সর্বশেষ তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ফার্মের মুরগির (তাজা ও প্রক্রিয়াজাত) মোট উৎপাদন হয়েছে ২ লাখ ৩২ হাজার ৫০৭ দশমিক ৬৭ মেট্রিক টন। এই উৎপাদন নিয়ে বিশ্বের ১৮৭টি দেশ ও অঞ্চলের মধ্যে বাংলাদেশ ৫৩তম অবস্থানে রয়েছে। দেশের অভ্যন্তরে পোল্ট্রি শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটলেও বৈশ্বিক বাজারে উৎপাদন ও প্রতিযোগিতার দৌড়ে বাংলাদেশ এখনো বেশ পিছিয়ে। বিশেষ করে আধুনিক প্রযুক্তির অভাব, পোল্ট্রি খাদ্যের উচ্চমূল্য এবং খামারিদের সঠিক প্রশিক্ষণের ঘাটতি এ খাতে আশানুরূপ অগ্রগতির বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ফার্মের মুরগি উৎপাদনের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ শীর্ষ তিন দেশের মধ্যে জায়গা করতে পারেনি। এফএওর তথ্য অনুযায়ী, এ অঞ্চলে উৎপাদনের দিক থেকে বাংলাদেশ বর্তমানে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তালিকা অনুযায়ী বর্তমানে নিবন্ধিত পোল্ট্রি খামারের সংখ্যা প্রায় ৮৬ হাজার। সব মিলিয়ে দেশে বর্তমানে পোল্ট্রি খামারের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৩৬ হাজার, যা পাঁচ বছর আগে প্রায় ২ লাখ ছিল। গত পাঁচ বছরে প্রায় ৬৪ হাজার খামার উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন (বিপিআইএ)। সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, নিবন্ধিত খামারের পাশাপাশি দেশে প্রায় ৫০ হাজার অনিবন্ধিত খামারও পরিচালিত হচ্ছে।

দীর্ঘদিন ধরে ডিম উৎপাদনকারী খামারিরা উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় কম দামে ডিম বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে তারা ধারাবাহিকভাবে লোকসানের মুখে পড়ছেন। এ অবস্থায় খামারিদের টিকিয়ে রাখতে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ এবং কার্যকর নীতিগত সহায়তা জরুরি।

পোল্ট্রি শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে সরকার, খামারি ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। অন্যথায় উৎপাদন কমে যাওয়ার ফলে ভবিষ্যতে বাজারে ডিম ও মুরগির সরবরাহে সংকট তৈরি হতে পারে, যার প্রভাব সরাসরি সাধারণ ভোক্তাদের ওপর পড়বে। পোল্ট্রি খাতকে টেকসই রাখতে এখনই বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণের বিকল্প নেই। খামারিদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদনও বাড়বে, বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরবে এবং দেশের প্রাণিজ আমিষের নিরাপদ সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্পের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে এফএওর ডাটাবেজ থেকে স্পষ্ট যে, এ খাতে এখনো বিশাল উন্নতির সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ বর্তমানে ৫৩তম অবস্থানে থাকলেও অভ্যন্তরীণ বাজারে ব্রয়লার ও সোনালি মুরগির চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। দেশে পোল্ট্রি খাতের মাধ্যমে লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। তবে খাত-সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মুরগির মাংসের উৎপাদন আরও বাড়াতে হলে পোল্ট্রি ফিডের দাম কমাতে হবে। কারণ, মুরগি উৎপাদনের মোট ব্যয়ের প্রায় ৭০ শতাংশই খাদ্যের পেছনে ব্যয় হয়। পাশাপাশি খামারিদের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করা এবং বার্ড ফ্লুসহ বিভিন্ন রোগবালাই প্রতিরোধে উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ বিশ্বতালিকায় আরও এগিয়ে যেতে পারবে।

পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমানে বাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্পে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। এটি দেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় চালিকাশক্তি। এ শিল্পে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নিয়োজিত রয়েছেন ৬০ লাখের বেশি মানুষ। সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক তথ্য হলো, এই বিপুলসংখ্যক কর্মীর প্রায় ৪০ শতাংশই নারী। তারা শুধু শ্রমিক হিসেবেই কাজ করছেন না, বরং অনেকেই নিজ উদ্যোগে খামার গড়ে তুলেছেন।

আধুনিক কৃষি ও পোল্ট্রি শিল্প এখনো দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় খাত। অন্ধের মতো চাকরির পেছনে না ছুটে, সঠিক পরিকল্পনা ও বিচক্ষণতার সঙ্গে কৃষিতে বিনিয়োগ বেকারত্ব দূর করার কার্যকর উপায় হতে পারে। তবে এই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা। কৃষি প্রশিক্ষণের কার্যকর ব্যবস্থা, সহজ শর্তে ঋণ, বাজার সম্প্রসারণ এবং কৃষিশিল্পের বিকাশে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত ও পরিকল্পিত উদ্যোগ দেশের কৃষি অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।

আমাদের প্রত্যাশা, যথাযথ কর্তৃপক্ষ তৃণমূল পর্যায়ের এসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে। তরুণদের পেশাগত দক্ষতা অর্জনে কার্যকর ভূমিকা রাখার পাশাপাশি নতুন উদ্যোক্তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা গেলে কৃষির হাত ধরেই গড়ে উঠবে আগামীর সমৃদ্ধ ও আত্মনির্ভরশীল বাংলাদেশ।

লেখক: কৃষি অর্থনীতিবিদ

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

পাঠ্যবই: প্রাথমিকে কী শেখানো হচ্ছে চাকমা শিক্ষার্থীদের?

কী আছে চাকমা ভাষা ও হরফে রচিত পাঠ্যবইগুলোতে? বইগুলো পর্যালোচনায় অসংখ্য ভুল, অসঙ্গতি ও মানহীন রচনা পাওয়া গেছে। রয়েছে ভুলে ভরা বানান, শব্দের অপপ্রয়োগ, দুর্বল লিখনশৈলী ও ধারাবাহিকতার অভাব। পেশাদারিত্বের বিশাল অনুপস্থিতি স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। ভিনভাষার ছড়াকে অনুকরণ করে চাকমারূপ দেওয়া হয়েছে। এখানে কিছু অসঙ

১১ দিন আগে

রাজনৈতিক কৌশল নাকি ভাষার অবক্ষয়?

অশালীন ভাষার এই বিস্তার কেবল আবেগের বহির্প্রকাশ নয়, অনেক ক্ষেত্রেই এটি একটি রাজনৈতিক কৌশল। যখন কোনো গোষ্ঠী ইচ্ছাকৃতভাবে বিতর্ককে যুক্তির জায়গা থেকে সরিয়ে অপমান, কুরুচি ও যৌন ইঙ্গিতের দিকে নিয়ে যায়, তখন প্রকৃত রাজনৈতিক প্রশ্নগুলো আড়ালে চলে যায়। নীতির আলোচনা হারিয়ে যায়, জবাবদিহি দুর্বল হয়, আর জনপরিসর

১৪ দিন আগে

ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ও রাষ্ট্রধর্ম নিয়ে রাজনীতি— উভয় পক্ষের শুভবুদ্ধির উদয় হোক

জানাজার দিনে সাক্ষাৎকার নেওয়ার পরিকল্পনা ছিল না। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার হিসেবে আমার চেহারা ছিল স্যারের কাছে পরিচিত। অনেকদিন পর কাছে পেয়ে উনি মন খুলে কথা বললেন। বেশ স্বাভাবিকভাবে কুশলাদি জিজ্ঞাসা করলেন। উনি যে সন্তানহারা বাবা, তা তখন মনে হয়নি। ওনার মনোবল দেখে বিস্মিত হয়েছিলাম।

১৮ দিন আগে

পুঁজিবাজার ধনাত্মক ধারায়: ধরে রাখাই চ্যালেঞ্জ

দীর্ঘ সময়ের অস্থিরতা ও আস্থাহীনতার পর দেশের পুঁজিবাজার আবার ধনাত্মক ধারায় ফিরতে শুরু করেছে। জাতীয় বাজেটে কর-সুবিধা ও নীতি-সহায়তার ইতিবাচক প্রভাব ইতোমধ্যে বাজারে দৃশ্যমান। তবে এ ইতিবাচক ধারা ধরে রাখাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

১৯ দিন আগে