এখনই চাই ‘শিক্ষক সুরক্ষা আইন’

জাকির আহমদ খান কামাল

চক হাতে যে মানুষটি জাতির ভবিষ্যৎ লেখেন, আজ তার নিজের ভবিষ্যৎই সবচেয়ে অনিরাপদ। ক্লাসরুমে পাঠদান করতে গিয়ে শিক্ষার্থীর হাতে লাঞ্ছিত হচ্ছেন শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যে হেনস্তার শিকার হচ্ছেন অধ্যাপক, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের নিয়ে চলছে অশ্লীল ট্রল ও মানহানি।

সম্প্রতি চুয়াডাঙ্গায় এক শিক্ষকের লাঞ্ছনার ঘটনায় তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে জামালপুরে শিক্ষকরা মানববন্ধন করেছেন এবং অবিলম্বে ‘শিক্ষক সুরক্ষা আইন’ প্রণয়নের দাবি তুলেছেন। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি এখন বাংলাদেশের শিক্ষাঙ্গনের উদ্বেগজনক বাস্তবতা।

কেন আজ শিক্ষক এত অসহায়? কারণ রাষ্ট্রের আইনেই তাদের সুরক্ষার জন্য আলাদা ও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেই। বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ কিংবা শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নীতিমালায় শিক্ষকদের কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষার বিষয়ে সুস্পষ্ট বিধান নেই।

শ্রম আইনে একজন শ্রমিকের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার অধিকার নিশ্চিত হলেও একজন শিক্ষক প্রায়ই স্কুল পরিচালনা কমিটির রাজনীতি, স্থানীয় প্রভাবশালীদের চাপ এবং অভিভাবকদের অযৌক্তিক আচরণের কাছে অসহায় হয়ে পড়েন।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও শিক্ষকদের নিরাপত্তাহীনতা আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি উচ্চশিক্ষা ও রাষ্ট্রের আইনি কাঠামোর ওপর গুরুতর আঘাত। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে রাজশাহীসহ দেশের কয়েকটি শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের প্রকাশ্যে হেনস্তার ঘটনা সেই বাস্তবতারই প্রমাণ।

মনে রাখতে হবে, শিক্ষক কেবল পাঠদান করেন না, তিনি একটি জাতির নৈতিক মেরুদণ্ড গড়ে তোলেন। শিক্ষকের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়া মানেই রাষ্ট্রের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়া। যখন একজন শিক্ষার্থী তার শিক্ষকের গায়ে হাত তোলে এবং তার যথাযথ বিচার হয় না, তখন একটি প্রজন্ম শিখে— জ্ঞান নয়, শক্তিই শ্রেষ্ঠ।

যে জাতি শিক্ষককে কাঁদায়, সে জাতি নিজের ভবিষ্যৎকেই অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়।

তাই এখন আর মানববন্ধন বা নিন্দা প্রস্তাবে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। প্রয়োজন একটি পূর্ণাঙ্গ ‘শিক্ষক সুরক্ষা আইন’। এই আইনে অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে—

  • শিক্ষকের ওপর শারীরিক হামলা, গালিগালাজ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানহানি ও মিথ্যা মামলা দায়েরকে কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে হবে;
  • এসব ঘটনার বিচার ৯০ দিনের মধ্যে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে সম্পন্ন করতে হবে;
  • শিক্ষককে জোর করে পদত্যাগে বাধ্য করা, শ্রেণিকক্ষে অপমান করা কিংবা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে;
  • শিক্ষার্থীদের জন্য বাধ্যতামূলক আচরণবিধি প্রণয়ন করতে হবে, যেন তারা অধিকার ও শৃঙ্খলার সীমারেখা সম্পর্কে সচেতন হয়।

শিক্ষক বাঁচলে শিক্ষা বাঁচবে, শিক্ষা বাঁচলে দেশ বাঁচবে। শিক্ষকদের আর করুণা নয়— প্রয়োজন আইনের সুরক্ষা। রাষ্ট্রকে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে— শিক্ষককে সুরক্ষা দেবে, নাকি জাতির ভবিষ্যৎকে অনিরাপদ রেখেই এগিয়ে যাবে?

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও কলামিস্ট

ad
ad

মতামত থেকে আরও পড়ুন

কী দিয়েছে ৫ আগস্ট, কী দিতে পারেনি?

আজ ৫ আগস্ট ২০২৬। সেই দুপুরের ঠিক দুই বছর পর। যে মিছিল সেদিন শাহবাগ, শহিদ মিনার আর যমুনার সামনের রাস্তায় থেমে গিয়েছিল আনন্দ-উল্লাসে, তার পায়ের শব্দ আজও যেন মিলিয়ে যায়নি। বদলেছে সরকার, বদলেছে সংসদ, বদলেছে রাষ্ট্রের নথিপত্র। কিন্তু সেই দিনের প্রশ্নগুলো এখনো বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে।

৩ দিন আগে

৫ আগস্ট: ইতিহাস নির্মাণের গণঅভ্যুত্থান দিবস

বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি দিন ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা টানা কয়েক সপ্তাহের ছাত্র-জনতার বিক্ষোভ, রক্তক্ষয় এবং দেশ জুড়ে অশান্তির পর ক্ষমতা ত্যাগ করে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। তার পতনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ক্ষমতার মসনদে চেপে বসা ১৬ বছরের স্বৈরশাসনের অবসান ঘটে।

৩ দিন আগে

চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন সমীকরণ

বাংলাদেশ আজ আর সাহায্যনির্ভর রাষ্ট্র নয়; বরং উদীয়মান একটি আঞ্চলিক অর্থনীতি। সেই বাস্তবতার আলোকে কূটনীতিও হতে হবে আত্মবিশ্বাসী, ভারসাম্যপূর্ণ এবং দূরদর্শী। বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলোর সঙ্গে বন্ধুত্ব বজায় রেখে, কিন্তু কারও প্রভাববলয়ে আবদ্ধ না হয়ে, বাংলাদেশ তার সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা অটু

৪ দিন আগে

নদী থেকে থালায়— মাইক্রোপ্লাস্টিকের নীরব আগ্রাসনে বাংলাদেশ

মাইক্রোপ্লাস্টিক কীভাবে মাছে প্রবেশ করে? নদীতে ফেলা প্লাস্টিক সূর্যের আলো, তাপ, ঢেউ ও ঘর্ষণের ফলে ক্ষুদ্র কণায় ভেঙে যায়। প্ল্যাংকটন, চিংড়ি, শামুক এবং ছোট মাছ এগুলো খাদ্য ভেবে গ্রহণ করে। পরে বড় মাছ সেই ছোট মাছ খায়।

৭ দিন আগে